উচ্চকক্ষ, গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে টানাপোড়েন

· Prothom Alo

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি ছিল প্রবল। কিন্তু সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবে কোন প্রস্তাব, কোন আপত্তি আর কোন রাজনৈতিক দর-কষাকষির ভেতর দিয়ে সংস্কার আলোচনা এগোল—তা নিয়ে দুই পর্বের আয়োজন। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত হয় প্রথম পর্ব। আজ পড়ুন শেষ পর্ব

সাংবিধানিক পদে নিয়োগপদ্ধতি, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি সংসদে উচ্চকক্ষের গঠন প্রক্রিয়া ও সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি প্রশ্নেও ছিল টানাপোড়েন। এরপর সামনে আসে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি কী হবে, সেই প্রশ্ন।

Visit biznow.biz for more information.

সংবিধান সংস্কার কমিশন উচ্চকক্ষকে ‘অতিরিক্ত তত্ত্বাবধায়নমূলক’ একটি স্তর হিসেবে বিবেচনা করেছিল। এটি সংসদের নিম্নকক্ষের বা সংসদে সরকারি দলের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও একচ্ছত্র ক্ষমতা কমাবে, এমন চিন্তা থেকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গঠনের প্রস্তাব করেছিল তারা।

বিএনপিসহ প্রায় সব দলই সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার বিষয়ে একমত। বিএনপির দলীয় ৩১ দফাতেও এই প্রতিশ্রুতি আছে। কিন্তু উচ্চকক্ষের গঠনপদ্ধতি ও ক্ষমতা নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য আছে।

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ছিল, উচ্চকক্ষে (সিনেট) নির্বাচন হবে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে। অর্থাৎ নিম্নকক্ষে সাধারণ নির্বাচনে একটি দল সারা দেশে যত ভোট পাবে, তার অনুপাতে দলটি উচ্চকক্ষে আসন পাবে।

অন্যদিকে বিএনপির চাওয়া ছিল—নিম্নকক্ষে একটি দল যতগুলো আসন পাবে, তার অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন হবে। অর্থাৎ এটি হবে এখন যেভাবে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হয়, সেটার মতো।

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করা হলেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, তা নয়। বরং এটি নির্ভর করবে কোন পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের নির্বাচন হবে, উচ্চকক্ষের কেমন ক্ষমতা থাকবে, সেটার ওপর। প্রস্তাবে উচ্চকক্ষকে মূলত সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়।

জুলাই সনদে বর্ণিত সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি চালু হলে উচ্চকক্ষে কোনো দলের একক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। এতে উচ্চকক্ষ ভারসাম্যমূলক এবং তুলনামূলক বেশিসংখ্যক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এই পদ্ধতিতে কোনো দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ারই সম্ভাবনা কম থাকে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে কোনো দলকে নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি পেতে হবে। দেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর কোনোটিতেই কোনো দল এককভাবে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছে ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট।

পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকারের একটি সূত্র তখন প্রথম আলোকে জানিয়েছিল, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজে ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তাবটি মেনে নেওয়ার জন্য বিএনপিকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিএনপি এটি মানেনি।

মৌলিক সংস্কার আলোচনার শুরু থেকেই ছিল মতভেদ

উচ্চকক্ষের ক্ষমতা

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, উচ্চকক্ষের আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করার ক্ষমতা থাকবে না। তবে নিম্নকক্ষে পাসকৃত অর্থবিল ছাড়া সব বিল উভয় কক্ষে উপস্থাপিত হতে হবে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকাতে পারবে না। উচ্চকক্ষ কোনো বিল দুই মাসের বেশি আটকে রাখলে, তা উচ্চকক্ষ দ্বারা অনুমোদিত বলে বিবেচিত হবে।

উচ্চকক্ষ কোনো বিল পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। উচ্চকক্ষ কোনো বিল অনুমোদন করলে তা রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য পাঠানো হবে।

