বাংলায় মাদ্রাসাশিক্ষার সূচনা ও প্রসার
· Prothom Alo

বাংলায় মাদ্রাসা শুধু ধর্মশিক্ষার ইতিহাস নয়; এটি একসময়ের জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশেরও ইতিহাস। মধ্যযুগের বাংলায় মাদ্রাসাগুলো শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। শিলালিপি ও ঐতিহাসিক সূত্রের আলোকে সেই ইতিহাস আলোচিত হয়েছে এই নিবন্ধে। প্রকাশিত হলো এর শেষ পর্ব
বাংলায় মাদ্রাসাশিক্ষার সূচনা ও প্রসার (১ম পর্ব)বাংলার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বহির্বিশ্বের ছাত্রদের আকর্ষণ করত, তেমনি বাংলার ছাত্ররাও খুরাসান, মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও আরব বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমাত। উল্লেখ্য, উপনিবেশিক আমল এবং স্বাধীনতা–পরবর্তীকালে বাংলার মুসলিম ছাত্ররা ইসলামি শিক্ষা ও গবেষণার জন্য উত্তর ভারতের কতগুলো বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গমনাগমন শুরু করে। এগুলোর অন্যতম ছিল অধুনালুপ্ত মাদ্রাসা রাহমানিয়া দিল্লি, দার আল-উলুম দেওবন্দ, মাযাহির আল-উলুম সাহারানপুর এবং নাদওয়াত আল-’উলামা লক্ষ্ণৌ এবং সর্বোপরি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়। উত্তর ভারতের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাগুলো থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্ররা বাংলায় ফিরে এসে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ দিত। আবার অনেকে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিত।
Visit esporist.org for more information.
যুগ যুগ ধরে নিত্যনতুন মাদ্রাসা গড়ে তোলার প্রক্রিয়াটি বাংলায় এখনো পুরোদস্তুর চালু আছে। ঐতিহ্যবাহী এসব মাদ্রাসায় যে নিয়মপদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম চালু ছিল, সাধারণভাবে তাকে আল-দারস আল-নিজামি বলা হতো। তার কারণ ১১ শতকে আব্বাসীয় খলিফাদের একজন বিখ্যাত মন্ত্রী নিজাম আল-মুলক প্রথমে বাগদাদে এবং পরে নিশাপুর ও খুরাসানে বিশেষ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করেন। পরবর্তীকালে তা আল-মাদ্রাসা আল-নিজামিয়া নামে খ্যাতি লাভ করে। একপর্যায়ে নিজামিয়া পাঠ্যক্রম ইসলামি বিশ্বে প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো এখন দারস-ই-নিজামি নামে পরিচিত।
অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ার মাদ্রাসাগুলোয় আওরঙ্গজেবের সময় থেকে এক বিশেষ পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হতো। এর উদ্যোক্তা ও প্রবক্তা ছিলেন মোল্লা নিজাম আল-দীন। উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাগুলোয় প্রচলিত পাঠ্যক্রম তাঁর নামেই নিজামি পাঠ্যক্রম নামে খ্যাত। এই পাঠ্যক্রমে হানাফি ফিকহ ঘরানার ওপরে বিশেষ গুরুত্ব অর্পণ করা হয়েছে। বস্তুত আগের যুগে মাদ্রাসাগুলোয় শাস্ত্রীয় শিক্ষাদীক্ষা ছাড়াও জ্ঞান–বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হতো। এককথায়, বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যা করে থাকে, সে যুগের মাদ্রাসাগুলো ঠিক একই ধরনের ভূমিকা পালন করত।
যত দূর জানা যায়, মক্তব–মাদ্রাসাগুলো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণিনির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল।১ ঔপনিবেশিক শাসনের আগমনের পরও এ ধারা চালু ছিল। উদাহরণস্বরূপ ফরিদপুর জেলার, তথা পূর্ববঙ্গের বৈষ্ণবপন্থী মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুর (জন্ম ১৩ মার্চ ১৮৪৬) নিম্নবর্ণের হিন্দু হওয়ায় কোনো টোলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে লেখাপড়া শিখেছিলেন।
