চুম্বনের দৃশ্যে স্ত্রীর ‘পিটুনি’! ছেলের ক্যানসারে যুদ্ধ—ইমরানের ঘটনাবহুল জীবন

· Prothom Alo

একসময় বলিউডে তাঁর নাম মানেই ছিল বিতর্ক, ঘনিষ্ঠ দৃশ্য আর ‘সিরিয়াল কিসার’ তকমা। সেই ইমরান হাশমি আজ ৪৭-এ পা রেখে দাঁড়িয়ে আছেন এক ভিন্ন পরিচয়ে—একজন পরিণত, চরিত্রনির্ভর অভিনেতা হিসেবে। জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর এই দীর্ঘ, বহুমাত্রিক পথচলা—যেখানে আছে সাহসী সিদ্ধান্ত, ব্যক্তিগত সংগ্রাম, ইমেজ ভাঙার লড়াই আর নতুন করে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার গল্প।

Visit newsbetsport.bond for more information.

চুম্বনের ইমেজ!
বলিউডে ইমরান হাশমির নাম উচ্চারণ হলেই ভেসে ওঠে ‘মার্ডার’, ‘জান্নাত’, ‘রাজ থ্রি’ আর সেই সঙ্গে তাঁর বিখ্যাত চুম্বন দৃশ্য। নব্বইয়ের দশকের পর বলিউডে যখন রোমান্টিকতার ভাষা বদলাচ্ছিল, তখন ইমরান যেন সেই পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর এই সাহসী পর্দা-ইমেজ দর্শকের কাছে যেমন জনপ্রিয়তা এনে দেয়, তেমনি ব্যক্তিজীবনে তৈরি করে মজার কিছু পরিস্থিতিও। এক সাক্ষাৎকারে ইমরান হাশমি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, তাঁর স্ত্রী পারভীন শাহানি পর্দায় তাঁর চুম্বনের দৃশ্য মোটেই সহজভাবে নিতে পারতেন না। হাসতে হাসতেই বলেছিলেন, ‘এখন আর খুব একটা মারে না। আগে তো ব্যাগ দিয়ে পেটাত!’—এই এক মন্তব্যই যেন তাঁর ব্যক্তিজীবনের এক অনন্য, মানবিক দিক সামনে নিয়ে আসে।

ভাট পরিবারের ছায়া থেকে নিজস্ব পরিচয়
১৯৭৯ সালের ২৪ মার্চ মুম্বাইয়ে জন্ম ইমরান হাশমির। চলচ্চিত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ছিল পারিবারিক—মায়ের দিক থেকে তিনি ভাট পরিবারের সদস্য। প্রযোজক-পরিচালক মহেশ ভাট ও মুকেশ ভাট তাঁর আত্মীয়, সেই সূত্রে ছোটবেলা থেকেই সিনেমার পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় গড়ে ওঠে। তবে এই সম্পর্ক তাঁকে সুযোগ এনে দিলেও, নিজস্ব পরিচয় তৈরি করার লড়াইটা ছিল পুরোপুরি তাঁর নিজের।

‘তস্করি: দ্য স্মাগলার টাইম’–এ ইমরান হাশমি। আইএমডিবি

বলিউডে আসার আগে ইমরান বেশ কিছু ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে বিক্রম ভাটের ‘রাজ’ ছবিতে সহকারী হিসেবে যুক্ত ছিলেন তিনি। এ অভিজ্ঞতাই তাঁকে ক্যামেরার পেছন থেকে সামনে আসার আত্মবিশ্বাস দেয়।
২০০৩ সালে বিক্রম ভাট পরিচালিত ‘ফুটপাথ’ ছবির মাধ্যমে তাঁর অভিষেক। ছবিতে অজয় দেবগন ও বিপাশা বসুর মতো তারকার সঙ্গে কাজ করলেও বক্স অফিসে ছবিটি বড় সাফল্য পায়নি। তবে ইমরানের অভিনয় নজর কাড়ে নির্মাতাদের।
এর ঠিক এক বছর পর, ২০০৪ সালে মুক্তি পায় অনুরাগ বসু পরিচালিত ‘মার্ডার’। এ ছবিই বদলে দেয় ইমরানের ক্যারিয়ারের গতিপথ। মল্লিকা শেরাওয়াতের সঙ্গে তাঁর রসায়ন, সাহসী দৃশ্য ও সংগীত—সব মিলিয়ে ছবিটি হয়ে ওঠে তুমুল আলোচিত ও বাণিজ্যিকভাবে সফল।

‘মার্ডার’ শুধু একটি হিট সিনেমা নয়, বরং ইমরান হাশমির জন্য ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। এ ছবির মাধ্যমেই তিনি বলিউডে ‘আউটসাইড-দ্য-বক্স’ নায়ক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন—যিনি প্রচলিত নায়কদের মতো নন, বরং কিছুটা ধূসর, কিছুটা বেপরোয়া, আবার একই সঙ্গে আকর্ষণীয়।

