দেশ–বিদেশে ছড়িয়ে আছেন দিনাজপুরের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা
· Prothom Alo

দুই যুগ পেরিয়ে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ২৫ বছরে পা রাখল ৮ এপ্রিল। কীভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়েছিল?
Visit h-doctor.club for more information.
উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭৯ সালে স্থাপিত হয়েছিল কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। ১৯৮৮ সালে সেটি কৃষি কলেজে উন্নীত হয়। তেভাগা আন্দোলনের নেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের নামে রাখা হয় কলেজটির নাম। পরে ২০০২ সালের ৮ এপ্রিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপনে এটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে। প্রথম উপাচার্যের দায়িত্ব পান অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন। প্রথম ব্যাচে ভর্তি হয়েছিলেন মাত্র ১৫০ জন শিক্ষার্থী। সেখানে এখন নয়টি অনুষদে ৪৫টি বিভাগে সাড়ে তেরো হাজার ছাত্রছাত্রী পড়ছেন। শিক্ষক আছেন পাঁচ শতাধিক।
১৯৯৯-২০০০ সেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন ফরহাদ নবীন। বর্তমানে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটে প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। ফরহাদ বলেন, ‘শুরুতে আমরা ১৫০ জনের মতো ভর্তি হয়েছিলাম। ক্লাস করলাম, বছর চলে গেল, কিন্তু আমাদের পরীক্ষা আর হয় না। কারণ, তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। আমরা সভা, সেমিনার, এমনকি ঢাকা প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে মানববন্ধনও করেছি। আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের পিটুনিও খেয়েছি। ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি প্রজ্ঞাপন জারি করলেন, কিন্তু তত দিনে আমাদের জীবন থেকে দুটি বছর কেটে গেছে। প্রথম ব্যাচের কয়েকজন দেশের বাইরে চলে গেছেন। আজকে বিশ্ববিদ্যালয়টি ২৫ বছরে পা রাখল। বেশ গর্ববোধ হয়। শুরুর দিকের স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়। এখনো মাঝেমধ্যে ক্যাম্পাসে যাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক খবরগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি।’
দেশ-বিদেশের মাটিতে
দেশে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন এই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা। কেউ কাজের খোঁজে গেছেন, কেউ উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। আবার উচ্চশিক্ষা শেষে সেখানেই থিতু হয়েছেন কেউ কেউ।
কয়েক বছর আগেই যেমন বিখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন খায়রুল বাশার। তারও আগে জার্মানির বার্লিনে একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছেন। চীনে মাইক্রোসফট ৩৬৫ কোম্পানিতে কর্মজীবন শুরু করেন ১৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী রিয়াদ হোসেন। বর্তমানে জাপানের একটি কোম্পানিতে শিফট সার্ভিস লিড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যুক্ত আছেন।
রিয়াদ বলেন, ‘দেশ এবং দেশের বাইরে চাকরির বাজার দিন দিন পরিবর্তন হচ্ছে। এআইয়ের প্রভাব বাড়ছে। বর্তমানে সাইবার সিকিউরিটি, ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাহিদা অনেক। সুতরাং শুধু স্পেসিফিক ফিল্ডে ফোকাস করে চাকরির বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে।’
অভিজ্ঞতা ছাড়াই চাকরি দেয় এই ১১ প্রতিষ্ঠান, বেতন ৫০ হাজারের বেশিইরাসমাস মুন্ডাস বৃত্তির আওতায় এই ক্যাম্পাসের ৯ শিক্ষার্থী সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদেরই একজন গণিত বিভাগের আবুল হাসান। বর্তমানে ইতালির লা-কুইলা ইউনিভার্সিটিতে একটি সেমিস্টার করছেন। আবুল হাসান বলেন, ‘২০১৫ সালে আমাদের ক্যাম্পাসে গণিত বিভাগ চালু হয়। এরই মধ্যে গণিত বিভাগেরই অন্তত ১৫ জন দেশের বাইরে আছি। দুই বছরের কোর্সে ইউরোপের কয়েকটি দেশে যাব। এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা অনেক আধুনিক। আমরা অনেক পুরোনো সিলেবাসের সঙ্গে থাকি। আমি মনে করি উন্নত গবেষণার জন্য আমাদের যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন জরুরি।’
বন্যার্ত কৃষকের পাশে
২০২৪ সালে দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় কৃষকদের বিভিন্ন ফসলের খেত, খামার। এ সময় কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর উপায় খুঁজছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী। অনলাইনে প্রাথমিক আলোচনা শেষে ঠিক হয়, কৃষকদের মধ্যে বিভিন্ন সবজি ও ধানের চারা বিতরণ করবেন তাঁরা। সেই লক্ষ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ একর জমিতে ধানের চারা ও সিডলিং ট্রেতে প্রায় ১০ লাখ বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদন করে বিনা মূল্যে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেন। এই কাজে শিক্ষকদের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে এসেছিল।
উদ্যান রোগতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মহিদুল হাসান বলছিলেন, ‘যেহেতু একটা ভালো উদ্যোগ, তাই সে সময় আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছিলাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যারা এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলা-উপজেলার কৃষি বিভাগে কাজ করছে, তাদের দারুণ সহযোগিতা পেয়েছি।’ দুই যুগের এমন অনেক কার্যক্রমই শিক্ষার্থীদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রেরণা।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে কৃষক সেবাকেন্দ্র, ভেটেরিনারি ক্লিনিক ও ভ্রাম্যমাণ ভেটেরিনারি ক্লিনিক। স্থানীয় কৃষকেরা আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি, বীজ ও সারের সঠিক ব্যবহার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি বিষয়ক প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন। আবার গবাদিপশুর চিকিৎসা পরামর্শ সহায়তাও পাচ্ছেন।
দুই যুগের পথচলায় সফলতার পাশাপাশি নানা সীমাবদ্ধতার কথাও বলছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী বৃদ্ধির ফলে বেড়েছে শ্রেণিকক্ষ, আবাসন, পরিবহন ও ল্যাব–সংকট। অপ্রতুল আবাসিকেও নেই শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা, নেই গবেষণার উল্লেখযোগ্য প্রায়োগিক ক্ষেত্র। শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, বিনোদন ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগও সীমিত।
বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য এম এনামউল্যা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে আমরা কাজ করছি। সমাবর্তন আয়োজন ছিল শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি। সেই দাবি কয়েক মাস আগে পূরণ হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও ডিনদের সঙ্গে আলাপ করছি। কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। সেগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে নিরসন করে গবেষণা সম্প্রসারণ এবং মাঠ গবেষণার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়া হবে।’
কাঁঠালের গুড় তৈরি করেছেন ফারহানা, খেতে কেমন