সিলভিয়া প্লাথ: কিছু ব্যথা কিছু কথা
· Prothom Alo

সিলভিয়া প্লাথ জন্মেছিলেন ১৯৩২ সালের ২৭ অক্টোবর—আমেরিকার বোস্টন শহরে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রতিভার অতিরিক্ত ভারে নুয়ে পড়া এক অসাধারণ শিশু। ৯ বছর বয়সে তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয়। ১২ বছর বয়সে আইকিউ টেস্ট তাঁকে ‘প্রত্যয়িত প্রতিভা’ ঘোষণা দেয়—১৬০। কিন্তু জীবন তাঁর চিরাচরিত নিষ্ঠুরতায় তখনই আরেকটি কাগজ তাঁর হাতে ধরিয়ে দেয়—বাবার মৃত্যুসনদ। কবির বয়স যখন আট বছর, তখন ডায়াবেটিসে মারা যান তাঁর বাবা অটো প্লাথ—একজন কঠোর, কর্তৃত্বপরায়ণ ও দূরত্বে ঢাকা মানুষ।
Visit milkshakeslot.com for more information.
সিলভিয়ার জীবনে এই মৃত্যু শুধু শোক ছিল না। ছিল এক মানসিক ভূমিকম্প। বাবার অনুপস্থিতির কারণে বালিকা কবি সিলভিয়ার ভেতরে এক অদ্ভুত আত্মোপলব্ধি ও প্রতিক্রিয়া বাসা বাঁধে—ভয়, শ্রদ্ধা, রাগ আর ঘৃণার চতুর্বেণী সঙ্গমে। এরই শীতল ছায়া পরে তাঁর বিখ্যাত ‘Daddy’ কবিতায় কঠিন ভাষা পায়। সেখানে বাবা আর ব্যক্তি নন—তিনি ক্ষমতা, পিতৃতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ এবং ইতিহাসের নিষ্ঠুর মুখ। কবিতার শেষ স্তবকে তাই এমন উচ্চারণ—
‘...There's stake in your flat black heart
And the villagers never liked you.
They are dancing and stamping on you.
They always knew it was you.
Daddy, daddy, you bastard, I'm through.’
এখানে ‘থ্রু’ শব্দটি শুধু বাবার উদ্দেশে নয়। নিজের ভেতরের আতঙ্ক, দাসত্ব আর অতীতকেও একসঙ্গে খুন করার ভয়ংকর আকাঙ্ক্ষা। তারুণ্যে এসে এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র, আরও অগ্নিদগ্ধ হয়। স্মিথ কলেজে পড়াকালীন সময়ের বাহ্যিক সাফল্য তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে—স্কলারশিপ, প্রশংসা, প্রতিভার ঝলক। ১৯৫৩ সালে Mademoiselle ম্যাগাজিনের অতিথি সম্পাদক হয়ে নিউইয়র্কে যান। বাইরে ঝকঝকে মহানগরের চাকচিক্য, ভেতরে এক হাহাকার-করা শূন্যতা। পরে তিনি এই সময়কে তিনটি কথায় সংক্ষেপে চিত্রায়িত করেছিলেন—‘মনের ব্যথা, সামাজিক আনন্দ-উৎসবের ব্যস্ততা ও কাজের পাগলামী।’
হার্ভার্ডের একটি লেখালেখির প্রোগ্রাম থেকে প্রত্যাখ্যান তাঁকে গভীর মানসিক ভাঙনের দিকে ঠেলে দেয়। ২০ বছর বয়সে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন—মায়ের ঘুমের ওষুধ খেয়ে বাড়ির নিচে লুকিয়ে থাকেন তিন দিন। সংবাদপত্রে শিরোনাম হয় তাঁর নিখোঁজ হওয়া, অবশেষে উদ্ধার। এরপর ম্যাকলিন হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসা। ইলেকট্রোশক থেরাপি। জীবন যেন নির্মমভাবে তাঁকে শিখিয়ে দিচ্ছিল—প্রতিভা মানেই প্রশান্তির অনুষঙ্গ খুঁজে পাওয়া নয়।
