প্রেম–বিচ্ছেদ থেকে প্রত্যাবর্তন, তাঁর গল্পটা সিনেমার মতোই

· Prothom Alo

মাত্র ১৬ বছর বয়সে এক ছবিতে অভিনয় করে রাতারাতি সুপারস্টার হওয়া, এরপর জনপ্রিয়তার চূড়ায় থাকতেই বিয়ে করে চলচ্চিত্র থেকে সরে যাওয়া, দীর্ঘ বিরতির পর ফিরে এসে আবারও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা—ডিম্পল কাপাডিয়ার জীবন যেন নাটকীয় সব বাঁকে ভরা এক চলচ্চিত্র। আজ ৮ জুন। ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই অভিনেত্রীর জন্মদিন। বয়সের সংখ্যা যতই বাড়ুক, পর্দায় তাঁর উপস্থিতি এখন সমান আকর্ষণীয়। কখনো গ্ল্যামার কুইন, কখনো শক্তিশালী অভিনেত্রী, কখনো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু—ডিম্পল কাপাডিয়া পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় বিনোদন অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত নাম।

Visit saltysenoritaaz.org for more information.

স্বপ্নের শুরু
১৯৫৭ সালের ৮ জুন ভারতের মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন ডিম্পল। তাঁর বাবা চুনিলাল কাপাডিয়া ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী। ছোটবেলা থেকেই ডিম্পল ছিলেন প্রাণবন্ত ও আত্মবিশ্বাসী। স্কুলজীবনেই মডেলিং শুরু করেন তিনি।
সেই সময় বলিউডের কিংবদন্তি নির্মাতা রাজ কাপুর নতুন মুখ খুঁজছিলেন। তাঁর নজরে পড়েন কিশোরী ডিম্পল। রাজ কাপুর বুঝতে পেরেছিলেন, এই মেয়ের মধ্যে রয়েছে অসাধারণ তারকাসুলভ আবেদন।

‘ববি’ এবং এক রাতের মধ্যে তারকা
১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় ‘ববি’। ছবিতে ডিম্পলের বিপরীতে ছিলেন ঋষি কাপুর। মুক্তির পর ছবিটি শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যই পায়নি, ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

‘ববি’তে ডিম্পলের উপস্থিতি ছিল একেবারেই নতুন। তাঁর ফ্যাশন, অভিনয়, হাসি, আত্মবিশ্বাস—সবকিছু তরুণ প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছিল। ছবিটি তাঁকে এনে দেয় সেরা অভিনেত্রীর ফিল্মফেয়ার পুরস্কার।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতীয় সিনেমার নতুন সেনসেশন।

সিনেমার দৃশ্যে ডিম্পল কাপাডিয়া। আইএমডিবি

রাজেশ খান্নার প্রেমে
‘ববি’ মুক্তির আগেই ডিম্পলের জীবনে আসে আরেকটি বড় ঘটনা। তিনি প্রেমে পড়েন তৎকালীন বলিউড সুপারস্টার রাজেশ খান্নার। তখন রাজেশ খান্না ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা। অসংখ্য নারী ভক্তের হৃদয়ের নায়ক। বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ১৫ বছর। কিন্তু প্রেমের কাছে সেটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ১৯৭৩ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের সময় ডিম্পলের বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর।

বিয়ের পর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি অভিনয় ছেড়ে দেন। এমন এক সময়ে তিনি সিনেমা থেকে দূরে সরে গেলেন, যখন তাঁর সামনে ছিল সীমাহীন সম্ভাবনা।

সংসারের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া বছরগুলো
বিয়ের পর ডিম্পল ও রাজেশ খান্নার সংসারে জন্ম নেয় দুই কন্যা—টুইঙ্কল খান্না ও রিঙ্কি খান্না। বাইরে থেকে তাঁদের পরিবারকে সুখী মনে হলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। সময়ের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।

ডিম্পল পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নিজের স্বাধীনতা ও পরিচয় হারিয়ে ফেলছিলেন তিনি। একজন সফল অভিনেত্রী হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তিনি কেবল ‘সুপারস্টারের স্ত্রী’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন।
১৯৮২ সালে তিনি রাজেশ খান্নার সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। যদিও তাঁদের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হয়নি কখনো।