উচ্চকক্ষ কোনো বিল প্রত্যাখ্যান করে সংশোধনের সুপারিশসহ বিল পুনর্বিবেচনার জন্য নিম্নকক্ষে পাঠাতে পারবে। নিম্নকক্ষ উচ্চকক্ষের প্রস্তাবিত সংশোধনগুলো সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। নিম্নকক্ষে পরপর দুটি অধিবেশনে পাসকৃত বিল যদি উচ্চকক্ষ প্রত্যাখ্যান করে এবং নিম্নকক্ষ যদি এটি আবারও পরবর্তী অধিবেশনে পাস করে, তবে উচ্চকক্ষের অনুমোদন ছাড়াই বিলটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য পাঠানো যাবে।

সাধারণ বিলে উচ্চকক্ষের সম্মতির বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সংবিধান সংশোধন বিলে উচ্চকক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রস্তাব আছে জুলাই সনদে। তাতে বলা হয়, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষের দুই–তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) আছে। তারা উচ্চকক্ষে সংবিধান সংশোধন বিল পাঠানো এবং তা পাস করানোর বিপক্ষে।

বিএনপি যেভাবে উচ্চকক্ষ চায়, তাতে নিম্নকক্ষে কারও সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে উচ্চকক্ষেও তা থাকবে। এতে উভয় কক্ষেই ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে যাবে, যা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দেবে।

গত বছরের ২৯ জুন ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এই মতপার্থক্য উঠে আসে। সেদিন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছিলেন, যদি নিম্নকক্ষের আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হয়, তাহলে এটি নিম্নকক্ষের ‘রেপ্লিকা’ হবে।

একই দিন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছিলেন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা না থাকলে সেটার প্রয়োজনীয়তা থাকে না।

সাধারণ বিলে উচ্চকক্ষের সম্মতির বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সংবিধান সংশোধন বিলে উচ্চকক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রস্তাব আছে জুলাই সনদে। তাতে বলা হয়, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষের দুই–তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) আছে। তারা উচ্চকক্ষে সংবিধান সংশোধন বিল পাঠানো এবং তা পাস করানোর বিপক্ষে।
সংসদীয় গণতন্ত্র নাকি ‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ পুনঃপ্রবর্তন

দ্বিকক্ষের প্রস্তাব কেন

সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রস্তাবের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলা হয়, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে একটি এক কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আসছে। নির্বাহী কার্যাবলির দুর্বল তদারকি, প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে দুর্বলতা এবং বিভিন্ন কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে সংসদ যথাযথ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। নির্বাহী বিভাগের আধিপত্যের কারণে অর্থপূর্ণ সংসদীয় আলোচনা এবং সংসদের যাচাই-বাছাই কার্যক্রম লক্ষণীয়ভাবে সীমিত হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর সংসদ বর্জনের সংস্কৃতির কারণে জবাবদিহির জায়গাটা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল সংস্কার কমিশনের। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ সদস্যরা সংসদে অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।

তাতে আরও বলা হয়, পর্যাপ্ত পর্যালোচনা এবং কার্যকর বিতর্ক ছাড়াই দ্রুত ও দুর্বল আইন প্রণয়নের কারণেও এক কক্ষবিশিষ্ট ব্যবস্থা সমালোচিত হয়েছে। সংসদীয় তদারকি এবং নিয়ন্ত্রণের অভাবে শাসক দলকে নিপীড়নমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যা স্বেচ্ছাচারী আইন প্রণয়ন ও ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণে সহায়তা করেছে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী ও পঞ্চদশ সংশোধনীর উদাহরণ টানা হয়। ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় শাসনপদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনপদ্ধতি চালু এবং বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় রাজনীতি প্রবর্তন করা হয়েছিল। আর ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দেওয়া হয়েছিল।

এসব বিবেচনা করে কমিশন এককক্ষীয় আইনসভার কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো মোকাবিলার জন্য দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাব করে।

কমিশনের প্রস্তাব গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করবে

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কতটা কমবে

দেশে সংসদীয় ব্যবস্থায় এখনো ব্যক্তি একাধারে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও ক্ষমতাসীন দলের প্রধান হতে বাধা নেই। অনেকে মনে করেন, এতে সরকার, সংসদ ও দলে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ একজনের হাতে থাকে। এখানে পরিবর্তন আনতে সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা হতে পারবেন না।

দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় ঐকমত্য কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়, একই ব্যক্তি একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদে থাকতে পারবেন না। এ বিষয়ে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দল একমত হয়। তবে এই সিদ্ধান্তে বিএনপিসহ কয়েকটি দল ভিন্নমত দিয়েছে। বিএনপি বলেছে, একটি দল নির্বাচনে জয়ী হলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন আর কে দলীয় প্রধান হবেন, গণতান্ত্রিকভাবে এটা ঠিক করার এখতিয়ার ওই দলের। এটি সংবিধানের বিষয় নয়।

যেভাবে সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে, তাতে কিছু ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমবে। যেমন নির্বাচন কমিশন গঠন। সরকারি দল, বিরোধী দল ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত একটি বাছাই কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার বাছাই করবে। কমিটি যাদের বাছাই করবে, তাঁদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল ও আইন কমিশনে সরাসরি নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি। এখানে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিছুটা কমবে।

আর এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন, এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার এক পর্যায়ে বিএনপি এই প্রস্তাব এনেছিল, তাতে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে এ ক্ষেত্রে বিএনপির একটি শর্ত ছিল, তা হলো তারা ১০ বছরের বিষয়টি মানবে, সে ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদে নিয়োগের পদ্ধতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।

জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় কিছু পরিবর্তন আসবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার জন্য ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতিস্বাক্ষরের’ পরিবর্তে ‘মন্ত্রিসভার অনুমোদনের’ বিধান যুক্ত করা হবে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা–সম্পর্কিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা অথবা তাঁর অনুপস্থিতিতে বিরোধীদলীয় উপনেতার উপস্থিতি অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ প্রস্তাবেও বিএনপিসহ প্রায় সব দল একমত।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে জুলাই সনদে যেসব প্রস্তাব আছে সেগুলোর বাস্তবায়ন হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমবে। কিন্তু এসব প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট আছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একটি বৈঠক। ফরেন সার্ভিস একাডেমি, ঢাকা, ৫ অক্টোবর ২০২৫

অবশ্য সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ ভিন্নমত জানিয়ে প্রথম আলোতে বিশ্লেষণ লিখেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, প্রধানমন্ত্রীর পদকে গুরুত্বহীন করে তোলা হচ্ছে। তাঁর যুক্তিগুলো আমার এ লেখার প্রথম পর্বে উল্লেখ করেছিলাম।

নিজাম উদ্দিন আহমদের লেখার প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোতে ২৮ মার্চ বিশ্লেষণ লিখেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান সিদ্দিক। তিনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ওই লেখায় নিজাম উদ্দিন আহমদের যুক্তিগুলো খণ্ডনের পাশাপাশি ক্ষমতার ভারসাম্য কেন প্রয়োজন এবং সেটি কীভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করেন ইমরান। তিনি সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো ব্যাখ্যা করে লিখেছিলেন, রাষ্ট্রপতিকে এমন কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, যা প্রধানমন্ত্রীকে গুরুত্বহীন করে ফেলে।

ইমরান আরও লেখেন, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের গঠন হবে: তিনজন সরকারি দল থেকে, তিনজন বিরোধী দল থেকে এবং তিনজন নিরপেক্ষ সদস্য—রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি এবং এমন একজন সংসদ সদস্য, যিনি সরকার বা প্রধান বিরোধী দলের অন্তর্ভুক্ত নন। এই ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো নিশ্চিত করবে যে কোনো একক গোষ্ঠী পুরো কাউন্সিলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

ইমরানের ভাষ্য ছিল, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের প্রতিনিধিদের এই নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার ফলে এটি কম গণতান্ত্রিক নয়, বরং অধিকতর গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো সব সময় এই নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। কিন্তু ঠিক এ কারণেই জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের প্রয়োজন; নিয়োগপ্রক্রিয়া ন্যায়সংগত রাখা এবং তা যেন কোনো একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে না থাকে, সেটা নিশ্চিত করা।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে জুলাই সনদে যেসব প্রস্তাব আছে সেগুলোর বাস্তবায়ন হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমবে। কিন্তু এসব প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট আছে।
সংসদীয় গণতন্ত্র নাকি ‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ অন্য রূপ