তবু তিনি থামেননি। ফুলব্রাইট স্কলারশিপ পেয়ে কেমব্রিজে যান। সেখানেই ১৯৫৬ সালে টেড হিউজের সঙ্গে সেই বিখ্যাত সাক্ষাৎ—প্রেম, কবিতা, রক্ত আর সহিংস আবেগের এক বিস্ময়কর সংঘর্ষ। প্রথম দেখাতেই সিলভিয়া মোমের মতো গলে গেলেন। জলের গভীরতা না মেপে জলে ঝাঁপ দিলেন—যেন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সেই দিন সেখানেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। চার মাসের মাথায় বিয়ে। এই সম্পর্ক ছিল প্রবল, সৃজনশীল, কিন্তু ভয়ংকরভাবে অস্থিতিশীল। সিলভিয়া পরে অভিযোগ করেছিলেন—তাঁর বৈবাহিক সম্পর্কে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন ছিল। এমনকি তাঁর একবার গর্ভপাতও ঘটে। সংসারে আসে দুই সন্তান—ফ্রিডা ও নিকোলাস।
কিন্তু কবিতার মতোই স্বামীর সঙ্গের সম্পর্কও ছিল আত্মঘাতী। টেড হিউজ অন্য এক রমণী—আসিয়া উয়েভিলের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৬২ সালে সিলভিয়া আলাদা হয়ে যান। দুই শিশু নিয়ে লন্ডনের একটি ছোট ফ্ল্যাটে ওঠেন। সময়টা ছিল শতাব্দীর অন্যতম কঠিন শীত। ঘরে তীব্র ঠান্ডার কামড়। শরীরে ইনফ্লুয়েঞ্জা। হৃৎপিণ্ডে টেড হিউজের বিশ্বাসঘাতকতার কাঁটার খোঁচা। অন্তরে ব্যর্থতা আর হতাশার সীমাহীন নীল আকাশ।
এই সময়েই ঘটে এক আশ্চর্য বিস্ফোরণ। মানসিকভাবে প্রায় ভেঙে পড়া এই নারী তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও ঝাঁজালো কবিতাগুলো লিখে ফেলেন—বিদ্যুতের মতো ধারালো, অগ্নিময়, নির্দয়ভাবে সত্য। পরে এগুলো Ariel নামে প্রকাশিত হয়। একই সময়ে তাঁর উপন্যাস ‘দ্য বেল জার’ একের পর এক প্রত্যাখ্যাত হয়। প্রকাশকেরা বলেন—এটা উপন্যাস হয়নি, হয়েছে একটি কেস হিস্ট্রি। যেন তাঁর যন্ত্রণা সাহিত্য হওয়ার যোগ্য নয়। সে কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুছিয়ে রাখা নথিমাত্র।
মৃত্যুর ঠিক আগের দিনগুলোতে বন্ধুরা বুঝতে পেরেছিলেন—সিলভিয়া ভালো নেই। রাগ, ক্ষোভ, হিংসা—যত্রতত্র উথলে উঠছে একসঙ্গে। আত্মহত্যার আগের দিন শেষ রাতে কাঁদতে কাঁদতে গাড়ি থেকে নামেন। কেউ তাঁকে থাকতে বললে তিনি খেপে যান—‘না, এসব বাজে কথা। আমাকে বাড়ি যেতেই হবে।’ এখানে ‘বাড়ি’ বলতে যে তিনি তাঁর অন্তিম ঠিকানা বুঝিয়েছিলেন, সেটা তাৎক্ষণিক বন্ধুদের মাথায় খেলেনি।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
১১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৩, সকাল ৭টা। সিলভিয়া উঠে সন্তানদের যত্ন নেন। দুধ, রুটি, মাখন টেবিলে সাজিয়ে রাখেন। অতিরিক্ত কম্বল বের করে দেন। দরজার ফাঁক টেপ দিয়ে বন্ধ করেন—যেন পৃথিবীর বিষ তাঁর নিরাপদ ঘরে ঢুকতে না পারে। তারপর রান্নাঘরে যান, গ্যাসের ওভেন জ্বালান। একসময় জ্বলন্ত ওভেনের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে দেন। কবিতা আর নিশ্বাস—দুটোই থেমে যায়। তিনটি জিনিস ছিল তখন রান্নাঘরে—একজন কবির মৃতদেহ, দুটি শিশুর নিশ্বাস এবং এক নিঃশব্দ বিস্মরণ। তিনি তাঁর প্রিয় সন্তানদের রেখে চলে যান এমন এক দেশে, যেখানে আর কোনো শব্দ নেই, কোনো ব্যথা নেই—শুধু এক নিঃসঙ্গ আলো, যেটা হয়তো তাকে এত দিন ডেকেছিল। পরিবার লজ্জায় বলে—নিউমোনিয়া। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের জগৎ জানে—এটা ছিল এক বিষণ্ন কবির দীর্ঘ, ক্লান্ত, সচেতনভাবে নেওয়া মারাত্মক সিদ্ধান্ত।
