৩৫০০ বছরের পুরোনো বিশ্বস্ত সঙ্গীই হারিয়ে গেল প্রযুক্তির ভিড়ে

· Prothom Alo

শহরের আকাশ, ব্যস্ত ফুটপাত, পুরোনো ভবনের কার্নিশ বা রেলস্টেশনের ছাদে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ানো কবুতরকে অনেকেই খুব সাধারণ পাখি হিসেবে বিবেচনা করেন। কেউ কেউ দেখে হয়তো বিরক্ত হন, কেউবা না দেখার ছলে পাশ কাটিয়ে চলে যান। কিন্তু হাজার বছরের ইতিহাস বলছে, একসময় এ পাখিই ছিল মানুষের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী।

Visit mchezo.life for more information.

বার্তা পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ রক্ষা, এমনকি খাদ্য ও সার উৎপাদন—মানুষের সভ্যতার নানা অধ্যায়ে কবুতর বা পায়রার ছিল গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি। শান্তির প্রতীক হিসেবেও পরিচিত পায়রা। নতুন এক গবেষণা সেই পুরোনো সম্পর্কের গল্পই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।

সম্প্রতি বিশ্ব প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক জার্নাল অ্যান্টিকুইটিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কবুতরকে মানুষ পুষতে শুরু করেছিল প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বছর আগে; অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে এদের সম্পর্কের ইতিহাস আগের ধারণার চেয়ে প্রায় হাজার বছর পুরোনো।

নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ো–আর্কিওলজিস্ট অ্যান্ডারসন কার্টার এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি গবেষণা প্রতিবেদনের মূল লেখকও।

অ্যান্ডারসন কার্টার বলেন, মানুষ খুব সম্প্রতি কবুতরের ভূমিকা ভুলে যেতে শুরু করেছে। অথচ উনিশ ও বিশ শতকেও কবুতর সমাজের এক উপকারী পাখি ছিল।

একসময় বার্তা পৌঁছে দেওয়া থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ রক্ষা, এমনকি খাদ্য ও কৃষকের সারে পায়রার ছিল গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি

কার্টার আরও বলেন, ‘যুদ্ধের সময় বার্তা আদান–প্রদানে কবুতরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরে অনেক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হলো—টেলিগ্রাফ আবিষ্কার হলো, তারপর টেলিফোন এল আর কবুতরের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল।’

এরপরও কবুতর মানুষের কাছছাড়া হয়নি। হাজার বছর ধরে মানুষের আশপাশে বসবাসে তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।

শিল্পবিপ্লবের পর যখন বড় বড় শহর গড়ে উঠতে থাকে, তখন কবুতরকে নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে শুরু করে। একসময়ের উপকারী পাখিটিই হয়ে ওঠে ‘নোংরা’, ‘রোগ ছড়ানো’ শহুরে উপদ্রবে। এখন অনেক ভবনের কার্নিশে কবুতরের আসা ঠেকাতে বসানো কাঁটা যেন সেই বদলে যাওয়া সম্পর্কেরই প্রতীক বলে মন্তব্য করেছেন কার্টার।

সাইপ্রাসে পাওয়া গেল প্রাচীন প্রমাণ

সাধারণ কবুতর অথবা রক ডাভ মূলত ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে এসেছে। জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আজকের শহুরে কবুতরগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বুনো পায়রার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।

নতুন এ গবেষণার জন্য ডাচ্ নেতৃত্বাধীন একদল বিজ্ঞানী দক্ষিণ–পূর্ব সাইপ্রাসের লারনাকা লবণ হ্রদের তীরে অবস্থিত ‘হালা সুলতান টেক্কে’ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে যান। সেখানে পাওয়া ১৫৯টি প্রাচীন পায়রার হাড় বিশ্লেষণ করেন তাঁরা।

শান্তির প্রতীকও পায়রা

গবেষকেরা জানতে চেয়েছেন, এ পাখিগুলো কী খেত, কীভাবে বাঁচত ও কীভাবে মারা যেত। এ ছাড়া মানুষের কোনো হস্তক্ষেপের চিহ্ন, যেমন কাটার দাগ পর্যবেক্ষণ করেছেন গবেষকেরা।

বায়োমেট্রিক ও আইসোটোপিক বিশ্লেষণে জানা গেছে, কবুতরগুলো খ্রিষ্টপূর্ব তেরো ও চৌদ্দ শতকে; অর্থাৎ ব্রোঞ্জ যুগে বাস করত।

হাড়ের কোলাজেন বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নাইট্রোজেন ও কার্বনের অনুপাত পরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, কবুতরগুলোর খাদ্যাভ্যাস ছিল কোনো প্রাণীর খাদ্যাভ্যাসের মতোই। এরপর ফলাফলগুলো একই সময়ের সাইপ্রাসের মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর নমুনার সঙ্গে তুলনা করা হয়।

কার্টার বলেন, ‘হালা সুলতান টেক্কের’ কবুতরগুলোর ফলাফল ব্রোঞ্জ যুগের অন্যান্য সাইপ্রিয়ট স্থানের মানুষের ফলাফলের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে মিলে গেছে। এতে বোঝা যায়, তারা সম্ভবত মানুষের মতোই খাবার খেত।’ অর্থাৎ, কবুতরগুলো বাইরে মাঠে চরে বেড়িয়ে নিজেরা খাবার খুঁজে নিত না, বরং মানুষ তাদের নিজেদের খাবার থেকে খাইয়েছে, যেমন শস্য, ডাল বা রান্না করা খাবার দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে, ওই কবুতরগুলো গৃহপালিত ছিল এবং মানুষ সচেতনভাবে তাদের লালন-পালন করত—সম্ভবত খাদ্য হিসেবে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে।

রয়্যাল নেদারল্যান্ডস ইনস্টিটিউট অব সি রিসার্চের জ্যেষ্ঠ গবেষক ও গবেষণা প্রতিবেদনের সহলেখক কানান চাকিরলার বলেন, খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১৪০০ সালের দিকেই (আজ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বছর আগে) কবুতর গৃহপালিত হয়ে উঠেছিল, কিংবা সেই পথে এগোচ্ছিল।

মানুষ অতিসম্প্রতি কবুতরের ভূমিকা ভুলে যেতে শুরু করেছে

এর আগে ধারণা করা হতো, কবুতর গৃহপালনের ইতিহাস শুরু হয়েছিল আরও প্রায় এক হাজার বছর পরে। এ ধারণার পেছনে আছে গ্রিসে আবিষ্কৃত বিশাল পাথরের কাঠামো, যা কবুতরের বাসা বা ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এটি খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দের (প্রায় ২ হাজার ৩০০ বছর আগে) তৈরি বলে প্রমাণিত হয়েছিল। মনে করা হতো, মানুষ তখনই প্রথম কবুতর লালন-পালন করা শুরু করে।

গবেষকেরা বলছেন, এ পাখির ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে মানুষের ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে। কার্টার বলছেন, ‘তাদের গল্প আসলে আমাদেরই গল্প।’

Read full story at source