পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন: ’৭১–এর পর এবারই কি সবচেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা

· Prothom Alo

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছে বুথফেরত জরিপগুলো। অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে রাখা হয়েছে বিজেপিকে। গত এক দশকে এ ধরনের জরিপে অনেকবারই ভুল হয়েছে, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে। এ কথা মাথায় রেখে বলা যেতে পারে, এসব জরিপ আগামী ৪ মে ঠিক প্রমাণিত হলে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে তা হবে একটা রেকর্ড।

কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় কখনোই পশ্চিমবঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকে প্রায় সব সময়ই নির্দিষ্টভাবে একটি দলের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

Visit esporist.org for more information.

এর ব্যতিক্রম হয়েছে ১৯৭১ সালে। তখন প্রকৃত অর্থেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল। একদিকে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন সিপিআই-এম (কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া-মার্ক্সিস্ট) পেয়েছিল ১১৩ আসন, অন্যদিকে কংগ্রেস পেয়েছিল ১০৫ আসন। ওই সময় এই ফলের নানা কারণ ছিল। যেমন—খাদ্যসংকট ও তা নিয়ে আন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া বা সিপিআই ভেঙে সিপিআই-এম গঠন বা জাতীয় কংগ্রেস ভেঙে বাংলা কংগ্রেস গঠন, পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থী প্রবেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের শহর ও গ্রামে তাদের ধরে বামপন্থী আন্দোলনের বেড়ে ওঠা, কংগ্রেসের সঙ্গে বামপন্থীদের রক্তাক্ত সংঘাত, রাজ্যজুড়ে ছাত্র আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনকে ঘিরে ধারাবাহিক সংঘাতের জেরে ১৯৬৭ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে তিনটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

প্রথম দুটি নির্বাচনে তিন দলের মধ্যে লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি। আসন ভাগ হয়েছিল কংগ্রেস, কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসা বাংলা কংগ্রেস ও সিপিআইএমের মধ্যে। তিনটি প্রধান দল থাকার কারণে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছিল প্রবল। ফলে তিন দল ভালো রকম আসন পেয়েছিল। যদিও ১৯৭১ সালে এককভাবে এগিয়ে ছিল কংগ্রেস, তবে সরকার গঠন করেছিল বাম জোট।

সে সময়ে লড়াইটা সিপিআই–এম ও কংগ্রেসের মধ্যে ছিল। এ সময়টা বাদ দিলে পশ্চিমবঙ্গে সব সময়ই মানুষ একটি দলকে হাত উপুড় করে ভোট দিয়েছে। প্রথমে কংগ্রেস (১৯৪৭-৬২), তারপরে বাম জোট (১৯৭৭-২০০৬) এবং শেষে তৃণমূল কংগ্রেস (২০১১-২০২১)।

তবে শতাংশের হারে ধরলে ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৬ সাল—ওই দুই বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভোট সিপিআই–এমের কাছাকাছি এসে গিয়েছিল। ওই দুবার এককভাবে সিপিআই–এমকে টপকেও যায় কংগ্রেস। এ দুই নির্বাচনে কংগ্রেস সিপিআই–এমের চেয়ে এককভাবে ২ শতাংশ বেশি ভোট পায়। তবে সিপিআই–এম একা কখনো লড়াই করেনি। তারা নেতৃত্ব দিয়েছিল একাধিক ছোট বামপন্থী দল নিয়ে গঠিত বাম ফ্রন্টের।

ফলে বাম ফ্রন্টের সব শরিক দলের ভোট মিলিয়ে সিপিআই–এম শেষ পর্যন্ত অনেকটাই এগিয়ে যায়। তবে ক্ষমতাসীন বাম জোট ও বিরোধী কংগ্রেসের আসনসংখ্যা কখনোই খুব কাছাকাছি ছিল না। সব সময়ই সিপিআই–এমের নেতৃত্বাধীন বাম ফ্রন্ট বিপুল আসন জিতেছিল, কংগ্রেস ছিল দ্বিতীয় স্থানে।

১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পরে কংগ্রেসের ভোট দুই ভাগ হয়ে যায়। কংগ্রেস তৃতীয় স্থানে চলে যায় এবং দ্বিতীয় স্থানে প্রথম রানার্সআপ হিসেবে ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উঠে আসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু এরপরও দীর্ঘ ১০ বছর জিততে পারেনি তৃণমূল কংগ্রেস।

পশ্চিমবঙ্গে কি এককভাবে কোনো দল প্রথমবার জিততে পারে না

এক কথায় উত্তর হলো, না। নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, ১৯৫২ সালে প্রথম নির্বাচনের পরে যখন ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দল প্রথমবার হেরেছে (১৯৬৭), তখন বিরোধীরা একটা জোট তৈরি করে ক্ষমতায় এসেছিল। এককভাবে কখনো কোনো বিরোধী দল ক্ষমতাসীন দলকে হারাতে পারেনি।

১৯৬৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে সিপিআই–এম জোট বেঁধেছিল কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসা বাংলা কংগ্রেসের সঙ্গে। তারা হারিয়েছিল ক্ষমতাসীন কংগ্রেসকে। ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন সিপিআই–এম দল জোট বেঁধেছিল ফরোয়ার্ড ব্লক, রেভোল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টিসহ সাতটি দল ও নির্দলীয় প্রার্থীর সঙ্গে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রেও জোট বেঁধে তারা কংগ্রেসকে হারিয়েছিল।

