পানিহাটিতে ‘অভয়া’র মাকে ঘিরে বিজেপির ভোট–রাজনীতি
· Prothom Alo

‘অভয়া’কে মনে আছে? কলকাতার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সেই তরুণী চিকিৎসক, যিনি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ধর্ষণ ও খুনের শিকার হয়েছিলেন। পরিচয় গোপন রাখতে দিল্লির ‘নির্ভয়া’র সঙ্গে মিলিয়ে জনতা তাঁর নাম দিয়েছিল ‘অভয়া’।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
সেই ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। ন্যায়বিচারের দাবিতে উত্তাল হয়েছিল জনমানস। সেই ‘অভয়া’র মা রত্না দেবনাথ অবগুণ্ঠনের আড়াল থেকে বেরিয়ে সাড়া ফেলেছেন। এবারের নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে বিজেপির টিকিটে প্রার্থী হয়েছেন তিনি।
আর জি কর হাসপাতালে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার সেই চিকিৎসকের মা এবার ভোটের মাঠেরত্না দেবনাথ প্রার্থী হয়েছেন কলকাতার উপকণ্ঠে পানিহাটি কেন্দ্রে। ওই এলাকাতেই তাঁদের বসবাস। ওখানেই বাড়ি করেছিলেন ‘অভয়া’র ব্যবসায়ী বাবা। কন্যাকে হারিয়ে তাঁরা ঠিক করেন, বাকি জীবন সমাজসেবা করেই কাটাবেন। তাঁদের কাছে রাজনীতিও সমাজসেবা। রত্না তাই ‘স্বেচ্ছায়’ বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। প্রার্থী হয়েছেন তৃণমূলকে হারিয়ে মেয়ের ন্যায়বিচারের সম্ভাবনা উজ্জ্বল করতে। সাড়া ফেলে দিয়েছেন এবারের ভোট–রাজনীতিতে।
সাড়া ফেলার পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন অনিঃশেষ বিতর্কও। কেননা, তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ তুলে ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছেন রত্না দেবনাথ। সেই তদন্ত, যা সিবিআই করেছে, সেই সিবিআই আবার কেন্দ্রের অধীন। কলকাতা পুলিশ যাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল, ধৃত সেই সিভিক পুলিশ ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করে সিবিআই–ই জেলে পুরেছে।
তাহলে কোন ন্যায়বিচারের দাবি রত্না–কণ্ঠে? অভিযোগই–বা কার বিরুদ্ধে? নির্বাচনী প্রচারে নেমে ‘অভয়া’–জননী সেই উত্তরে বলছেন, ‘ওই ঘটনায় আরও অনেকে জড়িত ছিল। রাজ্য সরকার তা ধামাচাপা দিয়েছে। জিতলে সেই মামলা নতুন করে শুরু হবে।’
২০০৪ সালে কলকাতার আর জি কর হাসপাতালে ‘অভয়া’ ধর্ষণ–হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর ‘অভয়া মঞ্চ’ গড়ে হয়েছিল প্রতিবাদরত্নার ওই দাবিতে ঘৃতাহুতি দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। গত শুক্রবার দুপুরে পানিহাটির অমরাবতীর জনাকীর্ণ মাঠ তার সাক্ষী রইল। মোদি বললেন, ‘৪ মে ফল বেরোবে। বিজেপি সরকার গড়বে। তারপর খুলবে অত্যাচারের ফাইল। এটা মোদির গ্যারান্টি।’
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নদীয়ার কল্যাণী হয়ে উত্তর চব্বিশ পরগনার পানিহাটির মধুসূদন ব্যানার্জি রোডে পৌঁছাতে রাত হয়ে গেল। অপ্রশস্ত রাস্তার একধারে পানিহাটি বিধানসভা, অন্য ধারে খড়দহ। কোন ধারে কার কেন্দ্র, প্রায়ই তা ভ্রম সৃষ্টি করে। ওই রাস্তার ওপরেই ‘অভয়া’দের বাড়ি। ভোটের আগে সাদা রং করা হয়েছে। বাড়ির লাগোয়া গলির ওপর শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে রোদ্দুর ঠেকাতে। সেখানে ২৪ ঘণ্টা পুলিশি প্রহরা।
স্থানীয় লোকজন সতর্ক করে দিলেন, এই পাহারার ব্যবস্থা করেছেন সুপ্রিম কোর্ট। দুই বছর ধরে এটাই দস্তুর। গলির দুদিকে সরানো দুটি গার্ড রেল। তা দেখিয়ে প্রহরারত পুলিশ সদস্য বললেন, ব্যারিকেড এখন সরানো হয়েছে ভোটের জন্য মানুষের আনাগোনা বেড়েছে বলে। কারণ, ব্যারিকেড অসুবিধা সৃষ্টি করে।
সেই রাতে রত্না গৃহে ছিলেন না। পরের দিন প্রধানমন্ত্রী আসবেন। তাঁর ব্যস্ততার শেষ নেই। ভোটে দাঁড়ানোর পর চরকি ঘোরা ঘুরতে হচ্ছে তাঁকে। বারবার গণমাধ্যমকে বলছেন, নিজের গরজেই তিনি বিজেপির কাছে গেছেন। প্রার্থী হতে চেয়েছেন। ন্যায়বিচারের আশায়। রাজ্য সরকারকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার বাসনায়।
‘অভয়া’–জননীর প্রার্থীপদ ও তাঁর সুপ্ত বাসনা আর কিছু হোক না হোক পানিহাটির নির্বাচনকে নজরকাড়া করে তুলেছে। এতটাই যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে টেনে এনেছে একদা ‘পণ্যহট্ট’ বলে পরিচিত আজকের পানিহাটিতে।
প্রচারের আলোয় পানিহাটি উদ্ভাসিত শুধু রত্না দেবনাথের কারণেই নয়। তিনি ছাড়া আরও দুজন রয়েছেন, যাঁদের নাম কোনো না কোনোভাবে দুই বছর আগের ‘অভয়া’ আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল।
প্রথম জন কলতান দাশগুপ্ত, আন্দোলনকে ক্ষুরধার করে তুলে রাজ্য সরকারকে বিব্রত ও ব্যতিব্যস্ত করেছিলেন। কলতান এই কেন্দ্রের সিপিএমের প্রার্থী। দ্বিতীয় জন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষ, যাঁর বাবা নির্মল ঘোষ এই কেন্দ্রের বিদায়ী বিধায়ক। নির্মলের বিরুদ্ধে নির্যাতনের শিকার ওই চিকিৎসকের মরদেহ তড়িঘড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ ছিল। সিবিআই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছিল।
‘অভয়া’ আন্দোলন যখন তীব্র, কেউ তখন প্রশ্ন তোলেনি, কে সিপিএম, কে বিজেপি, কে অন্য কোনো দলের। কলতান তখন আন্দোলনের প্রধান মুখ। অথচ রাজনীতি কী নির্মম! কলতানের বিরুদ্ধেও আজ রত্নাদেবীদের সরব হতে হচ্ছে। একদা সমব্যথী আজ প্রতিদ্বন্দ্বী!
