আমরা আর কতকাল মিসকিন থাকব
· Prothom Alo

এলডিসি বলতে আমরা একসময় বুঝতাম লোয়ার ডিভিশন ক্লার্ক। আমাদের অফিস-আদালতে তাদের পরিচয় ছিল ‘নিম্নমান সহকারী’ নামে। আমরা জানি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) হিসেবে পরিচিত। বলা যেতে পারে ‘কুখ্যাত’। এই স্তরের দেশগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সবার নিচে। আমরা নিজেদের বাংলা ভাষায় ‘অনুন্নত’ বলতে চাই না। আদর করে বলি ‘স্বল্পোন্নত’। স্বল্পোন্নত বলার মধ্যে একধরনের শ্লাঘাবোধ আছে। মানে, আমরাও উন্নত, তবে একটু কম।
Visit bettingx.bond for more information.
দেশগুলোকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়—স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অনেক সময় মধ্য আয়ের দেশও বলা হয়। আসলে এলডিসির নিচে আর কোনো স্তর নেই। জাতিসংঘের দেওয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী, এগুলো এমন দেশ, যা আর্থসামাজিক ও মানব উন্নয়ন সূচকে সবার নিচে অবস্থান করে। এক অর্থে এসব দেশকে দরিদ্রতম বলা যেতে পারে।
গরিবের আবার মানমর্যাদাবোধ টনটনে। হাবভাব, কথাবার্তা, চালচলনে সে বোঝানোর চেষ্টা করে, সে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। আমাদের শীর্ষ নেতারা এবং তাঁদের পারিষদ প্রায়ই দাবি করেন, আমাদের নেতা বিশ্বনেতা। কিছুদিন আগে দুটি বই নজরে এসেছিল। একটির নাম বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু। আরেকটির নাম দেশরত্ন থেকে বিশ্বরত্ন। আদিখ্যেতা দেখাতে আমরা যে বিশ্বসেরা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা—এ তিন সূচকের ভিত্তিতে এলডিসি নির্ধারণ করা হয়। জাতিসংঘের একটি সংস্থা এটি নির্ধারণ ও পর্যালোচনা করে। সংস্থাটির নাম ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ’ (ইকোসোক)। এই সংস্থার অধীন আছে একটি ‘উন্নয়ন নীতিমালাবিষয়ক কমিটি’ (কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি, সংক্ষেপে সিডিপি)। এটি প্রতি তিন বছর পরপর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোকে ওপরে উল্লেখিত তিনটি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে। একটি এলডিসি সূচক পেরিয়ে গেলে সিডিপির সুপারিশের ভিত্তিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এলডিসি থেকে তার উত্তরণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসির তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাবে বলে নির্ধারিত রয়েছে।
এলডিসি হতে হলে একটি দেশের যেসব দোষ বা গুণ থাকা দরকার, তার একটি হলো জনসম্পদ। নিয়ম হলো, যেসব দেশের জনসংখ্যা ৭৫ মিলিয়ন বা সাড়ে সাত কোটিতে পৌঁছেছে বা ছাড়িয়ে গেছে, তারা এলডিসি হতে পারবে না। এ সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশের এলডিসির তালিকায় থাকার কথা নয়। কারণটি যথার্থ।
