বিজ্ঞান পড়ায় কি শিক্ষার্থীরা উৎসাহ পাচ্ছে না!

· Prothom Alo

‘নিউটনের ভুল সূত্র’ গল্পের অমর বাবু চরিত্রটির কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। হুমায়ূন আহমেদের এক অনবদ্য সৃষ্টি, যিনি সায়েন্সের প্রতি তীব্র মমত্ববোধ থেকে পরিবারের সান্নিধ্যও ছেড়ে দিয়েছিলেন। একসময় দেখা যেত পরিবারের ছেলে–মেয়েদের কেউ একজন পড়াশোনায় মনোযোগী হলেই অভিভাবকেরা ওই সন্তানকে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ানোর জন্য খুব উৎসাহী হতেন। কিন্তু বর্তমান অবস্থা ভিন্ন। শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান না হওয়া, কারিগরি প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, ব্যবহারিক–সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় হাতে–কলমে শিক্ষার দৈন্যদশা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের সুযোগ সেভাবে সৃষ্টি না হওয়া, ভালো ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা প্রভৃতি কারণে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

ব্যানবেইসের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর হার ৪২ দশমিক ৮১ শতাংশ ও উচ্চমাধ্যমিকে ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২০১৫ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর হার ২৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ ও উচ্চমাধ্যমিকে ১৭ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ পরিসংখ্যানে এটি স্পষ্ট যে বিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আরও জানা যায়, বিজ্ঞানাগার নেই প্রায় ২৯ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাধ্যমিকে প্রায় ২২ শতাংশ ও উচ্চমাধ্যমিকে ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেছে।

Visit librea.one for more information.

ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্নাতক পর্যায়ে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ১১ শতাংশের মতো। এখানে উল্লেখ্য যে, মাধ্যমিকের তুলনায় উচ্চমাধ্যমিকে সিলেবাস ব্যাপক। অনেক শিক্ষার্থীই এ বিপুল সিলেবাসের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না, ফলে ঝরে পড়ে।

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ২০২৫: ৪০০ নম্বরে বিভাজন ও প্রশ্নপত্রের কাঠামো যেভাবে

এশিয়া মহাদেশের অর্থনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী দেশ সিঙ্গাপুর, জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশে বিজ্ঞান শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য আমাদের ইংরেজি শিক্ষাকেও সহজলভ্য করা উচিত। প্রতিটি স্কুল–কলেজে সপ্তাহে অন্তত এক দিন গ্রুপ করে শিক্ষার্থীদের স্পোকেন ইংলিশ প্র্যাকটিস ক্লাস নেওয়া যেতে পারে। একই কথা আইসিটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনেক কলেজে আইসিটি ল্যাব থাকলেও শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় না। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সব বিষয়ের শিক্ষকদের জন্যও আইসিটি জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করানো এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অভিভাবকেরাও এ দায় এড়াতে পারেন না। অনেক অভিভাবক সন্তানদের প্রতি সঠিকভাবে নজর না রাখার ফলে তারা মুঠোফোনের বিভিন্ন ক্ষতিকর অ্যাপের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হচ্ছে, মাদক গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তাভাবনা ছেড়ে দিচ্ছে। শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানের করার জন্য দক্ষ শিক্ষকের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের দেশে শিক্ষকদের উন্নত গবেষণা ও প্রশিক্ষণের পথ সুগম নয়।

এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬, ঈদের ছুটিতে পরীক্ষার্থীরা যা করতে পারে

ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ৬ হাজার ৪০০ শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রিধারী রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ও গবেষণার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি এখন একটি অপরিহার্য যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়, যা দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সহায়ক। যাহোক, শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহী করার জন্য ভালো ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা একটি বড় বিষয়। স্কুল–কলেজগুলোয় শিক্ষার্থীদের কর্মচঞ্চলতা, শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রাত্যহিক সমাবেশ অর্থাৎ পিটি বাধ্যতামূলক করা উচিত। স্কুলগুলোয় মোটামুটিভাবে পিটি হলেও কলেজগুলোয় হয় না বললেই চলে। এ ক্ষেত্রে কলেজগুলোয়ও কর্মঘণ্টার মধ্যে পিটি সংযুক্ত করা আবশ্যক।