১৮৩৫ সালে মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান ও বীরভূম জেলায় এক জরিপে স্কটিশ শিক্ষাবিদ ও জরিপকারী উইলিয়াম অ্যাডাম দেখতে পান যে এ ধরনের মাদ্রাসা ও আরবি-ফারসি বিদ্যালয়গুলোয় ৭৮৬ জন মুসলিম ছাত্রের পাশাপাশি ৭৮৪ জন হিন্দু ছাত্র ভর্তি ছিল।২ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় সে ধারা আজও টিকে আছে। সেখানে হাই (উচ্চ) মাদ্রাসায় মুসলমানদের পাশাপাশি অমুসলিম শিক্ষার্থীরাও ভর্তি হয়ে থাকে। মধ্যযুগের বাংলায় সাক্ষরতা যে কেবল মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীর হাতে কুক্ষিগত ছিল, তা মনে করা হয়তো–বা ঠিক হবে না। যদি সংস্কৃত, আরবি (বা ফারসি) বর্ণমালা শেখাকে একধরনের বিকল্প সাক্ষরতার ধারা হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে পল্লি অঞ্চল, গ্রামগঞ্জ ও শহরে গড়ে ওঠা মসজিদ বা মক্তব ইত্যাদির মাধ্যমে এ ধরনের সাক্ষরতা যথেষ্ট প্রসারিত ছিল। শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ মক্তবে আরবি-ফারসি লেখাপড়া শেখার পর উচ্চশিক্ষার জন্য মাদ্রাসায়ও ভর্তি হতো। এই শিক্ষিত শ্রেণির অনেকেই পরে আরও কার্যকর ও বড় ভূমিকা রাখার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিংবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংস্কৃত (এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাও) শিখে নিত। মধ্যযুগের বাংলায় আরবি ও ফারসি ভাষা ধর্ম ও ভৌগোলিক বা জাতিগত পরিচয়–নির্বিশেষে একটি সাংস্কৃতিক বাহক হিসেবে চালু ছিল। এ অঞ্চলে পাওয়া শিলালিপিগুলো অন্তত সে রকমই সাক্ষ্য দেয়। উনিশ শতকের গোড়া পর্যন্ত অন্তত এ ধারাই বহাল ছিল।
মধ্যযুগে বাংলায় মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্রমবিকাশের মানচিত্রআলিয়া মাদ্রাসা ঔপনিবেশিক প্রশাসনের হাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে প্রথম দিকে মুসলিম সমাজের অনেকেই এর প্রতি বিরূপ ছিলেন। তা সত্ত্বেও ক্রমে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে এর জনপ্রিয়তা আরও বেশি।
ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম হওয়ার পর ইংরেজি এসে ক্রমেই এ দুই ভাষার স্থান দখল করে। আরবি ও ফারসি ভাষায় দখল রাখা সে যুগে আভিজাত্যের একটি পরিচয় ছিল। বাঙালি হিন্দুদের বড় একটি অংশ চাকরির উদ্দেশ্যে সে সময়ের সরকারি ভাষা ফারসি (এবং অনেক ক্ষেত্রে আরবি) গভীর আগ্রহ নিয়ে শিখতেন। যেমন আওরঙ্গজেবের আমলে লালা রাজমল নামের একজন সরকারি কর্মচারী ফারসি ভাষায় খুব উচ্চাঙ্গের সুললিত কবিতায় একটি সেতুর স্মারকলিপি খোদাই করেন এবং শিলালিপিটিকে (১১০২ হিজরি/ ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দ) ঢাকার অদূরে চাঁপাতলীর সেতুতে স্থাপন করেন। মধ্যযুগের বাংলার শিলালিপিগুলোতে সে যুগে বিদ্যমান ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও সহিষ্ণুতার ইঙ্গিতও যথেষ্ট পাওয়া যায়।
১৮৫৭ সালে স্বাধীনতাসংগ্রামের পর ওলামাদের এক বড় অংশ নিজেদের ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষা একটি সংকীর্ণ গণ্ডির আওতায় গুটিয়ে আনেন। এর মুখ্য কারণ ছিল ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাদের সশস্ত্র আন্দোলনের শোচনীয় ব্যর্থতা। শিক্ষার অস্ত্রে বলীয়ান হয়ে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে মাঠে নামাকেও তারা জিহাদের একটি অন্যতম বিকল্প পন্থা হিসেবে দেখেছিল।
মাদ্রাসাগুলোর দুরবস্থার বহু কারণ ছিল। মাদ্রাসাগুলোর মুখ্য অর্থনৈতিক উৎস ছিল রাজা-বাদশাহ ও সুলতানদের ওয়াক্ফ করা সম্পত্তি। ১৮২৮ সালের দিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি নতুন আইন প্রবর্তন করে মাদ্রাসাগুলোর ওয়াক্ফ করা সম্পত্তিগুলো বাজেয়াপ্ত করে। এরপরের ধাক্কাটি আসে ১৮৪৪ সালে লর্ড হার্ডিঞ্জের সময়ে। তিনি মাদ্রাসা থেকে পাস করা শুধু আরবি ও ফারসি ভাষায় দক্ষতা অর্জনকারী শিক্ষিত যুবকদের সরকারি চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিধিনিষেধ আরোপ করে তাদের উপার্জনের পথ বন্ধ করে দেন। এর ফলে মাদ্রাসার স্নাতকোত্তর যুবকেরা ইসলামি আইনবিশারদের ‘কাজি’ পদটিতে আবেদন করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। নতুন প্রবর্তিত নিয়মে ‘কাজি’ পদে আবেদন করার জন্য ব্রিটিশ আইনের সম্যক জ্ঞান অর্জনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।