মৃত্যুর পরই শুরু হয় সিলভিয়া প্লাথের আসল জীবন। ‘আরিয়েল’ প্রকাশিত হয়। ‘দ্য বেল জার’ আমেরিকায় আলোর দেখা পায়। ১৯৮২ সালে তিনি হন ইতিহাসের প্রথম মরণোত্তর পুলিৎজার বিজয়ী ব্যক্তি। কিন্তু বিতর্কও থামে না। টেড হিউজ তাঁর শেষ ডায়েরি ধ্বংস করে দেন—‘সন্তানদের রক্ষা করার অজুহাতে’। বিষণ্নতার উত্তরাধিকার পৌঁছে যায় ছেলের ভেতরেও। নিকোলাস ৪৭ বছর বয়সে জীবনের বিনিময়ে মায়ের করুণ পথরেখা বেছে নেন।
আজ সিলভিয়া প্লাথকে স্মরণ করা হয় দুইভাবে—প্রথমত, একজন অসামান্য কবি হিসেবে; আর দ্বিতীয়ত, একটি খোলা ক্ষত হিসেবে। তাঁর কবিতায় মৃত্যু আর শিল্প আলাদা নয়। তিনি নিজেই লিখে গেছেন—
‘Dying is an art…’
হয়তো সিলভিয়া বিশ্ববাসীকে এটুকুই শিখিয়ে গেছেন—কখনো মানুষ কবিতা লেখে বাঁচার জন্য, আর কখনো কবিতা লেখে যেন মৃত্যুটা আরেকটু সহনীয় হয়। অভিমানী কবির মৃত্যু কতটা সহনীয় ছিল, কে জানে?
আলবের কামু, ফ্রানৎস কাফকা, সিলভিয়া প্লাথ—তিনজন জীবনে একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু তিনজন তিনভাবে উত্তর দিয়েছিলেন। প্রশ্নটি খুব সাধারণ, আবার খুব ভয়ংকরও বটে। এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার মানে কী, যখন পৃথিবী নিজেই কোনো মানে দেয় না?
কামু এই প্রশ্নের নাম দিয়েছিলেন অ্যাবসার্ড, কাফকা একে পরিণত করেছিলেন এক অন্তহীন বিচারে। আর সিলভিয়া প্লাথ—তিনি এই প্রশ্নকে নিজের শরীরের ভেতরে ঢুকতে দিয়েছিলেন। কামু বলেছিলেন, পৃথিবী নীরব। মানুষ প্রশ্ন করে, কিন্তু উত্তর আসে না। তবু আত্মহত্যা তাঁর কাছে সমাধান নয়—কারণ বাঁচাটাই একধরনের বিদ্রোহ। ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’–এ তিনি মানুষকে পাথর ঠেলতে ঠেলতে হাসতে শিখিয়েছিলেন। কামু জানতেন, অর্থ নেই—কিন্তু মর্যাদা আছে। কাফকার পৃথিবীতে অবশ্য মর্যাদারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। সেখানে মানুষ জন্ম থেকেই অপরাধী। দ্য ট্রায়াল-এ যেমন কেউ জানে না, কী অপরাধে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তবু শাস্তি অনিবার্য। কাফকা বাঁচলেন, লিখলেন, কষ্ট পেলেন—কিন্তু নিজেকে শেষ করে দেননি। তাঁর যন্ত্রণা ছিল ধীর, দীর্ঘ, প্রায় ব্যুরোক্রেটিক। আর সিলভিয়া প্লাথ? তিনি এই দুই দার্শনিক অবস্থানের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছিলেন—কিন্তু কোনোটিতেই পুরোপুরি আশ্রয় পাননি। কামুর মতো তিনি জানতেন, পৃথিবী নিষ্ঠুর ও অর্থহীন। কাফকার মতো তিনি বুঝতেন, এই নিষ্ঠুরতার কাঠামো আছে—বাবা, পুরুষ, সমাজ, ইতিহাস। কিন্তু তিনি সেই কাঠামোর ভেতরে বাঁচতে পারেননি। সিলভিয়ার ট্র্যাজেডি এখানেই—তিনি চিন্তাকে কবিতায় রূপ দিলেন, কিন্তু কবিতাকে বেঁচে থাকার ঢাল বানাতে পারলেন না। ‘ড্যাডি’ বা ‘লেডি ল্যাজারাস’—এই কবিতাগুলো দর্শনের ভাষায় লেখা হয়নি, লেখা হয়েছে রক্তের ভাষায়। কামু যেখানে যুক্তি ব্যবহার করেন, সিলভিয়া সেখানে উপমা ব্যবহার করেন। কাফকা যেখানে রূপক নির্মাণ করেন, সিলভিয়া সেখানে শরীরকে রূপক বানান।
