অরার সন্ধানে: রঘু রাইয়ের আলোকচিত্রের অন্তর্ময় জগত

· Prothom Alo

আলোকচিত্রী হিসেবে তিনি কেবল ছবি তোলেননি; বরং বলা যায় তিনি ভারতের হৃৎস্পন্দন ধারণ করেছেন। রাস্তাঘাটে সময়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খল ঘটনাগুলোকে তিনি ক্যামেরার সাহায্যে রূপ দিয়েছেন একরকম গভীর ও স্থায়ী দৃশ্যমান ইতিহাস হিসেবে। আমাদের এই পর্বের পাঠ আলোকচিত্রী রঘু রাই।

হিডেন ট্রুথ (লুকানো সত্য) এবং ডিসাইসিভ মোমেন্টের (নির্ণায়ক মুহূর্ত) এক অনন্য আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে রঘু রাইয়ের কাজ উপমহাদেশের এক চিরন্তন আয়নার মতো। তিনি স্বাক্ষর রেখে গেছেন—একটিমাত্র ফ্রেমও ধারণ করতে পারে একটি পুরো জাতির আত্মার গভীরতা।

Visit mchezo.life for more information.

রঘু রাই। ফটো ক্রেডিট : ম্যাগনাম ফটোস
রঘু রাইয়ের কাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘সাক্ষী’ হয়ে থাকার মানসিকতা। তাঁর কাছে তিনি নিজে দৃশ্যের নির্মাতা নন; বরং একজন নীরব পর্যবেক্ষক, যিনি ভাগ্যক্রমে জীবনের স্পন্দনটুকু ধারণ করতে পারেন।

রঘু রাইয়ের আলোকচিত্র ধারণ করার পদ্ধতি প্রযুক্তিগত নিখুঁততার চেয়ে অনেক বেশি, যা তাঁর বিষয়বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্যের সঙ্গে গভীর দার্শনিক সংযোগ স্থাপনের ওপর নির্ভর করে। তাঁর বিশ্বাস, আলোকচিত্রের কাজ কেবল সুন্দরভাবে কিছু দেখানো নয়; বরং একটি মুহূর্তের গভীরতা ও জীবন্ত শক্তিকে ধারণ করা।

রঘু রাইয়ের মতে, প্রত্যেক মানুষ ও প্রতিটি বিষয়বস্তুর ভেতর নিজস্ব একটি ‘অরা’ (মানুষের ভেতরের ভাব, আবেগ, অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিত্ব, যা বাইরে থেকে পুরোপুরি দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়) উপস্থিতি থাকে। এই অরা শুধু আধ্যাত্মিক বা মহৎ ব্যক্তিত্বদের (যেমন মাদার তেরেসা) মধ্যেই সীমাবদ্ধ—তিনি এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। বরং তিনি মনে করতেন, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই একধরনের স্বতন্ত্র উপস্থিতি থাকে, যা একজন আলোকচিত্রীকে খুঁজে বের করতে হয়। তাঁর কাছে শিল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো এই লুকানো শক্তি ও সত্যকে তুলে ধরা।

রঘু রাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে শিল্প কেবল সৌন্দর্য ধরে রাখা বা চোখে ভালো লাগার মতো কিছু তৈরি করা নয়। ঘরের সাজসজ্জার সঙ্গে মানানসই ছবি তোলা তাঁর লক্ষ্য নয়। যদিও তিনি স্বীকার করেন যে ১৯৬০ ও ’৭০-এর দশকের শুরুতে তাঁর ধারণ করা আলোকচিত্র হিন্দি সিনেমার ‘রোমান্টিকতা’ ও ‘নাটকীয়তা’র প্রভাব বহন করত, পরে তিনি সেই ধারা থেকে সরে এসে আলোকচিত্রের গভীরতর অর্থ উপলব্ধি করেন।

