ব্যাংকঋণই ভরসা সরকারের, চ্যালেঞ্জে বেসরকারি খাত

· Prothom Alo

বাজেটঘাটতি মেটাতে প্রতিবছরের মতো এবারও ব্যাংকঋণের ওপরই বেশি ভরসা রাখছে সরকার। বরং বিশাল আকারের বাজেটের ব্যয় নির্বাহে বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ছে। এতে বেসরকারি খাতকে চাঙা করার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট। এতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে বলে জানা গেছে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

বেসরকারি খাতকে গতিশীল করতে নতুন সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল ঘোষণা করেছে, যার বড় অংশ ব্যাংকগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন থেকে আসার কথা। এ নিয়ে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরাতে ব্যাংকঋণ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এমন পরিস্থিতিতে সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে।

রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে নিট ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল সরকারের। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই, অর্থাৎ জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থবছর শেষে এ ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

— মোস্তফা কে মুজেরী, সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ ব্যাংক।দেশের অর্থনীতিতে গতি না ফিরলে লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা কম। সে ক্ষেত্রে ব্যয় মেটাতে সরকারকে আরও বেশি ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হতে পারে এবং খাতটিকে চাঙা করার উদ্যোগও ব্যাহত হতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারকে সতর্কভাবে এগোতে হবে

জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে।

‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’—এমন সম্ভাব্য প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সরকারের ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ রাজস্ব আদায়ে পিছিয়ে থাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (এপ্রিল পর্যন্ত) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এ সময়ে ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী প্রথম আলোকে বলেন, দেশের অর্থনীতিতে গতি না ফিরলে লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা কম। সে ক্ষেত্রে ব্যয় মেটাতে সরকারকে আরও বেশি ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হতে পারে এবং খাতটিকে চাঙা করার উদ্যোগও ব্যাহত হতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারকে সতর্কভাবে এগোতে হবে।

ব্যাংকঋণে মন্দা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন। প্রবৃদ্ধির এই হারে অর্থনীতিতে বিনিয়োগের মন্থর গতিই প্রতিফলিত হচ্ছে।

ব্যাংকগুলোতে নতুন ঋণ বিতরণ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চের শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে নতুন ঋণ বেড়েছে মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকারদের ভাষ্য, ১০ শতাংশ সুদ ধরলে তিন মাসে অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকা সুদ যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু ঋণ আদায় বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলো ঋণের স্থিতি কমিয়ে আনছে। ফলে সুদের প্রভাব থাকা সত্ত্বেও তিন মাসে মোট ঋণের স্থিতি বেড়েছে মাত্র ৪ হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি হবে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যার সিংহভাগ অর্থাৎ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংক খাত থেকে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে।

Read full story at source