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটা বাড়বে

অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের সংস্কারের সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দেয়

সংবিধান সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর এবং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে গড়ে তোলা আবশ্যক। এই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং কার্যকরী ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তাতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান; ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের মহাপরিচালকসহ ১২টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, গভর্নর, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।

তবে এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার বিষয়ে বিএনপিসহ ছয়টি দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেয়।

নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি প্রায় সব দল সমর্থন করলেও নারী আসনে নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য ছিল। শেষ পর্যন্ত নারী আসনে সরাসরি ভোটের বিষয়ে একমত হতে পারেনি দলগুলো।

সংসদে জবাবদিহি

ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে আইনসভা বা সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা এবং উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখানে বিএনপির ভিন্নমত আছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রস্তাব ছিল সংস্কার কমিশনের। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ সদস্যরা সংসদে অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।

অবশ্য এখানে বিএনপি আরও দুটি বিষয় যুক্ত করার বিষয়ে বলেছিল— সংবিধান সংশোধন ও জাতীয় নিরাপত্তা (যুদ্ধ পরিস্থিতি)। অর্থাৎ বিএনপির অবস্থান হলো—সংসদে সদস্যরা অর্থবিল, আস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধন বিল ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে নিজ দলের বাইরে ভোট দিতে পারবেন না।

শেষ পর্যন্ত জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়ার ১৫টি স্তরের কথা বলা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি স্তর নিয়ে বিএনপিসহ ৭টি দলের নোট অব ডিসেন্ট আছে। একটি স্তর নিয়ে জামায়াতেরও নোট অব ডিসেন্ট আছে।

নারী প্রতিনিধিত্ব

জাতীয় সংসদ ভবন

সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব ছিল সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন ১০০টিতে উন্নীত করা এবং সেখানে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা করার।

নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি প্রায় সব দল সমর্থন করলেও নারী আসনে নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে ব্যাপক মতপার্থক্য ছিল। শেষ পর্যন্ত নারী আসনে সরাসরি ভোটের বিষয়ে একমত হতে পারেনি দলগুলো।

সিদ্ধান্ত হয়েছিল, জুলাই সনদ স্বাক্ষর–পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে (ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন) ৩০০ আসনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে, তবে এটি সংবিধানে উল্লেখ থাকবে না। এতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি ছাড়া সব দল একমত হয়। অবশ্য কোনো দলই গত নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। বিএনপির মোট নারী প্রার্থী ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। আর বর্তমান প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি।

নারী আসনের বিষয়ে আরও সিদ্ধান্ত হয়—বিদ্যমান সংরক্ষিত ৫০টি আসন বহাল রেখে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। আগামী চতুর্দশ সংসদ নির্বাচনে দলগুলো সাধারণ ৩০০ আসনে ন্যূনতম ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। এভাবে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনে ন্যূনতম ৫ শতাংশ বর্ধিতহারে নারী প্রার্থী মনোনয়ন অব্যাহত রাখা হবে।

তবে বাংলাদেশ জাসদ, সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) ও বাসদ নারী আসন ১০০টি করা এবং সরাসরি ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয়।

তবে শেষ পর্যন্ত ৩০টি রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন সংস্কার প্রশ্নে আলোচনা চালিয়ে গেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। একটি সনদও তারা তৈরি করতে পেরেছে। সেদিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে তৎকালীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ

নির্বাচনকালীন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে রাখার প্রস্তাব ছিল সংস্কার কমিশনের। এই ব্যবস্থা রাখার বিষয়ে সব দল একমত হয়। এই সরকারের গঠনপদ্ধতি নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল ঐকমত্য কমিশনে। শেষ পর্যন্ত জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠনপ্রক্রিয়ার ১৫টি স্তরের কথা বলা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি স্তর নিয়ে বিএনপিসহ ৭টি দলের নোট অব ডিসেন্ট আছে। একটি স্তর নিয়ে জামায়াতেরও নোট অব ডিসেন্ট আছে।

ছিল সংশয়ও

সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কতটা ঐক্য হবে, তা নিয়ে সংশয় ছিল। বিশেষ করে মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি প্রশ্নে আলোচনা ভেস্তে যেতে পারে, এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল।

