এত প্রতিশ্রুতি, কী করে পূরণ করবেন থালাপতি বিজয়

· Prothom Alo

চেন্নাইয়ে রাজ্যপালের সামনে গত ১০ মে শপথ নেওয়ার সময় জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখরের চোখে যে দৃঢ়তা ছিল, তা তামিলনাড়ুর কোটি কোটি মানুষের চেনা। ভক্তকুলের কাছে তিনি ‘থালাপতি’ নামেই পরিচিত। তামিল ভাষায় শব্দটির অর্থ কমান্ডার বা সেনাপতি। বছরের পর বছর ধরে এই অভিনেতাকে সিনেমার পর্দায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে দেখেছেন তাঁরা। সেই ‘থালাপতি’ বিজয় এখন তামিলনাড়ুর নবম মুখ্যমন্ত্রী।

তবে শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিজয়ের সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের চাপে পড়েছে। কৃষকেরা রাস্তায় নেমেছেন, বিদ্যুৎ ভর্তুকি নিয়ে বিতর্ক উঠেছে এবং সামনে এসে দাঁড়িয়েছে রাজ্যের বিশাল ঋণের বোঝা। এসব দেখে অনেকেই সন্দিহান—সত্যিই কি প্রতিশ্রুতির ভার বহন করতে পারবেন থালাপতি বিজয়?

Visit aportal.club for more information.

রুপালি পর্দা থেকে ক্ষমতার মসনদে

১৯৭৪ সালের ২২ জুন চেন্নাইয়ে জন্ম নেওয়া বিজয় চলচ্চিত্র পরিচালক এস এ চন্দ্রশেখরের ছেলে। লয়োলা কলেজ ছেড়ে সরাসরি অভিনয়ে মনোযোগ দেন তিনি। একপর্যায়ে হয়ে ওঠেন তামিল সিনেমার সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতাদের একজন। ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি ‘তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম’ (টিভিকে) নামের রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালের ৪ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ২৩৪ আসনের বিধানসভায় ১০৮টি আসন জিতে তাঁর দল একক বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

তামিলনাড়ুতে রুপালি পর্দার তারকাদের রাজনীতিতে আসা নতুন কোনো ঘটনা নয়। এম জি রামচন্দ্রন (এমজিআর) ১৯৭৭ সাল থেকে টানা ১০ বছর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর ছায়া থেকে বেরিয়ে রেকর্ড পাঁচবারের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন সত্তরের দশকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়ললিতা। কিন্তু থালাপতি বিজয়ের জয়কে কেবল সেই পুরোনো ধারার পুনরাবৃত্তি ভাবলে ভুল হবে। এমজিআর বা জয়ললিতা প্রতিষ্ঠিত দলের কাঠামো ব্যবহার করে উঠে এসেছিলেন, আর বিজয়ের শুরুটা হয়েছে একেবারে শূন্য থেকে।

‘জন নায়াগান’-এ থালাপাতি বিজয়

হালে রজনীকান্ত ও কমল হাসানের মতো সিনেমার দুই কিংবদন্তি রাজনীতিতে এসে ব্যর্থ হয়েছেন। দুজনেরই কোটি কোটি ভক্ত, তবু রাজনীতির মাঠে খালি হাতে ফিরতে হয়েছে তাঁদের। এই হোঁচট খাওয়ার মূল কারণ ছিল তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী সংগঠনের অভাব। কমল হাসান ২০১৮ সালে দল গঠন করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নিজের আসনেই হেরে যান।

মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক রামু মণিভান্নান সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, ‘তামিলনাড়ু মতাদর্শগত ও রাজনৈতিকভাবে একটি পরিপক্ব রাজ্য। এখানে সামাজিক ন্যায়বিচার, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক এবং ভাষাগত পরিচয়ের প্রশ্নই মুখ্য। শুধু তারকাখ্যাতি দিয়ে এখানে ভোট পাওয়া যায় না।’

তামিলনাড়ুতে পুরোনোদের কয়েক দশকের আধিপত্য ভেঙেছেন বিজয়, এরপর তাঁর সামনে কী

কীভাবে পারলেন বিজয়

রাজনীতিতে আসার আগে রজনীকান্ত বা কমল হাসান কেউই সিনেমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি, কিন্তু বিজয় করেছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়ায় ক্যারিয়ারের শেষ সিনেমার অডিও লঞ্চিংয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি ৩৩ বছরের অভিনয়জীবনের ইতি টানার ঘোষণা দেন।

সবচেয়ে বড় কথা, রাজ্যজুড়ে মাঠপর্যায়ে বিজয়ের প্রায় ৮৫ হাজার ফ্যান ক্লাব ছিল। রাজনীতিতে নেমে অত্যন্ত সুচারুভাবে এসব ক্লাবের সদস্যদের নিয়ে কর্মীভিত্তিক একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি।

