প্রকৃতি রক্ষায় মহানবী (সা.)–এর যত্ন ও উদ্যোগ
· Prothom Alo

মহাবিশ্বের সকল কিছুর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক মূলত অধীনতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ব্যাখ্যা মতে, কোনো কিছুকে অধীন করে দেওয়ার অর্থই হলো তা ব্যবহারের সক্ষমতা প্রদান করা।
তবে এই সক্ষমতা লাভের প্রধান শর্ত হলো পৃথিবীতে আল্লাহর ‘প্রতিনিধিত্ব’ (খেলাফত) এবং তাঁর ইচ্ছানুযায়ী পৃথিবীকে আবাদ ও সমৃদ্ধ করার নীতি বাস্তবায়ন করা।
Visit rouesnews.click for more information.
ঠিক এ কারণেই মানব আচরণের সঠিক দিকনির্দেশনার জন্য কিছু নীতিমালার প্রয়োজন ছিল। মানুষ যে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে বাস করছে, সেই জগতের সঙ্গে তার আচরণ কেমন হবে, তা এসব নীতিমালার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো:
উদ্ভিদের প্রতি তাঁর মমতা ও মনোযোগ এতটাই গভীর ছিল যে তিনি গাছের বরকতের জন্য দোয়া করতেন এবং নিয়মিত এর বেড়ে ওঠা ও ফল আসার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতেন।
১. পৃথিবীর সুপ্ত শক্তি ও সম্পদকে কাজে লাগাতে উৎসাহিত করা।
২. সম্পদের ব্যবহারে মিতব্যয়ী ও দূরদর্শী হওয়া।
৩. প্রকৃতির প্রতিটি বস্তু ও উপাদানের সঙ্গে এমন সতর্ক আচরণ করা, যা মানুষের জাগতিক আকাঙ্ক্ষা এবং স্রষ্টার মহৎ উদ্দেশ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে।
হাদিসে পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। রাসুল (সা.) মানুষকে পরিবেশগত শিষ্টাচার শিখিয়েছেন।
মহানবী (সা.) উদ্ভিদের পরিচর্যা ও সুরক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। উদ্ভিদের ক্ষতি করে এমন সব কাজ থেকে তিনি নিষেধ করেছেন। এমনকি উদ্ভিদের প্রতি তাঁর মমতা ও মনোযোগ এতটাই গভীর ছিল যে তিনি গাছের বরকতের জন্য দোয়া করতেন এবং নিয়মিত এর বেড়ে ওঠা ও ফল আসার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতেন।
আবু হোরাইরা (রা.) বলেন, লোকেরা যখন প্রথম (পাকা) ফল দেখতে পেত, তা নিয়ে নবীজির নিকট আসত এবং তিনি যখন তা গ্রহণ করতেন তখন দোয়া পড়তেন, “হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ফলে (বা উৎপন্ন ফসলে) বরকত দান করুন, আমাদের মদিনায় বরকত দান করুন, আমাদের ‘সা’ ও ‘মুদ্দ’–এ বরকত দান করুন।...” অতঃপর তিনি সর্ব কনিষ্ঠ শিশুকে ডাকতেন এবং তাকে ফল দিয়ে দিতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৭৩)
প্রাণীর অধিকারে ইসলামের দর্শনসা ও হলো দুটি পরিমাপক পাত্র। সাধারণত ৪ মুদ বা প্রায় আড়াই কেজিতে ১ সা হিসাব করা হয়।
এখান থেকে বোঝা যায়, নবীজি (সা.) উদ্ভিদের ফলন নিয়ে কতটা আনন্দিত হতেন এবং বরকতের দোয়া করার মাধ্যমে কৃষি ও পরিবেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতেন। তিনি কেবল উৎসাহ দিয়ে ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি নিজ হাতে গাছ রোপণ করে এই কাজে সহায়তা করতেন।
সালমান (রা.) বলেন, “আমি আমার মালিকপক্ষের সঙ্গে এই চুক্তিতে আবদ্ধ হলাম যে, আমি যদি তাদের জন্য ৫০০টি খেজুর চারা রোপণ করি এবং সেগুলো বেঁচে যায় (শিকড় গেড়ে বড় হতে শুরু করে), তবে আমি মুক্ত হয়ে যাব। এরপর আমি নবীজির কাছে এসে বিষয়টি জানালাম।
তিনি বললেন, ‘তুমি চারাগুলো রোপণ করো এবং তাদের শর্ত মেনে নাও। তবে যখন রোপণ শুরু করবে, তখন আমাকে অবশ্যই জানাবে।’
সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০যদি কোনো মুসলিম গাছ রোপণ করে অথবা শস্য বপন করে, আর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ কিংবা জীবজন্তু আহার করে, তবে সেটি তার জন্য ’সদকা’ হবে।এরপর আমি তাঁকে জানালাম। তিনি আসলেন এবং নিজ হাতে একটি একটি করে চারা রোপণ করতে শুরু করলেন। মাত্র একটি চারা আমি নিজে রোপণ করেছিলাম, বাকি সবগুলো তিনি নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন। ফলাফল এই হলো যে প্রতিটি চারা বেঁচে গেল এবং শিকড় ধরল, শুধু সেই চারাটি বাদে যা আমি নিজে রোপণ করেছিলাম।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৭৩০)
