ডেনিস লিভারটভের একগুচ্ছ যুদ্ধবিরোধী কবিতা

· Prothom Alo

গত শতকের ষাটের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে যেসব কবি কলম ধরেছেন, তাঁদের অন্যতম ডেনিস লিভারটভ (১৯২৩–১৯৯৭)। এখানে অনূদিত ‘তেনেব্রে’, ‘তারা কেমন ছিল?’ ও ‘যুদ্ধকালীন জীবন’—এই তিনটি কবিতা তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য সরো ড্যান্স (১৯৬৭) ও টু স্টে অ্যালাইভ (১৯৭১) থেকে সংকলিত। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত ব্রিদিং দ্য ওয়াটার গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে ‘শান্তি নির্মাণ’ কবিতাটি। বর্তমান বিশ্বে ইরান, আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান অস্থিরতা আর লাশের স্তূপের সামনে লিভারটভের পঙ্‌ক্তিগুলো আজও এক শাণিত প্রতিবাদ; হারানো মমত্ববোধ পুনরুদ্ধারের আকুল প্রার্থনা।

Visit goldparty.lat for more information.

ভাষান্তর: রাব্বী আহমেদ

তেনেব্রে

ভারী, ভারী, ভারী, হাত আর হৃদয়।
আমরা যুদ্ধে জড়িয়ে গেছি।
তিক্তভাবে, তিক্তভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে গেছি...

আর কেনা আর বেচা।
ভনভন করে আমাদের মাথার ওপর। একঝাঁক
ব্যস্ত মাছি। একরকমের অনপরাধ।

সোনালি সিকুইনের গাউন ফিটফাট পরানো,
ধারালো ঝলক। কী যে কর্কশ রুপালি মোয়ারের
খসখস, আমাকে মনে
পড়ায় শ্র্যাপনেল স্প্লিন্টারদের।

আর বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় যথাযথ গাম্ভীর্যে
আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং শিষ্টাচার রক্ষায়।
মাড়-দেওয়া লেসের সেই বৈবাহিক আড়ম্বর;
এক ক্রূর সরলতা।
আর সৈকত থেকে ফেরা পিকনিক পার্টিরা
পুড়ছে সন্ধ্যার গুদামজাত রোদে;

বাড়ি ফিরে টিভি শো দেখতে পাওয়ার প্রতিশ্রুত শিশুরা
ঘুমিয়ে পড়ছে লক্ষ লক্ষ স্টেশন ওয়াগনের পেছনের সিটে,

মাথায় ওদের বালু, ঢেউয়ের শব্দ
নীরবে অনর্গল বাজে ওদের কানে।
ওরা শুনছে না।

ওদের মা–বাবারা রাতে
স্বপ্ন দেখে আর তাদের স্বপ্ন ভুলে যায়।
তারা জেগে ওঠে অন্ধকারে আর
পরিকল্পনা করে। তাদের চকচকে পরিকল্পনাগুলো
আগামীকালের দিকে ঝিলিক দিয়ে যায়।
তারা কেনে, তারা বেচে।

তারা খাবার দিয়ে ফ্রিজার ভরে রাখে।
নিয়ন চিহ্নগুলো তাদের উদ্দেশ্য
ঠিকরে দেয় সামনের বছরগুলোর ভেতর।

আর তাদের কানে যুদ্ধের
সেই শব্দ। তারা
শুনছে না, শুনছে না।

[*লাতিন শব্দ ‘তেনেব্রে’র অর্থ অন্ধকার। ‘হলি উইক’ বা পবিত্র সপ্তাহের শেষ তিন দিনের গির্জার বিশেষ এক প্রার্থনা-সেবা, যিশুর কষ্টভোগ আর মৃত্যুকে স্মরণ করে যা পালন করা হয়। সেবার শুরুতে কিছু মোমবাতি প্রজ্বালন করা হয়; আর প্রতিটি ‘সাম’ বা স্তোত্র পাঠ বা গান গাওয়ার পর সেগুলোকে নিভিয়ে দেওয়া হয়, একে একে। যিশুর মৃত্যুর সময় পৃথিবীতে নেমে আসা অন্ধকারের এটি এক প্রতীকী উপস্থাপন।]

তারা কেমন ছিল?

