প্যারাডক্স লস্ট

· Prothom Alo

এই বাক্যের ঠিক পরের পূর্ণচ্ছেদ পর্যন্ত যা যা লেখা আছে, তার সবই ডাহা মিথ্যা কথা। তার মানে, কথাগুলো মিথ্যা নয়। না না, আগেই তো বলা হয়েছে, কথাগুলো মিথ্যা। তাহলে? এ তো মহা গন্ডগোল!

Visit een-wit.pl for more information.

প্রাচীন গ্রিকদেরও এই লায়ার প্যারাডক্স বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল। আজও এই ধাঁধা আমাদের মাথায় প্যাঁচ লাগিয়ে দেয়। এর পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, দুনিয়ার কিছু বিখ্যাত প্যারাডক্স একটু গভীরে গিয়ে চিন্তা করলেই আর ধোপে টেকে না।

গণিতের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও মাথা-ঘোরানো সমস্যাগুলো লুকিয়ে আছে যুক্তি বা লজিকের জগতে। দেখতে এগুলোকে খুব সহজ-সরল মনে হলেও, আসলে পরতে পরতে ফাঁদ পাতা আছে। গাণিতিক যুক্তিশাস্ত্রের সবচেয়ে বড় জুজু হলো সহজ অথচ বিভ্রান্তিকর সব প্যারাডক্সের অস্তিত্ব। প্যারাডক্স মানে এমন কিছু, যা দেখতে সত্যি মনে হলেও আসলে মিথ্যা, অথবা মিথ্যা মনে হলেও আসলে সত্যি।

যেমন ওপরের লায়ার প্যারাডক্সের কথাটাই ধরা যাক। ধরুন, আমি একটা কাগজে লিখলাম—এই বাক্যটি মিথ্যা। এখন প্রশ্ন হলো, বাক্যটি কি সত্য, নাকি মিথ্যা?

যদি বলেন বাক্যটি সত্য, তাহলে এর ভেতরের কথাও সত্য হতে হবে। আর ভেতরে কী লেখা? ‘এই বাক্যটি মিথ্যা।’ অর্থাৎ বাক্যটি মিথ্যা! আবার যদি বলেন বাক্যটি মিথ্যা, তাহলে ভেতরের কথাটি ভুল। অর্থাৎ ‘এই বাক্যটি মিথ্যা’—এই কথাটি ভুল। তাই বাক্যটি আসলে সত্য! অর্থাৎ, আপনি যেদিকেই যান, একটা গোলকধাঁধায় আটকে যাচ্ছেন। সত্য বললে মিথ্যা হয়, মিথ্যা বললে সত্য।

তোমার অর্ধেক আমার অর্ধেকের চেয়ে বড়!
গণিতের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও মাথা-ঘোরানো সমস্যাগুলো লুকিয়ে আছে যুক্তি বা লজিকের জগতে। দেখতে এগুলোকে খুব সহজ-সরল মনে হলেও, আসলে পরতে পরতে ফাঁদ পাতা আছে।

এই ধাঁধাকেই বলে লায়ার প্যারাডক্স। এটার সবচেয়ে পুরোনো রূপ ছিল এমন: ‘আমি মিথ্যা বলছি।’ যদি লোকটি সত্যি কথা বলে, তাহলে সে মিথ্যা বলছে। আর যদি মিথ্যা বলে, তাহলে সে সত্যি কথা বলছে! এই ধরনের কূটাভাস দার্শনিক, গণিতবিদ এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানীদের অনেক ভাবিয়েছে। কারণ এটি দেখায়, ভাষা ও যুক্তির নিয়ম ব্যবহার করেও কখনো কখনো এমন বাক্য তৈরি করা যায়, যার সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আবার অনেকেই মনে করেন, একুশ শতক শুরু হয়েছিল ২০০০ সালে। কথাটা শুনতে ঠিক মনে হলেও, এটি আসলে ভুল। কারণ, প্রথম শতক শুরু হয়েছিল ১ সালে, ০ সালে নয়। কেননা ০ সাল বলে কোনো সালই ছিল না। এখন এর সঙ্গে ২০০০ যোগ করুন, দেখবেন একুশ শতক আসলে ২০০১ সালে শুরু হয়েছিল। আর ঠিক এ কারণেই বিখ্যাত সাই-ফাই মুভিটির নাম ২০০০: আ স্পেস ওডিসি না রেখে ২০০১: আ স্পেস ওডিসি রাখা হয়েছিল।

