‘ঝড়োত ধানগাচ শুইয়ে গ্যাচে, কামলা খরোচ বেশি পড়চে’
· Prothom Alo
গাইবান্ধায় গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে বোরো ধানের নিচু জমিতে পানি জমেছে। আজ শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় গাইবান্ধায় ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। বৃষ্টির সঙ্গে সম্প্রতি কালবৈশাখীর আঘতে জেলায় প্রায় ২১২ হেক্টর জমির ধানগাছ নুইয়ে পড়েছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
দুপুরে একাই নুইয়ে পড়া ধান কাটছিলেন পলাশবাড়ী উপজেলার কুমারগাড়ি গ্রামের কৃষক আমিরুল ইসলাম (৫০)। ওই কৃষক এ বছর তিন বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছেন। সম্প্রতি কালবৈশাখীর আঘাতে তাঁর ৮০ শতক জমির ধান পানিতে নুইয়ে পড়ে।
একই ধান কাটা প্রসঙ্গে কৃষক আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঝরিতে (বৃষ্টি) জমিত পানি আটকি আচে। মাঝেমদ্দে ঝড় হবার নাগচে। একনো ধান পুরাপুরি পাকে নাই। তার মদ্দে ঝড়োত ধানগাচ শুইয়ে গ্যাচে। গায়োত কামলা পাওয়া যাচ্চে না। পাওয়া গেলেও কামলা খরোচ বেশি পড়চে। গাছ বেশি দিন পানিত ডুবি থাকলে ধান নষ্ট হোবে। তাই কষ্ট করি নিজের ধান নিজে কাটপ্যার নাগচি। শুইয়ে পড়া ধান নিয়া হামরা চিন্তাত পড়চি।’
আমিরুলের মতো শনিবার অন্তত ২০ জন কৃষক নুইয়ে পড়া ধান কাটা নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানালেন। তবে নতুন করে ঝড়বৃষ্টি না হলে ধানের ক্ষতি হবে না বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, জমি থেকে দ্রুত পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি বছর জেলার সাতটি উপজেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে অনেক জমিতে পানি জমেছে। ঝড়ে উঠতি বোরো ধান নুইয়ে পড়েছে।
কৃষি বিভাগের সূত্র জানায়, বোরো ধান কাটা পুরোপুরি শুরু হয়নি। শনিবার পর্যন্ত শতকরা ২ ভাগ ধান কাটা হয়েছে।
শনিবার দুপুরে সরেজমিন দেখা গেছে পানি জমে থাকা খেতে ধান কাটার চিত্র। বিশেষত পলাশবাড়ী উপজেলার কুমারগাড়ি, হরিণাবাড়ি, রাইতি নরাইল, নান্দিশহর বিল, মালিয়ানদহ, খামার নান্দিশহর, পুকুরিয়া বিল, মাঠেরবাজার ও সদর উপজেলার বাদিয়াখালী এবং চকবরুল গ্রামের নিচু জমির আধা পাকা ধান ঝড়ে মাটিতে নুইয়ে পড়েছে। কোনো কোনো এলাকায় জমির ধানগাছ পানিতে ডুবে আছে। অনেক কৃষক আধা পাকা ধান কাটছেন।
হরিণাবাড়ি গ্রামের কৃষকেরা বলেন, গ্রামের সোলাগাড়ি বিলে প্রায় ৫০০ বিঘা জমিতে আধা পাকা ধান রয়েছে। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে অনেক জমিতে পানি জমে গেছে। বিলের পানিনিষ্কাশনের জন্য নালা ছিল। ইটভাটার কারণে নালাটি এখন বন্ধ। ফলে পানিনিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আধা পাকা ধান নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শ্রমিকসংকটে ধান কাটতে পারছেন না কৃষকেরা।
এদিকে ধান কাটার মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই গ্রামাঞ্চলে কৃষিশ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে। শ্রমিক পাওয়া গেলেও মজুরি অনেক বেশি। নুইয়ে পড়া ধান কাটা নিয়ে কৃষকেরা বিপাকে পড়েছেন।
কুমারগাড়ি গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া জানান, এ বছর চার বিঘা জমিতে বোরো ধানের চাষ করেছি। এর মধ্যে ঝড়ে এক বিঘা জমির আধা পাকা ধানগাছ পানিতে মিশে গেছে। নুইয়ে পড়া ধান কাটতে কৃষিশ্রমিকদের বেশি মজুরি দিতে হচ্ছে। বর্তমানে বিঘাপ্রতি সাত থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। তবু শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ধান কাটা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
হরিণাবাড়ি গ্রামের কৃষক মুকুল চন্দ্র বলেন, ‘এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হয়ে ধানগাছ পানির নিচে ডুবে আছে। আমার প্রায় ৪০ শতক জমির আধা পাকা ধানগাছ পানিতে পড়েছে।’ তিনি বলেন, গত বছর এ সময় বিঘাপ্রতি জমির ধান কাটতে তিন থেকে চার হাজার লাগত। সেখানে বর্তমানে বিঘাপ্রতি সাত থেকে আট হাজার টাকা বেশি লাগছে। টাকা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না।
এ প্রসঙ্গে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরও বলেন, যেসব জমিতে পানি জমেছে, সেসব জমির ধান পেকে থাকলে কৃষকদের তা কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। না পেকে থাকলে পানিনিষ্কাশনের কথা বলা হচ্ছে।