পারমাণবিক দুর্ঘটনার পরেও বুনো প্রাণীরা চেরনোবিলে ফিরল কীভাবে

· Prothom Alo

প্রায় চল্লিশ বছর আগে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এই দুর্ঘটনার কারণে উত্তর ইউক্রেন ও দক্ষিণ-পূর্ব বেলারুশের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। এটি ছিল একটি বিরাট পরিবেশগত বিপর্যয়। তবে এই দুর্ঘটনার পর ওই এলাকায় মানুষের চলাফেরা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ না থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশের পরিত্যক্ত এলাকায় বন্য প্রাণীদের সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে বাড়তে শুরু করে। এমনকি সেখানে বেশ কিছু অত্যন্ত বিরল প্রজাতির প্রাণীও দেখা গেছে।

একটি নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ক্যামেরা ট্র্যাপ বা স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা ব্যবহার করেন। এই ক্যামেরার সাহায্যে তাঁরা চেরনোবিল এক্সক্লুশন জোন বা মানুষের জন্য নিষিদ্ধ এলাকার বন্য প্রাণীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর তাঁরা এই তথ্য পাশের ড্রেভলিয়ানস্কি নেচার রিজার্ভ ও কাছাকাছি থাকা অন্য সাধারণ বনাঞ্চলের বন্য প্রাণীদের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করে দেখেন। নতুন গবেষণাটি প্রসিডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

Visit newsbetting.bond for more information.

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের জন্য নিষিদ্ধ চেরনোবিল এলাকাতেই এখন সবচেয়ে বেশি বন্য প্রাণীর বাস। সেখানে প্রাণীদের প্রজাতির বৈচিত্র্য ও সংখ্যা অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে বেশি। বন্য প্রাণীর সংখ্যার দিক থেকে চেরনোবিলের পরেই রয়েছে নেচার রিজার্ভের স্থান। আর সবচেয়ে কম প্রাণী পাওয়া গেছে সাধারণ অরক্ষিত এলাকাগুলোতে।

চীনে খোঁজ মিলল নতুন ‘দুই মাথাওয়ালা’ সাপের

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, চেরনোবিলের এই পরিত্যক্ত এলাকাটি প্রজেওয়ালস্কির ঘোড়া, বনবিড়াল, মুস হরিণ, লাল হরিণ, র‍্যাকুন এবং বাদামি ভালুকের মতো বিরল প্রাণীদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে লাল শিয়ালের মতো যেসব সাধারণ প্রাণী যেকোনো পরিবেশে খুব সহজে মানিয়ে নিতে পারে, এরা আশা অনুযায়ী তেমন একটা ফিরে আসেনি।

এই গবেষণার প্রধান লেখক ও জার্মানির ফ্রেইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সভিতলানা কুড্রেঙ্কো একজন ইউক্রেনীয় পরিবেশবিদ। তিনি জানান, ‘আমি অবাক হয়েছি। সরকারিভাবে কঠোর সুরক্ষা থাকা বনাঞ্চল বা নেচার রিজার্ভের তুলনায় মানুষের জন্য নিষিদ্ধ চেরনোবিল এলাকায় বন্য প্রাণীর বৈচিত্র্য অনেক বেশি। আমি ভেবেছিলাম লাল শিয়ালের সংখ্যা চেরনোবিলে বেশি পাওয়া যাবে। কারণ, শিয়াল খুব দ্রুত যেকোনো পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।’

মুস হরিণ

গবেষণায় দেখা গেছে, লাল শিয়াল কোনো এলাকায় থাকবে কি থাকবে না, তা ওই এলাকার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে না। অর্থাৎ চেরনোবিলের রাস্তাঘাট থেকে দূরত্ব বা সেখানে মানুষের আনাগোনা আছে কি না, তার ওপর শিয়ালদের সংখ্যার কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়া এ ক্ষেত্রে একটি চমৎকার উদাহরণ। এই বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির বন্য ঘোড়া একসময় পৃথিবী থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৯০ সালের শেষের দিকে ইউক্রেনের কিছু বনাঞ্চলে এই ঘোড়াগুলোকে আবার নতুন করে ছেড়ে দেওয়া হয়। গবেষকদের স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরায় চেরনোবিলের নিষিদ্ধ এলাকায় এই ঘোড়াগুলো ১ হাজার বারের বেশি ধরা পড়েছে। অথচ চেরনোবিলের বাইরের অন্য কোনো এলাকায় এই ঘোড়ার একটিও দেখা মেলেনি।