আরেকটি মজার গাণিতিক ঘটনা আছে, যার নাম বানাক-তারস্কি প্যারাডক্স। এই প্যারাডক্স অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট মাপের নিরেট গোলককে যদি নির্দিষ্ট সংখ্যক টুকরো করে কাটা হয়, তবে সেই টুকরোগুলো দিয়ে আবার ওই একই মাপের দুটি নিরেট গোলক বানানো সম্ভব! শুনতে তো ডাহা মিথ্যা মনে হয়। কারণ আয়তন তো আর বেড়ে যেতে পারে না! কিন্তু ঘটনা হলো, এই টুকরোগুলো এতই জটিল গাণিতিক আকারের হয় যে, তাদের কোনো নির্দিষ্ট আয়তন থাকে না। যাহোক, আসল কথায় ফেরা যাক।

গণিতের দৃষ্টিতে এগুলোকে বেশ দুর্বল প্যারাডক্স বলা যায়। এগুলো হয়তো কোনো বিষয়ে আমাদের আগের ধারণা পাল্টাতে বাধ্য করে, কিন্তু আমাদের চিন্তার ধরন পাল্টাতে বাধ্য করে না। সবচেয়ে গভীর ও প্যাঁচানো প্যারাডক্সগুলো হলো সেই সব বাক্য, যেগুলো নিজেরাই নিজেদের কথার বিরোধিতা করে।

গড়ের গোলকধাঁধা: লটারি, কয়েন ও মহাকাশে হারিয়ে যাওয়া
বানাক-তারস্কি প্যারাডক্স অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট মাপের নিরেট গোলককে যদি নির্দিষ্ট সংখ্যক টুকরো করে কাটা হয়, তবে সেই টুকরোগুলো দিয়ে আবার ওই একই মাপের দুটি নিরেট গোলক বানানো সম্ভব!

এর সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হলো: ‘এই বাক্যটি মিথ্যা।’ একবার ভাবুন তো, বাক্যটি যদি সত্যি হয়, তবে সে আমাদের বলছে যে সে আসলে মিথ্যা। আবার বাক্যটি যদি মিথ্যা হয়, তবে সে বলছে যে সে আসলে সত্যি! মাথা ঘোরার মতোই ব্যাপার, তাই না?

এ ধরনের প্যারাডক্স গাণিতিক যুক্তিবিদদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল, তারা কী নিয়ে কথা বলছে এবং সেটা দিয়ে কী কী করা সম্ভব, সে ব্যাপারে তাঁদের আরও অনেক সতর্ক হতে হবে। বারট্রান্ড রাসেলের নাপিতের প্যারাডক্স এর একটি বড় উদাহরণ।

ধরুন, কোনো এক গ্রামে এমন একজন নাপিত আছেন, যিনি গ্রামের সেই সব মানুষকেই দাড়ি কামিয়ে দেন, যারা নিজেরা নিজেদের দাড়ি কামাতে পারে না। এখন প্রশ্ন হলো, ওই নাপিতের দাড়ি কে কামিয়ে দেয়? বাস্তব জগতে এই ধাঁধা থেকে পালানোর অনেক উপায় আছে। যেমন, আমরা কি এখানে দাড়ি কামানোর কথা বলছি, নাকি হাত-পায়ের লোম কামানোর কথা বলছি? নাপিত কি কোনো নারী? এমন অদ্ভুত নাপিতের কি আদৌ কোনো অস্তিত্ব থাকা সম্ভব?