যেমন ২৯ জুন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেছিলেন, ‘আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম আবু সাঈদের শাহাদাতবার্ষিকীতে (১৬ জুলাই, ২০২৫) সবাই মিলে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করব। কিন্তু বাস্তবে সেটা কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। এ বিষয়ে আমাদের এখন খানিকটা শঙ্কাও রয়েছে।’

সেদিন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনও মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর কতটা ঐকমত্য হবে, সে ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যে বিষয়গুলো মৌলিক সংষ্কারের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, সেগুলোতে বিএনপি বা তার সঙ্গে আরও কয়েকটি দল দ্বিমত পোষণ করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনার পরও সে বিষয়টা অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে। এটা একটা আশঙ্কার জায়গা তৈরি করছে।

এর আগে একদিন আলোচনা শেষে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এখানে কিছু কিছু দল একবারে নিজেদের অবস্থানে অনড়। যদি এভাবে চলতে থাকে, কিয়ামত পর্যন্ত কোনো ঐক্যের সম্ভাবনা দেখি না।’

২৯ জুন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যেসব বিষয়ে দলগুলো একমত হবে, সেগুলো নিয়ে জাতীয় সনদ সই হওয়ার কথা। তিনি বলেন, ‘এখানে যদি আমাদের বাধ্য করা হয় যে এই সমস্ত বিষয়ে একমত হতেই হবে, সেটা তো সঠিক হলো না।’

১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপি, জামায়াতসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল এই সনদে সই করে। এনসিপিসহ ছয়টি দল সেদিন সনদে সই করেনি। পরে অবশ্য এনসিপি ও গণফোরাম সনদে সই করে।

সংশয় থেকে প্রাথমিক সাফল্য

প্রতীকী ছবি

যখন জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়, তখন যে প্রশ্নটি বড় আকারে সামনে এসেছিল তা হলো বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ঐকমত্য তৈরি করা কি আদৌ সম্ভব? আমার নিজেরও এটি নিয়ে যথেষ্ট সংশয় ছিল। বিষয়টি নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সদস্যদের কারও কারও মধ্যেও শুরুতে এই সংশয় আমি দেখেছি। বিশেষ করে একটি বড় দলের সঙ্গে প্রথম পর্বের প্রথম রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর তাঁদের কেউ কেউ হতাশ হয়েছিলেন।

তবে শেষ পর্যন্ত ৩০টি রাজনৈতিক দলকে একসঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিন সংস্কার প্রশ্নে আলোচনা চালিয়ে গেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। একটি সনদও তারা তৈরি করতে পেরেছে। সেদিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন।

প্রাথমিকভাবে এই আলোচনা সফল হওয়ার পেছনে মোটাদাগে তিনটি কারণ কাজ করেছে বলে মনে হয়। প্রথমত, একটি গণঅভ্যুত্থানের পরপরই এই আলোচনাটা শুরু হয়েছিল, সংস্কার বা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তখন একেবারে তাজা।

দ্বিতীয়ত, এই আলোচনায় অংশ নেওয়ার দলগুলো মতাদর্শিক দিক থেকে ডান, বাম বা মধ্যপন্থার হলেও সবাই ছিল অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তি। এই আলোচনায় আওয়ামী লীগ বা তার রাজনৈতিক মিত্র দলগুলো ছিল না।

তৃতীয়ত, দ্বিতীয় পর্বের মূল আলোচনা বা বৈঠকগুলো টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আমি যতটুকু জেনেছি, প্রথম পর্বের আলোচনার অভিজ্ঞতা থেকে এটা সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সংস্কার প্রশ্নে দলগুলোর কার কী অবস্থান, তা যেন মানুষ দেখতে পায়।

শেষ পর্যন্ত সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্যের ভিত্তিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ তৈরির লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা শেষ হয় গত বছর ৩১ জুলাই। এরপর জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু হয় তৃতীয় পর্বের আলোচনা। তবে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ঠিক হওয়ার আগেই জুলাই সনদ সইয়ের আয়োজন করা হয়।

