ট্রাস্টের টাকা বিতরণে দীর্ঘসূত্রতা দূর করুন
· Prothom Alo

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশের এক নীরব মহামারি। প্রতিদিনই কেউ না কেউ প্রাণ হারাচ্ছেন, কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গু হচ্ছেন। এই নির্মম বাস্তবতায় ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ কেবল আর্থিক সহায়তা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকা সত্ত্বেও সেই দায়বদ্ধতা পূরণে বড় ধরনের ব্যর্থতা রয়ে গেছে।
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এবং এর অধীন প্রণীত ২০২২ সালের বিধিমালা স্পষ্টভাবে বলে, দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবার পাঁচ লাখ টাকা এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিরা নির্ধারিত হারে ক্ষতিপূরণ পাবেন। আবেদন করার পর দুই মাসের মধ্যে এই অর্থ দেওয়ার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ আইনগত কাঠামো যথেষ্ট পরিষ্কার। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই আইন বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
Visit casino-promo.biz for more information.
২০২৩ সাল থেকে গত অক্টোবর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১৬ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। অথচ ক্ষতিপূরণ পেয়েছে মাত্র ১৪ শতাংশ পরিবার। আহত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই হার আরও হতাশাজনক, মাত্র ২ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ অধিকাংশ ভুক্তভোগী বা তাঁদের পরিবার আইনের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা স্পষ্ট। প্রথমত, প্রশাসনিক জটিলতা। ক্ষতিপূরণের আবেদনপ্রক্রিয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসন এবং বিআরটিএ যুক্ত থাকে। কিন্তু এসব সংস্থার দায়িত্ব বণ্টন স্পষ্ট নয়, সমন্বয় দুর্বল। ফলে আবেদন মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।
দ্বিতীয়ত, জবাবদিহির অভাব। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হলেও কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। যে ট্রাস্টি বোর্ড ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্বে রয়েছে, তাদের কাজেও গতি নেই। অথচ এই তহবিলে অর্থের ঘাটতি নেই; ২৫৫ কোটি টাকার বেশি জমা রয়েছে। অর্থ আছে, আইন আছে; কিন্তু প্রয়োগ নেই—এ এক ভয়াবহ প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
তৃতীয়ত, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। কোথাও কোথাও ক্ষতিপূরণ পেতে ঘুষ চাওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমন অভিযোগ কেবল অনৈতিকই নয়, এটি পুরো ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ধ্বংস করে দেয়।
চতুর্থত, সচেতনতার ঘাটতি। অনেক মানুষ জানেনই না যে তাঁরা ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করতে পারেন। আবার আগে ৩০ দিনের সময়সীমা থাকায় অনেকেই আবেদন করার সুযোগ পাননি। যদিও পরে তা বাড়িয়ে ৯০ দিন করা হয়েছে, কিন্তু আগের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্র কি কেবল আইন প্রণয়ন করেই দায় শেষ করেছে? নাকি বাস্তবায়নের দায়ও তার? একটি মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দ্রুত সহায়তা দেওয়া, যাতে তারা অন্তত প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সমাধান কী? ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। আবেদন থেকে অর্থ প্রদান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অনলাইনে ট্র্যাক করা গেলে গড়িমসি কমবে। নির্দিষ্ট সময়সীমা লঙ্ঘন করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান কার্যকর করতে হবে। ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে মানুষ তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারেন। প্রয়োজনে সরকারি উদ্যোগে আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জবাবদিহি নিশ্চিত করা। যত দিন পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা না হবে, তত দিন এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর উচিত এখনই জবাবদিহি কার্যকর সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পরিবার যখন তার উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারায়, তখন ক্ষতিপূরণ সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। কিন্তু এটি তাদের বেঁচে থাকার লড়াইকে কিছুটা সহজ করে। সেই সহায়তাও যদি বছরের পর বছর আটকে থাকে, তাহলে সেটা একধরনের নির্মমতা।