লাঙ্কারাসনার গ্রাম, রাজস্থান, ১৯৮৯। আলোকচিত্র : রঘু রাই

রঘু রাইয়ের কাজের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘সাক্ষী’ হয়ে থাকার মানসিকতা। তাঁর কাছে তিনি নিজে দৃশ্যের নির্মাতা নন; বরং একজন নীরব পর্যবেক্ষক, যিনি ভাগ্যক্রমে জীবনের স্পন্দনটুকু ধারণ করতে পারেন। আলোকচিত্রের বিষয়বস্তু কোনো রাজনৈতিক নেতা হোক বা পথশিশু, সব ধরনের বিষয়বস্তুর সঙ্গে গভীর সহানুভূতি ও আন্তরিকতার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। প্রচলিত অর্থে ‘নিখুঁত’ আলো বা নিখুঁত কম্পোজিশন খোঁজার বদলে তিনি খোঁজেন ভারতের প্রাণস্পন্দন। এ জন্য তিনি প্রায়ই ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স ব্যবহার করেন, যাতে ভারতের বৈচিত্র্যময়, বিশৃঙ্খল অথচ জীবন্ত বাস্তবতাকে পুরোপুরি তুলে ধরা যায়।

রঘু রাইয়ের ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডিকে ঘিরে দুই দশকের নিবিড় আলোকচিত্র ধারণ কেবল প্রচলিত ফটোসাংবাদিকতার সীমায় আবদ্ধ ছিল না; এটি পরিণত হয়েছিল এক আজীবন নৈতিক সাক্ষ্যদানে। ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডিতে যখন মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস লিক হয়ে শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে, তখন তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছান কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। সেখানে তিনি যে দৃশ্য দেখেন, তা কেবল মানুষের চিৎকার বা বিশৃঙ্খলার নয়; বরং দমবন্ধ করা নীরবতায় আচ্ছন্ন এক মৃত্যুভূমি।

ভোপাল গ্যাস ট্রাজেডির কারণে গর্ভপাত হওয়া ভ্রুণ, ১৯৮৪। আলোকচিত্র : রঘু রাই

শুরুতে ধারণ করা রঘু রাইয়ের ছবিগুলো সেই তাত্ক্ষণিক ভয়াবহতার নির্মম দলিল হয়ে আছে। রাস্তায় পড়ে থাকা ফুলে ওঠা পশুর মৃতদেহ আর আতঙ্কিত, দৃষ্টিহীন মানুষের হোঁচট খেতে খেতে বেঁচে থাকার চেষ্টা। শহরটি যেন এক খোলা আকাশের নিচে বিশাল মর্গে পরিণত হয়েছিল। তাঁর তোলা অন্যতম বিখ্যাত ছবি, যেখানে আমরা দেখতে পাই একজন পিতা নিজের সন্তানকে কবর দিচ্ছেন, যা বিপর্যয়ের প্রতীকী মুখ হয়ে ওঠে। কিন্তু রাইয়ের কাছে সেই একটি ফ্রেমই শেষ কথা ছিল না; বরং সেটিই ছিল এক দীর্ঘ দায়িত্ববোধের সূচনা, যা টানা ২০ বছর ধরে চলেছে।

যখন দেশ ও বিশ্ব এই ঘটনার প্রতি আগ্রহ হারাতে শুরু করে, তখনো রঘু রাই থেমে থাকেননি। তিনি একাধিকবার ভোপালে ফিরে গেছেন এক গভীর হতাশা থেকে, যে সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোকে রাষ্ট্র ও করপোরেশন উভয়েই উপেক্ষা করছে। তাঁর দৃষ্টি তখন ধীরে ধীরে তাৎক্ষণিক ধাক্কা থেকে সরে গিয়ে ‘ধীরে ধীরে মৃত্যুর’ দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। যারা বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু আর কোনো দিন পুরোপুরি সুস্থভাবে বাঁচার উপায় তাদের ছিল না।

