সমতার পাল্লায় পোশাকশিল্পের নারী কি শুধুই সংখ্যা

· Prothom Alo

যে নারীদের কাঁধে ভর করে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বিশ্ববাজারে সাফল্যের গল্প লিখছে, তাঁদের জীবন যদি অনিশ্চয়তা, বঞ্চনা ও অবহেলার ভেতরেই আটকে থাকে, তাহলে সেই সাফল্যের গল্প কখনোই পূর্ণতা পাবে না।

ঢাকা ইপিজেডের কাছেই বলিভদ্র বাজার। ব্যস্ত এই বাজারের উল্টো পাশে একটি শপিং মলের নিচতলায় সারি সারি কম্পিউটার কম্পোজ ও প্রিন্টিংয়ের ছোট ছোট দোকান। নিজ কারখানার বেতন প্রদানের দিনে এখানে অদ্ভুত এক ভিড় দেখা যায় পোশাকশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের। তাঁরা কেউ চাকরির আবেদন করতে আসেন না এখানে, কোনো কাগজ টাইপ করাতেও নয়। তাঁরা আসেন নিজের বেতনের পে-স্লিপ পরিবর্তন করতে। প্রথমে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হয়। কিন্তু কিছুটা খোঁজ নিলে যে বাস্তবতা সামনে আসে, তা আরও কঠিন। এই নারীদের অনেকেই মাস শেষে পাওয়া বেতনের পুরোটা স্বামী বা পরিবারের কর্তাব্যক্তির হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। নিজের জন্য, নিজের সন্তানের জন্য কিংবা অসুস্থ মা-বাবার জন্য সামান্য কিছু টাকা রাখার সুযোগও তাঁদের থাকে না।

পে-স্লিপে যে পরিমাণ বেতন লেখা থাকে, ঠিক সেই পরিমাণ টাকাই বুঝিয়ে দিতে হয় পরিবারের হাতে। তাই কেউ কেউ বাধ্য হয়ে পে-স্লিপে বেতনের অঙ্ক কমিয়ে নেন, যেন নিজের হাতে সামান্য কিছু টাকা রাখতে পারেন। আইনগতভাবে এটি অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি কোনো প্রতারণা নয়; বরং চরম অমানবিক পরিস্থিতি থেকে মুক্তির ক্ষুদ্র এক প্রচেষ্টা।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় উল্লিখিত ঘটনাটি পোশাকশিল্পে কর্মরত নারীদের জীবনের শত বঞ্চনার একটি ছোট্ট উদাহরণমাত্র। এ সেক্টরে কর্মজীবনের অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হয় নারীদের। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মেলে না প্রমোশন। ধরে নেওয়া হয়, নারীর কর্মললাটে শুধু শ্রমিকের ভাগ্য আঁকা। সুপারভাইজার হওয়ার মতো সক্ষমতা নারীকে অর্জন করতে দেওয়া হয় না। এ দক্ষতা অর্জিত হলেও মেলে না স্বীকৃতি। পুরুষতান্ত্রিকতার জাদুমন্ত্রে তৈরি এসব শৃঙ্খলকে মেনে নিয়ে কাজ করে যেতে হয় পোশাকশিল্পের নারীদের। ব্যক্তিগত জীবনে তাতেও মুক্তি মেলে না পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জাঁতাকল থেকে। সঙ্গে যোগ হয় নানাবিদ শারীরিক সমস্যা।

সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী সাধারণ নারীদের ৫২ থেকে ৫৫ শতাংশ চোখের নানা ধরনের সমস্যায় ভোগেন। কিন্তু ন্যূনতম ৩ বছর পোশাকশিল্পে কর্মরত নারীদের ৯২ শতাংশই চোখের এ ধরনের সমস্যায় পতিত হন। এটি সহজে অনুমেয় যে এ সেক্টরে কর্মরত নারীদের শুধু কাজের ধরনের জন্যই চোখের এ সমস্যায় ভুগতে হয়। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক পিয়ার-রিভিউড জার্নাল এমডিপিআইতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য। গাজীপুরের ১ হাজার ৫০ জন গার্মেন্টস শ্রমিকের ওপর পরিচালিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৪ দশমিক ২ শতাংশ শ্রমিক ‘ড্রাই আই’ বা চোখের পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার সমস্যায় ভুগছেন। এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশই নারী। অনুপযুক্ত কর্মপরিবেশ, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ও পুষ্টিকর খাদ্যের ঘাটতি—সবকিছু মিলেই তৈরি হচ্ছে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি। সেলাই মেশিনের সামনে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, পর্যাপ্ত আলো ও বাতাসের অভাব এবং শারীরিক ক্লান্তি চোখের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