এখানে বৃক্ষরোপণ এবং এর ব্যাপক বিস্তারের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। গাছপালা ও উদ্ভিদরাজি রোপণ করা পরিবেশগত ভারসাম্যের অন্যতম প্রধান উপাদান, যা পৃথিবীতে মানুষের জীবনধারণ সহজ করে দেয়।
বর্তমানে এই মৌলিক নীতিগুলোর বিপরীতে কাজ করা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই একের পর এক পরিবেশগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে; যার শুরু ওজোন স্তরে ফাটল ধরা, এরপর জলবায়ু পরিবর্তন এবং সবশেষে হিমবাহের গলন ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো ভয়াবহ বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে।
ইসলামে পরিবেশ রক্ষা ও গাছ লাগানোকে একজন মুসলিমের জন্য সার্বক্ষণিক সওয়াবের মাধ্যম বানানো হয়েছে, সদকায় রূপান্তরের মাধ্যমে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, “যদি কোনো মুসলিম একটি গাছ রোপণ করে অথবা শস্য বপন করে, আর তা থেকে কোনো পাখি, মানুষ কিংবা জীবজন্তু আহার করে, তবে সেটি তার জন্য 'সদকা' হিসেবে গণ্য হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৫৩)
নবীজির (সা.) উপমায় প্রাণ ও প্রকৃতি: ১অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও—অর্থাৎ যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও—গাছপালা ধ্বংস করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। উদ্ভিদের প্রতি ইসলামের এই মমতার কোনো নজির পূর্ববর্তী কোনো ধর্মে বা মানুষের তৈরি আধুনিক কোনো আইনে খুঁজে পাওয়া যায় না।
ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফাগণ যখন যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনী পাঠাতেন, তখন তাদেরকে নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষার নির্দেশের পাশাপাশি গাছপালা, বিশেষ করে ফলবান বৃক্ষ, সংরক্ষণ করারও কঠোর নির্দেশ দিতেন।
একবার আবু বকর সিদ্দিক (রা.) যখন সিরিয়ায় (শাম) সৈন্যবাহিনী পাঠালেন, তখন তিনি ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)-কে বিদায় জানাতে বের হলেন এবং বললেন, “আমি তোমাকে দশটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি: কোনো শিশু, নারী বা অতি বৃদ্ধকে হত্যা করবে না। কোনো ফলবান বৃক্ষ কাটবে না, কোনো জনপদ ধ্বংস করবে না। খাওয়ার প্রয়োজন ছাড়া কোনো ছাগল বা উট জবাই করবে না। খেজুর গাছ পানিতে ডুবিয়ে নষ্ট করবে না এবং তা জ্বালিয়েও দেবে না। গণিমতের মাল চুরি করবে না এবং কাপুরুষতা প্রদর্শন করবে না।” (মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ১৬২৭)
জলবায়ু সংকটের এই ক্রান্তিকালে ওজোন স্তরের ক্ষয় কিংবা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মতো দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে ইসলামের এই পরিবেশগত শিষ্টাচারের কোনো বিকল্প নেই।
মানুষ যখন নিজেকে পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি না ভেবে আল্লাহর ‘প্রতিনিধি’ হিসেবে বিবেচনা করবে, তখনই প্রকৃতির সঙ্গে তার আচরণের ভারসাম্য ফিরে আসবে। নবীজির সুন্নাহ ও সাহাবিদের অনুসৃত নীতি আমাদের শেখায় যে একটি চারা রোপণ করা যেমন ইবাদত, তেমনি অপ্রয়োজনে একটি গাছ কাটা বা প্রকৃতির ক্ষতি করাও স্রষ্টার অবাধ্যতা।
বর্তমান জলবায়ু সংকটের এই ক্রান্তিকালে ওজোন স্তরের ক্ষয় কিংবা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মতো ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে ইসলামের এই পরিবেশগত শিষ্টাচারের কোন বিকল্প নেই।
প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে একে আগামীর জন্য আবাদ ও সমৃদ্ধ রাখা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের হাতে লাগানো বৃক্ষ কেবল পরিবেশের ভারসাম্যই রক্ষা করে না, বরং মৃত্যুর পরেও তা আমাদের জন্য ‘সদকায়ে জারিয়া’ হিসেবে সওয়াবের দুয়ার খুলে দেয়।
আবদুল্লাহিল বাকি: আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার