ভিড়ের মাঝেও একা লাগে: কোরআনের ব্যাখ্যা কী
· Prothom Alo

ঘরভর্তি মানুষ। হাসি আছে, কথা আছে, খাবার টেবিলে গল্প আছে। কিন্তু আপনি বসে আছেন আর ভেতরে একটাই অনুভূতি—কেউ নেই। কেউ সত্যিকার অর্থে বোঝে না। সবাই আছে, তবু একটা শূন্যতা। যেন বুকের মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গা, যেটা কোনোভাবেই ভরছে না।
Visit afsport.lat for more information.
এই অনুভূতিটার নাম একাকীত্ব। মজার ব্যাপার হলো, এটা নির্জনতায় আসে না, আসে ভিড়ের মাঝে।
কোরআন বলছে, সমস্যাটা পরিবেশে নয়, বরং সংযোগে। এবং সেই সংযোগ কোথায় খুঁজতে হবে, সেটা দেড় হাজার বছর আগেই বলে দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞান কী বলছে
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী একাকীত্ব শুধু মনকে নয়, শরীরও ভাঙে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় এবং মস্তিষ্কে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা এতটাই বাড়িয়ে তোলে যা দিনে পনেরোটি সিগারেট খাওয়ার সমান ক্ষতি করে। (Cacioppo, J. T. & Hawkley, L. C., 2003, 58/3, আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, ওয়াশিংটন ডিসি)
আধুনিক মনোবিজ্ঞান এর সমাধান হিসেবে বলছে, 'সংযোগ খোঁজো, মানুষের সঙ্গে থাকো।' কিন্তু একটু আগেই তো দেখলাম, মানুষের মাঝেও এই শূন্যতা থাকে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
কোরআন বলছে, সমস্যাটা পরিবেশে নয়, বরং সংযোগে। এবং সেই সংযোগ কোথায় খুঁজতে হবে, সেটা দেড় হাজার বছর আগেই বলে দেওয়া হয়েছে।
মানুষকে দেওয়া আল্লাহর অমূল্য আমানতকোরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ–তাআলা সুরা কাফে বলেন, 'আমি তার গলার শিরার চেয়েও তার অধিক নিকটবর্তী।' (সুরা কাফ, আয়াত: ১৬)
একটু থামুন। এই আয়াতটা আস্তে আস্তে পড়ুন।
‘হাবলিল ওয়ারিদ’: মানে গলার শিরা। এই শিরাটার কথা ভাবুন। এটা আপনার শরীরের এত গভীরে যে আপনি নিজেও সেটা দেখতে পান না, হাত দিয়ে ছুঁতে পারেন না। এই শিরা বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ বাঁচে না। এটা জীবনের সবচেয়ে কাছের জিনিস। আর আল্লাহ বলছেন, আমি তার চেয়েও কাছে।
‘নাহনু আকরাব’: আরবিতে 'আকরাব' তুলনামূলক বিশেষণ। মানে তুলনা করা হচ্ছে। শুধু ‘কাছে’ নয়, ‘আরও কাছে।’ যে জিনিস আপনার থেকে আলাদা করা যায় না, আল্লাহ তার চেয়েও অধিক অবিচ্ছেদ্য।
ইমাম গাজ্জালি (রহ.)যে হৃদয় আল্লাহকে চেনে, সে হৃদয় কখনো প্রকৃত অর্থে একা নয়। আর যে হৃদয় তাঁকে চেনে না, সে হৃদয় মানুষের ভিড়েও নিঃসঙ্গ।তাহলে প্রশ্ন আসে, এত কাছে থাকলে একাকীত্ব আসে কোথা থেকে? উত্তরটা আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। সুরা ত্বহায় বলেন, ‘যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, তার জীবন হবে সংকুচিত ও কষ্টময়।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪)
‘মাইশাতান দানকা’: সংকুচিত জীবন। ‘দানক’ শব্দটা আরবিতে এমন একটা অনুভূতি বোঝায়, মানুষ বাইরে থেকে ঠিকঠাক আছে, হাসছে, কথা বলছে, কিন্তু ভেতরে একটা অদৃশ্য চাপ। যেন বুকের উপর কিছু একটা চেপে বসে আছে, সরছে না। এটাই ‘দানক’। আর এই অনুভূতি তৈরি হয় আল্লাহ থেকে দূরত্বে।
এজন্যই ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেছেন, ‘যে হৃদয় আল্লাহকে চেনে, সে হৃদয় কখনো প্রকৃত অর্থে একা নয়। আর যে হৃদয় তাঁকে চেনে না, সে হৃদয় মানুষের ভিড়েও নিঃসঙ্গ।’ (ইহইয়াউ উলুমিদ দিন, বৈরুত: দারুল মারিফাহ, ৪/৩২২)
একাকীত্বের আসল রহস্য এখানেই।
কোরআনের শিক্ষা
১. হৃদয়ের শূন্যতা একটাই জিনিস দিয়ে পূর্ণ হয়। আমরা একাকীত্ব দূর করতে ফোন স্ক্রল করি, মানুষ খুঁজি, বিনোদনে ডুবি, কিন্তু প্রশান্তি আসে না। কারণ আল্লাহ সুরা রাদে বলেছেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)