১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপি, জামায়াতসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল এই সনদে সই করে। এনসিপিসহ ছয়টি দল সেদিন সনদে সই করেনি। পরে অবশ্য এনসিপি ও গণফোরাম সনদে সই করে।

শুরুতে সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি—এই তিন দলের তিন ধরনের অবস্থান দেখেছি। সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো সংসদ গঠনের পরবর্তী দুই বছরে সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পক্ষে ছিল বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী চেয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশের মাধ্যমে বা গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হোক। আর এনসিপি চেয়েছিল গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হোক।

ভিন্নমত থাকবে কি না

জুলাই সনদে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত থাকবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল। জামায়াত, এনসিপিসহ বেশ কিছু দলের অবস্থান ছিল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রাখা যাবে না। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকও নোট অব ডিসেন্ট রাখার বিপক্ষে ছিলেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের যুক্তি ছিল—নোট অব ডিসেন্ট সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে না। এটা শুধুই ভিন্নমত।

অন্যদিকে কেউ কেউ বলেছিলেন, শুধু যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো নিয়ে সনদ করা প্রয়োজন। যেমন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমানের অভিমত ছিল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলো অন্তর্ভুক্ত করে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করা উচিত নয়; বরং যেসব বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য রয়েছে, কেবল সেগুলো নিয়েই জুলাই সনদ চূড়ান্ত হওয়া উচিত। (প্রথম আলো, ৩ আগস্ট ২০২৫)

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও শুরুতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ না রাখার বিষয় বিবেচনা করেছিল। সেভাবেই জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া দলগুলোর কাছে প্রথমে পাঠানো হয়েছিল। পরে শুধু কোন প্রস্তাবে কার ভিন্নমত আছে, সেটা উল্লেখ করার চিন্তা ছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিএনপির দাবি ছিল ভিন্নমতের উল্লেখের পাশাপাশি যেন একটা নোট দেওয়া হয়, সেটা এ রকম—‘অবশ্য কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক যদি জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাহলে তারা সেইমতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।’

ঐকমত্য কমিশনের একটি সূত্র তখন প্রথম আলোকে জানিয়েছিল, এ ধরনের নোট রাখার বিষয়ে কমিশন একমত ছিল না। কিন্তু জুলাই সনদ সই হওয়ার আগমুহূর্তে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেয় বিএনপি। এটি রাখা না হলে বিএনপি সনদে সই করবে না—এমন একটা আশঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষর অনুষ্ঠান যাতে ভেস্তে না যায়, সে জন্য সনদে এটি যুক্ত করা হয়।

গত বছর ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশটি বাদ দেওয়া হয়। অন্যদিকে জানানো হয়, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে তৃতীয় পর্ব

জাতীয় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটি আলোচনা শেষে ব্রিফিংয়ে তৎকালীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ

৩১ জুলাই দ্বিতীয় পর্বের আলোচনার শেষ দিন এনসিপি, জামায়াতসহ কয়েকটি দলের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণ নিয়ে আলোচনার দাবি তোলা হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের টার্মস অ্যান্ড রেফারেন্স অনুযায়ী সনদ বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণ করার এখতিয়ার তাদের নেই। তারপরও যদি এটি নিয়ে কমিশন আলোচনা করতে চায়, বিএনপি তাতে অংশ নেবে।

পরে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আবারও আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করেছিল ঐকমত্য কমিশন। পাশাপাশি একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গেও কমিশন অনেকগুলো বৈঠক করেছিল।

শুরুতে সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি—এই তিন দলের তিন ধরনের অবস্থান দেখেছি। সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো সংসদ গঠনের পরবর্তী দুই বছরে সংসদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের পক্ষে ছিল বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী চেয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রপতির বিশেষ আদেশের মাধ্যমে বা গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হোক। আর এনসিপি চেয়েছিল গণপরিষদ গঠনের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হোক। বাস্তবায়নের উপায় নিয়েও দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছিল। এ পর্বে গণভোট করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে বিএনপি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট চেয়েছিল। আর জামায়াত, এনসিপিসহ কিছু দল চেয়েছিল এটি আগে করা হোক। একই সঙ্গে তারা একটি বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারির দাবিতে অনড় থাকে। আর বিএনপি বলে আসছিল, সাংবিধানিক আদেশ জারির কোনো এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই। একটি প্রজ্ঞাপন হতে পারে। এর ভিত্তিতে একটি অধ্যাদেশ করে গণভোট করা যায়।

