হেগসেথকে নিয়ে কেন পেন্টাগনে আতঙ্ক, কেন তাঁকে নিয়ে অস্বস্তিতে কর্মকর্তারা

· Prothom Alo

সময়টা ছিল এপ্রিলের শুরু। মার্কিন সেনাপ্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জ সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তথা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সময় এসেছে।

জেনারেল জর্জ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। কারণ, বেশ কিছু বিষয়ে পেন্টাগনপ্রধান সরাসরি সেনা কর্মকর্তাদের কর্মজীবনে হস্তক্ষেপ করছিলেন। এর মধ্যে একটি ঘটনায় হেগসেথ নিজে উদ্যোগী হয়ে চারজন কর্নেলকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি আটকে দেন।

Visit newssport.cv for more information.

কয়েক মাস ধরেই হেগসেথকে সেনাবাহিনী ও জেনারেল জর্জসহ এর শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ক্রমশ অসন্তুষ্ট হতে দেখা যাচ্ছিল। সেনাপ্রধানের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো সিএনএনকে জানায়, এই অসন্তোষের কারণ তাঁদের কাছে রহস্যময় ঠেকছিল। কারণ, হেগসেথের মেয়াদে তাঁর সঙ্গে জেনারেল জর্জের যোগাযোগ ছিল খুবই সীমিত। এমনকি পদোন্নতি আটকে দেওয়ার আগেও তাঁদের মধ্যে তেমন কোনো আলাপ হয়নি।

সূত্রগুলোর মতে, এই ঘটনাটি হেগসেথের একটি নির্দিষ্ট কার্যপদ্ধতির সঙ্গেই মিলে যায়—যেখানে সব তথ্য তাঁর দপ্তরের মধ্যেই কঠোর গোপনীয়তায় রাখা হতো এবং পেন্টাগন নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা কী, তা বাইরের খুব কম মানুষই জানতে পারতেন।

হেগসেথ তাঁর চারপাশের অনেককেই তীব্র অবিশ্বাস করতেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল, সামরিক অভিযান সম্পর্কে জানতে কিছু সেনাকে গোপনীয়তা রক্ষার চুক্তিতে (এনডিএ) স্বাক্ষর করতে হতো এবং পেন্টাগনে মিথ্যা শনাক্তকরণ পরীক্ষা বা ‘পলিগ্রাফ টেস্ট’ নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।

জেনারেল জর্জ হেগসেথের সঙ্গে এই টানাপোড়েন কিছুটা কমাতে চেয়েছিলেন। তাই ১ এপ্রিল তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম উন্নয়ন এবং এগুলো অর্জনে সেনাবাহিনী কীভাবে কাজ করছে, তা নিয়ে আলোচনার জন্য একটি বৈঠকের অনুরোধ করেন। পেন্টাগন ও মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা সিএনএনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

কিন্তু সেই বৈঠক আর আলোর মুখ দেখেনি। পরদিনই জর্জকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

পেন্টাগনের বর্তমান ও সাবেক ১৫ জন কর্মকর্তা এবং হেগসেথের অধীনে এই বিভাগের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের দেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সিএনএন।

একাধিক সূত্র জানায়, দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় শুরু থেকেই হেগসেথ তাঁর চারপাশের বেসামরিক–সামরিক কর্মকর্তাদেরই অবিশ্বাস করে আসছিলেন এবং তাঁদের আনুগত্য নিয়ে সংশয়ে ভুগছিলেন।

হেগসেথ এ পর্যন্ত ২৪ জনের বেশি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন। তাঁর সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো নৌবাহিনী সচিবকে সরিয়ে দিয়েছেন এবং সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখায় পদোন্নতির বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন, যা সামরিক নেতৃত্বকে পুনর্গঠিত করছে।

জেনারেল জর্জের বরখাস্তের সময়টি ছিল আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। যখন সেনাবাহিনী সচিব ড্যান ড্রিসকল শহরের বাইরে ছিলেন, তখন আকস্মিকভাবে এই সিদ্ধান্ত সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে হতভম্ব করে দেয়। তবে এই বরখাস্তের ঘটনাটি অবশম্ভাবীই ছিল। এটি ছিল হেগসেথের সঙ্গে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, বিশেষ করে জেনারেল জর্জের কয়েক মাসের টানাপোড়েনের চূড়ান্ত পরিণতি।

হেগসেথ ও ট্রাম্পের অন্য ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা শুরু থেকেই জর্জকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। এর আংশিক কারণ ছিল, বাইডেন প্রশাসনের সময় সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন জর্জ।

হোয়াইট হাউসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে (ট্রাম্পের বাম পাশে) প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ২৭ মে ২০২৫, হোয়াইট হাউস