এরপর ২০১১ সালে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস জিতল, তখনো তারা জোট বেঁধেছিল কংগ্রেস, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি ও ঝাড়খন্ড পার্টির সঙ্গে। এর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটা সামাজিক জোট তৈরি করেছিলেন শহরকেন্দ্রিক সুশীল সমাজ এবং গ্রামকেন্দ্রিক কৃষক-শ্রমিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে।

নাগরিক সমাজের এই জোটগুলো নির্বাচনে লড়েনি; কিন্তু সামাজিক স্তরে ভোট প্রভাবিত করে তৃণমূলের জয়ের রাস্তা প্রশস্ত করেছিল।

এর কোনোটিই বিজেপির নেই। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে তারা কোনো শক্তিশালী দলের সঙ্গে জোট বাঁধেনি। সেটা বাঁধা সম্ভবও নয়। কারণ, দুটি শক্তিশালী জোট কংগ্রেস ও সিপিআই-এমের নেতৃত্বাধীন বাম ফ্রন্ট তাদের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই জোট বাঁধবে না। দ্বিতীয়ত, বুথফেরত সমীক্ষা যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কথা বলেছে, তার সম্ভাবনাও কম। কারণ, তেমনটা ১৯৭১ সালের পরে আর হয়নি।

তারপরও তৃণমূলের ঝুঁকি কী?

তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে বড় একটি ঝুঁকির আশঙ্কা এখনো রয়ে গেছে। সেই আশঙ্কার নাম ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম। সিপিআই–এম ও তৃণমূলের বুথ পর্যায়ের কর্মীরা প্রথম আলোকে বলেছেন, নির্বাচন কীভাবে করাতে হয়, তা তাঁরা ভালোভাবেই জানেন। তাঁদের শক্তিশালী সংগঠন আছে, ফলে বুথ পর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় রাখতেও কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু তাঁদের কাছে বড় এক ধোঁয়াশার নাম এই ইভিএম।

ভোটযন্ত্র ঠিক কীভাবে কাজ করে এবং যন্ত্রের কারচুপি কীভাবে রুখতে হয়, তা তাঁরা এখনো পুরোপুরি রপ্ত করতে পারেননি। তৃণমূলের বুথ পর্যায়ের এক কর্মীর ভাষায়, ‘এটি হয়তো শীর্ষ নেতৃত্ব জানেন বা যাঁরা নির্বাচনের কারিগরি দিকটি দেখেন, তাঁরা জানেন। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মেশিনে কারচুপি কীভাবে ধরতে হয়, সেই প্রশিক্ষণ আমাদের অনেকে পাননি। নিঃসন্দেহে এটি একটি “ব্ল্যাক হোল” বা অন্ধকারের গর্ত।’

দক্ষিণ কলকাতার কসবা বিধানসভা কেন্দ্রের এক সিপিআই–এম কর্মী এ প্রসঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, ভোট গ্রহণের আগে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে সব ভোটযন্ত্র রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে খতিয়ে দেখা হয়।

ওই কর্মী বলেন, ‘দলের পক্ষ থেকে আমাকে কসবা বিধানসভা কেন্দ্রের ৩১৫টি ইভিএম পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে নির্বাচন কমিশন ও অন্য দলের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। প্রতিটি যন্ত্রে এক হাজারটি করে ভোট থাকে। ভোট শুরুর আগে একে বলা হয় “মক পোল” বা পরীক্ষামূলক ভোটদান।’

সিপিআই–এমের ওই কর্মীর দাবি, ৩১৫টি যন্ত্রের মধ্যে প্রথম ৫০টি যন্ত্রের প্রতিটি বোতাম ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, তা এক হাজার বার টিপে পরীক্ষা করা হয়েছে। অর্থাৎ যে প্রতীকে বোতাম টেপা হচ্ছে, সেই প্রতীকেই ভোট পড়ছে কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। কিন্তু সব মেশিনে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়নি।

ওই কর্মী আরও বলেন, ‘বাকি ২৬৫টি মেশিনে ১ হাজার বার বোতাম টেপা হয়নি। ওই যন্ত্রগুলোতে ১০০ বার বোতাম টিপে পরীক্ষার পরই নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন যে আর সময় নেই। আমি আপত্তি জানালেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল তৃণমূলের প্রতিনিধিরা কোনো আপত্তি করেননি। ফলে ওই ২৬৫টি মেশিনে ১ হাজার ভোটের বদলে মাত্র ১০০টি ভোট দিয়ে মক পোল করা হয়েছে। বাকি ৯০০ ভোটের পরীক্ষা হয়নি। আমি মনে করি, ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এটি একটি বড় ফাঁক।’

এই কারিগরি ‘ফাঁক’ এবং ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন—এ দুই বিষয়ের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে থাকা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়াকে পুঁজি করে বিজেপি আগামী ৪ তারিখের লড়াইয়ে জিততে পারে কি না, তা দেখার জন্য এখন অপেক্ষা করতে হবে আর মাত্র চার দিন।

Read full story at source