শিল্পায়নে গতি আনতে পদক্ষেপ নিন

· Prothom Alo

একদিকে আছে প্রকৃতির আশীর্বাদ, অন্যদিকে প্রতিবন্ধকতা। গ্যাসের প্রাচুর্য নিয়ে ভোলা জেলা পড়েছে অদ্ভুত এক সমস্যায়। গ্যাস উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে যুক্তকরণ, সেই সঙ্গে জেলাটিতে শিল্পায়ন—সবকিছু থমকে আছে। অতীতে বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও এই স্থবিরতা কাটছে না। আরও বেদনাদায়ক হচ্ছে, দেশের যে পাঁচটি জেলা অবর্ণনীয় দারিদ্র্যের শিকার, ভোলা তার অন্যতম। গ্যাসের বিশাল মজুত নিয়ে জেলাটির এমন অর্থনৈতিক করুণ দশা কোনোভাবেই মানা যায় না। 

Visit turconews.click for more information.

বাপেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ভোলার গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা যেখানে ১২২ মিলিয়ন ঘনফুট, সেখানে স্থানীয় বর্তমান চাহিদা মাত্র ৭০ থেকে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এই উদ্বৃত্ত গ্যাস ব্যবহারের সঠিক ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি নির্ধারণে নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতা স্পষ্ট। কয়েক বছর আগে একটি বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে ট্রাকে করে সিএনজি আকারে ভোলার গ্যাস ঢাকার শিল্পাঞ্চলে নেওয়ার যে উদ্যোগ দেখা গেছে, তা কেবল ব্যয়বহুল ও সাময়িক উপশমমাত্র। এ ক্ষেত্রে বড় সমাধান হতে পারে ভোলা জেলাতেই শিল্পায়ন গড়ে তোলা এবং সে অনুসারে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা। 

ভোলার গ্যাস নিয়ে বিভিন্ন সরকার মোট চারটি পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে আছে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়া, সিএনজিতে রূপান্তরিত করে জেলার বাইরে নেওয়া, এলএনজি করে জেলার বাইরে নেওয়া এবং ভোলাতেই ইপিজেড, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে সেখানে গ্যাস ব্যবহার করা। সরকারগুলো নানা সময়ে এসব পরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগও গ্রহণ করেছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। নানা সময়ে জ্বালানি সংকটের মধ্যে ভোলার এই গ্যাস মজুতের প্রতি বারবার গুরুত্বারোপ করে গেছেন বিশেষজ্ঞরা।  

বর্তমানে ভোলায় চাহিদার চেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদনের সক্ষমতা বেশি। ফলে প্রস্তুতি নিয়েও দুটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না। দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানিবিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ভোলার গ্যাসের সবচেয়ে যৌক্তিক ও সাশ্রয়ী ব্যবহার হতে পারে ভোলাতেই ইপিজেড, সার কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ভারী শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভোলা থেকে নদীপথে পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পরিবহন অত্যন্ত সহজ। ফলে এখানে শিল্পায়ন হলে দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীরা যেমন আকৃষ্ট হবেন, তেমনি বদলে যাবে পুরো দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চেহারা।

ইতিমধ্যে কিছু বড় শিল্প গ্রুপ সেখানে বিনিয়োগ শুরু করেছে। তবে বিসিকে প্লট থাকা সত্ত্বেও গ্যাস অনুমোদন জটিলতায় নতুন শিল্প স্থাপনের গতি থমকে আছে। একটি সংযোগ পেতে উদ্যোক্তাদের কয়েক মাস ধরে দাপ্তরিক টেবিলে ঘুরতে হচ্ছে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রভাবশালী মহলের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যও এখানে শিল্পায়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। 

সম্প্রতি ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভোলার গ্যাস ভোলাতেই ব্যবহার করে সেখানে শিল্পাঞ্চল ও সার কারখানা গড়ে তোলার যে নীতিগত নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা তাকে স্বাগত জানাই। তবে এই নির্দেশনার দ্রুত ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন জরুরি। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিটি ঘরে গ্যাস-সংযোগ, প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনসহ যে পাঁচ দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন, তা মূলত দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক বৈষম্য ও বঞ্চনা থেকে তৈরি হওয়া তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আমরা আশা করি, সরকার এ দাবিগুলো সুবিবেচনায় নেবে এবং এই প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে ভোলার মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বঞ্চনার অবসান ঘটাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

Read full story at source