এই পথচলার শুরু অবশ্য আরও আগে। ২০০৯ সালে বিজয় তাঁর ফ্যান ক্লাবগুলোকে একত্র করে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ (ভিএমআই) গঠন করেন। এটি নিছক তারকা-বন্দনার প্ল্যাটফর্ম ছিল না। পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক কাজ, শিক্ষার প্রসার এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব কাজের মধ্য দিয়ে তৃণমূল থেকেই বিজয়ের রাজনৈতিক ক্ষেত্র প্রস্তুত হতে থাকে।

তামিলনাড়ু রাজ্যের বিধানসভায় বক্তৃতা করছেন মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়। ১২ মে ২০২৬, চেন্নাই

২০১২ সালের পর থেকে বিজয়ের সিনেমার চিত্রনাট্যেও বদল আসে। খলনায়ক আর কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি থাকেননি, পুরো রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থাটাই হয়ে দাঁড়ায় মূল প্রতিপক্ষ। ‘কাত্থি’ সিনেমায় কৃষকদের দুরবস্থা, ‘মের্সাল’-এ পল্লী স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জিএসটির সমালোচনা, ‘সরকার’-এ নির্বাচনী জালিয়াতির বয়ান—এখন বোঝা যায়, এগুলো কাকতালীয় ছিল না। বিনোদনের মোড়কে এগুলোই ছিল বিজয়ের রাজনৈতিক ইশতেহার, যা বছরের পর বছর ধরে মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া হয়।

২০২১ সালের অক্টোবরে স্থানীয় নির্বাচনে বিজয়ের ফ্যান ক্লাবের সদস্যরা স্বতন্ত্রভাবে লড়ে ১৬৯টি পঞ্চায়েতের মধ্যে ১১৫টিতে জয়লাভ করে মাঠ প্রস্তুত করে দেন। এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আসে টিভিকে গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।

এরপর বিজয়ের রাজনীতির পথ অবশ্য মসৃণ ছিল না। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর একটি জনসভায় পদদলিত হয়ে ৪০ জন নিহত হন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা কটাক্ষ করেছিল, যে নেতা একটি সভা সামলাতে পারেন না, তিনি পুরো রাজ্য সামলাবেন কীভাবে? কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে এবং আর্থিক সহায়তা দিয়ে বিজয় সেই বিপর্যয় সামলে নেন।

থালাপতি বিজয়: ভারতের দক্ষিণে রাজনীতির নতুন ‘কমান্ডার’?

ভোটের মাঠে চমক

২০২৬ সালের ৪ মে ভোটের ফল ঘোষণার দিন রাজ্যটির ৫০ বছরের দ্বিদলীয় আধিপত্য ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ২০২১ সালে এককভাবে ১৩৩টি আসন পাওয়া ডিএমকে নেমে আসে ৫৯টিতে। দলটির নেতা এম কে স্ট্যালিন নিজের আসন হারান, তাঁর মন্ত্রিসভার ১৫ জন হেরে যান। অন্যদিকে এআইএডিএমকে পায় মাত্র ৪৭টি আসন।

তামিলনাড়ুর ৪২ শতাংশ ভোটারের বয়স ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। এই তরুণ প্রজন্মের ৬০ শতাংশই ভোট দিয়েছেন বিজয়কে। ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক আর কান্নান সংবাদমাধ্যম দ্য ফেডারেলকে বলেন, ‘এটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী ভোট। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তামিলনাড়ুর রাজনীতি একটি দ্বিমুখী লড়াইয়ে আটকে ছিল। তরুণ প্রজন্ম সেই বৃত্ত ভাঙতে চেয়েছে।’

জয়ের পরও সরকার গঠন সহজ ছিল না। সরকার গঠনের জন্য বিজয়ের প্রয়োজন ছিল ১১৮টি আসন, আর টিভিকে পেয়েছিল ১০৮টি। বিজয় নিজে দুটি আসন থেকে জেতায় একটি ছেড়ে দেওয়ার পর কার্যকর আসন দাঁড়ায় ১০৭-এ। রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ চেয়ে চারবার টিভিকের ফাইল ফিরিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের পাঁচ বিধায়ক, সিপিআই, সিপিআই (এম), ভিসিকে, আইইউএমএল এবং এআইএডিএমকের বিভক্ত অংশের ২৪ বিধায়কের সমর্থনে ১৪৪ জনের সমর্থন নিয়ে ‘ফ্লোর টেস্টে’ উতরে যান বিজয়।

মঞ্চে বক্তব্য দিচ্ছেন থালাপতি বিজয়। তামিলনাড়ুর কারুর জেলায়। ২৭ সেপ্টেম্বর

নির্বাচনী ইশতেহারে কী ছিল

‘দশ নিশ্চয়তা’ নামে পরিচিত টিভিকের ইশতেহার বিশাল কল্যাণমূলক পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি হয়েছিল। প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে ছিল—৬০ বছরের কম বয়সী পরিবারের নারী প্রধানদের মাসে আড়াই হাজার রুপি সহায়তা, বছরে ছয়টি বিনা মূল্যের এলপিজি সিলিন্ডার, বিয়েতে ৮ গ্রাম সোনা ও ১টি রেশমি শাড়ি, ৫ একরের কম জমির কৃষকদের ফসলি ঋণ মওকুফ, স্নাতকদের মাসে ৪ হাজার রুপি বেকারত্ব ভাতা, প্রতি বিলিং চক্রে ২০০ ইউনিট বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ এবং ৫ লাখ সরকারি চাকরি সৃষ্টি।

বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে রাজ্যের বার্ষিক কল্যাণ ব্যয় প্রায় ৫২ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ কোটি রুপিতে পৌঁছাবে, যা রাজ্যের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

থালাপতি বিজয়: রাজনীতির ময়দানে চমক দেখালেন পর্দার নায়ক

শুরুতেই বিতর্ক ও আর্থিক বাস্তবতা

শপথের দিন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় বলেছিলেন, ‘আমি কোনো রাজপরিবারের সন্তান নই। আমি দারিদ্র্য ও ক্ষুধা কী, তা জানি।’ ওই দিনই বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ, মাদকবিরোধী টাস্কফোর্স ও নারী নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন তিনি।

তবে শুরুতেই সূচনা হয় বিতর্কের। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ২০০ ইউনিট বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হলেও শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যে কেবল তাঁরাই এটি পাবেন, যাঁরা দুই মাসে সর্বোচ্চ ৫০০ ইউনিট ব্যবহার করেন। বিরোধী দল ডিএমকে অভিযোগ তোলে, ইশতেহারে এমন কোনো শর্তের কথা বলা ছিল না।

কৃষকদের ঋণ মওকুফকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আরও বড় সংকট। বিজয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, পাঁচ একরের কম জমির কৃষকদের সমবায় ব্যাংকের ফসলি ঋণ পুরোপুরি মওকুফ করা হবে। কিন্তু সরকার ঘোষণা করেছে, শুধু এক লাখ রুপি পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে পূর্ণ মওকুফ মিলবে, আর এর চেয়ে বেশি ঋণের ক্ষেত্রে মাত্র পাঁচ হাজার রুপি ছাড় দেওয়া হবে। এতে রাজ্যের কোষাগারে চাপ পড়বে মাত্র ২ হাজার ৪৪ কোটি রুপি। অথচ ২০২১ সালে পূর্ববর্তী এআইএডিএমকে সরকার ১২ হাজার ১১০ কোটি রুপির ঋণ মওকুফ করেছিল।

তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্যের পর মা–বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে ভক্তদের অভিবাদনের জবাব দিচ্ছেন অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ বিজয়। চেন্নাই, তামিলনাড়ু। ৪ মে ২০২৬

ইতিমধ্যে কোয়েম্বাটোর, পেরাম্বালুর, ত্রিচিসহ বিভিন্ন জেলায় কৃষকেরা কালো পতাকা হাতে কালেক্টরেটের সামনে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁদের একটাই দাবি, ‘বিজয় আন্নাচি, ভোটের প্রতিশ্রুতি কোথায় গেল?’

গ্রীষ্মের তাপদাহে ৩৬-৪১ ডিগ্রি তাপমাত্রার মধ্যে বিদ্যুতের ঘাটতি নিয়েও বিরোধীরা সরকারকে কাঠগড়ায় তুলছে। বিদ্যুৎমন্ত্রী বলছেন, পুরোনো অবকাঠামোর কারণেই এ সমস্যা। তবে বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস, ২০২৬-২৭ সালে রাজ্যের বিদ্যুতের চাহিদা ১ লাখ ৪৮ হাজার মিলিয়ন ইউনিট ছাড়িয়ে যাবে, যা ২০৩৫-৩৬ সালে প্রায় দ্বিগুণ হবে।

