প্রেমের গল্প: একটি শিশিরবিন্দু
· Prothom Alo

নীপা জানাল, রায়হান বাসায় নেই। আমার হতাশ চেহারার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি ফোন করে আসেন না কেন, রফিক ভাই?...বেকার এতটা পথ এসে ফিরে যেতে হয়।’
Visit moryak.biz for more information.
কথা ঠিক। আমার ফোন করেই আসা উচিত। কিন্তু এত দিন এসব নিয়ে ভাবতে হয়নি। শুক্রবার ছুটির দিনে আমি হল থেকে এখানে আসব, রায়হান আমার জন্য অপেক্ষা করবে, তারপর এ বাসায় দুবন্ধুর আড্ডা, চা-নাশতা খাওয়া, নেটফ্লিক্স বা চরকিতে নতুন কোনো সিনেমা দেখে রাতে হলে ফিরে যাওয়াই ছিল দস্তুর। ভালো কিছু রান্না হলে খালাম্মা রাতে ভাত না খাইয়েও ছাড়েন না। এটা আমার রীতিমতো বাজে একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল। অথচ এ নিয়ে তৃতীয় সপ্তাহ আমি বন্ধুর দরজায় এসে ফিরে যাচ্ছি।
গত দুই শুক্রবার একটু মন খারাপের মতো হয়েছিল। অভিমান। কিন্তু আজ ব্যাপারটা রীতিমতো অপমানে গিয়ে দাঁড়াল। তা ছাড়া নীপার কথার মধ্যে ওই ‘বেকার’ শব্দটা যেন খানিকটা জ্বালাও ধরিয়ে দিল মনে। আফটার অল আমি তার বড় ভাইয়ের বন্ধু। কথা বলার সময় ওই সমীহটুকুও থাকবে না! আমি তো বেকার নই। বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের ছাত্র। সপ্তাহে চারটি টিউশনি করে মোটামুটি আয়-উপার্জনও আছে আমার। পাস করে বেরোলে চাকরির অভাব হবে না। বিসিএস করে এমনকি সরকারি চাকরিতেও ঢুকে পড়তে পারি।
অপমানবোধ থেকেই বোধ হয় একটু ক্ষোভ জমা হয়েছিল। বললাম, ‘রায়হানও তো একটা ফোন করে বলতে পারত সে বাসায় থাকবে না...। দুসপ্তাহ এসে ফিরে গেলাম, ওকে বলোনি?’
‘বলেছি।’
‘তবু একটা ফোন করার কথা তার মাথায় এল না!’ আমার গলায় সামান্য ঝাঁজ।
‘আপনি প্রেমে পড়েছেন কখনো?’
হঠাৎ নীপার এ কথায় ভ্যাবাচেকা খেলাম। আগে কখনো খুব একটা কথাবার্তা হয়নি ওর সঙ্গে। চা-নাশতা দিতে এলে পড়াশোনা কেমন চলছে ধরনের দু-একটা প্রশ্ন করেছি। সে-ও ‘এই তো চলে যাচ্ছে’ ধরনের সাদামাটা উত্তর দিয়ে সরে পড়েছে। আজ বড় ভাইয়ের বন্ধুকে অসংকোচে এমন একটা প্রশ্ন করে বসল!
‘কেন বলছ?’