ভিয়েতনামের সেই মানুষেরা—
তারা কি ব্যবহার করত পাথরের লন্ঠন?
কুঁড়ি ফোটার মুহূর্তের সম্ভ্রমে
তারা কি পালন করত কোনো অনুষ্ঠান?
তাদের কি ঝোঁক ছিল অনুচ্চ হাসিতে?
গয়না বানাতে, তারা কি কাজে লাগাত
হাড় ও হাতির দাঁত, জেড আর রুপো?
তাদের কি একটা মহাকাব্য ছিল?
তারা কি জানত কথা আর গানের তফাত?

স্যার, তাদের ফুরফুরে হৃদয়টা পাথর হয়ে গেছে।
মনে পড়ছে না পাথুরে বাগানগুলো উদ্যানের সুন্দর
পথকে আলোকিত করত কি না।
হয়তো একদা তারা জড়ো হতো ফুল ফোটার আনন্দে,
কিন্তু তাদের সন্তানেরা নিহত হওয়ার পর—
আর কোনো কুঁড়ি ছিল না।
স্যার, পোড়া মুখে হাসির স্বাদ বড়ই তিক্ত।
এক স্বপ্নকাল আগে, হয়তো। অলংকার স্রেফ আনন্দের জন্য।
সব হাড় পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে।
আর মনে পড়ে না। মনে রাখবেন—
অধিকাংশই ছিল কৃষক; তাদের জীবন
ছিল ধান আর বাঁশের সঙ্গেই।

যখন কাদাজমা ধানখেতে প্রতিবিম্বিত হতো শান্ত মেঘ
আর জলমহিষরা হাঁটত স্থির পায়ে ধাপকাটা খেত ধরে,
হয়তো বাবারা শোনাতেন ছেলেদের পুরাণ-কথা।
যখন বোমারা চুরমার করে দিল সেই আয়নাগুলোকে
সময় তখন ছিল কেবল চিৎকারের।
তাদের কথার এক প্রতিধ্বনি আছে এখনো
যা ঠিক একটা গানের মতো।
শোনা যায়, তাদের সেই গান ছিল চাঁদের
আলোয় মথের উড়াল দেওয়ার সদৃশ।
কে বলতে পারে? সব স্তব্ধ এখন।

ডেনিস লিভারটভ: যুদ্ধ, যন্ত্রণা, সংশয়, অধ্যাত্মবাদ

শান্তি নির্মাণ

অন্ধকার থেকে ডেকে উঠল একটা কণ্ঠ,
             ‘কবিদের অবশ্যই আমাদের
দিতে হবে শান্তির কল্পনা, যা উৎখাত করবে
দুর্যোগের সেই তীব্র, চেনা কল্পনাকে। শান্তি, শুধু
যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়।

             কিন্তু শান্তি, এক কবিতার মতো,
নিজের আগে কোথাও প্রস্তুত থাকে না;
তৈরি হওয়ার আগে তাকে কল্পনা করা যায় না,
নির্মাণের শব্দগুলো ছাড়া তাকে জানা যায় না—
ন্যায়ের ব্যাকরণে,
পারস্পরিক সহায়তার পদবিন্যাসে।

তার অভিমুখে এক অনুভূতি,
অস্পষ্ট এক ছন্দের আভাস—এটুকই আমাদের সম্বল
যতক্ষণ না আমরা তার রূপকগুলোকে উচ্চারণ করা শুরু করি,
বলতে বলতে সেগুলো রপ্ত করি।

                                     শান্তির একটা পঙক্তি হয়তো জেগে উঠবে,
যদি আমরা পালটে ফেলি আমাদের জীবন দিয়ে গড়া বাক্যটিকে;
রদ করি মুনাফা আর ক্ষমতার এই পুনঃসমর্থন,
প্রশ্ন করি নিজেদের প্রয়োজনকে, জায়গা করে দিই
দীর্ঘ নীরবতাগুলোকে…