গ্যাস লিকের কারণে অন্ধ হয়ে যাওয়া নাগরিক। ভোপাল, ১৯৮৪। আলোকচিত্র : রঘু রাই

রঘু রাই তুলে ধরেন সেই ক্লান্ত, নিস্তেজ জীবনের ছবি, যেখানে বাবা-মায়েরা অসহায়ের মতো দেখছেন, তাঁদের সন্তানেরা বছরের পর বছর ফুসফুসের জটিল রোগ বা হৃদ্‌যন্ত্রের অপারেশনের সঙ্গে লড়াই করছে। ইউনিয়ন কার্বাইটের পরিত্যক্ত কারখানার মরিচা ধরা কাঠামো আর তার চারপাশের সবুজ দেখানো বস্তিগুলোর ছবি তুলে তিনি এক ভয়াবহ বৈপরীত্যকে মানুষের সামনে আনেন। যেখানে শিশুরা খেলছে এমন মাটিতে, যা আসলে এখনো বিষাক্ত রাসায়নিকের দূষণে ভরা।

রঘু রাইয়ের ২০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন আলোকচিত্র ধারণের পরিণতি ঘটে তাঁর ২০০২ সালের প্রকল্প ‘এক্সপোজার: পোর্ট্রেট অব আ করপোরেট ক্রাইম’-এ। তাঁর যে কাজ আর শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগের গল্প বলে না; বরং করপোরেট অবহেলা ও দায়হীনতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী অভিযোগপত্র হয়ে ওঠে। এখানে তিনি তুলে ধরেন গবেষণার জন্য ব্যবহৃত পরিত্যক্ত খুলি, কিংবা কাচের জারে সংরক্ষিত গর্ভপাত হওয়া ভ্রূণের মতো মর্মান্তিক চিত্র, যা এই বিপর্যয়ের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে।

পরিত্যক্ত ইউনিয়ন কার্বাইট, ভোপাল, ১৯৮৪। আলোকচিত্র : রঘু রাই
রঘু রাইয়ের ধারণ করা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে শরণার্থী সংকট নিয়ে আলোকচিত্রগুলো তাঁর ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কাজের মাধ্যমেই তিনি একজন প্রতিভাবান আঞ্চলিক আলোকচিত্রী থেকে মানবিক দুর্ভোগের এক বৈশ্বিক সাক্ষীতে পরিণত হন।

রঘু রাইয়ের ধারণ করা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে শরণার্থী সংকট নিয়ে আলোকচিত্রগুলো তাঁর ক্যারিয়ারের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কাজের মাধ্যমেই তিনি একজন প্রতিভাবান আঞ্চলিক আলোকচিত্রী থেকে মানবিক দুর্ভোগের এক বৈশ্বিক সাক্ষীতে পরিণত হন। যুদ্ধ শুরু হলে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে লাখ লাখ মানুষ নির্মম সামরিক দমন-পীড়ন থেকে বাঁচতে ভারতে আশ্রয় নেয়। রাই পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার সীমান্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেখেন উদ্বাস্তু মানুষের এক বিশাল স্রোত—অসংখ্য মানুষের ভিড়ে গড়ে ওঠা এক বেদনাময় বাস্তবতা।

রঘু রাইয়ের এই সময়ের ছবিগুলো প্রকৃতির এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তুলে ধরে। বর্ষায় সিক্ত সবুজ ও সজীব গ্রামীণ সৌন্দর্যের পাশে কাদামাটিতে হাঁটু-ডোবানো পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া ক্ষীণদেহী মানুষের ক্লান্ত যাত্রা। রঘু রাই এ ক্ষেত্রে শুধু যুদ্ধের সামরিক কৌশল বা সংঘর্ষের দৃশ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং তাঁর ক্যামেরা ধরেছে বাস্তুচ্যুত মানুষের নীরব, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিগুলো। তিনি তুলে ধরেছেন মায়েদের সেই শূন্য দৃষ্টি, যাঁরা প্রবল বৃষ্টির মধ্যে নিজেদের শিশুদের আগলে রাখছেন; কিংবা বৃদ্ধ মানুষদের, যাঁরা মাথায় ছোট্ট পুঁটলিতে তাঁদের সমগ্র জীবন বহন করছেন। তাঁর একটি হৃদয়স্পর্শী ছবিতে দেখা যায় খাবারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শরণার্থীদের দীর্ঘ সারি, যাদের চোখে ক্লান্তি আর বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা একসঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে।