আর জি কর ধর্ষণ ও হত্যা মামলা: রায়ে সন্তুষ্ট নয় চিকিৎসকের পরিবার, ক্ষোভ নানা মহলেনাগরিক সমাজও আলোড়িত। রত্নাদেবীকে শুনতে হচ্ছে, যে দলের নেতারা হাথরস বা উন্নাওয়ের মতো নারকীয় ঘটনায় উদাসীন, বিলকিস বানোর ধর্ষকদের যাঁরা মালা পরিয়ে বরণ করেন, রাম রহিমের মতো ধর্ষককে বছরে চারবার প্যারোলে কেন মুক্তি দেওয়া হয়—সে প্রশ্ন যাঁরা তোলেন না, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নারী কুস্তিগিরদের অভিযোগ সত্ত্বেও ব্রিজভূষণ শরণ সিংয়ের মতো নেতাকে যাঁরা প্রশ্রয় দেন, সেই দল তাঁর কন্যার মৃত্যুর ন্যায়বিচার করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন? কী করে তিনি ভাবলেন, ভোটের পর ‘অভয়া’ ফাইল নতুন করে খোলা হবে? খোলাই যদি হবে, এত দিন তাহলে সিবিআই তা খোলেনি কেন? সুপ্রিম কোর্ট যখন জানিয়ে দিয়েছেন সিবিআই সরকারি তোতা?
রাজনীতি প্যাঁচালো। ভোটের রাজনীতিতে আরও প্যাঁচ। পানিহাটির পরিচিত ও জনপ্রিয় শিক্ষক কুমারেশ ঘোষ ‘অভয়া’র বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সেই প্যাঁচ–পয়জারের কথা স্বীকার করে বললেন, ‘রত্নাদেবীর সিদ্ধান্ত অবশ্যই বিস্ময়কর। কেউ কেউ মনে করছেন, মেয়ের মৃত্যুর রাজনৈতিকীকরণ করে ফেললেন মা। কারও কারও ধারণা, এভাবে বেসাতি না করলেও চলত। কিন্তু কী জানেন, পানিহাটির মা–বোনেদের এক বড় অংশ তাঁর পাশে সমর্থনের ডালি হাতে দাঁড়িয়েছেন। ভাবছেন, জিতলে মায়ের মন হয়তো শান্ত হবে।’
অভয়া ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আর জি কর হাসপাতালের চিকিৎসকেরা নেমেছিলেন প্রতিবাদেতৃণমূল প্রার্থীর ওপর চাপ বাড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। মোদির ‘মহাজঙ্গলরাজের’ সমালোচনার মোকাবিলায় তীর্থঙ্করকে নারী–পরিবেষ্টিত থাকতে হচ্ছে। মালা পরতে হচ্ছে। নারীদের বলতে হচ্ছে, দিদির রাজত্বে তাঁরা সুরক্ষিত।
১২ বছর ধরে বিরোধীরা বারবার বলে আসছে, সিবিআই, ইডির মতো সংস্থাগুলো কেন্দ্রের রাজনৈতিক হাতিয়ার। পানিহাটিতে নিজের অজান্তে নরেন্দ্র মোদি বিরোধীদের হাতে সেই অস্ত্র তুলে দিলেন। তৃণমূল নেতারা বলতে ছাড়ছেন না, নতুন করে ‘ফাইল খোলার’ কথা শুনিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, সিবিআই মোটেই স্বশাসিত নয়। তিনিই নিয়ন্ত্রক।
রাস্তাঘাটের উন্নতি নয়, নিকাশি ব্যবস্থার হাল শোধরানো নয়, নাগরিক পরিষেবা নয়, পানিহাটিতে ‘অভয়া’ই একমাত্র ইস্যু। মারকাটারি শুরু করা ‘অভয়া’–জননী রত্না দেবনাথের দ্বিতীয় ইনিংস কেমন হবে, ২৯ এপ্রিল পানিহাটির জনতা তা ঠিক করবে।