পোশাকশিল্প

চোখের সমস্যাই শেষ নয়। দীর্ঘদিন একই ভঙ্গিতে কাজ করার ফলে অনেক নারী শ্রমিক মেরুদণ্ডের ক্ষয়জনিত সমস্যা, কোমরব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের নানা জটিলতা ও দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন। এ সমস্যাগুলো একই সেক্টরে কর্মরত পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যেও দেখা যায়। তবে সংখ্যা ও মাত্রায় নারীরা এ ধরনের সমস্যায় বেশি ভুক্তভোগী। বাস্তবে দেখা যায়, টানা ৮ থেকে ১০ বছর কাজ করার পর অনেক নারীর পক্ষে এ পেশা চালিয়ে নেওয়ার মতো শারীরিক সক্ষমতা থাকে না। তখন তাঁদের সামনে নতুন কোনো দক্ষতা বা বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকে না। অনেকেই বাধ্য হয়ে শূন্য হাতে গ্রামে ফিরে যান, যেখানে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করে আরও অনিশ্চিত ও মানবেতর জীবন। এভাবেই পোশাকশিল্পের কর্মে অংশগ্রহণ, সংগ্রামী জীবন পার করার পরও দিন শেষে ক্ষমতায়ন বা নারী-পুরুষের সমতার মূল্যায়নে নারী শুধু সংখ্যাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।

কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নটিও এখানে প্রাসঙ্গিক। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের প্রায় ২২ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। একই প্রতিবেদনে প্রায় ৮৩ শতাংশ নারী শ্রমিক জানিয়েছেন, তাঁরা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬৮ শতাংশ শ্রমিক জানিয়েছেন, তাঁদের কর্মস্থলে কার্যকর কোনো যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নেই। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মজুরি অনিশ্চয়তা ও চাকরির নিরাপত্তাহীনতা। অনেক কারখানায় শ্রমিকদের ১২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাজ করতে হয়। অথচ যে মজুরি তাঁরা পান, তা বর্তমান সময়ের জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। একটি পরিবারের খরচ চালানো তো দূরের কথা, অনেক সময় একজন শ্রমিকের নিজের জীবনধারণের জন্যও এই বেতন যথেষ্ট নয়।

প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে জীবন কাটাতে হয় পোশাকশ্রমিকদের। নারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বেশ কঠিন

চাকরির অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। অনেক সময় দেখা যায়, পুরো মাস কাজ করার পর হঠাৎ কোনো ধরনের নোটিশ ছাড়াই কারখানার গেটে তালা ঝুলে গেছে। শ্রমিকেরা বকেয়া মজুরি না পেয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনা নোটিশে ছাঁটাই, লে-অফ বা বেতন আটকে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০২৪-২৫ সালে দেশে ১৮৫টির মতো পোশাক কারখানা বিনা বা স্বল্প দিনের নোটিশে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে জীবন কাটাতে হয় পোশাকশ্রমিকদের। নারীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা বেশ কঠিন। কারণ, চাকরি চলে গেলে বা বেতন আটকে গেলে পুরুষ শ্রমিকেরা যত সহজে অন্যত্র কাজ জোটাতে পারেন, বিভিন্ন বাস্তবতার কারণে নারীদের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়। কেননা নারীরা চাইলেও হকারি, ছোট ব্যবসায় বা দিনমজুরির মতো বিকল্প পেশায় অংশ নিতে পারেন না। এতসব প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁরা কাজ করে যান। কারণ, তাঁদের পেছনে আছে পরিবারের ভরন-পোষণের ভার, সন্তানের ভবিষ্যৎ, কিংবা গ্রামের বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব।

পোশাকশিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে আশীর্বাদ। কিন্তু এ শিল্পের টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে শ্রমিকদের জীবন ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকেরা অধিকারবঞ্চিত এবং অমানবিকতার শিকার হন, সেগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। এর জন্য কয়েকটি কাঠামোগত পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রয়োজন।
• প্রথমত, নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নিয়োগকর্তা কর্তৃক নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য বাস্তবসম্মত ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
• দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর কমিটি ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
• তৃতীয়ত, পুষ্টিকর খাদ্য ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন কাজ করা শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও থাকা দরকার।

পোশাকশিল্পে আমরা প্রায়ই সরকারের পক্ষ থেকে নীতিসহায়তা বা সরকারি প্রণোদনার কথা শুনে থাকি। উপর্যুক্ত বিষয়গুলোকে এ ধরনের সহায়তা প্যাকেজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে কার্যকর ফল পাওয়া যেতে পারে।

যে নারীদের কাঁধে ভর করে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প বিশ্ববাজারে সাফল্যের গল্প লিখছে, তাঁদের জীবন যদি অনিশ্চয়তা, বঞ্চনা ও অবহেলার ভেতরেই আটকে থাকে, তাহলে সেই সাফল্যের গল্প কখনোই পূর্ণতা পাবে না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হবে তখনই, যখন এই নারীদের জীবনেও নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায্যতার আলো পৌঁছাবে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

Read full story at source