এলডিসি উত্তরণ: যে সত্য উচ্চারণ করা হয় নাএকটি দেশের প্রধান সম্পদ হচ্ছে তার জনগণ। তামাম দুনিয়ায় এটি স্বীকৃত। কিন্তু আমাদের নেতারা জনগণকে সম্পদ মনে করেন না। তাঁদের কাছে মানুষ হচ্ছে বোঝা। তাই ১৯৭৫ সালে আমাদের সরকার রীতিমতো দরখাস্ত দিয়ে এলডিসির তালিকায় যুক্ত হওয়ার আবেদন জানিয়েছিল। বাংলাদেশ তখন সদ্য স্বাধীন। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি থেকে দেশ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
এ দেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহানুভূতি প্রবল। জনসংখ্যার সূচকটিকে তখন নমনীয়ভাবে দেখার চেষ্টা হয়েছে। সেই সুযোগে আমরা হয়ে যাই এলডিসি। সত্তরের দশকে আমাদের চেয়েও গরিব দেশ ছিল ভিয়েতনাম। ভিয়েতনাম কিন্তু এলডিসি নয়। দেশের মান-ইজ্জত খুইয়ে কপালে ‘আন্তর্জাতিক ভিখিরি’র তকমা লাগানোর ইচ্ছা তাদের ছিল না। এই আত্মমর্যাদাবোধ তাদের অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে, সেটি ফুটবল হোক কিংবা কৃষি বা শিল্প। বাংলাদেশ এখনো পড়ে আছে পেছনে।
আমাদের নেতা আর কর্মকর্তাদের শানশওকত দেখলে কে বলবে যে আমরা গরিব? জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে আমরা প্রতিবছর ঘটা করে পাত্র-মিত্র-অমাত্যের বহর নিয়ে নিউইয়র্কে যাই। আমরা লিফট কেনার আগে সেটি দেখতে জার্মানি-ইতালি যাই। নিচ থেকে পাঁচতলায় একটা বালিশ তুলতে মুটে খরচের বিল বানাই ছয় হাজার টাকার। ৫০ হাজার টাকার ল্যাপটপ কিনি ৩ লাখ টাকায়। প্রচণ্ড গরমে দরজা-জানালা বন্ধ করে স্যুট-টাই পরে এসি চালিয়ে আর বাতি জ্বালিয়ে বসে থাকি।
আমাদের স্বল্পশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত নেতারা না জেনে না বুঝে অনেকে কিছু বলেন। জানার আগ্রহটুকুও নেই তাঁদের। অথবা তাঁরা ধরে নেন, তাঁরা সবজান্তা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি কথা প্রায়ই বলতেন, ‘বাংলাদেশ ছিল অনুন্নত। আমার বাবা দেশকে এলডিসিতে উন্নীত করেছিলেন। আমি এটিকে মধ্য আয়ের দেশ বানিয়েছি।’ তিনি ভেবেছিলেন, এলডিসি বোধ হয় উন্নয়নের একটি সনদ বা সোপান। এর নিচে যে আর কিছু নেই, এটি তাঁর মাথায় ঢোকেনি।
এলডিসি হওয়ার সুবাদে আমরা অনেক দয়াদাক্ষিণ্য পাই। যেমন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ‘সফট লোন’। বিশ্বব্যাংক বা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকে আমরা যে ঋণ পাই, তার সার্ভিস চার্জ সর্বোচ্চ ১ শতাংশ। ঋণ শোধ দিতে হয় ৪০ বছরের মধ্যে। প্রথম ১০ বছর রেয়াত পাওয়া যায়, অর্থাৎ ঋণের কোনো কিস্তি শোধ দিতে হয় না। ৪০ বছর পর টাকার মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, তা আমরা আন্দাজ করতে পারি। এক অর্থে বলা যায়, এই ঋণ অনেকটা অনুদানের মতোই।
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ কি বিলম্বিত হবেএ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আছে নানান সুবিধা। অনেক শিল্পোন্নত দেশে আমরা সুবিধাজনক শর্তে পণ্য রপ্তানি করতে পারি। শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে যে দ্বিপক্ষীয় সাহায্য আমরা পাই, বিশেষ করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়া থেকে, তার সবটাই অনুদান। বিদেশে পেটেন্ট করা সব ওষুধ আমরা কম দামে পাই। আমাদের কোনো রয়্যালটি দিতে হয় না। আমাদের দেশের অনেকেই চিকিৎসার জন্য ব্যাংকক-সিঙ্গাপুরে যাই। সেখানে ওষুধের দাম বেশি। এর কারণ হলো রয়্যালটি। এলডিসি না হলে আমরা এসব সুবিধা পেতাম না।
