দেড় শ কোটি টাকা আয় বেড়েছে রেলের, তবু যাত্রীসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন
· Prothom Alo

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে আগের তুলনায় ১৫০ কোটি টাকা বেশি আয় করেছে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল। এই আয়ের বেশির ভাগই হয়েছে যাত্রী পরিবহন থেকে। তবে এবারও আয় কমেছে পণ্য পরিবহন খাতে।
Visit mwafrika.life for more information.
চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আয় হয়েছে ৯০৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। গত অর্থবছরে একই সময়ে আয় হয়েছিল ৭৫৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
রেলওয়ে মোট আটটি খাত থেকে আয় করে। তবে মূল আয়ের খাত হচ্ছে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। এবার মোট আয়ের সাড়ে ৮৬ শতাংশ অর্থ এসেছে যাত্রী পরিবহন খাত থেকে। পণ্য ও পার্সেল পরিবহন থেকে আয় হয়েছে ৭১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা মোট আয়ের মাত্র ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
চার্জ আরোপ, পুরোনো সুবিধা প্রত্যাহারসহ নানা কারণে যাত্রী পরিবহনে আয় বাড়লেও যাত্রীসেবার মান বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ তেমন নেই রেলওয়ের। সূচি না মেনে ট্রেন চলাচল, নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে না পৌঁছানো, পথে পথে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়া, লাইনচ্যুত হওয়া, টিকিট কেটেও আসন পেতে ভোগান্তি, জনপ্রিয় রুটে পাথর নিক্ষেপসহ বিভিন্ন ভোগান্তির ঘটনা এখনো বন্ধ হয়নি।
পণ্য পরিবহনে এবার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি, বরং আগের বছরের চেয়ে এবার আয়ও কমেছে। ইঞ্জিন–সংকটে পণ্যবাহী ট্রেন চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি। অথচ পাশের দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পণ্য পরিবহনে জোর দেয়।
পণ্য পরিবহনে এবার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি, বরং আগের বছরের চেয়ে এবার আয়ও কমেছে। ইঞ্জিন–সংকটে পণ্যবাহী ট্রেন চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি। অথচ পাশের দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পণ্য পরিবহনে জোর দেয়।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ বিভাগ নিয়ে গঠিত রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল। পূর্বাঞ্চলে রেলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে আয়ের অনুপাতে বড় ব্যবধান থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও পাকিস্তানের চিত্র ভিন্ন। সর্বশেষ অর্থবছরে (২০২৪-২৫) ভারতীয় রেলের মোট আয় হয়েছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার ১১৩ কোটি রুপি। এর মধ্যে পণ্য পরিবহন থেকে আয় হয় ১ লাখ ৭১ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। যাত্রী আয় ছিল ৭৫ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। যাত্রী আয়ের তুলনায় পণ্য পরিবহনের আয় ২ দশমিক ৩ গুণ বেশি। আর শেষ অর্থবছরে পাকিস্তান রেলওয়ে আয় করেছিল ৮৩ বিলিয়ন রুপি। এর মধ্যে যাত্রী খাত থেকে আসে ৪২ বিলিয়ন রুপি এবং পণ্য পরিবহন খাত থেকে ২৯ বিলিয়ন রুপি। অন্যান্য খাত থেকে বাকি অর্থ আয় হয়েছে।
মাশুল আরোপে বেড়েছে যাত্রী খাতে আয়
রেলওয়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রেলের আয়ের প্রধান ভরসা এখন যাত্রী পরিবহন। যাত্রী পরিবহন খাত থেকে আয় হয়েছে ৭৮৭ কোটি টাকা। আগের বছরে তা ছিল ৬২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে আয় বেড়েছে ১৬৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা ২৬ শতাংশ বেশি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই থেকে মার্চ) ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ট্রেনে যাতায়াত করেছেন ৩ কোটি ৬৯ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ। যদিও রেলের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ৭৮ লাখ ৬৪ হাজার যাত্রী। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯১ লাখ ২১ হাজার বেশি মানুষ ট্রেনে চড়েছেন।
যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলেন, সড়কপথে যানজট, দুর্ঘটনার শঙ্কা, বাড়তি ভাড়া, সময় বাঁচানোসহ নানা ভোগান্তি এড়াতে মানুষ রেলের দিকে ঝুঁকছেন। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন নতুন রুট চালু হয়েছে। নিরাপদ ও স্বস্তিতে যাতায়াতের জন্য ট্রেনের প্রতি মানুষের আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
মাহবুবুর রহমান, প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল।আন্তনগর ট্রেনে লম্বা দূরত্বের আসনগুলো ফাঁকা থেকে যেত। মাঝামাঝি দূরত্বের যাত্রীরা ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় বেশি ভাড়ার (লম্বা দূরত্বের জন্য ভাড়া) কারণে আগ্রহ পেতেন না। পরে টিকিটের কোটাব্যবস্থা পরিবর্তন করে যাত্রীচাহিদা আছে, এমন স্টেশনের জন্য টিকিটের পরিমাণ বাড়ানো হয়। এতে যাত্রীর পরিমাণও বেড়েছে, আয়ও বেড়েছে।এদিকে ট্রেনের প্রতি মানুষের আগ্রহ যত বাড়ছে, তত বিভিন্ন ধরনের চার্জ বা মাশুল আরোপ করেছে রেলওয়ে। এমনকি আগে থেকে চালু সুবিধাও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। প্রথম শ্রেণির নন–এসি (শীতাতপনিয়ন্ত্রিত নয়) বগিতে আগে ভ্যাট ছিল না। তবে ২০২২ সালে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়।
একসময় যাত্রী আকর্ষণে দূরত্বভেদে রেয়াতি সুবিধা দিত রেলওয়ে। রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১০১ থেকে ২৫০ কিলোমিটার ভ্রমণে ২০ শতাংশ, ২৫১ থেকে ৪০০ কিলোমিটার ভ্রমণে ২৫ শতাংশ এবং ৪০১ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ৩০ শতাংশ ছাড় পেতেন যাত্রীরা। কিন্তু ২০২৪ সালের এপ্রিলে তা প্রত্যাহার করে নেয় রেলওয়ে।
এ ছাড়া যাত্রী খাতে আয় বাড়াতে আন্তনগর ট্রেনগুলোর অতিরিক্ত যুক্ত করা কোচ এবং আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রিজার্ভ বগির এসি টিকিটে স্বাভাবিক ভাড়ার সঙ্গে ৩০ শতাংশ এবং নন–এসিতে ২০ শতাংশ চার্জ যুক্ত করা হয়। সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে ১০০ মিটারের চেয়ে বেশি লম্বা সেতুর ওপর পন্টেজ চার্জ আরোপ করে রেলওয়ে। এতে ট্রেন ও আসনভেদে সর্বনিম্ন ৫ থেকে সর্বোচ্চ ২২৬ টাকা ভাড়া বেড়েছে।
রেলওয়ের ভাষায়, রেলপথের মধ্যে কোনো সেতু বা সমজাতীয় অবকাঠামো পড়লে ভাড়ার সঙ্গে যে বাড়তি মাশুল নির্ধারণ করা হয়, তা-ই ‘পন্টেজ চার্জ’। সে ক্ষেত্রে ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুকে আড়াই কিলোমিটার দূরত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে পথের দূরত্ব কাগজে-কলমে বেড়ে যাবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রেলের আয়বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলন করা হয়েছে। যেমন আন্তনগর ট্রেনে লম্বা দূরত্বের আসনগুলো ফাঁকা থেকে যেত। মাঝামাঝি দূরত্বের যাত্রীরা ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় বেশি ভাড়ার (লম্বা দূরত্বের জন্য ভাড়া) কারণে আগ্রহ পেতেন না। পরে টিকিটের কোটাব্যবস্থা পরিবর্তন করে যাত্রীচাহিদা আছে, এমন স্টেশনের জন্য টিকিটের পরিমাণ বাড়ানো হয়। এতে যাত্রীর পরিমাণও বেড়েছে, আয়ও বেড়েছে।
আয় কমছে পণ্য পরিবহনে, বিনিয়োগের সুফল নেই
রেলওয়ের আয় বাড়লেও পণ্য পরিবহনে হতাশাজনক চিত্র রয়ে গেছে। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না সংস্থাটি, আয়ও বাড়াতে পারছে না। ১১ অর্থবছর ধরে আয় কমছে এই খাতে। মাঝখানে আয় কিছুটা বাড়লেও তা ধরে রাখতে পারেনি রেলওয়ে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পণ্য পরিবহন খাতে রেলওয়ে আয় করেছিল ৭৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা। ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শতকোটি টাকা আয় হয়েছিল। তবে গত অর্থবছরে আয় হয় ৭৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