             শান্তির এক স্বরভঙ্গি হয়তো খুঁজে পাবে তার ভারের ভারসাম্য,
অন্য এক ভরবিন্দুর ওপর; শান্তি—এক উপস্থিতি,
যুদ্ধের চেয়ে তীব্রতর এক শক্তিক্ষেত্র,
স্পন্দিত হতে পারে তখন,
স্তবকে স্তবকে এই পৃথিবীর বুকে;
জীবনের প্রতিটা কাজ হবে
তারই একেকটা শব্দ, প্রতিটি শব্দ
আলোর এক কাঁপন—সেই
গড়ে ওঠা স্ফটিকের একেকটা দিক।

যুদ্ধকালীন জীবন

দুর্যোগগুলো অবশ করে দেয় আমাদের ভেতর
আটকে থাকে বুকে, মগজের মধ্যে ঘুরপাক খায়
ঠিক নুড়িপাথরের মতো। অনুভূতিরা যেন
কাঁচা আটার একেকটা দলা

পিঠা বানানোর দিন শিশুর পেট যেমন ভার হয়ে থাকে।
কিংবা রিলকে যেমন বলেন, ‘আমার হৃদয়…
বলতে পারি কি, এ উপচে পড়ছে তিক্ততায়…কিন্তু না,
বরং মনে হয়, এর সারাৎসার স্রেফ দলা পাকিয়ে হয়েছে
কিছু নিরাকার পিণ্ড, এভাবেই তাকে আমি বয়ে বেড়াই।’
সেই একই যুদ্ধ

চলছে আজও।
সারাটা জীবন, এর দানাদার ধুলো আমরা টেনে নিয়েছি নিশ্বাসে
তার দাগে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে আমাদের ফুসফুস।

আমাদের স্বপ্নের শ্লেষ্মা-ঝিল্লি
ঢাকা এর প্রলেপ দিয়ে,
কল্পনাও ঘোলাটে হয়ে গেছে এর ধূসর ময়লায়:
সেই জ্ঞান যে—এই মানবজাতি,

স্পর্শপিপাসী মানুষ, যার দেহ
সাড়া দেয় সামান্য আদরে,
যার চোখ নক্ষত্র-অন্বেষী কিছু কুসুম,

যার সংগীত ছাড়িয়ে যায় পাখিদের গান,
যার হাসি মিলে যায় কুকুরের হাসির সঙ্গে,
যার প্রজ্ঞা মূর্ত করে এমন নকশা যা সুন্দর
মাকড়সার সবচেয়ে সূক্ষ্মতর জালের চাইতেও,

তবু ফেরে কোনো চমক ছাড়াই, নামমাত্র অনুতাপে
পূর্বনির্ধারিত বুক চিরে ফেলার দৃশ্যে, যার দুধ গড়িয়ে
পড়ে এখনো জীবিত শিশুদের নাড়িভুঁড়ির ওপর,
প্রত্যক্ষদর্শী চোখের রূপান্তর থেঁতলানো মাংসপিণ্ডে,
ছাল-ছাড়ানো শিশ্ন মুচড়ে যায় পচা লাশের নর্দমায়।
আমরা মানুষ, সেই মানবসত্তা, যারা সৃষ্টি করতে পারে;
যার ভাষা কল্পনা করে অনুকম্পা,
প্রেমময় মমতা—আমরা বিশ্বাস করেছি পরস্পরের মধ্যে
ঈশ্বরের দর্পণ-রূপ, যাকে আমরা জেনেছি কল্যাণময়—

যারা এসব কাজ করে, যারা নিজেদের বোঝাই
এটা প্রয়োজন; এই কাজগুলো করা হয়
আমাদের নিজেদেরই রক্তমাংসের ওপর; মানুষের পোড়া মাংসের
গন্ধ ভেসে আসছে ভিয়েতনাম থেকে, এখন যখন লিখছি।

হ্যাঁ, এটা সেই বোধ যা লড়ছে আমাদের শরীরে জায়গা
করে নিতে—আমাদের আনন্দ আর ভালোবাসার
চিরন্তন, লালিত অনুভূতির পাশাপাশি।

আমাদের স্নায়ুর তন্ত্রী কাঁপে তার উপস্থিতিতে
দিন আর রাত,
আমাদের বলা সব কথায় লেগে থাকে গলাখাঁকারির শব্দ।
আমাদের কাজে নেই সেই ক্ষিপ্রতা, সেই দ্বিধাহীনতা,
যা থাকে শান্তিতে যাপন করা জীবনের প্রজ্ঞার ভেতর।

Read full story at source