এআই/ প্রথম আলো

শিক্ষার মানোন্নয়নে একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া উচিত। প্রাথমিক স্তরের শিশুদের প্রাথমিক বিজ্ঞান বইয়ের পাঠ্যসূচি পর্যাপ্ত থাকলেও শিশুদের হাতে–কলমে শেখানো হলে তারা উৎসাহী হতো, ক্লাস অনুযায়ী ছোট ছোট বিজ্ঞান প্রজেক্ট দেওয়া হলে তাদের মেধা আরও শাণিত হতো। শিশুরা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ খুশিমনে গ্রহণ করতে চায়। মাধ্যমিক স্তরের অনেক স্কুলেই নামমাত্র ল্যাবরেটরি আছে! যন্ত্রাংশ ব্যবহার না করতে করতে মরিচা ধরেছে, শিক্ষার্থীরা লিটমাস টেস্ট কী, তাই বুঝে না! কলেজ পর্যায়েও একই অবস্থা।

শহরাঞ্চলের নামকরা কলেজের শিক্ষার্থীরা হয়তো ল্যাবের সুবিধা পেয়ে থাকে, কিন্তু মফস্‌সল অঞ্চলগুলোয় বা উপজেলা পর্যায়ের কলেজগুলোয় ব্যবহারিক হাতে–কলমে করা হয় না বললেই চলে। অনেক কলেজে সল্ট অ্যানালাইসিস কখনো হয়েছে কি না সন্দেহ! পরীক্ষার সময়গুলোয় কোনো প্রকার ব্যবহারিক পরীক্ষা–নিরীক্ষা ছাড়াই প্রায় পূর্ণ নম্বর দেওয়া হয়। আসলে মুখস্থবিদ্যানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহ হারাচ্ছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির দিকেই প্রথমে নজর দেওয়া উচিত। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের গবেষণায় যথাযথ প্রণোদনা, শিক্ষাছুটি ঝামেলাহীন করা ও আর্থিক অনুদান নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া স্কুল পর্যায়ের শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিষয়ে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে—ব্যবহারিক–সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় হাতে–কলমে পরীক্ষা করার সুযোগ সৃষ্টি করা, গণিত ও আইসিটির মতো বিষয়গুলোর মানোন্নয়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, বিজ্ঞানভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা, প্রজেক্টের ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করা ও প্রতিযোগিতার আয়োজন। এ ক্ষেত্রে পুরস্কার হিসেবে বিজ্ঞানবিষয়ক জাদুঘর, গবেষণাকেন্দ্রে ভ্রমণের ব্যবস্থাসহ দেশ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিগুলোয় বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন অনুসন্ধানী বই, শিক্ষণীয় গল্প, বিভিন্ন বিজ্ঞানী–সম্পর্কিত বই ও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিবিষয়ক বই অন্তর্ভুক্ত করা। এতে আমাদের অনেক শিক্ষার্থীরই হয়তো রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের ‘ড. জেকিল অ্যান্ড মি. হাইড’ পড়ে আবিষ্কারের দিকে ঝোঁক সৃষ্টি হতে পারে বা এইচ জি ওয়েলসের ‘টাইম মেশিন’ পড়ে জগৎ সম্পর্কে ধারণা পরিশীলিত হতে পারে। এ ছাড়া নৈতিক শিক্ষার জন্য ধর্মীয় জ্ঞানমূলক বই অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানার্জনের জন্য আত্মসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহী হবে।

  • লেখক: সোনিয়া আহমেদ, প্রভাষক, রসায়ন, সরকারি হিজলা ডিগ্রি কলেজ, হিজলা, বরিশাল

  • [email protected]

Read full story at source