অরাজনৈতিক এই সামরিক দায়িত্বটি ছিল জর্জের দীর্ঘ কর্মজীবনের অনেকগুলো পদের একটি। ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে সেনা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকা জর্জের মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গেও ব্যাপক সুসম্পর্ক ছিল।

কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা এবং তথ্য প্রাপ্তি সীমিত করা হেগসেথের মেয়াদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সূত্রগুলো সিএনএনকে জানিয়েছে, এটি কেবল প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দপ্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এই সংস্কৃতি পেন্টাগনের অন্যান্য দপ্তরেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি করেছে।

পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিদিন আমরা যা কিছু করতাম, তা হিসাব কষে করতে হতো—এই কাজের ফলে বসের চাকরি থাকবে তো, নাকি তিনি বরখাস্ত হবেন? প্রতিটি দিন, প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে এটিই ছিল মূল ভাবনার বিষয়। কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই বিষয়টিকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া সত্যিই নজিরবিহীন।’

পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সিএনএন যেসব বেনামী সূত্রের বরাত দিয়েছে, তারা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বহিরাগত। তারা উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বিভাগকে কালিমালিপ্ত করতে এবং মন্ত্রী হেগসেথের নেতৃত্বকে দুর্বল করতে চায়।’

পার্নেল আরও বলেন, ‘যেকোনো সফল সংস্থায় নেতৃত্ব পরিবর্তন হয় এবং যাঁরা চলে গেছেন, দেশের প্রতি তাঁদের সেবার জন্য আমরা ধন্যবাদ জানাই। প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী এবং আমাদের যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাদের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এই চূড়ান্ত পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে।’

পেন্টাগনের ভেতরে এটি এখন এক প্রকাশ্য যে, পদে টিকে থাকতে হলে যতটা সম্ভব চুপচাপ থাকতে হবে এবং হেগসেথ ও তাঁর দপ্তরের নজর এড়িয়ে চলতে হবে। প্রতিরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘কখনো কখনো নেতাদের দায়িত্বে থাকাকালে সাহসী কিছু করতে হয়, ঝুঁকি নিতে হয় এবং সেনাবাহিনী এমন নেতাদেরই এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, যাঁরা তা করতে প্রস্তুত। কিন্তু এই পরিস্থিতি সেই ভাবনায় জল ঢেলে দিয়েছে।’

পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানান, জেনারেল জর্জ যখন সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ পরিচালকদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন, তখন আকস্মিকভাবে তাঁকে জানানো হয়, হেগসেথ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন।

জর্জ বৈঠক থেকে বের হয়ে যান এবং হেগসেথ তাঁকে বরখাস্তের খবরটি জানান। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার মতে, এটি ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সরাসরি একটি ফোন কল, যেখানে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। হেগসেথ খবরটি দেওয়ার ঠিক পরপরই সিবিএস নিউজের সাংবাদিক জেনিফার জ্যাকবস জনসমক্ষে এই বরখাস্তের খবরটি প্রকাশ করেন।

এর প্রায় ৩০ মিনিট পর জর্জ আবার তাঁর কর্মীদের নিয়ে বৈঠকে বসেন। পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ততক্ষণে সবাই টুইটটি দেখে ফেলেছিল। পরিবেশটা বেশ অস্বস্তিকর ছিল। কারণ, সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—তিনি এখন কী বলবেন?’

জেনারেল জর্জ অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে কোনো আবেগ বা নাটকীয়তা ছাড়াই খবরটি জানান। তাঁর আচরণ এতটাই সহজ ছিল, যেন তিনি পরিবেশের অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা করছিলেন।

সেই কর্মকর্তা স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘এরপর কর্মীরা একে একে এগিয়ে গিয়ে তাঁর সঙ্গে করমর্দন করলেন বা তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। পুরো পরিবেশটা ছিল বিষাদময়—যেন কেউ মারা গেছে।’ পরদিন সকালের মধ্যেই জেনারেল জর্জের দপ্তর খালি করে দেওয়া হয়।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সচিব ড্যানিয়েল ড্রিসকল ও জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন। ৭ মার্চ ২০২৬, ডেলাওয়ার

তথ্যের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ

পেন্টাগনে এই রদবদল আইনপ্রণেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে জেনারেল জর্জের বরখাস্তের বিষয়টি মার্কিন রাজনীতির উভয় শিবিরেই উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আইনপ্রণেতারা তাঁকে একজন সৎ কর্মকর্তা হিসেবে প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর বরখাস্তের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন।