জাতিসংঘের সদস্যসংখ্যা ১৯৩, তার মধ্যে এলডিসি ৪৬টি। বেশির ভাগই আফ্রিকায়, ৩৩টি। এশিয়ায় ৯টি, আরব অঞ্চলে আছে শুধু ইয়েমেন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আছে তিনটি। লাতিন আমেরিকায় আছে কেবল হাইতি। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বেশ কয়েকটি দেশের মাথাপিছু আয় এবং জীবনযাত্রার মান আমাদের চেয়ে ভালো হওয়া সত্ত্বেও তারা এখনো এলডিসি। এদের জন্য প্রযোজ্য সূচক হলো ‘পরিবেশগত ভঙ্গুরতা’। এরা অনেকেই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র, কেউবা ‘ল্যান্ডলকড’ (অনেকগুলো দেশের মাঝখানে অবস্থিত, যার সঙ্গে সমুদ্রের সংযোগ নেই)।
বাংলাদেশ সব সূচকেই এলডিসির মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে যেসব সুবিধা আর পাওয়া যাবে না, তা নিয়ে চলছে আহাজারি। দেশের জিডিপি যতই বাড়ুক, বেশির ভাগ মানুষ তো গরিব। তাদের কী হবে? এ অজুহাত তুলে এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও বাড়ানোর জন্য চলছে আবেদন-নিবেদন আর তদবির। এই কাফেলার সামনের কাতারে আছেন একদল ব্যবসায়ী আর তাঁদের সহযোগী বুদ্ধিজীবী। তাঁরা দেশটাকে গরিবই রেখে দিতে যান। যাঁরা তৈরি পোশাক রপ্তানি করেন, তাঁরা বলছেন, এর ফলে তাঁরা অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠবেন না। আসলে কি তা–ই? ভিয়েতনাম পারলে আমরা কেন পারি না?
একবার এলডিসি হলে সেই চক্কর থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর প্রধান অনুষঙ্গ হলো স্বৈরাচার ও দুর্নীতি। তারা ঋণ করে ঘি খায়। একটি শ্রেণির হাতে অঢেল সম্পদ। বাকিরা তলানিতে। কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে দেশকে স্বয়ম্ভর করে তোলার চেয়ে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘোরাফেরা করার মানসিকতা প্রবল। দেশ গোল্লায় যাক, আমি তো বেশ আছি—এই মন্ত্রে বুঁদ হয়ে আছেন আমাদের নেতারা আর ‘বিশিষ্ট’ নাগরিকেরা।
আমাদের নেতা আর কর্মকর্তাদের শানশওকত দেখলে কে বলবে যে আমরা গরিব? জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে আমরা প্রতিবছর ঘটা করে পাত্র-মিত্র-অমাত্যের বহর নিয়ে নিউইয়র্কে যাই। আমরা লিফট কেনার আগে সেটি দেখতে জার্মানি-ইতালি যাই। নিচ থেকে পাঁচতলায় একটা বালিশ তুলতে মুটে খরচের বিল বানাই ছয় হাজার টাকার। ৫০ হাজার টাকার ল্যাপটপ কিনি ৩ লাখ টাকায়। প্রচণ্ড গরমে দরজা-জানালা বন্ধ করে স্যুট-টাই পরে এসি চালিয়ে আর বাতি জ্বালিয়ে বসে থাকি।
তারপরও আমরা এলডিসি থেকে যেতে চাই। যথেষ্ট সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা প্রচণ্ড রকমের একটা অপচয়ের অর্থনীতি বয়ে বেড়াচ্ছি আর দুনিয়াজুড়ে ভিক্ষুকের মতো হাত পাতছি। সাধে তো লোকে আমাদের ‘মিসকিন’ বলে না!
প্রশ্ন হলো, এলডিসি হিসেবে আমরা তো ৫০ বছর পার করলাম। আর কত? আর কতকাল মিসকিন থাকব? কবে আমরা সাবালক হব?
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
* মতামত লেখকের নিজস্ব