পোকেমন গো গেমের ৩ হাজার কোটি ছবি দিয়ে কী শেখানো হচ্ছে এআই রোবটদের

গবেষক দলটি ধারণা করছে, চেরনোবিলে ঘটে যাওয়া একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই ঘোড়াগুলোর সংখ্যা আরও দ্রুত বেড়েছে। ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এই মাঠপর্যায়ের গবেষণাটি করা হয়। এর ঠিক আগেই চেরনোবিলের নিষিদ্ধ এলাকায় একটি ভয়াবহ দাবানল হয়েছিল। দাবানল শেষ হওয়ার পর বনের মাটিতে প্রচুর নতুন ও ঘন সবুজ ঘাস গজিয়ে ওঠে। এই কচি ঘাস খাওয়ার জন্যই প্রজেওয়ালস্কি ঘোড়াসহ অন্যান্য খুরওয়ালা প্রাণীরা চেরনোবিলের এই অঞ্চলের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল।

একইভাবে, চেরনোবিলের ভেতরে বেশ কয়েকটি ক্যামেরায় বাদামি ভালুকের ছবি ধরা পড়েছে। কিন্তু চেরনোবিলের বাইরে একটি ভালুকও দেখা যায় না। এ ছাড়া লাল হরিণের ছবি চেরনোবিলের ভেতর হাজার হাজারবার তোলা সম্ভব হলেও, সরকারিভাবে সুরক্ষিত বনাঞ্চলে তোলা গেছে মাত্র কয়েকশ বার। আর সাধারণ বনাঞ্চলে এই হরিণের একটি ছবিও তোলা যায়নি।

লাল শিয়ালের মতো যেসব সাধারণ প্রাণী যেকোনো পরিবেশে খুব সহজে মানিয়ে নিতে পারে, এরা আশা অনুযায়ী তেমন একটা ফিরে আসেনি

তাহলে চেরনোবিলের ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তার কী হলো? এই নতুন গবেষণায় তেজস্ক্রিয় দূষণের প্রভাব সরাসরি পরীক্ষা করা হয়নি। তবে গবেষক কুড্রেঙ্কো ২০১৬ সালের একটি পুরোনো গবেষণার কথা উল্লেখ করেছেন গবেষণাপত্রে। সেই গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, চেরনোবিলের নিষিদ্ধ এলাকায় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের বসবাসের ওপর তেজস্ক্রিয়তার মাত্রার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

এমনকি কিছু প্রাণী এই মারাত্মক পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে বলেও মনে হচ্ছে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চেরনোবিলের ধূসর নেকড়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় একধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনটি ক্যানসার আক্রান্ত যেসব মানুষ রেডিওথেরাপি নেন, তাঁদের শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার মতোই। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই নেকড়েদের শরীরে এমন কিছু প্রতিরক্ষামূলক জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটেছে, যা এদের ক্যানসারের হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করছে।

পারমাণবিক বিপর্যয় হলে কেন সূর্যমুখীর গাছ লাগানো হয়

চেরনোবিলের এই পরিস্থিতি বিজ্ঞানীদের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বন্য প্রাণী সংরক্ষণের এলাকাগুলো তখনই সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়, যখন সেগুলো প্রাণীদের স্বাধীনভাবে চলাচলের জন্য অনেক বড় হয়। বনের এলাকাগুলো আলাদা না থেকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকা জরুরি। একই সঙ্গে আইন কঠোরভাবে পালন করতে হবে, যাতে মানুষ কাগজে-কলমে নয় বরং সত্যি সত্যিই বনের ভেতরে ঢুকতে না পারে।

মানুষের জন্য নিষিদ্ধ চেরনোবিল এলাকাতেই এখন সবচেয়ে বেশি বন্য প্রাণীর বাস। সেখানে প্রাণীদের প্রজাতির বৈচিত্র্য ও সংখ্যা অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে বেশি

যুক্তরাজ্যের অ্যাসোসিয়েশন ফর স্টাডিং অ্যানিমেল বিহেভিয়ার এর অর্থায়নে এবং গবেষক স্ভিতলানা কুড্রেংকোর ক্যামেরা ট্র্যাপ প্রকল্পে চেরনোবিলের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে বুনো শূকরের উপস্থিতিও দেখা গেছে। গবেষক দলটির মতে, পরিস্থিতি যতই কঠিন বা বিপজ্জনক হোক না কেন, বন্য প্রাণীদের ওপর নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে যাওয়া খুবই প্রয়োজন।

বন্য প্রাণী সঠিকভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিখুঁত ও ধারাবাহিক গবেষণা অত্যন্ত জরুরি। বিপজ্জনক বা জটিল এলাকার ক্ষেত্রে গবেষণার নিয়ম সহজ করার একটি সাধারণ প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এমনটা করা একদমই ঠিক নয়, কারণ এতে পরে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই গবেষণা প্রমাণ করেছে, বিরল প্রজাতির প্রাণীদের দীর্ঘদিনের জন্য টিকিয়ে রাখতে হলে অনেক বড় সংরক্ষিত এলাকার কোনো বিকল্প নেই।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স‘এলিয়েন’ সিনেমার রহস্যময় পাহাড়ে পর্যটকেরা কেন ভিড় করেন

Read full story at source