স্বপ্ন দেখি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ

· Prothom Alo

স্বাধীনতার ৫৪ বছর গত হয়েছে, আজও সমাজের বৃহৎ অংশ হতদরিদ্র, এমনকি জীবিকার ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। তাই এখন স্লোগানটি হওয়া উচিত—‘এবারের সংগ্রাম—অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম।’

শিল্প-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ–সংক্রান্ত বিষয়ে সর্বাধিক বিশেষ গুরুত্ব আরোপ ও সহজীকরণের লক্ষ্যে সহায়ক/আকর্ষণীয় নীতিমালা এবং তা আইনে রূপান্তর করে দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন-প্রয়োগ করা হলে ‘তাইওয়ানের ন্যায় সমৃদ্ধ অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব’—যা শুধু সময়ের ব্যাপার।

Visit casino-promo.biz for more information.

সাধারণ অর্থে ‘সমৃদ্ধিশালী’ বলতে অর্থনৈতিকভাবে/সম্পদে সমৃদ্ধতাকে বোঝায়। আর এই সমৃদ্ধতা আনয়নের একমাত্র চাবিকাঠি বা উপায় উৎপাদনমুখী শিল্প-বাণিজ্যে সমৃদ্ধি লাভ। দেশটা আকারে ছোট, আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অত্যধিক, তুলনামূলকভাবে কয়েক গুণ বেশি। তেমন কোনো প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ নেই বললেই চলে। তবে সস্তা পারিশ্রমিকের প্রচুরসংখ্যক কর্মক্ষম জনবল বিদ্যমান, যা আশীর্বাদ বটে। এই বিপুল জনশক্তির অধিকাংশই অদক্ষ এবং উৎপাদন সক্ষমতা (Efficiency) অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় অনেক কম। তবে এদের শ্রমনির্ভর বিবিধ শিল্প-সেবা খাতে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর এবং শিল্পবিপ্লবসহ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভ সম্ভব। এ ছাড়া দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে আরও অধিক হারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

যেকোনো ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দারিদ্র বিমোচন, বেকারত্ব দূরীকরণ ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে চাই অর্থ। অর্থাৎ অর্থ বিনা কোনো কিছুই সম্ভব নয়। আর এই অর্থের মূল উৎস ও জোগান সৃষ্টির একমাত্র পন্থা বা উপায় শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার/উন্নয়ন সাধন, অন্য কোনো বিকল্প নেই। এককথায়, দেশকে বিনিয়োগ উপযোগী আকর্ষণীয় বিজনেস হাব-এ রূপান্তর করতে হবে।

আকর্ষণীয় বিজনেস হাব হিসেবে পরিচিতি লাভে চাই ‘Easy of Doing Business’ পরিবেশ এবং তা করতে হলে বাস্তবসম্মত সহজ-সরল ও সহায়ক-আকর্ষণীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা দ্রুততার সঙ্গে আইনে রূপান্তরের মাধ্যমে প্রয়োগ নিশ্চিত করা। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত অর্জন-সমৃদ্ধি লাভ অসম্ভব, যার বাস্তব প্রমাণ বিগত ৫৪টি বছর।

যেটুকু অর্জন বা অগ্রগতি হয়েছে তা সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য নয়। আমাদের পরে ভিয়েতনাম স্বাধীনতা পেয়েছে, দেশটি বহু আগেই বহুমুখী রপ্তানি পণ্যের বাজার সৃষ্টিসহ বিভিন্ন শিল্প খাতের বিকাশের মাধ্যমে শিল্পে সমৃদ্ধি লাভ করেছে। বিগত বছরে দেশটির রপ্তানি আয় প্রায় ৩৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আমাদের রপ্তানি আয়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এ ছাড়া কম্বোডিয়া ও অন্য দেশগুলো বেশ উল্লেখযোগ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, শুধু বস্ত্র খাতনির্ভর রপ্তানি আয়ের পরিবর্তে বিভিন্ন রপ্তানি খাত সৃষ্টির লক্ষ্যে রাজস্ব জামানত হিসেবে ১০০ শতাংশ ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বহুমুখী পণ্য রপ্তানিতে আংশিক রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকে সুযোগ দানে বারবার বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন, সুদীর্ঘ প্রচেষ্টা ও প্রতীক্ষার পর প্রায় এক যুগ পরে গত সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে এ বিষয়ে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করে এসআরও (SRO) জারির মাধ্যমে কয়েকটি আংশিক রপ্তানিমুখী শিল্প খাতকে পণ্য রপ্তানিতে সুযোগ প্রদান করা হয়। তবে বিবিধ শর্ত আরোপের ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর ন্যায় স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পণ্য রপ্তানি/সরবরাহ দুষ্কর করা হয়েছে, এক কথায় অসম্ভব। অর্থাৎ রপ্তানি সহজীকরণের পরিবর্তে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ এর চেয়ে জটিল, দীর্ঘায়িত ও ব্যয়বহুল করা হয়েছে, যা রপ্তানি বাণিজ্য বিকাশে ও বৈদেশিক ক্রেতা আকর্ষণে বড় অন্তরায়।

