তাকওয়া ও রমজান সামাজিক নিরাপত্তার অবলম্বন
· Prothom Alo

রমজান হলো তাকওয়ার মাস। আল্লাহ–তাআলা কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘হে মুমিনেরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৩)
Visit asg-reflektory.pl for more information.
রোজার মূল উদ্দেশ্য শুধু না খেয়ে থাকা নয়; এর লক্ষ্য মানুষের ভেতরে আল্লাহভীতি, আত্মসংযম ও নৈতিক শক্তি গড়ে তোলা। তাকওয়া মানে সাবধানতা, সতর্কতা এবং আল্লাহর অসন্তোষের ভয়। এটি মূলত অন্তরের অবস্থা—কলবের রোজা।
রমজানে একজন মানুষ দিনের বেলায় বৈধ খাওয়াদাওয়া ও দাম্পত্য সম্পর্ক থেকেও বিরত থাকেন। নির্জনে, কারও নজরদারি ছাড়া থাকলেও তিনি রোজা ভাঙেন না। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই তাকে শিখিয়ে দেয়, মানুষের আসল নিয়ন্ত্রক তার বিবেক ও ইমান। এভাবেই রোজা মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে থাকা এবং নেক কাজে দৃঢ় থাকার মানসিক শক্তি দেয়—এটাই তাকওয়ার বাস্তব প্রশিক্ষণ।
মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো হিদায়াত বা সঠিক পথের দিশা। আল্লাহ আমাদের দোয়া করতে শিখিয়েছেন, ‘আমাদের সরল পথ দেখান।’ (সুরা-১ ফাতিহা, আয়াত: ৪) পবিত্র কোরআন আবার বলছে, ‘এই কিতাব মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২)
অর্থাৎ তাকওয়া ছাড়া প্রকৃত হিদায়াত অর্জন সম্ভব নয়। যারা ইমান আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তাদের কোনো ভয়
নেই, তারা চিন্তিতও হবে না।’ (সুরা-১০ ইউনুস, আয়াত: ৬২)
মুত্তাকি অর্থ পরহেজগার, সতর্ক, সচেতন বা তাকওয়াবান ব্যক্তি, যার বহুবচন হলো মুত্তাকুন ও মুত্তাকিন। তাকওয়া শব্দের একটি প্রতিশব্দ হলো ‘খওফ’।
তাকওয়া মানে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক জীবনব্যবস্থা। তাকওয়া মানে সৎ চরিত্র, ন্যায়পরায়ণতা, মানুষের অধিকার রক্ষা, হালাল-হারাম মেনে চলা এবং লোভমুক্ত জীবন।
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যারা তার রবের সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে দুটি করে জান্নাত।’ (সুরা-৫৫ রহমান, আয়াত: ৪৬) তাকওয়া শব্দের আরেকটি প্রতিশব্দ হলো ‘খশিয়াত’। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তুমি শুধু তাকেই সতর্ক করতে পারো, যে উপদেশ (কোরআন) মেনে চলে এবং না দেখেও দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে। তুমি তাকে ক্ষমা ও সম্মানজনক পুরস্কারের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা-৩৬ ইয়াছিন, আয়াত: ১১)
অতিরিক্ত ভোগ-লালসা, ক্রোধ, লোভ, অহংকার, মোহ, ঈর্ষা—এ ধরনের নফসে আম্মারা পরিচালিত প্রবৃত্তি দমনে রোজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রোজা শুধু পেটের রোজা নয়; এটি চোখ, কান, জিব, হাত, পা ও মন—সবকিছুর রোজা। মুখের রোজা হলো মিথ্যা, কটুবাক্য ও গিবত থেকে বিরত থাকা। চোখের রোজা হারাম দৃশ্য বর্জন করা। কানের রোজা হারাম কথা না শোনা। হাত-পায়ের রোজা অন্যায় কাজে ব্যবহার না করা। মন ও অন্তরের রোজা হলো পাপের চিন্তা থেকেও দূরে থাকা। আল্লাহ বলেছেন, ‘শ্রবণ, দর্শন ও অন্তর—সবকিছু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা-১৭ ইসরা, আয়াত: ৩৬)
তাকওয়া মানে শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক জীবনব্যবস্থা। তাকওয়া মানে সৎ চরিত্র, ন্যায়পরায়ণতা, মানুষের অধিকার রক্ষা, হালাল-হারাম মেনে চলা এবং লোভমুক্ত জীবন। তাকওয়া মানুষকে আত্মরক্ষার শক্তি দেয়—অন্যায় ও পাপ থেকে নিজেকে বাঁচানোর সামর্থ্য দেয়। ব্যক্তিজীবনে তাকওয়া এলে পরিবারে আসে শান্তি, সমাজে গড়ে ওঠে নিরাপত্তা ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবেশ।
বৈষম্যহীন, ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার ভিতও তৈরি হয় এখান থেকেই। আর পরকালে এর ফল হলো মুক্তি ও কল্যাণ। তাই রমজান কেবল একটি মাস নয়; এটি এমন এক নৈতিক বিদ্যালয়, যেখানে মানুষ সারা জীবনের জন্য আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের পাঠ নেয়।
অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম