কম পানির মাছ বেশি পানিতে গেলে লাফায় কেন

· Prothom Alo

কম পানির মাছকে হঠাৎ বেশি পানিতে ছাড়লে অনেক সময় দেখা যায়, এরা লাফাতে থাকে। তখন এরা ছটফট করে, এদিক–ওদিক দ্রুত সাঁতার কাটে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এরা যেন নতুন জায়গায় এসে হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। কিন্তু ভেতরের কারণটা অনেক জটিল।

মাছের জীবন পুরোপুরি পানির ওপর নির্ভর করে। আবার পানি শুধু তরল নয়, এর ভেতরে পুরো একটা পরিবেশ লুকিয়ে আছে। এখানে আছে অক্সিজেন, খনিজ লবণ, তাপমাত্রা, পানির চাপ, প্রবাহের ধরন ইত্যাদি। সব মিলিয়ে পানিতে মাছের জন্য ‘স্বাভাবিক জোন’ তৈরি হয়।

Visit afsport.lat for more information.

একটা ছোট ডোবা বা অগভীর পুকুরের মাছ যখন হঠাৎ বড় পানিতে যায়, তখন এর চারপাশের পরিবেশের প্রায় সব বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বদলে যায়। আর এই পরিবর্তনই শুরু করে মাছের শরীরের ভেতরের প্রতিক্রিয়া।

পানির চাপের পার্থক্য

পানির গভীরতা বাড়ার সঙ্গে চাপও বাড়ে। একে বলে হাইড্রোস্ট্যাটিক প্রেশার। গভীর পানিতে এই চাপ অগভীর পানির তুলনায় বেশি।

অগভীর পানিতে থাকা মাছ এই বাড়তি চাপের সঙ্গে অভ্যস্ত থাকে না। হঠাৎ চাপ পরিবর্তন হলে এর শরীরের সেন্সরি সিস্টেম, বিশেষ করে ল্যাটারাল লাইন সিস্টেম পানির এই নতুন চাপ ও প্রবাহকে অস্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয়। তখনই শুরু হয় দ্রুত নড়াচড়া বা লাফানোর মতো আচরণ।

পাপুয়া নিউগিনিতে সামুদ্রিক প্রাণীর রহস্যময় মৃত্যু, মাছ ধরায় সতর্কতা

অক্সিজেনের বণ্টন

পানিতে অক্সিজেন সব জায়গায় সমানভাবে ছড়ানো থাকে না। অগভীর ও স্থির পানিতে অক্সিজেন অনেক সময় ভিন্নভাবে থাকে। আবার গভীর পানিতে স্তরভিত্তিকভাবে ভাগ হয়।

মাছের ফুলকা এই নতুন অক্সিজেন গ্রহণের প্যাটার্নের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় নেয়। সেই সময় শরীর দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বাড়ায়। আর বাইরে থেকে সেটা দেখা যায় অস্থিরভাবে সাঁতার কাটা বা লাফানোর মতো আচরণ হিসেবে।

অসমোসিস ও শরীরের ভারসাম্য

মাছের শরীর সব সময় পানির সঙ্গে লবণ ও তরলের ভারসাম্য বজায় রাখে। এই প্রক্রিয়াকে বলে অসমোরেগুলেশন।

নতুন পানিতে গেলে খনিজ লবণের ঘনত্ব আগের জায়গার চেয়ে আলাদা হতে পারে। তখন মাছের শরীরের কোষ দ্রুত সেই ভারসাম্য ঠিক করার চেষ্টা করে। এই ভেতরের মেটাবলিক চাপ সরাসরি দেখা যায় না, কিন্তু আচরণে এর প্রভাব পড়ে। তখন দ্রুত সাঁতার, দিক পরিবর্তন বা লাফানোর মতো ঘটনা ঘটে।

সেন্সরি ওরিয়েন্টেশন সমস্যা

মাছ পানির ভেতরে দিক ও পরিবেশ বোঝে ল্যাটারাল লাইন সিস্টেম দিয়ে। এটা পানির কম্পন ও প্রবাহ শনাক্ত করে।

ছোট জায়গার মাছ হঠাৎ বড় পানিতে গেলে পানির প্রবাহ অনেক বেশি জটিল হয়ে যায়। চারপাশ থেকে একসঙ্গে অনেক ধরনের সংকেত আসে। এই তথ্য একসঙ্গে প্রসেস করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন মাছ বারবার দিক বদলায়, দ্রুত নড়ে, যেন চারপাশটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

কেন কিছু মাছ নিজের বাচ্চাকে খেয়ে ফেলে

স্ট্রেস হরমোনের ভূমিকা

হঠাৎ পরিবেশ বদলালে মাছের শরীরে ‘কর্টিসল’ নামের স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। এটা মাছের ফাইট অর ফ্লাইট সিস্টেমকে সক্রিয় করে।

এই হরমোন বাড়লে হার্ট রেট ও শ্বাসপ্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়, মাংসপেশিও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে বাইরের আচরণ হয় অস্থিরভাবে সাঁতার কাটা বা লাফানোর মতো।

সব লাফানো কি এক রকম

না, সব সময় নয়। কিছু ক্ষেত্রে মাছ নতুন জায়গায় এসে বেশি জায়গা পাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই বেশি সাঁতার কাটে। এটা তখন স্ট্রেস নয়; বরং নতুন পরিবেশ বোঝার চেষ্টা হিসেবে এটা করে। কিন্তু শুরুতে যে তীব্র অস্থিরতা দেখা যায়, সেটা মূলত শরীরের অভিযোজনের প্রথম ধাপ।

সব মাছের আচরণ এক রকম নয়

কই, শিং ও মাগুরের মতো মাছ তুলনামূলকভাবে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখায়। এরা পরিবেশ পরিবর্তনে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়। আবার কিছু কার্প–জাতীয় মাছ ধীরে মানিয়ে নেয়, কম লাফায়, কিন্তু স্থির হতে সময় নেয় বেশি।

এই পুরো ঘটনাটা আসলে একসঙ্গে কাজ করা কয়েকটি জৈবিক ও ভৌত প্রক্রিয়ার ফল। পানির চাপ, অক্সিজেনের বণ্টন, লবণ ভারসাম্য, সেন্সরি ইনপুট আর স্ট্রেস হরমোন—সব মিলিয়ে মাছের এই অস্থির আচরণ তৈরি হয়।

তথ্যসূত্র: হিউম্যান ওয়ার্ল্ড ফর অ্যানিমেলসছোট যে মাছ মৃত্যুর কারণ হতে পারে

Read full story at source