শুধু টিকা নয়, ভিটামিন এ–ও পায়নি শিশুরা, পুষ্টির ঘাটতিতেও হামে মৃত্যু বাড়ছে

· Prothom Alo

ঠিক সময়ে টিকা না পাওয়ায় দেশের অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। মৃত্যুও বাড়ছে। শিশুরা ঠিক সময়ে ভিটামিন এ-ও পায়নি। শিশুদের মধ্যে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টি শিশুদের অবস্থাকে বেশি নাজুক করে তুলেছে।

এরই মধ্যে গতকাল শুক্রবারও হামে সাতটি শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল আটটা থেকে গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর। এ বছর ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে হামে ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৪৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

Visit salonsustainability.club for more information.

শিশুস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ। ঠিক সময় ঠিক পদক্ষেপ নিলে এত শিশুর মৃত্যু হতো না। টিকার পাশাপাশি শিশু পুষ্টিও তাদের সুরক্ষা দেয়।

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিশুদের ওপর একের পর এক অন্যায় করা হয়েছে। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর পক্ষে প্রচার নেই, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন নেই, কৃমিনাশক ঠিকমতো খাওয়ানো হয়নি। এসবই অপুষ্টি বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ঠিক সময়ে হামের টিকা না পেয়ে শিশুরা অরক্ষিত অবস্থায় চলে যায়। তারই পরিণতি এই প্রাদুর্ভাব, এত মৃত্যু।’

গত বুধবার ইউনিসেফ ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি, আর ২১ শতাংশ আংশিক টিকাপ্রাপ্ত।

শিশুরা অরক্ষিত হয়ে পড়ে

হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুরা বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে নিয়মিতভাবে দেশের ৯ মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। টিকাকে কার্যকর করতে হলে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা দরকার; কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ২০২৩ সালের ইপিআইয়ের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, টিকা পেয়েছে ৮২ শতাংশ শিশু। অর্থাৎ প্রতিবছর ১৮ শতাংশ বা এর বেশি শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়।

গত বুধবার ইউনিসেফ ও প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, আক্রান্ত শিশুদের ৬৫ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি, আর ২১ শতাংশ আংশিক টিকাপ্রাপ্ত।

এভাবে টিকা থেকে বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা কয়েক বছর ধরে বেড়েছে। এই বাদ পড়া শিশুর সংখ্যা এক বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যার সমান বা কাছাকাছি হলে হামের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় বলে রোগতত্ত্ববিদেরা জানিয়েছেন।

বিয়ের ১১ বছর পর সন্তানের জন্ম, মৃত্যু হামে

নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে যেসব শিশু বাদ পড়ে, তাদের জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকার আওতায় আনা হয়। সর্বশেষ ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। শেষ হয় ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। পরবর্তী ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। তারপর তারিখ পরিবর্তন করে নেওয়া হয় সেপ্টেম্বরে; কিন্তু টাইফয়েডের টিকা ক্যাম্পেইনের কারণে তা আবার পেছানো হয়। এরপর চলে আসে নির্বাচন। সেই ক্যাম্পেইন এ বছরের ২০ এপ্রিল শুরু হয়েছে। ক্যাম্পেইন শুরুর আগেই সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ে।

মুশতাক হোসেন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞশিশুদের ওপর একের পর এক অন্যায় করা হয়েছে। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর পক্ষে প্রচার নেই, ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন নেই, কৃমিনাশক ঠিকমতো খাওয়ানো হয়নি। এসবই অপুষ্টি বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ঠিক সময়ে হামের টিকা না পেয়ে শিশুরা অরক্ষিত অবস্থায় চলে যায়। তারই পরিণতি এই প্রাদুর্ভাব, এত মৃত্যু।

শিশুরা অবহেলার শিকার

কুষ্টিয়া থেকে আসা হামে আক্রান্ত আট মাস বয়সী শিশু ইরফান আহমেদ ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতালে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। ইরফানের মৃত্যুতে স্বজনদের আহাজারি

শিশুরা যে ঠিক সময়ে হামের টিকা পায়নি, শুধু তা-ই নয়। তারা ঠিক সময়ে ভিটামিন এ-ও পায়নি।

শিশুস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ভিটামিন এ-এর অনেক কাজ। শরীরে কোষের কাজ ঠিকঠাক রাখে ভিটামিন এ। ভিটামিন এ চোখের পানি তৈরিতে সহায়তা করে। ভিটামিন এ কম থাকলে রাতকানা রোগ থেকে শুরু করে মানুষ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া ভিটামিন এ রোগ প্রতিরোধক।

পুষ্টিবিদেরা জানিয়েছেন, দেশের সব বয়সী সাড়ে ৭ শতাংশ মানুষের ভিটামিন এ-এর ঘাটতি আছে। শিশুদের মধ্যে এই হার বেশি। শিশুদের ভিটামিন এ-এর ঘাটতি দূর করার জন্য প্রতিবছর দুবার ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন করা হয়। সেই ক্যাম্পেইনও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঠিকমতো হয়নি।

সরকারের জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. ইউনুস আলী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সর্বশেষ ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন হয়েছে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে। এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তা হয়নি।

পুষ্টিবিদেরা জানিয়েছেন, দেশের সব বয়সী সাড়ে ৭ শতাংশ মানুষের ভিটামিন এ-এর ঘাটতি আছে। শিশুদের মধ্যে এই হার বেশি। শিশুদের ভিটামিন এ-এর ঘাটতি দূর করার জন্য প্রতিবছর দুবার ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন করা হয়। সেই ক্যাম্পেইনও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঠিকমতো হয়নি।
ঢাকার ডিএনসিসি কোভিড–১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশু আবদুল্লাহ

ভিটামিন এ-এর মতো শিশুরা মায়ের বুকের দুধের ক্ষেত্রেও বঞ্চিত হচ্ছে। টিকাবিশেষজ্ঞ ও ইপিআইয়ের সাবেক উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক তাজুল এ বারি প্রথম আলোকে বলেন, মায়ের দুধ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুদের শুধু বুকের (এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং) দুধ খাওয়ানো দরকার; কিন্তু বিরাটসংখ্যক শিশু তা পাচ্ছে না; বরং তা কমছে।

সর্বশেষ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (২০২২) বলছে, ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ খায়, এমন শিশুর হার ৫৩ শতাংশ। এর চার বছর আগে এই হার ছিল ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের বিপুলসংখ্যক শিশু বুকের দুধ পাচ্ছে না।

মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর পরিস্থিতি বর্তমানে কেমন, তা গোলটেবিল বৈঠকে উল্লেখ করেছিলেন ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ। তিনি উপস্থাপনায় বলেন, ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ।

শিশুস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ আবিদ হোসেন মোল্লাঅপুষ্টি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়। পুষ্টিহীন শিশু টিকা না পেলে তার সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সে যদি ঠিক চিকিৎসা না পায়, তার মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ে।

শিশুদের প্রতি অবহেলার আরেক উদাহরণ জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ পালিত না হওয়া। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মে মাসে জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ সপ্তাহ পালিত হয়েছিল। বছরে দুবার এমন সপ্তাহ পালিত হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৫ সালে জাতীয় কৃমি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পালিত হয়নি। কিন্তু কৃমিনাশক বড়ি কেনা ছিল।

শিশুস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়। পুষ্টিহীন শিশু টিকা না পেলে তার সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সে যদি ঠিক চিকিৎসা না পায়, তার মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ে।

ভোলা-ঢাকা এক মাসের চিকিৎসা-লড়াই শেষে পাঁচ মাসের শিশুর মৃত্যু

Read full story at source