শিবির নেতা জিসানের চোখ কি খুলেছে

· Prothom Alo

মানুষ প্রেমে পড়লে নাকি অন্ধ হয়ে যায়। এই ক্লিশে বাক্যটি আমরা বহু যুগ ধরে শুনে আসছি। কিন্তু প্রেমে পড়ে মানুষ আক্ষরিক অর্থেই ‘চোখ বন্ধ’ করে জ্যান্ত পাথরের মূর্তি হয়ে যেতে পারে, তা সম্ভবত কুমিল্লার দাউদকান্দি ও লাকসামের সংযোগস্থলে না পৌঁছালে আধুনিক বিজ্ঞানের অজানাই থেকে যেত।

Visit freshyourfeel.org for more information.

সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক জিসান মিয়া প্রধানকে নিয়ে গত কয়েক দিনে যে ‘অলৌকিক’ এবং ‘অতি-নাটকীয়তা’ কাণ্ডকীর্তি রচিত হলো, তা যেকোনো লাতিন আমেরিকান সোপ অপেরা বা কলকাতার মেগা সিরিয়ালকে অনায়াসে টেক্কা দিতে পারে।

ঘটনার শুরু ১১ জুন। জিসান মিয়া ‘নিখোঁজ’ হলেন। জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক মহল থেকে জোর গলায় আওয়াজ উঠল—গুমের সংস্কৃতি ফিরে এল বলে! অনলাইনে প্রোপাগান্ডার তুফান, সরকারকে তুলাধুনো করা হলো। কিন্তু রাজনীতির এই গুম-নাটকের পেছনে যে প্রতারণামূলক ‘প্রেম-নাটক’ লুকিয়ে ছিল, তা পুলিশি উদ্ধার অভিযানের আগে বোঝার সাধ্য কার ছিল!

তবে এটিকে ‘প্রেম-নাটক’ বললে ভুল হবে। জিসানের বিপরীতে যিনি আছেন তাঁর প্রতি করা হবে অবিচার। ঘটনা যেদিকে গড়িয়েছে, সেটি আর প্রেমের পর্যায়ে থাকেনি। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ ও ভ্রূণ হত্যার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে জিসানের বিরুদ্ধে।

যদিও দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ স্ব–স্ব সম্মতিতে প্রেমে জড়ানোর পরে কীভাবে বিষয়টি ‘ধর্ষণ’ হয়, তা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। এ–সংক্রান্ত আইন নিয়ে অতীতে নানা সমালোচনাও হয়েছে। ‘বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ’—এই বাক্য নিয়ে নানা হাস্যরসও দেখা গিয়েছিল একসময়। যেখানে বাংলা সিনেমার একসময়কার জনপ্রিয় মুখ শাবানা, জসীম ও ওমর সানীর সেলাই মেশিন, সিনেমার টিকিট, চাবুকের কথা উঠে এসেছিল। ফ্যাসিস্ট আমলের ভোট চুরি নিয়েও ট্রল হয়েছিল এভাবে—‘গণতন্ত্রের প্রলোভনে ভোট চুরি।’

শিবির একটি ধর্মাশ্রয়ী ছাত্রসংগঠন। ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে সেখানে সম্ভবত প্রেম করা নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রেম কি জাত-ধর্ম-সমাজের বাধা মানে? ফলে জিসানকে তাঁর ছাত্রসংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় ‘প্রেমের দায়ে’, যা আরও হাস্যরসই তৈরি করে।

দায় স্বীকার-অস্বীকারের রাজনীতিতে শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জিসান মিয়াকে দল থেকে বহিষ্কার করার বিষয়টি জানান। সেখানে আরেকটি গুরুতর কাজও করা হলো, ওই নারীর নামও প্রকাশ করে দেওয়া হলো, এসব ক্ষেত্রে যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মারাত্মক লঙ্ঘনই বলতে হবে। আইনিভাবেও নিশ্চয়ই তা সমর্থনযোগ্য নয়।

তবে জিসানের এই প্রেম বা প্রতারণার ঘটনা রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠল কেন? কেন এ ঘটনা সংসদে তর্ক-বিতর্কের বিষয় হলো?

জামায়াত সমর্থনে জোয়ার বা হাইপ, ’৯১-এর পুনরাবৃত্তির আলাপ ও বাস্তবতা

এক বিধবা নারীর সঙ্গে প্রেম করতে গিয়ে গভীর সম্পর্কে জড়ান জিসান। একপর্যায়ে তাঁদের বিয়ের তারিখ ঠিক হয় ১২ জুন। কিন্তু জিসানের মনে অন্য মতলব। তিনি বিয়ে করতে রাজি নন। আগের দিন রাতে জিসান ‘গুম’ হয়ে গেলেন। চাচাতো ভাইকে দিয়েও থানায় নিখোঁজের জিডি করান তিনি। পরে নিজে গিয়ে লাকসাম রেলওয়ে জংশনে ‘অচেতন’ হওয়ার চমৎকার এক পোজ দিয়ে শুয়ে রইলেন।

এ ঘটনায় জামায়াতের আমির থেকে শুরু করে শিবিরের নেতৃবৃন্দ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বসলেন: তাঁদের একজন ছাত্রনেতাকে গুম করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় নির্যাতনের ভয়াবহ কার্যকরী অস্ত্র ছিল গুম। এর শিকার হয়েছেন বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের নেতা-কর্মীরা। একটা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মাত্র দুই মাস হলো এ দুই দল সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থানে। ফলে দগদগে কালো ঘায়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে দুই দলের এক দল আরেক দলের সরকারের বিরুদ্ধে সেই গুমের অভিযোগ তুলবে, তা অনাকাঙ্ক্ষিতই বলতে হবে।

চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখলেন—রক্তচাপ ঠিক আছে, হার্টবিট নরমাল, নার্ভের কোনো সমস্যা নেই। অর্থাৎ জিসান মিয়া হানড্রেড পারসেন্ট ফিট। কিন্তু তিনি চোখ খুলবেন না। কারণ, চোখ খুললেই তো আদালতের কাঠগড়া, পুলিশি রিমান্ড আর দুনিয়ার তাবৎ ক্যামেরার ফোকাস!

কোনো যাচাই–বাছাই ছাড়া শুরুতেই দল বা সংগঠনের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এমন অভিযোগ, পরিস্থিতি ঘোলাটে করেছে বলা যায়। সরকার বা রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে গুম বা নির্যাতন যে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে বা আর কখনো হবে না, সেই সিদ্ধান্তে যাওয়াটা কোনোভাবেই উচিত হবে না। কিন্তু জিসান ইস্যুতে জামায়াত-শিবির দ্রুত যে প্রতিক্রিয়া জানাল, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। আর এতে কি গুমের মতো স্পর্শকাতর একটি অপরাধকেও গুরুত্বহীন করে তোলা হয় না?

এ ঘটনা নিয়ে সংসদেও মুখোমুখি হয় সরকার ও বিরোধী দল। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে হইচই দেখা যায়। জামায়াতের দাবি, কুমিল্লা পুলিশ জিসানের সঙ্গে কাউকে কথা বলতে দিচ্ছে না। যে নারীর কথা বলা হয়েছে, তাঁর সঙ্গেও কাউকে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। জামায়াতের সংসদ উপনেতা আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে মনে হচ্ছে যে উনারা একটা প্লট তৈরি করার জন্যই পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একই লাইনে আলোচনা করে এই কাজটি করছেন।’

শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে এ ঘটনায়। কারণ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার কোথাও জিসান মিয়ার নাম ও পদের বিষয়টি উল্লেখ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। যে কারণে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এসেছে, এই ঘটনা না ঘটলে জানাই যেত না যে জিসান নামে শিবিরের একজন কেন্দ্রীয় নেতা আছেন।  