এরপর ভাট ক্যাম্পের একাধিক ছবিতে কাজ করলেও ধীরে ধীরে তিনি সেই গণ্ডি পেরিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেন। ‘গ্যাংস্টার’, ‘জান্নাত’, ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে প্রমাণ করেন, তিনি শুধু ‘ক্যাম্পনির্ভর’ অভিনেতা নন—বরং নিজের অভিনয়গুণেই দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া একজন তারকা।

‘হোয়াই চিট ইন্ডিয়া’ ছবিতে শ্রেয়া ধন্বন্তরি ও ইমরান হাশমি

‘সিরিয়াল কিসার’ তকমা—আশীর্বাদ না অভিশাপ
‘মার্ডার’-এর পর থেকে যেন একের পর এক ছবিতে চুম্বন দৃশ্য তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। ‘জান্নাত’, ‘আশিক বনায়া আপনে’, ‘রাজ থ্রি’, ‘গ্যাংস্টার’—প্রায় প্রতিটি ছবিতেই এই ইমেজ আরও জোরালো হয়। দর্শকেরা তাঁকে ভালোবেসে যেমন গ্রহণ করেন, তেমনি সমালোচকেরাও তাঁকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে বেঁধে ফেলেন। এমনকি অনেকেই তাঁকে ঠাট্টা করে ‘ইমরান কিসমি’ বলে ডাকতে শুরু করেন। এই ইমেজ তাঁকে জনপ্রিয়তা দিলেও, একসময় তা হয়ে ওঠে তাঁর জন্য সীমাবদ্ধতার কারণ। কারণ, দর্শক তাঁকে আর ভিন্ন চরিত্রে কল্পনাই করতে চাইছিলেন না।

ইমেজ ভাঙার লড়াই
ক্যারিয়ারের মাঝামাঝি সময়ে এসে ইমরান বুঝতে পারেন—একই ধরনের চরিত্রে আটকে থাকলে দীর্ঘ পথচলা সম্ভব নয়। তাই তিনি ধীরে ধীরে স্ক্রিপ্ট বাছাইয়ে পরিবর্তন আনতে শুরু করেন। ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই’, ‘সাংঘাই’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে তিনি দেখিয়ে দেন, তিনি শুধু রোমান্টিক বা বিতর্কিত চরিত্রের নায়ক নন; তাঁর অভিনয়ে রয়েছে গভীরতা ও পরিপক্বতা। ইমরানের নিজের ভাষায়, ‘আমি কখনোই কোনো চরিত্রকে ধূসর বা নেতিবাচক হিসেবে দেখি না। চরিত্রকে বিচার করলে অভিনয়ে পক্ষপাত চলে আসে।’ এ দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে ধীরে ধীরে ভিন্ন এক অবস্থানে নিয়ে যায়।

ব্যক্তিজীবনের কঠিন সময়
ক্যারিয়ারের উত্থান-পতনের মাঝেই একসময় ব্যক্তিজীবনে বড় ধাক্কা আসে ইমরান হাশমির জীবনে। ঠিক যখন পেশাগতভাবে নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তখনই সামনে আসে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা—ছেলের অসুস্থতা।
স্ত্রী পারভীন শাহানির সঙ্গে তাঁর সংসার শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে। ২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় একমাত্র সন্তান আয়ান হাশমি। সবকিছুই চলছিল স্বাভাবিক ছন্দে।

ছেলের এই লড়াইয়ের গল্পই পরে তিনি বই আকারে তুলে ধরেন

কিন্তু ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি হঠাৎই নেমে আসে অন্ধকার। সেদিনই জানতে পারেন, তাঁদের ছোট্ট ছেলে আয়ান ক্যানসারে আক্রান্ত।
একমুহূর্তেই যেন বদলে যায় সবকিছু। ইমরান-পরিবারের জীবনে শুরু হয় এক দীর্ঘ, কঠিন লড়াই। শুটিং সেট, ক্যামেরা, আলো—সবকিছু থেকে নিজেকে অনেকটাই সরিয়ে নিয়ে ছেলের চিকিৎসা ও সুস্থতার দিকেই মনোযোগ দেন ইমরান।

সৌভাগ্যের বিষয়, ক্যানসারটি প্রথম পর্যায়ে ধরা পড়েছিল। তবু চিকিৎসার পথ ছিল দীর্ঘ, মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর। হাসপাতাল, কেমোথেরাপি, অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে এই দম্পতিকে।
ইমরান নিজেই পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সেই সময়টা তাঁকে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন, খ্যাতি বা সাফল্যের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বড়।