কিন্তু গণিতের দুনিয়ায় প্যারাডক্স থেকে এভাবে সহজে পালানোর কোনো সুযোগ নেই। রাসেলের এই প্যারাডক্সের আরেকটু সতর্ক ও গাণিতিক রূপ গটলব ফ্রেগের সারা জীবনের কাজকে রীতিমতো ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। ফ্রেগে ভেবেছিলেন, তিনি সেটের কিছু যৌক্তিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে পুরো গণিতশাস্ত্রকে দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন।

তরমুজ বিক্রির ২৫০ টাকা গেল কোথায়
অন্যদিকে, যদি X নিজের ভেতরে না থাকে, তবে সে তার বৈশিষ্ট্য পূরণ করছে। ফলে, তাকে নিজের ভেতরেই থাকতে হবে। অর্থাৎ, X নিজের ভেতরে আছে, আবার নেই! আবার সেই গন্ডগোল!

সেট মানে কিছু বস্তুর সংগ্রহ। যেমন, ০ থেকে ১০ পর্যন্ত জোড় সংখ্যাগুলোর সেটে কেবল ০, ২, ৪, ৬, ৮ এবং ১০ থাকবে, অন্য কিছু নয়। ফ্রেগে ধরে নিয়েছিলেন, গণিতের যেকোনো অর্থবোধক বৈশিষ্ট্যই একটি সেট তৈরি করতে পারে। কিন্তু রাসেল তাঁকে একটা অদ্ভুত সেটের কথা ভাবতে বললেন। ধরা যাক, এক্স (X) হলো এমন একটি সেট, যা সেই সব সেটের সমন্বয়ে গঠিত, যারা নিজেরাই নিজেদের ভেতর থাকে না।

শুনতে বেশ যৌক্তিক মনে হচ্ছে, তাই না? কিছু সেট (যেমন: দুনিয়ার সব সেটের সেট) নিজেরাই নিজেদের ভেতর থাকে। আবার আগে বলা জোড় সংখ্যার সেটের মতো কিছু সেট নিজেদের ভেতর থাকে না। কারণ, ওই সেটটি তো আর ০ থেকে ১০-এর ভেতরের কোনো জোড় সংখ্যা নয়, সেটি কেবল একটি সেট।

রাসেল তখন মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, এক্স (X) সেটটি কি নিজের ভেতরে আছে?’ যদি X নিজের ভেতরে থাকে, তবে তার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সে নিজেকে নিজের ভেতরে রাখতে পারবে না। অর্থাৎ, X নিজের ভেতরে নেই। অন্যদিকে, যদি X নিজের ভেতরে না থাকে, তবে সে তার বৈশিষ্ট্য পূরণ করছে। ফলে, তাকে নিজের ভেতরেই থাকতে হবে। অর্থাৎ, X নিজের ভেতরে আছে, আবার নেই! আবার সেই গন্ডগোল!

গণিত ও যুক্তিশাস্ত্রের বইপত্রে এমন অনেক প্যারাডক্স ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এর মধ্যে কিছু প্যারাডক্স সত্যিই মানুষের যুক্তির সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আবার মজার ছলে তৈরি করা কিছু প্যারাডক্স একটু যুক্তি দিয়ে ভাবলেই চুপসে যায়। এগুলোকেই মজা করে বলা যায় প্যারাডক্স লস্ট। এখানে এখন এমন কয়েকটি প্যারাডক্স নিয়ে মতামত দেওয়া হবে। আপনি চাইলে দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন, তাতে অবশ্য কোনো সমস্যা নেই!

টাকা দ্বিগুণ করার জাদুকরী সংখ্যা
আবার আগে বলা জোড় সংখ্যার সেটের মতো কিছু সেট নিজেদের ভেতর থাকে না। কারণ, ওই সেটটি তো আর ০ থেকে ১০-এর ভেতরের কোনো জোড় সংখ্যা নয়, সেটি কেবল একটি সেট।

প্রথম প্যারাডক্সটি প্রাচীন গ্রিসের প্রোটোগোরাস নামে এক আইনজীবীকে নিয়ে। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে তিনি আইন শেখাতেন। তাঁর একজন ছাত্র ছিল। দুজনের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল, ছাত্রটি তার জীবনের প্রথম মামলা জেতার পরই প্রোটোগোরাসকে শিক্ষাদানের ফি দেবে।

কিন্তু ছাত্রটি কোনো মক্কেলই পাচ্ছিল না। এদিকে রেগেমেগে প্রোটোগোরাস একদিন ছাত্রের বিরুদ্ধেই আদালতে মামলা ঠুকে দিলেন! প্রোটোগোরাসের হিসাব ছিল সোজা; আদালত যদি তাঁর পক্ষে রায় দেয়, তবে ছাত্রকে টাকা দিতে হবে। আর যদি তিনি হেরে যান, তবে ছাত্র চুক্তি অনুযায়ী তার প্রথম মামলাটি জিতবে, ফলে চুক্তির শর্ত মেনেই তাকে টাকা দিতে হবে। অর্থাৎ, দুই দিক থেকেই প্রোটোগোরাস টাকা পাচ্ছেন!

অন্যদিকে ছাত্রটির যুক্তিও ছিল ঠিক উল্টো; প্রোটোগোরাস যদি জেতেন, তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী (যেহেতু ছাত্রটি প্রথম মামলা হারল) তাকে কোনো টাকা দিতে হবে না। আর প্রোটোগোরাস যদি হেরে যান, তবে আদালতের রায় অনুযায়ীই তাকে কোনো টাকা দিতে হবে না!

পুরো ব্যাপারটাই খুব মজার। কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বুঝবেন, এই প্যারাডক্স মোটেও ধোপে টেকে না। কারণ, দুই পক্ষই নিজেদের সুবিধামতো একবার চুক্তিকে বড় করে দেখছে, আবার পরের মুহূর্তেই চুক্তির চেয়ে আদালতের রায়কে বড় করে দেখছে! মানুষ আদালতে যায় কেন? কারণ, চুক্তিতে কোনো ঝামেলা থাকলে আদালতই তা সমাধান করে দেয় বা চুক্তির ওপরে গিয়ে চূড়ান্ত রায় দেয়। তাই আদালত যদি বলে ছাত্রকে টাকা দিতে হবে, তবে তাকে দিতেই হবে। আর আদালত যদি বলে টাকা দিতে হবে না, তবে প্রোটোগোরাসের আর কিছুই করার থাকবে না। আইনের চোখে আদালতের রায় চুক্তির চেয়ে অনেক বড়। কাজেই, এটি একটি পরাজিত প্যারাডক্স বা প্যারাডক্স লস্ট।

জুতার ফিতা বাঁধার জ্যামিতি!
প্রোটোগোরাস যদি জেতেন, তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাকে কোনো টাকা দিতে হবে না। আর প্রোটোগোরাস যদি হেরে যান, তবে আদালতের রায় অনুযায়ীই তাকে কোনো টাকা দিতে হবে না!

এর চেয়ে অনেক গভীর একটি প্যারাডক্স হলো ১৯০৫ সালের জুলস রিচার্ড প্যারাডক্স। ফরাসি এই যুক্তিবিদের প্যারাডক্সের একটি রূপ এমন—ইংরেজি ভাষার কিছু বাক্য ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যা প্রকাশ করতে পারে, আবার কিছু বাক্য পারে না। যেমন, ‘The year of the Declaration of Independence’। এই বাক্যের বাংলা করলে হয়, ‘আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার বছর’। এই বাক্যটি ১৭৭৬ সংখ্যাটিকে প্রকাশ করে। কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণার ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা বললে তা কোনো সংখ্যা প্রকাশ করে না।

এখন এই বাক্যটির কথা ভাবুন তো: ‘দ্য স্মলেস্ট নাম্বার দ্যাট ক্যাননট বি ডিফাইন্ড বাই আ সেন্টেন্স ইন দ্য ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ কনটেইনিং ফিউয়ার দ্যান টোয়েন্টি ওয়ার্ডস’। মানে ‘ইংরেজি ভাষায় ২০টির কম শব্দের কোনো বাক্য দিয়ে প্রকাশ করা যায় না, এমন সবচেয়ে ছোট সংখ্যা।’ মজার ব্যাপার হলো, এই অদ্ভুত সংখ্যাটি যাই হোক না কেন, আমরা কিন্তু ঠিক ১৯টি শব্দের একটি ইংরেজি বাক্য দিয়েই সেটিকে প্রকাশ করে ফেলেছি! অর্থাৎ, আবার সেই গন্ডগোল!

