দুর্দান্ত নিশো ‘দম’–কে নিয়ে গেলেন অন্য উচ্চতায়
· Prothom Alo

২০১৬ সালের ‘আইসক্রিম’ সিনেমার প্রায় ১০ বছর পর মুক্তি পেল রেদওয়ান রনি পরিচালিত ‘দম’ সিনেমা। রেদওয়ান রনির আগে মুক্তিপ্রাপ্ত দুটি সিনেমা (‘চোরাবালি’ ও ‘আইসক্রিম’) দেখলে বোঝা যায়, মূলধারার ভেতরে থেকেও একটু ভিন্ন ধরনের গল্প বলার চেষ্টা করেন তিনি। তবে ‘দম’ সিনেমায় নির্মাতা যেন আরও পরিণত। বাণিজ্যিক সিনেমার বহুমাত্রিকতাকে পাশ কাটিয়ে এখানে নির্মাতা নজর দিয়েছেন সংযত গল্প বলার ধরনে। সারভাইভাল থ্রিলার ঘরানার এ ছবি সত্যিকার অর্থেই দর্শককে নিয়ে যায় এক দুর্মর মরুভূমিতে, যেখানে একজনের বেঁচে থাকার যাত্রাকে ঘিরে এগিয়েছে পুরো গল্প।
Visit newsbetting.cv for more information.
একনজরে সিনেমা : ‘দম: আনটিল দ্য লাস্ট ব্রেথ’ধরন: সারভাইভাল থ্রিলার, ড্রামাপরিচালক: রেদওয়ান রনিচিত্রনাট্যকার: সৈয়দ আহমেদ শাওকী, আল-আমিন হাসান, মো. সাইফুল্লাহ, রবিউল আলমঅভিনয়: আফরান নিশো, চঞ্চল চৌধুরী, পূজা চেরী, ডলি জহুররানটাইম: ২ ঘণ্টা ৮ মিনিট
‘দম: আনটিল দ্য লাস্ট ব্রেথ’ সিনেমাটি সত্য ঘটনার ওপর নির্মিত। আফগানিস্তানের দুর্গম মরুভূমি। শুরুতেই দেখা যায়, ছুটে চলেছে এক জিপগাড়ি। বসে আছেন মুখঢাকা কয়েকজন তালেবান যোদ্ধা, হাতে বন্দুক। এরই মধ্যে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে পেছনের ভ্যান খুলে ধু ধু মরুভূমিতে ফেলা হলো একটি মৃতদেহ। কথা শুনে বোঝা গেল, অত্যাচার সামলাতে না পেরে মারা গেছেন সেই ব্যক্তি। আর ভ্যানের ডিকি থেকে সামনে নিয়ে আসা হয় আরেক বন্দী শাহজাহান ইসলাম নূরকে (আফরান নিশো)। গল্প এগোতে থাকে নূরের আফগানিস্তান আসাকে কেন্দ্র করে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নেস্টে কাজ করেন নূর। নিজের মা (ডলি জহুর) আর স্ত্রী রানীকে (পূজা চেরী) নিয়ে ছোট্ট সংসার। পরিবারের অভাব-অনটন মেটাতে পাড়ি জমান নেস্টের আফগানিস্তান শাখায়। এর মধ্যে আফগানিস্তানের এক তালেবান নেতাকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই নেতাকে মুক্ত করতে তালেবানরা ধরে নিয়ে যেতে থাকে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত ব্যক্তিদের। কারণ, তাদের ধারণা, এসব প্রতিষ্ঠান মার্কিন সহায়তাপুষ্ট।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে নূরও তাঁদের একজন। ‘বন্দীর বিনিময়ে বন্দী’—এই চুক্তিতে সমাধান চায় তালেবানরা। কিন্তু এরই মধ্যে বন্দী সেই তালেবান নেতাকে মেরে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। এরপর কী পরিণতি হয় নূরের? নূর কি পারেন বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পেতে? নাকি তাঁকেও মেনে নিতে চরম পরিণতি? এমন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এগিয়েছে ‘দম’ সিনেমার গল্প।
‘দম’–এর লুকে আফরান নিশোসারভাইভাল থ্রিলারের মূলধারা মেনেই এগিয়েছে ‘দম’। মাত্র দুই ঘণ্টার এ সিনেমায় নির্মাতা যেভাবে একের পর এক ঘটনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা প্রশংসনীয়। তবে এ সিনেমায় দুঃখ, কষ্ট, পরিবার, সন্ত্রাস, ধর্ম, জাতীয়তাবাদসহ নানান দিক উঠে এলেও শেষ পর্যন্ত ‘দম’ যেন একটি মানবিক ছবি। এ ছবির পরতে পরতে দেখা যায় মানবিকতার জয়গান। গ্রামের এক নিতান্ত সাধারণ ধর্মভীরু ব্যক্তি নূর দর্শককে টেনে নিয়ে যান তাঁর একক বেঁচে থাকার যাত্রায়। যেখানে নূরকে বাঁচানোর জন্য দর্শক নিজেই কখন যে নূরের সঙ্গে সঙ্গে দোয়া ইউনুস পড়া শুরু করেন, তা বলতে পারেন না। সিনেমার গল্পের সঙ্গে এভাবে দর্শকদের এত সূক্ষ্মভবে সংযোগ ঘটানোর জায়গাটাকে পরিচালক হিসেবে রেদওয়ান রনির সার্থকতা বলাই যায়।