জেনারেল জর্জের বিদায়ের পর গত মাসে হাউস অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস ডিফেন্স সাবকমিটির এক শুনানিতে সেনাবাহিনী সচিব ড্যান ড্রিসকল বলেন, ‘জেনারেল জর্জের ৪২ বছরের সেবা, তাঁর পার্পল হার্ট সম্মাননা এবং তাঁর পরিবারের প্রতি আমার চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা আর কারও নেই। আমি তাঁদের অত্যন্ত পছন্দ করি।’

হেগসেথ আইনপ্রণেতাদের কাছে জর্জকে বরখাস্তের সুনির্দিষ্ট কারণ জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, ‘ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি বিভাগের সংস্কৃতি পরিবর্তন করা খুবই কঠিন, যদি সেখানে আগের কর্মকর্তারা পদে বহাল থাকেন।’

পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেন, হেগসেথের এই মন্তব্য এটাই প্রমাণ করে, জর্জের বরখাস্তের ঘটনাটি ‘হেগসেথের সেই সংজ্ঞাহীন সংস্কৃতি যুদ্ধের অংশ, যা তিনি তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যেতে চান।’

তবে এই গোপনীয়তা ও সন্দেহের বাতাবরণই পেন্টাগনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে।

নিজের মেয়াদের অধিকাংশ সময়ের মতোই হেগসেথ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে প্রধান সামরিক পরিকল্পনাবিদদের দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। এর অর্থ হলো, জয়েন্ট স্টাফ—যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সামরিক পরিকল্পনা ও পরামর্শ দেওয়ার মূল কেন্দ্র—তার কিছু সদস্য ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত ভাবনা সম্পর্কে খুব কমই জানতেন।

ফলে সামরিক পরিকল্পনাবিদদের আকস্মিকভাবে ভেনেজুয়েলা উপকূলে মোতায়েন থাকা বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডসহ মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তরের রসদ জোগানোর দায়িত্ব সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।

সূত্রগুলো জানায়, হেগসেথ ও প্রশাসনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই ধরনের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা মার্কিন কমান্ডারদের জন্য ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা হেগসেথের মেয়াদ সম্পর্কে বলেন, ‘এক বছরেরও বেশি সময় পার হলেও পেন্টাগনের ভেতরে স্পষ্ট কোনো অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে। যার মূল কারণ চরম সংশয় ও অবিশ্বাস। এখানে কোনো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নেই, কোনো বিশ্বাস নেই। আর বিশ্বাস না থাকলে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।’

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হেগসেথ এবং তাঁর দল এই সংঘাতকে একটি বিশাল সাফল্য হিসেবে চিত্রিত করতে ব্যস্ত। এমনকি সংবাদ সম্মেলনগুলোতে তিনি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোকে ‘চরম দেশদ্রোহী’ বলে সমালোচনা করেছেন।

অন্য একটি সূত্র জানায়, ট্রাম্পের যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে হেগসেথ হোয়াইট হাউসের জন্য ‘যুদ্ধের ভিডিও’ তৈরির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এটি অনেকটা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের প্রচেষ্টার মতোই, যারা অভিবাসন আইনের কঠোর প্রয়োগের ভিডিও প্রচার করে নিজেদের সাফল্য জাহির করার চেষ্টা করেছিল।

তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধে ইরানের পদক্ষেপের ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক বাস্তবতা যখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে এবং তেহরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে হেগসেথের দাবির বিপরীত প্রতিবেদনগুলো দেখে ট্রাম্প যখন ক্রমশ ক্ষুব্ধ হচ্ছেন, তখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবারও তথ্য ফাঁসের তদন্তে মনোযোগ দিয়েছেন।

হেগসেথের পথ অনুসরণ করে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) মোতায়েন থাকা সেনাদের তথ্য ফাঁসের বিষয়ে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এমনকি সাধারণ তথ্য শেয়ার করা থেকে সেনাদের বিরত রাখতে ক্লাসিফিকেশনের বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহারের ভয় দেখানো হচ্ছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

ওই সূত্রটি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, ‘তারা আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করছে যেন আমরাই শত্রু।’

বরখাস্ত হওয়া সেনাপ্রধান জেনারেল র্যান্ডি জর্জ

সামরিক বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে হেগসেথের টানাপোড়েন

হেগসেথের মেয়াদে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অন্যতম বড় উদাহরণ হলো সেনাবাহিনী সচিব ড্রিসকলের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব। এর মূল কারণ ছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ড্রিসকলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ড্রিসকলের এই সম্পর্ককে হেগসেথ তাঁকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখতেন। এই নিরাপত্তাহীনতা গত বছর চরম রূপ নেয় যখন ড্রিসকল ভ্যান্স ও ট্রাম্পকে পেন্টাগনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।