এই প্যারাডক্স থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো এটা ধরে নেওয়া যে, এই বাক্যটি আসলে কোনো সংখ্যাকেই প্রকাশ করছে না। কিন্তু গাণিতিক যুক্তিতে তো তার কোনো একটি সংখ্যা প্রকাশ করার কথা! ইংরেজি ভাষায় যদি একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক শব্দ থাকে, তবে ২০টির কম শব্দের বাক্যের সংখ্যাও নির্দিষ্ট। এর মধ্যে অনেক বাক্য হয়তো কোনো অর্থ প্রকাশ করবে না, আবার অনেক অর্থবোধক বাক্য হয়তো কোনো সংখ্যা প্রকাশ করবে না। সব বাদ দেওয়ার পর যে কয়েকটি বাক্য অবশিষ্ট থাকবে, তারা একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যার সেট তৈরি করবে। গণিতের নিয়ম অনুযায়ী, এমন একটি সেটের বাইরে থাকা সবচেয়ে ছোট ধনাত্মক পূর্ণসংখ্যাটির অস্তিত্ব অবশ্যই থাকবে।

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হলো, এই বাক্যটি আসলে কোনো সংখ্যাই প্রকাশ করছে না। এর অস্তিত্বই যৌক্তিকভাবে সাংঘর্ষিক। রিচার্ডের এই প্যারাডক্স আমাদের একটা গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়; কেবল ভাষার গঠনের দিকে তাকিয়ে কোনো গাণিতিক বাক্যের অর্থ বা যৌক্তিকতা যাচাই করা সব সময় সম্ভব নয়। তাই এটিকে লস্ট প্যারাডক্স বলা যায় না।

যোগফল বের করার জাদুকরী শর্টকাট
বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পরীক্ষা না হলে সবাই বুঝে যাবে যে শুক্রবারেই পরীক্ষা হবে, ফলে আর কোনো সারপ্রাইজ থাকবে না। শুক্রবার বাতিল হওয়ার পর সপ্তাহের বাকি রইল চার দিন।

এবার একটু মজার একটা প্যারাডক্স নিয়ে কথা বলি। এর নাম সারপ্রাইজ টেস্ট প্যারাডক্স। শিক্ষক ক্লাসে এসে ঘোষণা দিলেন, আগামী সপ্তাহে (সোম থেকে শুক্রবারের মধ্যে) যেকোনো দিন তিনি একটি পরীক্ষা নেবেন। সেটি হবে একদম হঠাৎ করে, মানে কাউকে কিছু না জানিয়ে।

শিক্ষার্থীদের মাথায় তখন অন্য হিসাব। তারা ভাবল, পরীক্ষাটি কোনোভাবেই শুক্রবার হতে পারে না। কারণ, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পরীক্ষা না হলে সবাই বুঝে যাবে যে শুক্রবারেই পরীক্ষা হবে, ফলে আর কোনো সারপ্রাইজ থাকবে না। শুক্রবার বাতিল হওয়ার পর সপ্তাহের বাকি রইল চার দিন। ঠিক একই যুক্তিতে বৃহস্পতিবারও পরীক্ষা হতে পারে না, কারণ বুধবারে পরীক্ষা না হলে সবাই বৃহস্পতিবারের কথা জেনে যাবে। এভাবে পেছনের দিকে হিসাব করতে করতে বুধবার, মঙ্গলবার এবং সোমবারও বাতিল হয়ে যায়। ফলে সারপ্রাইজ টেস্ট নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়!

কিন্তু শিক্ষক যদি সত্যিই বুধবার পরীক্ষা নেন, তবে শিক্ষার্থীদের আগে থেকে তা জানার কোনো উপায়ই ছিল না। তাহলে যুক্তিতে কোথায় গলদ হলো?

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটি আসলে কোনো প্যারাডক্সই নয়; এটি নিছকই একটি চাতুরী। শিক্ষার্থীরা আসলে প্রতিদিন সকালে উঠে নিজেদের বোঝাচ্ছে, ‘আজই পরীক্ষা হবে!’ আর যেদিন সত্যিই পরীক্ষা হবে, সেদিন তারা লাফিয়ে উঠে বলবে, ‘আমরা তো জানতামই আজ পরীক্ষা হবে, এতে আর সারপ্রাইজের কী আছে!’

গণিত শিখলে কেন অন্য বিষয়েও ভালো করা যায়
আপনি যদি পাঁচটি বাক্স একে একে খোলার সুযোগ পান আর পঞ্চম বাক্সে গিয়ে বলেন, ‘আমি তো জানতামই যে এই বাক্সে টাকা আছে!’ তাহলে তো আর চমকে যাওয়ার কিছু নেই।

পুরো ব্যাপারটা নির্ভর করছে সারপ্রাইজ শব্দটার অর্থের ওপর। শিক্ষক যদি একটু নিয়ম পাল্টে দেন, তবেই এই প্যারাডক্স ধসে পড়বে। ধরুন, শিক্ষক বললেন, প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীদের বলতে হবে যে আজ পরীক্ষা হবে কি না। তারা যদি একবারই বলার সুযোগ পায়, তবে তারা কখনোই শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে না। কারণ পরীক্ষা তো সোম বা মঙ্গলবারেও হয়ে যেতে পারে!

আরেকটু সহজ করে বলি। ধরুন, আপনার সামনে পাঁচটি বাক্স রাখা আছে। এর যেকোনো একটিতে অনেক টাকা আছে। আপনাকে শুধু একবার অনুমান করে বলতে হবে কোন বাক্সে টাকা আছে। আপনি যদি প্রথমবারেই সঠিক বাক্সটা বলে দিতে পারেন, তবে আমি সত্যিই অবাক হব। কিন্তু আপনি যদি পাঁচটি বাক্স একে একে খোলার সুযোগ পান আর পঞ্চম বাক্সে গিয়ে বলেন, ‘আমি তো জানতামই যে এই বাক্সে টাকা আছে!’ তাহলে তো আর চমকে যাওয়ার কিছু নেই। সারপ্রাইজ টেস্টের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা ঠিক এই চাতুরীটাই করছে।

আরেকটি মজার যুক্তি দিই। ধরুন, শিক্ষার্থীদের স্মৃতিশক্তি খুব দুর্বল। তারা আজ রাতে যা পড়বে, কাল রাতে তা সব ভুলে যাবে। তারা যদি সত্যিই নিশ্চিত হয় যে পরীক্ষা কোনো সারপ্রাইজ নয়, তবে তাদের তো কোনো পড়াশোনা করারই দরকার নেই! যেদিন পরীক্ষা হবে, ঠিক তার আগের রাতে পড়লেই তো হয়! কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সোমবার পরীক্ষা হবে কি না তা না জানার কারণে রোববার রাতেও তাদের পড়তে হবে, আবার মঙ্গলবার পরীক্ষা হতে পারে ভেবে সোমবার রাতেও পড়তে হবে! এভাবে সারা সপ্তাহ জুড়েই তাদের ভয়ে ভয়ে পড়াশোনা করতে হবে।

তাহলে আর কিসের সারপ্রাইজ হলো! এটাও বরং একটা লস্ট প্যারাডক্স!

সূত্র: হাউ টু কাট আ কেক অবলম্বনেমজার গণিতযে গণিত জানলে ডিকশনারির যেকোনো শব্দ বলে দেওয়া যাবে

Read full story at source