‘দম আমার কাছে বাংলাদেশের সিনেমার একটি সম্পদ হয়ে থাকবে’এবার আসা যাক অভিনয়ে। ‘দম’ সিনেমায় নিশোকে ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না। নিশোর বাস্তব অভিনয় ছিল ‘দম’ সিনেমার প্রাণ। খুব কম সংলাপের এ সিনেমায় নিশো বারবার নিজেকে ভেঙেছেন। মানসিক চাপের সময়ে তাঁর ভঙ্গুরতা আর বেঁচে থাকার আকুতি যেমন চোখে জল এনেছে, তেমনি তাঁর সংসারের ছোট ছোট মুহূর্ত আনন্দ দিয়েছে দর্শকদের।
‘দম’ সিনেমার পোস্টার। চরকির সৌজন্যে২০২৩ সালে প্রথম সিনেমা ‘সুড়ঙ্গ’ দিয়ে নিশো চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে তাঁর জাত চিনিয়েছিলেন। এরপর গত বছর মুক্তি পাওয়া ‘দাগি’ সিনেমায় তাঁর অভিনয় প্রশংসা কুড়িয়েছে। এবার ‘দম’ সিনেমায় অভিনয় করে তিনি নিজেকে নিয়ে গেলেন অন্য উচ্চতায়। তিন সিনেমাতেই তাঁর চরিত্র সাধারণ মানুষের। ‘সুড়ঙ্গ’তে ছিল ইলেকট্রিশিয়ান মাসুদের কোনো রকম এক যাত্রার গল্প, ‘দাগি’তে জেলফেরত এক যুবকের প্রায়শ্চিত্তের গল্প আর ‘দম’ জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমানো এক যুবকের বন্দিদশার বয়ান। তিনটি সাধারণ মানুষের চরিত্র হলেও নিজের লুক, এক্সপ্রেশন আর অভিনয় দিয়ে চরিত্র তিনটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি।
সিনেমার বিরতির আগে পালানোর চেষ্টা করেন নূর, সে সময়ে তাঁর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা, বমি করা আর শঙ্কাভরা চাহনি ভোলা কঠিন। একইভাবে বিস্ফোরণের পর পালাবেন কি পালাবেন না, এই দোলাচল তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, সেটাও দেখার মতো।
মনে হচ্ছিল ‘দম’–এর চরিত্রের মানসিক বন্দিত্বে ঢুকে গিয়েছিপর্দায় পূজা চেরীর সঙ্গে নিশোর রসায়ন ভালো ছিল। চরিত্র ছোট হলেও পূজা ভালো অভিনয় করেছেন। বিদেশে বন্দী স্বামী, বেঁচে আছেন কি না, জানা নেই; এমন চরিত্রে যথাযথ ছিলেন পূজা। গত বছরের শুরুর দিকে ওয়েব সিরিজ ‘ব্ল্যাকমানি’র গ্ল্যামারাস চরিত্রে দেখা সেই পূজাকে এই সিনেমায় গৃহবধূর চরিত্রে চেনা মুশকিল। স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আশায় নেস্টের ঢাকা অফিসে যাওয়া বা দিনের পর দিন মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তাঁর আকুতি দর্শকদের ছুঁয়ে গেছে।
সিনেমায় সুজিত চরিত্রে ছিলেন চঞ্চল চৌধুরী। তবে এ চরিত্রের প্রতি নির্মাতা যেন খুব একটা সুবিচার করেননি। নূর ও সুজিতের মধ্যে সম্পর্কটা আরেকটু ভালোভাবে দেখানোর সুযোগ ছিল। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও চঞ্চল চৌধুরী নিছক একজন পার্শ্বচরিত্র হয়েই থেকে গেলেন।