ড্রিসকল এবং ভ্যান্স ইয়েল ল স্কুলের সহপাঠী ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব রয়েছে। তরুণ এই সেনাবাহিনী সচিব প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও নিজস্ব সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন, যা স্পষ্ট হয় যখন ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে আবার আলোচনায় বসানোর জন্য ড্রিসকলকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।

তা সত্ত্বেও পেন্টাগনের ওই কর্মকর্তা বলেন, ড্রিসকল ও হেগসেথের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব ‘শুরু থেকেই’ স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীর প্রতি তাঁর এক ধরনের গভীর অবিশ্বাস রয়েছে।’

জেনারেল জর্জকে সরানোর কয়েক মাস আগেই হেগসেথ সেনাবাহিনীর অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ভাইস চিফ অব স্টাফ জেনারেল জেমস মিঙ্গুসকে সরিয়ে তাঁর নিজের সামরিক সহকারী জেনারেল ক্রিস লানেভকে সেই পদে বসান।

সূত্রগুলো জানায়, লানেভকে এই পদে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যই ছিল একসময় তাঁকে দিয়ে জর্জের স্থলাভিষিক্ত করা। জর্জ বরখাস্ত হওয়ার পর লানেভ ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ায় সেই ধারণাই সত্যি হলো।

জেনারেল জর্জকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর পেন্টাগনের কর্মকর্তারা স্তব্ধ হয়ে যান, যখন নৌবাহিনী সচিব জন ফেলানকেও আকস্মিকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

সিএনএন জানায়, পেন্টাগনের মুখপাত্র যখন এক্সে ঘোষণা দেন, ফেলান ‘অবিলম্বে’ পদত্যাগ করছেন, তখনো ফেলান হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন, তাঁর বরখাস্তের আদেশটি বৈধ কি না।

প্রতিরক্ষা বিভাগের কিছু কর্মকর্তা রসিকতা করে বলছিলেন, ড্রিসকলের আগে ফেলানকে সরিয়ে দেওয়াটা বেশ আশ্চর্যজনক ছিল।

তবে একাধিক সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, বেশ কিছু কারণে ফেলানের সঙ্গেও হেগসেথের সম্পর্ক গত কয়েক মাসে তিক্ত হয়ে উঠেছিল। এর মধ্যে প্রশাসনের অগ্রাধিকার বিষয়গুলোতে ফেলানের ধীরগতি এবং ট্রাম্পের সঙ্গে ফেলানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে হেগসেথের সন্দেহ অন্যতম।

ফেলানের বরখাস্তের আলোচনার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, কাজের ক্ষেত্রে তাঁর বেশ কিছু ‘ঘাটতি’ পাওয়া গিয়েছিল—প্রধানত জাহাজ নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি ধীরগতিতে চলছিলেন এবং নৌবাহিনী ও মেরিন কোরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে হেগসেথের দপ্তরের সরাসরি যোগাযোগে নিরুৎসাহিত করছিলেন।

একই সূত্র জানায়, নৌবাহিনীর আন্ডার সেক্রেটারি হাং কাওকে তাঁর বসের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। কাও এখন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনে যোগ দেওয়ার আগেই হেগসেথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল।

ফেলানকে বরখাস্তের প্রায় একদিন পর ট্রাম্প তাঁর প্রশংসা করে বলেন, তিনি ‘দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং অত্যন্ত সফল ব্যবসায়ী, যিনি অসাধারণ কাজ করেছেন।’

একইভাবে ট্রাম্প হেগসেথের প্রশংসাও জারি রেখেছেন, যদিও পেন্টাগনের ভেতরের ও বাইরের সূত্রগুলো এক বছর ধরে ধারণা আসছিল, প্রেসিডেন্ট শিগগিরই নতুন কোনো প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেছে নিতে পারেন।

সূত্রগুলো জানায়, হেগসেথ তাঁর জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্যগুলোতে প্রায়ই সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন, যা আসলে ট্রাম্পের উদ্দেশ্যেই বলা এবং প্রেসিডেন্টের এই শৈলী পছন্দ। পেন্টাগনের ওপারে যতই নাটকীয়তা চলুক না কেন, প্রেসিডেন্ট এখন পর্যন্ত তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পাশ থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো লক্ষণ দেখাননি।

সম্প্রতি মন্ত্রিসভার এক শুনানিতে নিজের বাম পাশে বসা হেগসেথকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ, একদম উপযুক্ত চরিত্র। ও যুদ্ধ ভালোবাসে।’

Read full story at source