আলোকচিত্র : রঘু রাই
কিংবদন্তি ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ রঘু রাইয়ের যুদ্ধের এসব আলোকচিত্রে এমন এক বিরল ক্ষমতা খুঁজে পান, যেখানে কোনো রকম কৌতূহল ছাড়াই সংকটের ‘আত্মা’কে ধরা হয়েছে।

এই ছবিগুলো কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিবেদন ছিল না; বরং ছিল মানুষের সহ্যশক্তির সীমা কোথায় সেসবের গভীর অনুসন্ধান। গভীর সহানুভূতির সঙ্গে বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করে রঘু রাই ‘শরণার্থী’কে কেবল একটি সংখ্যা থেকে তুলে এনে এক একজন মানুষে পরিণত করেন, যাদের গল্প বিশ্ববাসীর মনোযোগ দাবি করে।

কিংবদন্তি ফরাসি আলোকচিত্রী অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ রঘু রাইয়ের যুদ্ধের এসব আলোকচিত্রে এমন এক বিরল ক্ষমতা খুঁজে পান, যেখানে কোনো রকম কৌতূহল ছাড়াই সংকটের ‘আত্মা’কে ধরা হয়েছে। এ স্বীকৃতিই পরবর্তীকালে রাইকে ম্যাগনাম ফটোস সংগঠনের প্রথম ভারতীয় সদস্য হওয়ার পথ করে দেয়।

১৯৭১। আলোকচিত্র: রঘু রাই

রঘু রাই দীর্ঘদিন ধরে মাদার তেরেসাকে কেন্দ্র করে কাজ করেন। সেসব আলোকচিত্র সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে আধ্যাত্মিক ও অন্তরঙ্গ সৃষ্টিগুলোর একটি। যেন কোনো দীর্ঘ সংলাপ। একদিকে আলোকচিত্রীর দৃষ্টি, অন্যদিকে এক নিঃস্বার্থ, আত্মনিবেদিত জীবনের গল্প। ১৯৭০–এর দশকের শুরু থেকে ১৯৯৭ সালে মাদার তেরেসার মৃত্যুর আগপর্যন্ত, রঘু রাই মিশনারিস অব চ্যারিটির কার্যক্রম খুব কাছ থেকে দেখার বিরল সুযোগ পান, বিশেষ করে কলকাতায়।

রঘু রাইয়ের অন্যান্য ব্যস্ত, বিশৃঙ্খল স্ট্রিট ফটোগ্রাফির তুলনায় মাদার তেরেসাকে নিয়ে তাঁর কাজগুলোতে এক গভীর নীরবতা ও স্থিরতা লক্ষ করা যায়। তিনি ‘দরিদ্রদের সাধ্বী’ হিসেবে পরিচিত জনসমক্ষের চিত্রের বাইরে গিয়ে তুলে ধরেছেন তাঁর দৈনন্দিন জীবনের কঠোর, কখনো ক্লান্তিকর বাস্তবতা। তাঁর ছবিতে নির্মল হৃদয়ের কঠিন, সরল পরিবেশ কিংবা মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের মুখ লুকানো নেই; তবু সেই ছবিগুলোতে এমন এক আলো অনুভূত হয়, তা যেন সেই কঠোরতার মধ্যেও এক অতীন্দ্রিয় করুণা ও অনুগ্রহের ইঙ্গিত দেয়।

মাদার তেরেসার আলোকচিত্রগুলোর শক্তি নিহিত রাইয়ের সেই ক্ষমতায়, যেখানে তিনি এক বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বকে মানবিক করে তুলেছেন, অথচ তার পবিত্রতার আভাও অক্ষুণ্ন রেখেছেন।
শিশু ভবন, কলকাতা, ১৯৭৯। আলোকচিত্র: রঘু রাই