তবে অন্যান্য চরিত্রকে বেছে নিতে নির্মাতা মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। বিশেষত আফগানিস্তানে তালেবান এবং তাঁদের পরিবারের যে চরিত্রগুলো রয়েছেন, তাঁদের সবাই বিদেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা সবাই চরিত্রের সঙ্গে দুর্দান্তভাবে মানিয়ে গেছেন। শিশুশিল্পী থেকে শুরু করে তালেবান নেতা—প্রত্যেকে বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করেছেন। অতিথি চরিত্রে জাহিদ হাসান, আবুল হায়াত, আফসানা মিমি তাঁদের স্বভাবজাত ভালো অভিনয় করেছেন।
‘দম’–এ চঞ্চল চৌধুরী। চরকির সৌজন্যেসাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নির্মিত কারিগরি দিক থেকে এগিয়ে থাকা সিনেমার তালিকা করলে ‘দম’ নিঃসন্দেহে ওপরের সারিতে থাকবে। ভিএফএক্সের যুগে অরিজিনাল অ্যাকশন খুব একটা দেখা যায় না। ‘দম’ এখানে ব্যতিক্রম। সিনেমায় গোলাগুলির দৃশ্য হোক কিংবা বিস্ফোরণ—প্রতিটি দৃশ্যের চিত্রায়ণ পরিচালক বাস্তবভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাই হলে বসে ‘দম’ দেখার অনুভূতি ছিল মনে রাখার মতো। চিত্রগ্রাহক মিখাইল সিরিয়ানোভকে এখানে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। মরুভূমির ল্যান্ডস্কেপ, অল্প আলোর পাহাড়ি গুহা আর মানুষের অসহায়ত্ব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। অনেক দৃশ্যই লং টেকের। বারবার ক্লোজআপ না দেখিয়েও ভিজ্যুয়ালি গল্প বলেছেন তিনি।
সিনেমার বেশ কয়েকটি দৃশ্য হল থেকে বেরিয়েও মনে থাকে। বিশেষ করে গাধার দৃশ্যটি ভিজ্যুয়ালি দুর্দান্ত, দীর্ঘ দৃশ্যটি সত্যিকার অর্থেই দমবন্ধ অনুভূতি দেয়। একইভাবে দমের সঙ্গে কাবাডি খেলা আর বাস্তবতার রূপকটাও ছিল দারুণ।
‘দম’-এ ‘প্রহর’ থেকে ‘কোথায় পাব তাহারে’ গানগুলো সিনেমার বয়ানের সঙ্গে মানিয়ে গেছে ভালোভাবেই। ‘প্রহর’-এ ন্যান্সি-পিন্টু ঘোষ জুটির গায়কিতে যেমন ছিল নতুনত্ব, তেমনি ইমরান-পারশার ‘কোথায় পাব তাহারে’ গানের আকুলতাও দর্শককে স্পর্শ করেছে। আর সাবিনা ইয়াসমীনের কালজয়ী ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ গানটি শুনে যে অনেকেই নস্টালজিক হয়েছেন, তা বলাই বাহুল্য। আবার কাজী নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি, কান্তার–মরু’ গানটির ব্যবহার ছিল যথাযথ। বিশেষ করে পর্দায় আক্ষরিক অর্থেই ‘দুর্গম গিরি’র দৃশ্যে গানটি যখন বাজে, না চাইলেও তখন স্নায়ুর চাপ বাড়ে।
এ ছাড়া সিনেমার আবহসংগীত, পোশাক আর মেকআপ ছিল গল্পের সঙ্গে মানানসই। তাই আলাদাভাবে নবরুণ বসু, ইদিলা ফরিদ তুরিন আর মো. খোকন মোল্লার নাম বলতেই হয়।
তবে ‘দম’–এর প্রথমার্ধের গতি বেশ ধীর। কিছু জায়গায় পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। আবার কেন্দ্রীয় চরিত্রের সংগ্রামকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে পার্শ্বচরিত্রগুলোর খুব একটা বিস্তার ঘটেনি। এ ছাড়া গাধার দৃশ্যটিও সাধারণ মানুষের প্রথম দেখায় বোঝা একটু মুশকিল। তবে একটি জায়গায় আপনাকে একমত হতেই হবে, এ সিনেমা দেখা শেষে আপনি শুধু গল্পটা মনে রাখবেন না, একটা অনুভূতি নিয়ে বের হবেন।
বাংলাদেশি সিনেমায় বেঁচে থাকার গল্প নতুন নয়—মুক্তিযুদ্ধ, সামাজিক সংগ্রাম বা সংকটের ভেতর দিয়ে সেই লড়াই বারবার উঠে এসেছে। তবে ‘দম’-এর মতো একক চরিত্রকেন্দ্রিক, বন্দিত্ব ও মানসিকভাবে টিকে থাকার গল্প আমাদের চলচ্চিত্রে খুব একটা দেখা যায় না। সেদিক থেকে ‘দম’ একটা উদাহরণ হয়ে থাকবে।