দীর্ঘ চিকিৎসা ও সংগ্রামের পর অবশেষে জয় আসে। ২০১৯ সালে আয়ান ক্যানসারমুক্ত হয়। সেই মুহূর্তটি শুধু তাঁদের পরিবারের জন্য নয়, ইমরান হাশমির জীবনেও এক নতুন সূচনা হয়ে ওঠে।

ছেলের এই লড়াইয়ের গল্পই পরে তিনি বই আকারে তুলে ধরেন। ‘কিস অব লাইফ: হাউ আ সুপারহিরো অ্যান্ড মাই সন ডিফিটেড ক্যানসার’ শিরোনামের বইটিতে তিনি লিখেছেন একজন বাবার ভয়, অসহায়তা, আশা আর জয়ের গল্প।
এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন তারকা ইমরান হাশমিকে নয়, একজন মানুষ ইমরানকে আরও সংযত, পরিণত ও সংবেদনশীল করে তুলেছে—যার প্রতিফলন এখন স্পষ্ট তাঁর কাজের ধরন, চরিত্র বাছাই এবং জীবনদর্শনে।

ক্যারিয়ারের উত্থান-পতনের মাঝেই একসময় ব্যক্তিজীবনে বড় ধাক্কা আসে ইমরান হাশমির জীবনে

ফিটনেস, শৃঙ্খলা আর নতুন জীবনযাপন
৪৭ বছর বয়সেও ইমরান হাশমির ফিটনেস আজকের অনেক তরুণ অভিনেতাকেও চ্যালেঞ্জ জানায়। তবে নিজের ফিটনেসের রহস্য জানতে চাইলে তিনি বরাবরের মতোই রসিকতা করেন—‘আমার বউ আমাকে ঠিকমতো খেতে দেয় না!’ এরপর অবশ্যই তিনি জানান, নিয়মিত শরীরচর্চা, ডায়েট ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপনই তাঁকে ফিট রেখেছে। করোনাকাল তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আনে। তিনি বলেন, তখন অনেকেই জীবনযাত্রায় ঢিলেমি এনেছিলেন, কিন্তু তিনি সেই সময়টাকেই কাজে লাগিয়েছেন নিজেকে গড়ে তুলতে।

‘হক’ ও দায়িত্বশীল অভিনয়
কিছুদিন আগে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত ইমরানের কাজ নতুনভাবে দর্শকের নজর কাড়ছে। বাস্তব ঘটনার প্রেরণায় নির্মিত ‘হক’ ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। এ ধরনের সংবেদনশীল গল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে ইমরান বলেন, ‘এ ধরনের ছবিতে দায়িত্বশীল হতে হয়। যাদের জীবনের ঘটনা থেকে গল্প নেওয়া, তাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সংবেদনশীল থাকতে হয়।’

তিনি আরও জানান, এই ছবির জন্য তাঁরা বিস্তর গবেষণা করেছেন এবং বাস্তবতার সঙ্গে যতটা সম্ভব সৎ থাকার চেষ্টা করেছেন।
ইদানীং ইমরানকে ধূসর চরিত্রে বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে তিনি এ শব্দটাকেই একটু ভিন্নভাবে দেখেন। তাঁর মতে, কোনো চরিত্রই পুরোপুরি ভালো বা খারাপ নয়। প্রতিটি চরিত্রের নিজস্ব যুক্তি ও বিশ্বাস থাকে। এ দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে নতুনভাবে চরিত্র নির্মাণে সাহায্য করছে।

আজহারউদ্দিন চরিত্রে ইমরান হাশমি

বদলে যাওয়া এক তারকার গল্প
একসময় বছরে চার-পাঁচটি ছবি করতেন ইমরান। এখন সেই সংখ্যা কমিয়ে এনেছেন এক বা দুটিতে। কারণ, এখন তাঁর কাছে গল্পটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘৫০টির বেশি ছবি করার পর নতুন কিছু খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই এখন আমি বেছে কাজ করি।’ এই বেছে নেওয়ার প্রবণতাই তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংসকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ওটিটিতে সাফল্যের পর বড় পর্দায়ও নতুনভাবে ফিরতে চাইছেন ইমরান। বলা যায় সফলও তিনি। সামনে রয়েছে বেশ কিছু বড় প্রজেক্ট। এর পাশাপাশি ওয়েব সিরিজেও তাঁর উপস্থিতি বাড়ছে। আরিয়ান খান পরিচালিত একটি সিরিজে তাঁর অভিনীত দৃশ্যগুলো ইতিমধ্যে দর্শকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।

সব মিলিয়ে ‘সিরিয়াল কিসার’—এই একটি তকমা দিয়ে একসময় যাঁকে বিচার করা হতো, সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলে গেছে। আজ ইমরান হাশমি শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক নন, বরং একজন পরিণত অভিনেতা—যিনি নিজেকে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। জন্মদিনে শুভেচ্ছা রইল এ অভিনেতার জন্য।

Read full story at source