মাদার তেরেসার আলোকচিত্রগুলোর শক্তি নিহিত রাইয়ের সেই ক্ষমতায়, যেখানে তিনি এক বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বকে মানবিক করে তুলেছেন, অথচ তার পবিত্রতার আভাও অক্ষুণ্ন রেখেছেন। তিনি প্রায়ই মাদার তেরেসাকে নিঃসঙ্গতা বা প্রার্থনার মুহূর্তে ধারণ করেছেন। যাতে তাঁর হাতের ভাঁজে বা মুখের রেখায় পৃথিবীর দুঃখকষ্টের ভার স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

রাইয়ের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সের ব্যবহার, যার মাধ্যমে তিনি মাদার তেরেসার ছোট, দৃঢ় অবয়বকে কলকাতার বিশাল দারিদ্র্যের পটভূমিতে স্থাপন করেছেন। ফলে স্পষ্ট হয়, তিনি নিজের ওপর কত বিশাল দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন। এই আলোকচিত্রগুলো কোনো প্রচারণার উদ্দেশ্যে তোলা হয়নি; বরং এগুলো এক নারীর জীবনের সৎ, নিরাভরণ পর্যবেক্ষণ। যিনি অটল লক্ষ্য নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন।

কলকাতা ১৯৯৭। আলোকচিত্র: রঘু রাই

সময়ের সঙ্গে রাইয়ের উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল যে তাঁর ক্যামেরা যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। ফলে তিনি এমন সব কোমল, স্বতঃস্ফূর্ত মুহূর্ত ধারণ করতে পেরেছেন, যেখানে মাদার তেরেসা অসহায় মানুষের কপালে হাত রাখছেন, কিংবা সহযাত্রীদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন বিরল এক উজ্জ্বল হাসি। প্রায় ৩০ বছর ধরে এই কাজকে ক্যামেরায় ধারণ করে তিনি এমন এক বর্ণনা নির্মাণ করেছেন, যা ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানবসেবার সর্বজনীন ভাষাকে তুলে ধরে।

আলোকচিত্র: রঘু রাই

মাদার তেরেসার মৃত্যুর পর, রঘু রাইয়ের ছবিগুলোই বিশ্ববাসীকে এই ক্ষতি উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। মাদার তেরেসাকে নিয়ে তাঁর এই ‘বডি অব ওয়ার্ক’ একদিকে যেমন ঐতিহাসিক দলিল, তেমনি অন্যদিকে এক আধ্যাত্মিক জীবনী। তাঁর ক্যামেরার মাধ্যমে প্রকাশ পায় সেই লুকায়িত সত্য, যা কোনো বৃহৎ কর্মে নয়, বরং ছোট ছোট, পুনরাবৃত্ত ভালোবাসার কাজে গড়ে ওঠে, যা তাঁর সারা জীবনের ভিত্তি।

রঘু রাইয়ের ‘দিল্লি’ ও ‘ইন্ডিয়া’ সিরিজ যেন এক আজীবনের প্রচেষ্টা। একটি দেশের বিস্তৃত, পরস্পরবিরোধী অথচ প্রাণবন্ত আত্মাকে ধরার চেষ্টা। যে দেশকে কোনো একক পরিচয়ে বেঁধে ফেলা যায় না। রাইয়ের কাছে দিল্লি কেবল একটি শহর নয়; এটি এক জীবন্ত সত্তা, যেখানে শতাব্দীর ইতিহাস একই পরিসরে পাশাপাশি বাস করে। তাঁর ক্যামেরায় মোগল যুগের প্রাচীন স্থাপত্য এবং আজকের চাঁদনী চকের ব্যস্ততা সমান গুরুত্ব পায়। এখানে অতীত কেবল বর্তমানকে ছায়া দেয় না, বরং সক্রিয়ভাবে তার অংশ হয়ে ওঠে।