কামু বলেছিলেন—‘One must imagine Sisyphus happy.’ কাফকার চরিত্ররা কখনো সুখ কল্পনা করে না।
আর সিলভিয়া? তিনি সুখকে সন্দেহ করতেন। সুখ তাঁর কাছে ছিল অস্থায়ী। প্রায় প্রতারণার শামিল। তাঁর জীবনে বাবার মৃত্যু ছিল প্রথম অযৌক্তিক আঘাত। কামুর দর্শনে যেমন দৈবতা নীরব, সিলভিয়ার জীবনেও দৈবতা অনুপস্থিত—কিন্তু সেই অনুপস্থিতি তাঁকে দার্শনিক বানায়নি, তাঁকে ক্ষুধার্ত বানিয়েছিল—নিরাপত্তার ক্ষুধা, স্বীকৃতির ক্ষুধা, ভালোবাসার ক্ষুধা। এই ক্ষুধা পূরণ করতে গিয়ে তিনি প্রেমে পড়েন, বিয়ে করেন, মা হন—কিন্তু প্রতিবারই দেখেন—পৃথিবী তাঁর কাছে অনেক বেশি চায়। তিনি দিতে পারেনি। তাই এই আত্মসমর্পণ। এই আত্মহনন।
কাফকার মতো সিলভিয়াও ক্ষমতার মুখোমুখি হয়েছেন; কিন্তু আদালতের নয়, সংসারের। টেড হিউজ তাঁর জন্য বিচারক ছিলেন না, ছিলেন আয়না। সেই আয়নায় তিনি নিজেকে প্রতিভাবান দেখেছেন। আবার অদৃশ্যও দেখেছেন। এই দ্বৈততা তাঁকে ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করেছে। সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি শেষ সিদ্ধান্তে। কামু বাঁচলেন, কারণ তাঁর কাছে বাঁচাই ছিল নৈতিক অবস্থান। কাফকা বাঁচলেন, কারণ হয়তো তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। সিলভিয়া প্লাথ মারা গেলেন—কারণ তাঁর কাছে বেঁচে থাকাটাই একসময় নৈতিকভাবে অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।
এখানে কোনো রোম্যান্টিকতা নেই। এটি সাহস বা কাপুরুষতার প্রশ্নও নয়। এটি দেখায় একই দর্শন, একই অন্ধকার—কিন্তু মানুষের সহনশীলতার সীমা এক নয়। কেউ পাথর ঠেলে যায়। কেউ কাগজে বিচারের রায় লিখে রাখে। আর কেউ আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে বলে—এখানেই থামি। সিলভিয়া প্লাথ তাই কামু বা কাফকার চেয়ে কম দার্শনিক নন। তিনি শুধু দর্শনকে কাগজে নয়, নিজের জীবনে প্রয়োগ করেছিলেন এবং সেই প্রয়োগে তিনি হেরে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর হারটাই বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য মণিমুক্তা হয়ে রয়ে গেছে।
কিছু মানুষ পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করে। কিছু মানুষ পৃথিবীকে সহ্য করে। আর কিছু মানুষ—সিলভিয়া প্লাথের মতো পৃথিবীর ভেতরের অন্ধকারটা পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়ে নীরবে নিঃশব্দে চলে যায়।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং ম্যানেজিং এডিটার, জার্নাল আফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ
Email: [email protected]