‘তাতমাইন্ন’ শব্দটা গভীরভাবে লক্ষ করুন। এর মানে শুধু ‘শান্ত হওয়া’ নয়, এর মানে এমন স্থিরতা যেখানে আর দুলতে হয় না, আর খুঁজতে হয় না। যেভাবে ঝড়ের পর নোঙর করা নৌকা বন্দরে স্থির হয়ে যায়। এই স্থিরতা মানুষের কাছে পাওয়া যায় না, কারণ মানুষ নিজেও দুলছে।
ইসলামে ওহির ধারণাএজন্যই ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন, 'হৃদয়ে একটি শূন্যতা আছে যা আল্লাহর ভালোবাসা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়।' (ইগাসাতুল লাহফান, বৈরুত: দারুল মারিফাহ, ১/৩১)
মানুষের কাছ থেকে সাময়িক উষ্ণতা পাওয়া যায়, কিন্তু সেই শূন্যতা ভরে না। কারণ এই শূন্যতা তৈরিই হয়েছে আল্লাহর জন্য।
২. তিনি শুধু কাছে নন, সাড়াও দেন। আল্লাহ সুরা বাকারায় বলেন, ‘আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আমি তো কাছেই আছি। যখনই কেউ ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৬)
এই আয়াতে একটা অসাধারণ জিনিস লক্ষ করুন। মানুষ জিজ্ঞেস করছে নবীজি (সা.)-কে , ‘আল্লাহ কোথায়?’ আল্লাহ উত্তর দিলেন সরাসরি নিজে, নবীজি (সা.)-এর মাধ্যমে নয় যে আমি তো কাছেই আছি (ফাইন্নি কারিব)। যেন তিনি বলছেন, আমাকে খুঁজতে দূরে যেতে হবে না, আমি এখানেই আছি।
হাদিসে কুদসিতে আছে, আল্লাহ বলেন, ‘আমি বান্দার সঙ্গে সেভাবেই থাকি, যেভাবে সে আমাকে ধারণা করে। সে যখন আমাকে স্মরণ করে, আমিও তাকে স্মরণ করি। সে যদি আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৪০৫)
একাকীত্ব তাই অভিশাপ নয়, এটা একটা সংকেত। আল্লাহর দিকে ফেরার সংকেত। মানুষের ভিড়ে যে শূন্যতা, সেটা মানুষ দিয়ে পূর্ণ হওয়ার নয়। যিনি আপনাকে বানিয়েছেন, শুধু তিনিই জানেন কোথায় আপনার শূন্যতা।
৩. মানুষ ছেড়ে যায়, তিনি যান না। আল্লাহ সুরা হাদিদে বলেন, ‘তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন তোমরা যেখানেই থাকো।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত: ৪)
এখানে বলা হয়েছে ‘যেখানেই থাকো’। পাহাড়ের চূড়ায়, সমুদ্রের গভীরে, রাতের অন্ধকার ঘরে, ভিড়ের মাঝে—কোনো ব্যতিক্রম নেই, সবখানে আল্লাহ আছেন। মানুষ বদলে যায়, সম্পর্ক ভাঙে, প্রিয়জন দূরে চলে যায়। কিন্তু এই সাহচর্য কখনো শেষ হয় না।
৪. মনের গভীরের কথাও তিনি জানেন। আল্লাহ সুরা কাফে আরও বলেন, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার মন যা কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি।’ (সুরা কাফ, আয়াত: ১৬)
মনের ভেতরে যে ফিসফিসানি, যে কথা কাউকে বলা হয়নি, যা ভাষায় আসে না, যা রাতের অন্ধকারে একা একা অনুভব করেন—আল্লাহ সেটাও জানেন। তাঁর কাছে কিছু গুছিয়ে বলার দরকার নেই, ভাষা খুঁজতে হবে না। শুধু মন খুলে দিন।
একটু থামুন
রাতের শেষ প্রহরে যখন ঘুম আসে না, যখন মনে হয় কেউ নেই, ঠিক তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই হাদিসটা মনে করুন। তিনি বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকছে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইছে, আমি তাকে দেব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইছে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)
রাতের সেই নিঝুম মুহূর্তে, আপনার একাকীত্বের সেই মুহূর্তটাই আসলে তাঁর সবচেয়ে কাছে যাওয়ার সুযোগ।
একাকীত্ব তাই অভিশাপ নয়, এটা একটা সংকেত। আল্লাহর দিকে ফেরার সংকেত। মানুষের ভিড়ে যে শূন্যতা, সেটা মানুষ দিয়ে পূর্ণ হওয়ার নয়। যিনি আপনাকে বানিয়েছেন, শুধু তিনিই জানেন কোথায় আপনার শূন্যতা।
মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।