ঐকমত্য কমিশন বলেছিল, সনদ বাস্তবায়নের উপায় জুলাই সনদের অংশ হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে তারা একাধিক সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারকে দেবে। পরে ২৮ অক্টোবর তারা সরকারের কাছে কাছাকাছি দুটি বিকল্প প্রস্তাব সুপারিশ করে।

সেখানে সনদের সংবিধান সম্পর্কিত প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রথমে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি, এরপর গণভোট এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়। সংসদ নির্বাচনে জয়ীরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কারকাজ শেষ করবে পরিষদ। বিকল্প একটি প্রস্তাবে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ এটি না করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব প্রস্তাব পাস হয়ে যাবে।

তবে কমিশনের সুপারিশ নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

তবে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ওই আদেশের বিপক্ষে বিএনপি আবার নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। তারা জাতীয় সংসদে এই আদেশটিকে ‘অবৈধ’ এবং ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার একটি দলিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং এই আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেবে না বলে পরিষ্কার করেছে। গণভোট অধ্যাদেশও সংসদে অনুমোদন করা হয়নি।

বাস্তবায়নের উপায়, আদেশ জারি

গত বছর ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি হয়

গত বছর ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশটি বাদ দেওয়া হয়। অন্যদিকে জানানো হয়, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।

সেখানে জুলাই সনদের সংবিধান–সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোট করার কথা বলা হয়। গণভোটের প্রশ্নও ঠিক করে দেওয়া হয় আদেশে। এতে যেভাবে প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করা হয়, তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপদ্ধতি, পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের মতো বিষয়গুলোতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দেওয়া হয়। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে জুলাই জাতীয় সনদে যেসব প্রস্তাব উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো সেভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে।

এ আদেশ জারি করা নিয়েও রাজনৈতিক মতভিন্নতা ছিল। শুরু থেকেই বিএনপি বলে আসছিল, এ ধরনের আদেশ জারির এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই। তবে তারা একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট করার বিষয়টিকে সমর্থন করে।

আদেশ জারির পর বিএনপি এই আদেশের বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া জানালেও পরে তারা বিষয়টি নিয়ে সেভাবে আর প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল তারা এটা মেনে নিয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্যও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান আহ্বান জানান।

তবে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ওই আদেশের বিপক্ষে বিএনপি আবার নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। তারা জাতীয় সংসদে এই আদেশটিকে ‘অবৈধ’ এবং ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার একটি দলিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং এই আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেবে না বলে পরিষ্কার করেছে। গণভোট অধ্যাদেশও সংসদে অনুমোদন করা হয়নি।

বিএনপি বলছে, ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেটা তারা অক্ষরে অক্ষরে মানবে।

গণভোটের প্রশ্ন অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, উচ্চকক্ষের গঠনপদ্ধতি ও ক্ষমতা, সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি—মৌলিক সংস্কারের এ বিষয়গুলোতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের গুরুত্ব নেই। গণভোটে এগুলো পাস হয়েছে জুলাই সনদে মূল প্রস্তাব যেভাবে আছে সেভাবে। বিএনপি বা অন্য দলের নোট অব ডিসেন্ট গণভোটে আসেনি।

গণভোট কেন হয়েছিল

গত ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়

গণভোট হয়েছে মূলত দুটি বিষয়ের অনুমোদনের জন্য। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ৩ নম্বর ধারায় গণভোট সম্পর্কে বলা আছে, ‘জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে এই আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত অংশ গণভোটে উপস্থান করা হইবে।’

ওই আদেশের ৪ নম্বর ধারায় গণভোটের ব্যালটে উত্থাপনীয় প্রশ্ন সম্পর্কে বলা ছিল। তাতে বলা হয়, গণভোটে নিম্নরূপ প্রশ্ন উপস্থান করা হবে—‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধানের সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ (হ্যাঁ/না):