প্রত্যাবর্তনের গল্প
ডিম্পলের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় আশির দশকে। ১৯৮৪ সালে মুক্তি পায় ‘জখমি শের’। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি দ্রুত প্রমাণ করেন, তাঁর সাফল্য শুধু সৌন্দর্যের কারণে নয়; অভিনয় দক্ষতাও অসাধারণ। এক সময়ের কিশোরী নায়িকা পরিণত হন শক্তিশালী অভিনেত্রীতে।

‘সাগর’ এবং দ্বিতীয় ইনিংসের বিস্ফোরণ
১৯৮৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সাগর’ ডিম্পলের ক্যারিয়ার বদলে দেয়। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন ঋষি কাপুর ও কমল হাসান। এই ছবির জন্য তিনি আবারও ফিল্মফেয়ার সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন। সমালোচক ও দর্শক—দুই পক্ষই তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে।

নব্বইয়ের দশকের শক্তিশালী অভিনেত্রী
ডিম্পল শুধু বাণিজ্যিক সিনেমায় আটকে থাকেননি। বরং চরিত্রনির্ভর চলচ্চিত্রে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন।

‘রুদালি’ ছবিতে তাঁর অভিনয় ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা নারী অভিনয় হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন পেশাদার শোক প্রকাশকারী নারীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় তাঁকে এনে দেয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
এরপর ‘ক্রান্তিবীর’, ‘দিল চ্যাহতা হ্যায়’, ‘বিয়িং সাইরাস’, ‘লাক বাইচান্স’ ইত্যাদি ছবিতে তিনি নিজেকে বারবার নতুনভাবে উপস্থাপন করেন।

ডিম্পল কাপাডিয়া। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

বিতর্ক ও গুঞ্জন
ডিম্পলের ব্যক্তিগত জীবন সব সময়ই আলোচনায় ছিল। বিশেষ করে সানি দেওলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন চলেছে। আশির দশক থেকে শুরু হওয়া এই সম্পর্ক নিয়ে বলিউডে অসংখ্য জল্পনা তৈরি হয়েছিল। যদিও দুই তারকাই প্রকাশ্যে খুব কম কথা বলেছেন।

২০১৭ সালে লন্ডনে তাঁদের একসঙ্গে দেখা যাওয়ার ছবি ভাইরাল হলে পুরোনো গুঞ্জন আবারও নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে ডিম্পল বরাবরই ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জনসমক্ষে খুব বেশি কথা বলতে পছন্দ করেননি।

মেয়ের বিয়ে ও অক্ষয় কুমারের সঙ্গে সম্পর্ক
ডিম্পলের বড় মেয়ে টুইঙ্কল বিয়ে করেন অক্ষয় কুমারকে। অক্ষয় ও ডিম্পলের সম্পর্ক নিয়ে বলিউডে বহু মজার গল্প প্রচলিত। শাশুড়ি-জামাইয়ের সম্পর্কের চেয়ে তাঁদের বন্ধুত্বই বেশি আলোচিত। অক্ষয় একাধিকবার বলেছেন, ডিম্পল অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও রসিক একজন মানুষ।

অমিতাভের সঙ্গে ছবি করতে বাড়ি বন্ধক, দেউলিয়া হতে বসেছিলেন তিনি

হলিউডেও ডিম্পলের পদচারণ
ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ দশকেও ডিম্পল থেমে থাকেননি। ২০২০ সালে তিনি অভিনয় করেন ‘টেনেট’–এ। পরিচালক ছিলেন ক্রিস্টোফার নোলান। নোলানের মতো বিশ্বখ্যাত পরিচালকের ছবিতে অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিক দর্শকদেরও নজর কাড়েন। ভারতীয় অভিনেত্রীদের মধ্যে খুব কমজনই এমন সুযোগ পেয়েছেন।

ডিম্পল কাপাডিয়ার বিশেষত্ব হলো, তিনি কখনো নিজেকে একটি নির্দিষ্ট ছকে আটকে রাখেননি। কখনো গ্ল্যামারাস নায়িকা, কখনো জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী, কখনো চরিত্রাভিনেত্রী—প্রতিটি পর্যায়ে তিনি সফল। তাই তাঁর সময়ের অনেক নায়িকা হারিয়ে গেলেও ডিম্পল এখনো প্রাসঙ্গিক।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে ও আইএমডিবি অবলম্বনে

Read full story at source