বাদশা হুমায়ুনের সমাধি, দিল্লী, ১৯৬৬। আলোকচিত্র: রঘু রাই

আলোকচিত্রগুলোর বিশেষত্ব হলো স্তরবিন্যাস। একটি ছবির মধ্যেই দেখা যায় ঘুমন্ত শ্রমিক, পথচলা গরু আর দূরে কোনো মিনারের অবয়ব; সবকিছু মিলিয়ে যেন বিশৃঙ্খলার মধ্যেও একধরনের কবিতার সুর তৈরি হয়। রাই শহরটিকে এমন কোনো পর্যটকের মতো করে দেখেন না, যিনি শুধু দর্শনীয় স্থান খোঁজেন; বরং তিনি যেন রাস্তাঘাটের এক ‘ফ্ল্যানিউর’, যিনি খুঁজে বেড়ান সেই মুহূর্তগুলো, যখন সাধারণ দৃশ্য হঠাৎ অসাধারণ হয়ে ওঠে। তিনি হয়ে ওঠেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা গন্তব্য ছাড়াই শহরের রাস্তায় অলসভাবে ঘুরে বেড়ান এবং শহুরে জীবন ও পরিবেশ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

দিল্লী, ১৯৭৯। আলোকচিত্র: রঘু রাই

রঘু রাইয়ের বিস্তৃত ‘ইন্ডিয়া’ সিরিজে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও প্রসারিত হয়, যেখানে তিনি শহরের সীমা ছাড়িয়ে গ্রামীণ জীবনের আধ্যাত্মিক ও ঋতুভিত্তিক ছন্দকে ধারণ করেন। তিনি বছরের পর বছর ধরে গঙ্গা নদীর তীরবর্তী জীবন এবং কুম্ভ মেলার বিশাল সমাবেশের ছবি তুলেছেন, যেখানে মানুষ ও আধ্যাত্মিকতার মিলন ঘটে।

ভারতীয় প্রকৃতিকে রঘু রাই খুব কমই স্থিরভাবে উপস্থাপন করেছেন। বরং চলন্ত ট্রেনের ঝাপসা দৃশ্য বা বর্ষার সকালের কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশের মাধ্যমে তিনি এমন এক দেশের অনুভূতি তুলে ধরেন, যা সব সময় পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে। প্রচলিত পোস্টকার্ডের মতো নিখুঁত ছবিকে এড়িয়ে গিয়ে তিনি খুঁজে পান সেই ‘হিডেন ট্রুথ’, যা ধুলো, মাটি আর অপরিশোধিত সকালের আলোতে লুকিয়ে থাকে।

পণ্ডিত রবিশঙ্কর, বারাণসী, ১৯৮৬। আলোকচিত্র: রঘু রাই
১৯৬০-এর পরবর্তী ঔপনিবেশিক সময় থেকে শুরু করে ডিজিটাল একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই দীর্ঘ যাত্রাকে ধারণ করে রঘু রাই এমন এক আর্কাইভ তৈরি করেছেন, যা একাধারে ব্যক্তিগত ডায়েরি আবার জাতীয় ইতিহাসও।

রঘু রাইয়ের এই সিরিজের কাজগুলো একটি দেশের পরিবর্তনশীল ইতিহাসের দৃশ্যমান জীবনী হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়কে সহজ করে না তোলার মধ্যে নিহিত রাইয়ের দক্ষতা; বরং তিনি ভারতের জটিলতা, ভিড় আর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিশৃঙ্খলাকে গ্রহণ করে তা আলো ও ছায়ার এক সূক্ষ্ম ভাষায় রূপ দেন। তাঁর আলোকচিত্র যেন ভারতীয় পরিচয়ের এমন এক আয়না, যেখানে সংগ্রাম ও অদম্য প্রাণশক্তি একসঙ্গে প্রতিফলিত হয়।

১৯৬০-এর পরবর্তী ঔপনিবেশিক সময় থেকে শুরু করে ডিজিটাল একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই দীর্ঘ যাত্রাকে ধারণ করে রঘু রাই এমন এক আর্কাইভ তৈরি করেছেন, যা একাধারে ব্যক্তিগত ডায়েরি আবার জাতীয় ইতিহাসও। তাঁর চোখে ভারত কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা স্মৃতিস্তম্ভের সমষ্টি নয়; বরং এক অবিরাম, স্পন্দিত হৃৎস্পন্দন, যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা তিনি সারা জীবন করে গেছেন।

Read full story at source