এবার এই খাত থেকে গত বছরের তুলনায় কম আয় করেছে রেল। গত বছর যেখানে আয় হয়েছিল ৭২ কোটি ৩১ লাখ টাকা, এবার আয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। যদিও ২২৭ কোটি ৮ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এ ছাড়া পার্সেল খাত থেকে আয় এসেছে ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরে রেলের উন্নয়নে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করা হয়। তবে নতুন নতুন রেললাইন নির্মাণে খরচ করা হয়েছে বেশি। কিন্তু তার সঙ্গে সমন্বয় করে নতুন ইঞ্জিন কেনা হয়নি। ফলে রেলপথ বাড়লেও চলাচলকারী ট্রেনের সংখ্যা কমেছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের পরিমাণ কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে ১ হাজার ৮৩৮টি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করেছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরের এই সময়ে চলাচল করে মাত্র ৯৮৫টি ট্রেন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ট্রেনের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। এবারের অর্থবছরের এই সময়ের মধ্যে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৭১৫ ওয়াগন পরিবহন করার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু পণ্য পরিবহন করেছে ৪৯ হাজার ৪৭৬টি ওয়াগন। অর্থাৎ, চার ভাগের তিন ভাগ কম।
মূলত ইঞ্জিন–সংকটের কারণে ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১৩টি ইঞ্জিন প্রয়োজন, সেখানে পাওয়া যায় মাত্র ৩ থেকে ৪টি। কখনো কখনো তা–ও পাওয়া যায়নি। ইঞ্জিন–সংকটের কারণে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও পণ্য পরিবহনে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞ ও রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, বিপুল বিনিয়োগের পরও রেলওয়ে ‘লাইনচ্যুত’ হয়েছে মূলত ভুল পরিকল্পনা, দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অপব্যয়ের কারণে। এর একটি বড় উদাহরণ লাগেজ ভ্যান ক্রয়। পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে রেলকে লাভজনক করার কথা বলে ২০২৩ সালে ৩৫৮ কোটি টাকায় ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনা হয়েছিল। এগুলো চালু করে লাভ তো হয়নি, উল্টো এখন এগুলো রেলওয়ের ‘গলার কাঁটায়’ পরিণত হয়েছে। রেলওয়ের নথিপত্র বলছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রেলওয়ের বহরে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান যুক্ত হয়। পুরোনো লাগেজ ভ্যান ছিল ৫০টি, যার ১৮টি সচল ছিল।
নতুন লাগেজ ভ্যানগুলো যুক্ত হওয়ার আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) পার্সেল পরিবহনে আয় হয়েছিল ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। লাগেজ ভ্যান যুক্ত করার পরও আয় তেমন বৃদ্ধি হয়নি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পার্সেল খাত থেকে আয় হয়েছে মাত্র ৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। লাগেজ ভ্যানের মাধ্যমে ৮৮২ কুইন্টাল পণ্য পরিবহনের কথা থাকলেও করেছে ২৮৬ কুইন্টাল।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পরিবহনবিশেষজ্ঞ মো. সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, রেলে যে হারে বিনিয়োগ হয়েছে, সেবার মান ও যাত্রী পরিবহনের সংখ্যা একেবারেই বাড়েনি। এর অর্থ, বিনিয়োগ সুবিবেচনাপ্রসূত হয়নি। রেলের অনেক কেনাকাটা হয়েছে কোনো না কোনোভাবে সাপ্লায়ারদের (সরবরাহকারী) সুবিধা দেওয়ার জন্য; যার বড় উদাহরণ লাগেজ ভ্যান। উপযোগিতা যাচাই-বাছাই না করে লাগেজ ভ্যান ক্রয় করা হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি।