হলুদ বিল্ডিং আর লাল ছেলেবেলা
· Prothom Alo

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়—সব জায়গায় এসে আমার মনে হলো, বেশির ভাগ মানুষের সঙ্গে চিন্তাভাবনায়, গান-সিনেমার পছন্দে আমার একটা বড় পার্থক্য রয়েছে; তা আমি যতই ঢাকার ভালো স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করি না কেন। যখন ভাবলাম এই পার্থক্য কেন, তখন দেখলাম, তাদের শৈশবের সঙ্গে আমার শৈশবের বিস্তর ফারাক। তাদের জীবনজুড়ে ছিল রঙিন ঢাকা শহর, কার্টুন নেটওয়ার্ক চ্যানেল আর বলিউডের ‘কুচ কুচ হোতা হ্যায়’। এর একটিরও উপস্থিতি আমার শৈশবে নেই।
Visit sportnewz.click for more information.
আমার শৈশব মানে ভোলা থানা কোয়ার্টার। থানা কোয়ার্টার মানে থানা, থানা-সংলগ্ন কোয়ার্টার, থানার পুকুর, মসজিদ—সব মিলিয়ে বিশাল এক জায়গা। এই জায়গার তিন-চারটা বাসা, মানে কোয়ার্টার, বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা। বাউন্ডারির মেইন গেট থেকে তিনটা রাস্তা তিন বাসার দিকে চলে গেছে। এই রাস্তায় চালাতে চালাতে তিনটা সাইকেল নষ্ট করে ফেলেছি।
দুপুর সাড়ে ১২টায় একটা খেলার সময় ছিল। মধ্যদুপুরে চারদিকে একটা নীরবতা থাকে। সুনসান মাঠে আমরা ছোটরা কয়েকজন মিলে, কখনো আবার আমি একাই পেছনের জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতাম। রোদে মুখ পুড়িয়ে বাসায় ফিরতাম।
প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]
বিকেল চারটা বাজতেই দুজন–তিনজন করে সব বাচ্চা নেমে আসত। ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ুয়া আমার ভাইয়া, পাশের বাসার রবিন ভাইয়া, তুনান ভাইয়া, আমি, রিচি, অন্তি আপু, শিমু আপু—সবাই নেমে আসতাম। ভাইয়ারা ওদের খেলা খেলতে খেলতে বিরক্ত হয়ে গেলে আমাদের সঙ্গে এসে ‘ইচিং বিচিং’ খেলত।
আম্মুরা নিচে নেমে গল্প করত। মাগরিবের আজান দিলে যার যার আম্মু বাসায় যাওয়ার জন্য তাড়া দিত। এই ‘আর পাঁচ মিনিট’, ‘আর এক মিনিট’, ‘একটা দৌড় দিয়ে আসি’, ‘লাস্ট একবার মাঠে দৌড় দিয়ে আসি’ করতে করতে মাগরিবের আজান শেষে বাসায় আসতাম।
বিদ্যুৎ চলে যেত, দেড় ঘণ্টায়ও আসত না। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার উসিলায় আবার একজন একজন করে সবাই নিচে নেমে আসতাম।
মাঠটা বর্ষাকালে ডোবা হয়ে যেত। শাপলা ফুলে ভরে যেত। ব্যাঙের কারণে হলুদ লাগত পানি। কোয়ার্টার মানেই বিশাল রুম, বিশাল বাসা। সে তুলনায় আমাদের বাসায় কোনো ফার্নিচার ছিল না। একটা রুম ফাঁকাই ছিল। আর বাসার পেছনে ছিল ঘন ঝোপঝাড়। তার পাশ দিয়ে চলে গেছে একটা খাল। খালের ট্রলার আর ঝোপঝাড়ের মধ্যে বেজি দেখাতে দেখাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আম্মু আমাকে খাওয়াত—
‘খাও খাও, ওই যে দেখো ট্রলার যাচ্ছে...বেজি দেখো।’
ভোলা থানার সাব–ইন্সপেক্টরের চাকরি থেকে বাবা বদলি হলেন ঢাকায়। ২০০৩ সাল। আমরা ঢাকায় চলে এলাম। ঢাকা শহরের চার দেয়ালের বন্দিজীবন আর পড়াশোনার এক পাহাড়সম চাপের ভেতর কতবার যে ভেবেছি, একবার হলেও ভোলা যাব। কত পড়ন্ত বিকেলে মনে হয়েছে, আচ্ছা, বিল্ডিংগুলো কি ভেঙে ফেলেছে? অনেক আধুনিক করে ফেলেছে হয়তো। মাঠটা আছে তো? আচ্ছা, আমাদের মতো কেউ এখন খেলতে নামে?
সেই সুযোগ চলে এল। ফেব্রুয়ারি মাসে বরিশাল গিয়েছিলাম একা। খালাতো বোনের ছেলে সাজ্জাদকে পটিয়ে আব্বু-আম্মুকে না জানিয়েই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, ভোলা যাব। ভীষণ ঘরকুনো স্বভাবের এই আমি বিশাল নদীর মোহনা পার হয়ে নামলাম ভোলায়।
সদরে পৌঁছে রিকশা ঠিক করলাম। বুক ধুকপুক করছিল। গলা ধরে আসছিল। কী হবে? যেখানে যাচ্ছি, আদৌ আছে কি জায়গাটা? রিকশাওয়ালা চিনতে পারল কি? রিকশাওয়ালা নিয়ে গেলেন। নামালেন গেটের সামনে। বড় বড় করে লেখা—
‘ভোলা থানা অফিসার্স কোয়ার্টার’।
তৎক্ষণাৎ কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর আমি চিৎকার করে বললাম, ‘সাজ্জাদ, এটাই! এটাই আমাদের বাসা...এখানেই আমরা থাকতাম। এই তো সেই বিল্ডিং, সেই হলুদ বিল্ডিং!’
২৩ বছর। কিছুই পরিবর্তন হয়নি। এই তো, এটাই তুনান ভাইয়াদের বাসা। ভেঙেচুরে গেছে। তাতে কী, বাসা তো আছে। সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেলাম। এখানেই আমাদের ছোটবেলার ছবি তোলা হয়েছিল।
পেছনের জঙ্গলটা এখনো আছে। খাল ছোট হয়ে গেছে। বেশির ভাগ বাসাই পরিত্যক্ত। হাতে গোনা দুই-তিনটা পরিবার থাকে। মাঠে একটা ব্যাডমিন্টন কোর্ট করা হয়েছে। বরইগাছটা আর নেই। রাতুলদের বাসাটা এখনো ঠিকঠাক আছে। আমি দৌড়াচ্ছি, ছবি তুলছি, ভিডিও করছি। থানা আগের মতোই আছে, শুধু মসজিদটা একটু নতুন হয়েছে। আর উত্তেজনা ধরে রাখতে না পেরে মাকে কল দিয়ে সারপ্রাইজ দিয়ে ফেললাম।
ফিরতে হবে। লঞ্চ থাকে সাতটা পর্যন্ত। ফিরতেই হবে। আসার সময় বলে এসেছিলাম আমার সেই মাঠকে, খেলার রাস্তাকে, হলুদ বিল্ডিংকে—
‘ভালো থেকো মেলা—লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো।
ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।’