তবে নাটকের ক্লাইম্যাক্স তখনো বাকি ছিল। লাকসাম থেকে যখন তাঁকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলো, জিসান দিব্যি সুস্থ মানুষের মতো পুলিশের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিন্তু ঠিক যে মুহূর্তে তাঁর কানে খবর পৌঁছাল যে ভুক্তভোগী নারী তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন’ আইনে মামলা ঠুকে দিয়েছেন, জিসান আর দেরি করলেন না। সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো এমন শক্ত করে বন্ধ করে ফেললেন, যা তিন দিনেও আর খোলানো যায়নি!

চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে দেখলেন—রক্তচাপ ঠিক আছে, হার্টবিট নরমাল, নার্ভের কোনো সমস্যা নেই। অর্থাৎ জিসান মিয়া হানড্রেড পারসেন্ট ফিট। কিন্তু তিনি চোখ খুলবেন না। কারণ, চোখ খুললেই তো আদালতের কাঠগড়া, পুলিশি রিমান্ড আর দুনিয়ার তাবৎ ক্যামেরার ফোকাস!

অবস্থা বেগতিক দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চার সদস্যের এক বিশাল ‘মেডিক্যাল বোর্ড’ গঠন করতে হয়েছে। সেখানে মেডিসিন, নিউরোলজি আর অ্যানেসথেসিয়ার ডাক্তারদের পাশাপাশি একজন ‘মনোরোগ বিশেষজ্ঞ’ও রাখা হয়েছে। অভিজ্ঞ ডাক্তাররা এখন জিসানের কেবিনে গিয়ে নাড়ি টিপে বোঝার চেষ্টা করছেন—এই চোখ বন্ধ রাখাটা কি কোনো স্নায়বিক রোগ, নাকি ‘ধরা খাওয়ার’ পর বাঙালির আদি ও অকৃত্রিম এক মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষাকবচ!

রাজনীতিতে কত ধরনের কৌশল আমরা দেখেছি। মিছিল, মানববন্ধন, অনশন, হরতাল, ঘেরাও—কত কী! কিন্তু ‘মামলা থেকে বাঁচতে চোখ বন্ধ করে থাকা’র এই অভিনব থেরাপি এর আগে দেশের মানুষ দেখেনি।

জিসান মিয়া হয়তো ভাবছেন, তিনি চোখ বন্ধ রাখলে চারপাশের এই পুলিশ, মামলা, আদালত আর সংবাদপত্রের ক্যামেরা—সব একনিমেষে উধাও হয়ে যাবে। কিন্তু জিসানকে মনে করিয়ে দিতে চাই কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সেই বিখ্যাত উটপাখির কবিতা: ‘তপন-তপ্ত বালুকায় শুষি নিজেরি রক্ত/তুমি ভেবেছ—অন্যেরা সব অন্ধ?’

জিসান ভাই, চোখ আপনি যতই বন্ধ রাখুন না কেন, মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট কিন্তু বলছে আপনার শরীর ও মন দুটোই সম্পূর্ণ ‘সুস্থ’। সুতরাং চোখটা এবার মেলুন। লাকসাম জংশনের নাটক শেষ, এবার আদালতের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময় হয়েছে!

যাক, এরই মধ্যে আমরা জানতে পারছি মেডিক্যাল বোর্ডের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জিসানের শারীরিক অবস্থা ‘ভালো’ বা ‘সুস্থ’ দেখে হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। তিনি বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে আছেন। যে কোনো সময় তাঁকে আদালতে তোলা হবে। সেখানে কি নাটকের অন্য ক্লাইম্যাক্স বের হয়ে আসবে, নাকি ভিন্ন কোনো সত্য আমরা জানব? দেখা যাক।

  • রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী।
    ই–মেইল: [email protected]
    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source