‘বলছি; কারণ, প্রেমে পড়লে বুঝতে পারতেন, তখন মাথা ঠিকমতো কাজ করে না। বন্ধু বাসায় এসে ফিরে গেল কি না, সে কথা মনে রাখার সময়ও থাকে না তখন।’
এত কথা জানো কী করে, তুমি কবার প্রেমে পড়েছ? এ রকম একটা প্রশ্ন প্রায় ঠোঁটের আগায় এসে পড়েছিল। কিন্তু সামলে নিলাম। যত যা-ই হোক, বন্ধুর আপন ছোট বোন।
আমি বোধ হয় ঠিক প্রেমে পড়ার ম্যাটেরিয়াল নই। চেষ্টা করিনি তা নয়। হয় না। একবার চালু টাইপের এক ছাত্রীর পাল্লায় পড়েছিলাম। নানাভাবে উসকানি দিয়েছে। ওর আচার-আচরণ নিয়ে রায়হানের সঙ্গে আলাপও করেছিলাম। কিন্তু রায়হান সব শুনে সতর্ক করেছিল, ‘খবরদার, ওই ফাঁদে পা দিবি না, ওই মেয়ে তোকে হোলসেলে কিনে রিটেইলে বিক্রি করে দেবে।’
ভাতের হোটেলে রবীন্দ্রনাথ কখনো খেতে আসেননিবন্ধুর পরামর্শ শুনে পরের মাসে টিউশনিটা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার সেই বন্ধু এখন চুটিয়ে প্রেম করছে তার ছোট বোন নীপার বান্ধবীর সঙ্গে। আমার জন্য তার হাতে এখন সময় নেই।
অদিতি নামে বুয়েটেরই দুব্যাচ জুনিয়র এক মেয়েকে ভালো লেগেছিল। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত গায়। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রীর মতো চলাফেরা। দেখে মুগ্ধতা জেগেছিল। কিন্তু যখন দেখলাম সুতির শাড়ি, কপালে কালো টিপ, কোলাপুরি চটি আর কাঁধে চটের ব্যাগ ঝোলানো মেয়েটা নিয়মিত ডেট করতে যায় জিনসের প্যান্ট আর টি–শার্ট পরা এক ছটফটে যুবকের সঙ্গে, তখন মনটা একেবারে ভেঙে গিয়েছিল। এরপর আর কখনো চেষ্টা করিনি।
‘আচ্ছা আসি, রায়হানকে বোলো, আর আসব না।’
আমার কথায় একটা দীর্ঘশ্বাস জড়ানো ছিল বোধ হয়। নীপা বলল, ‘এক কাপ চা খেয়ে যান, রাকিব ভাই।’
‘আজ থাক,’ বলে ফিরে আসতে উদ্যত হয়েছিলাম।
তখন ভেতর থেকে খালাম্মার গলা শোনা গেল, ‘চা খেয়ে যাও, রাকিব।’
খালাম্মার অনুরোধ তো নির্দেশের মতো। আমি চুপচাপ ঘরে ঢুকে বসলাম। অল্প কিছুক্ষণ পর চা-নাশতা নিয়ে ঘরে ঢুকল নীপা। অন্য দিনের মতো টেবিলে রেখে চলে গেল না।
চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, ‘তোমার মতো একটা ছোট বোন থাকলে বড় ভালো হতো নীপা।’
‘কেন, বলেন তো?’
হেসে বললাম, ‘ওই যে রায়হানের মতো বোনের বান্ধবীর সঙ্গে একটা সম্পর্ক...মানে প্রেম করতে পারতাম।’
‘বোনের বান্ধবীর সঙ্গে প্রেম করা যায়, বন্ধুর বোনের সঙ্গে বুঝি হয় না?’
‘এটা একটু আনএথিক্যাল মনে হয়। বন্ধুর কাছে এসে তার বোনের দিকে নজর দেওয়া একধরনের বিট্রেয়াল হয়ে গেল না?’
‘এসব নীতিমালা কোন বইয়ে আছে?’
আশ্চর্য, নীপা আজ এত তর্ক করছে কেন! চোখ তুলে তাকাতেই চমকে উঠলাম আমি। মেয়েটার কাজলটানা গভীর দুটি চোখে জল টলটল করছে। নিজেকে এখন নির্বোধ একটা গর্দভ মনে হচ্ছে আমার। ঘরে রতন ফেলে আমি বনে খুঁজে বেড়াচ্ছি! আমার মতো গর্দভদের জন্যই তো রবিঠাকুর গাহিয়াছিলেন, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশিরবিন্দু।’