তদানীন্তন সরকারপ্রধানের সরাসরি হস্তক্ষেপের ফলে বস্ত্র, ওষুধ ও কৃষি খাতগুলোর উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন সম্ভব হয়েছে এবং এই খাতগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত ও নির্ভরশীল অন্যান্য অগ্র-পশ্চাৎ শিল্প ও সেবা খাতের ব্যাপক বিস্তারে সহায়ক হয়েছে। বিগত ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে কয়েকটি বিনিয়োগ সামিট আয়োজন করা হয়েছিল। তবে অর্জন উল্লেখযোগ্য নয়। বিনিয়োগ আকর্ষণে চাই বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা ও তা আইনে রূপান্তর/প্রয়োগ।

শুধু আমলাতন্ত্রের ওপর ন্যস্ত করা হলে তা বাস্তবায়নহীনতার চক্রে সুদীর্ঘ সময় যাবৎ ঘুরপাক খাবে বা এমন সব শর্ত ও পদ্ধতি আরোপ করা হবে, যার দ্বারা কাঙ্ক্ষিত সুফল অর্জন অসম্ভব বা কঠিন হয়ে পড়বে। এর কারণ, তাদের দ্বারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া কিছু ডিপার্টমেন্টের রুলস অ্যান্ড রেগুলেশনের দ্বারা সীমাবদ্ধ, আইনি বা চাকরিজনিত সমস্যা বিবেচনায় উদ্যোগী না হয়ে সর্বদা সাবধানতা ও নেতিবাচক পন্থা অবলম্বন, বাস্তবতার ভিত্তিতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্তহীনতাজনিত সমস্যা, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সঠিক নির্দেশনা না পাওয়া বা সময়ক্ষেপণ, আন্তমন্ত্রণালয়/প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার সমন্বয়ের অভাব ইত্যাদি। এ–সংক্রান্ত বিষয়ে জনস্বার্থে-জনকল্যাণে সরকার কর্তৃক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অতীব উত্তম। কারও প্রতি কোনো প্রকার অভিযোগ বা অনুযোগ নয়, এটি সম্পূর্ণ আমার দীর্ঘ ব্যবসায়িক জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যক্তিগত মতামত মাত্র।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে রপ্তানিসহ শিল্প-বাণিজ্যের প্রসার ও বিনিয়োগ আকর্ষণে সহজ-সরল ও সহায়ক-আকর্ষণীয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা দ্রুত আইনে রূপান্তরের বিষয়ে সার্বিক গুরুত্ব আরোপ আবশ্যক। এ–সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারপ্রধান-মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, তদারকি ও দ্রুত বাস্তবায়নে হস্তক্ষেপ আবশ্যক, যাতে করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তা দ্রুত বাস্তবায়নে গুরুত্বসহকারে উদ্যোগী হন।

উল্লেখ্য, আমদানি নীতি আদেশ, রপ্তানি নীতি, ট্যারিফ পলিসি, জাতীয় শিল্পনীতি ইত্যাদিতে রপ্তানিসহ শিল্প-বাণিজ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও বিকাশে বিবিধ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। এসব নীতিমালাকে ‘Intention of Government’ হিসেবে গণ্য করা হয়, যা আইন নয়, সেই হিসেবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্ব বা বিধিনিষেধ নেই। যার বহুলাংশ বছরের পর বছর বাস্তবায়নহীনতার চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। এসব নীতিমালা সরকারপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতিক্রমে প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। আইন দ্বারা এসব নীতিমালা বাস্তবায়ন অন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান-মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত এবং বিষয়টি সম্পূর্ণ তাদের সদিচ্ছা বা মর্জির ওপর নির্ভর করে। যদিও ওই প্রতিষ্ঠান-মন্ত্রণালয় এসব নীতিমালা প্রণয়নকারী সব কার্যনির্বাহী কমিটির মুখ্য বা বিশেষ উল্লেখযোগ্য সদস্য। গৃহীত এসব নীতিমালা বাস্তবায়ন বা দীর্ঘ সময় পরেও প্রয়োগ না হওয়ার ফলে, বিদেশি-দেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাস্থাসহ বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করছে, যা রপ্তানিসহ শিল্প-বাণিজ্য বিকাশ ও বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় অন্তরায় এবং যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করছে।

প্রস্তাব: অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে বহুমুখী পণ্য রপ্তানি, শিল্প-বাণিজ্য ও সেবা খাতগুলো এর বিকাশে ও বিনিয়োগ আকর্ষণে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নীতিমালা নির্ধারণী কমিটি গঠন—সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের সব পর্যায়ে কাজের বাস্তব দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অংশীজনদেরসহ অর্থনীতি তথা ব্যবসা-বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নীতিনির্ধারণী কমিটি গঠন করা যেতে পারে, ওই কমিটি বিদ্যমান শিল্প-বাণিজ্য ও সেবা খাতগুলোর সমস্যাবলি পর্যালোচনা, সমাধানকল্পে উপায়, বিকাশ এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে বাস্তবসম্মত উপায় ও বাজার চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন খাতভিত্তিক আলাদা করে বা একসঙ্গে সরকারপ্রধানের কাছে করণীয় সুপারিশ উপস্থাপন করবেন এবং তা যথাযোগ্য বলে বিবেচিত হলে, পরবর্তী সময়ে প্রচলিত নিয়মতান্ত্রিকতা অনুসরণ করে জনস্বার্থে-জনকল্যাণে দ্রুততার সঙ্গে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন-প্রয়োগ করা যেতে পারে।

*লেখক: মো. সাইফুর রহমান, চেয়ারম্যান, এসকেবি স্টেইনলেস স্টিল মিলস লিমিটেড

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

Read full story at source