(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।

(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধনী করিতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।

(গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হইয়াছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকিবে।

(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।

গণভোটের প্রশ্ন অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, উচ্চকক্ষের গঠনপদ্ধতি ও ক্ষমতা, সংবিধান সংশোধন পদ্ধতি—মৌলিক সংস্কারের এ বিষয়গুলোতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্টের গুরুত্ব নেই। গণভোটে এগুলো পাস হয়েছে জুলাই সনদে মূল প্রস্তাব যেভাবে আছে সেভাবে। বিএনপি বা অন্য দলের নোট অব ডিসেন্ট গণভোটে আসেনি।

ফলে গণভোটের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পক্ষে রায় এসেছে।

তবে বিএনপি বলছে, তারা ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ যেভাবে সই করেছে সেভাবে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন করবে। ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অর্থ হলো সংবিধানে মৌলিক যেসব সংস্কার আনার প্রস্তাব ছিল, সেগুলো আসবে না। বিএনপির দলীয় ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে সংবিধান সংশোধন হবে।

ভোটের আগে আগে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি সূত্র থেকে জানতে পেরেছিলাম, তাদের একটা আশঙ্কা ছিল যে বিএনপি গণভোটে গোপনে ‘না’–এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারে। এটি হলে ভোটে না জয়ী হয়ে যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে চেষ্টা ছিল বিএনপি যেন ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে প্রচার চালায়।

গত ৩০ জানুয়ারি রংপুরে নির্বাচনী জনসভায় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি জুলাই সনদের সম্মানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে সেদিন তারেক রহমান বলেন, ‘সেখানে আমাদের সংস্কার প্রস্তাব আমরা দিয়েছি। মোটামুটিভাবে সংস্কার প্রস্তাব যেগুলো আমরা দিয়েছি, যা আমরা জনগণের সামনে অনেক আগে উপস্থাপন করেছিলাম, সেটাই কমবেশিভাবে তারাও দিয়েছে। হতে পারে কোনো কোনোটির ব্যাপারে আমাদের সঙ্গে কিছু কিছু দ্বিমত আছে। কিন্তু আমাদের সঙ্গে যদি দ্বিমত থাকে, আমরা লুকোছাপা করিনি। আমরা জনগণের সামনে প্রকাশ্যে বলেছি, কোনটিতে আমরা সম্মতি দিয়েছি, কোনটিতে আমাদের অসম্মতি আছে।’

তবে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর জুলাই জাতীয় সনদ আদেশ এবং গণভোটের রায় কার্যকর করার বিপক্ষে অবস্থান নেয় বিএনপি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ত্রয়োদশ সংসদে একাধিক দিন বলেছেন, ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ যাত্রা শুরু করার পর থেকে রাষ্ট্রপতির আর কোনো আদেশ জারির এখতিয়ার নেই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ।

ওই আদেশের ভিত্তিতে জারি করা গণভোট অধ্যাদেশও সংসদে অনুমোদন করা হয়নি। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, গণভোট দেওয়া হয়েছে গোঁজামিল করে। প্রশ্ন চারটি হলেও উত্তর দেওয়ার অপশন ছিল একটি।

তবে বিএনপি বলছে, তারা ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ যেভাবে সই করেছে সেভাবে এর পূর্ণ বাস্তবায়ন করবে। ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অর্থ হলো সংবিধানে মৌলিক যেসব সংস্কার আনার প্রস্তাব ছিল, সেগুলো আসবে না। বিএনপির দলীয় ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে সংবিধান সংশোধন হবে।

ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অর্থ হলো সংবিধানে মৌলিক যেসব সংস্কার আনার প্রস্তাব ছিল, সেগুলো আসবে না। এ ক্ষেত্রে সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ করা বা যেকোনো ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার উত্থান রোধ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ, পর্যাপ্ত ক্ষমতায়নের যে লক্ষ্যের কথা সংস্কার কমিশন বলেছিল, সেটা কতটা পূরণ হবে, সেটা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আবার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া শুধু আইন–বিধির পরিবর্তনের মাধ্যমে এ ধরনের সংস্কার কতটা সম্ভব, সে প্রশ্নও থেকে যায়।

Read full story at source