তামিলনাড়ু ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ রাজ্য। ২০২৫ সালে রাজ্যটির মাথাপিছু আয় ভারতের জাতীয় গড়ের ১৭৬ শতাংশ ছিল। পূর্ববর্তী ডিএমকে সরকারের পাঁচ বছরে রাজকোষের ঘাটতি ৪ দশমিক ৬ থেকে ৩ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে এসেছিল। কিন্তু রাজ্যের বর্তমান ঋণ ইতিমধ্যে ১০ লাখ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার দিন বিজয় নিজেই বলেছেন, আগের সরকার রাজ্যের কোষাগার ‘প্রায় শূন্য’ করে রেখে গেছে। এ নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের কথাও জানিয়েছেন তিনি। অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থের সংস্থান না করে বড় কল্যাণমূলক ব্যয় চালু করলে রাজকোষের ঘাটতি ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ শতাংশ হতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বেশ বিপজ্জনক।

কেন্দ্রের সঙ্গে টানাপোড়েন ও অনভিজ্ঞতার ছাপ

কৃষকদের ঋণ মওকুফের প্রশ্নে নতুন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট (নাবার্ড)। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্য সরকারগুলো নাবার্ডের অনুমোদন ছাড়া কৃষিঋণ মওকুফ করতে পারবে না। এটি সরাসরি বিজয়ের প্রতিশ্রুতি পূরণের পথে আইনি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক অবদানের অনুপাতে তামিলনাড়ুকে যে পরিমাণ কেন্দ্রীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়, জনসংখ্যা কম হওয়ার কারণে তা ক্রমশ কমছে। এই কাঠামোগত সমস্যাটিও বিজয়কে সামলাতে হবে।

টিভিকে সরকারের সামনে আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব। স্ট্যালিন সরকারে অভিজ্ঞ শিল্পমন্ত্রী ও অর্থনীতিবিদেরা ছিলেন। কিন্তু বিজয়ের মন্ত্রিসভায় এমন মুখ বিরল। অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া এন মেরি উইলসন রাজনৈতিক অঙ্গনে একেবারেই অপরিচিত মুখ।

তামিলনাড়ুর তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) দলের প্রধান থালাপতি বিজয়কে (বাঁয়ে) ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকার। চেন্নাইয়ের লোকভবনে, ৯ মে ২০২৬

শপথের প্রথম সপ্তাহেই বিজয় একের পর এক বিতর্কে জড়ান। নিজের ব্যক্তিগত জ্যোতিষীকে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়োগ দিয়ে সমালোচনার মুখে তা বাতিল করতে বাধ্য হন তিনি। কাঞ্চিপুরমের একটি পানির ট্যাংক প্রকল্পে মাত্র ছয় ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে টেন্ডার আহ্বানের অভিযোগ উঠলে সেটিও বাতিল করা হয়। প্রতিটি ঘটনাতেই প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট।

শপথ অনুষ্ঠানে তামিলনাড়ুর চিরাচরিত রাজ্যসংগীত ‘তামিল থাই ভাজথু’-এর আগে ‘বন্দে মাতরম’ বাজানো নিয়েও বিতর্ক ওঠে। বিরোধীদলীয় নেতা উদয়নিধি বিধানসভায় এ নিয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন তোলেন। পরে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এটি একবারের ঘটনা, ভবিষ্যতে এমনটা হবে না (দ্য ফেডারেল, মে ২০২৬)। তামিলনাড়ুতে ভাষা ও আঞ্চলিক পরিচয়ের প্রশ্নটি সব সময়ই স্পর্শকাতর, আর এসব বিষয়ে বিজয়কেও সেই মানদণ্ডেই জনগণ মূল্যায়ন করবে।

তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয়

সামনের পথ

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বিজয়ের সামনের পথ একেবারেই মসৃণ নয়। ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের দলগুলোকে নিয়ে জোট সামলানোর পাশাপাশি রাজ্যের ১০-১১ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ তাঁর সামনে।

তবে আশার দিকও আছে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে বিজয় স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তামিলনাড়ুতে বিজেপির কট্টর ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রবেশ আটকাতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দেশ যখন সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মুখে, তখন একটি বড় রাজ্যে ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ভারতের জাতীয় রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া টিভিকের ইশতেহারে রাজস্ব বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মন্ত্রণালয়, এআই বিশ্ববিদ্যালয় ও ‘এআই সিটি’ গড়ার স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। কিন্তু এসব পরিকল্পনার অর্থায়নের উপায় এখনো অস্পষ্ট।

বিজয় স্বয়ং বলেছেন, তিনি জনগণকে ঠকাবেন না। সেই কথা রাখার পরীক্ষা এখন সত্যিকার অর্থেই শুরু হয়েছে। ‘থালাপতি’র পরিচয় এখন কেবল রুপালি পর্দার নয়, তামিলনাড়ুর সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়তে যাচ্ছে—বিষয়টি বিজয়কে প্রতিমুহূর্তেই মনে রাখতে হবে।

Read full story at source