এ সত্ত্বেও ঔপনিবেশিক শক্তি স্থানীয় লোকাচার, দেশীয় আইন, সংস্কৃতি, এমনকি মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে সক্ষম হয়নি। বরং তাদের প্রশাসনিক স্বার্থে একপর্যায়ে তারাও নতুন ধরনের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভব করতে শুরু করে। প্রায় ২০০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনামলের প্রথম পর্যায়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্বকালে ভারতীয় ভাষা, সাহিত্য, আচার, সংস্কার, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ভারততত্ত্বের প্রতি সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭৩-৮৪ খ্রিষ্টাব্দ)। ১৭৮১ সালে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই পরে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা নামে খ্যাতি লাভ করে। অতিসম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি আলিয়া ইউনিভার্সিটি নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানে চিরাচরিত ধর্মশাস্ত্রের পাঠ্যক্রম ছাড়াও নিত্যনতুন আধুনিক জ্ঞান–বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম সংযোজিত হতে থাকে। ফলে একদিকে যেমন এখানে আরবি ও ফারসির ওপর জোর দেওয়া হয়, তেমনিভাবে এখানে পড়ানো হয় ইংরেজি, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য।
আলিয়া মাদ্রাসা ঔপনিবেশিক প্রশাসনের হাতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে প্রথম দিকে মুসলিম সমাজের অনেকেই এর প্রতি বিরূপ ছিলেন। তা সত্ত্বেও ক্রমে এর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে আলিয়া মাদ্রাসাগুলো জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে এর জনপ্রিয়তা আরও বেশি। এখানে সর্বত্র ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন আকারের ও পরিধির আলিয়া মাদ্রাসা। এসব মাদ্রাসা বাংলার প্রান্তিক জনগণের এক বিরাট অংশের শিক্ষাঘাটতিজনিত সমস্যাগুলো সম্পূর্ণভাবে দূর করতে না পারলেও কিছুটা নিবারণ অবশ্যই করেছে।৩
সুলতানী আমলের একটি ধ্বংসপ্রায় মাদ্রাসা‘সুলতান’ শব্দটি এখন পর্যন্ত জুমার নামাজের পঠিত আরবি খুতবার একটি অংশবিশেষ হিসেবে রয়ে গেছে। এটি শুধু সে যুগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাগাড়ম্বরের স্মৃতিটুকুই বহন করে। কোনো এক কালে সুলতানেরা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং জনসমর্থন অর্জনের জন্য সুকৌশলে আল-সুলতান জিল্ল-আল্লাহ ‘সুলতান দুনিয়ায় আল্লাহর ছায়া, যে সুলতানের অসম্মান করবে, আল্লাহ তার অসম্মান করবেন’ কথাটি জুমার খুতবায় চালু করেছিলেন। আজও সেটি যথারীতি খুতবায় উচ্চারিত হয়।
বর্তমান যুগে অগ্রসর বিদ্যাচর্চাকে অবহেলা করে মাদ্রাসাশিক্ষার প্রাচীন পাঠ্যক্রমগুলোর মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখে টিকে থাকা যে অসম্ভব, আলেম–সমাজ তা অনুধাবন করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ধর্মের ক্ষেত্রেও যে যুক্তি, মননশীলতা, জ্ঞান–বিজ্ঞান ও তর্কবিতর্কের অবকাশ রয়েছে, তার এক নীরব সাক্ষী অতীতের মাদ্রাসার পাঠ্যক্রম, যেখানে যুক্তিবিজ্ঞান ও তর্কশাস্ত্র (মানতেক), দর্শন (ফালসাফা), স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা ও নিত্যনতুন সমস্যাগুলোর সৃজনশীল সমাধান (ইজতেহাদ) ইত্যাদি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হতো। ক্রমেই সেসবের জায়গা নিয়েছে অন্ধবিশ্বাস ও পুরোনো প্রথা, শ্রুতি ও স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল জ্ঞান আঁকড়ে ধরে রাখার স্থূল প্রবণতা (তাকলিদ)। এর এক লক্ষণীয় উদাহরণ ‘সুলতান’ শব্দটির ধর্মীয় উপস্থিতি, যা মধ্যযুগীয় শাহি দরবারের জাঁকজমকপূর্ণ রাজকীয় সংস্কৃতির প্রতীক ছিল। ‘সুলতান’ শব্দটি এখন পর্যন্ত জুমার নামাজের পঠিত আরবি খুতবার একটি অংশবিশেষ হিসেবে রয়ে গেছে। এটি শুধু সে যুগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাগাড়ম্বরের স্মৃতিটুকুই বহন করে। কোনো এক কালে সুলতানেরা নিজেদের কায়েমি স্বার্থ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এবং জনসমর্থন অর্জনের জন্য সুকৌশলে আল-সুলতান জিল্ল-আল্লাহ ‘সুলতান দুনিয়ায় আল্লাহর ছায়া, যে সুলতানের অসম্মান করবে, আল্লাহ তার অসম্মান করবেন’ কথাটি জুমার খুতবায় চালু করেছিলেন। আজও সেটি যথারীতি খুতবায় উচ্চারিত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার কোনো কোনো অঞ্চলে এই আরবি বাক্যকে খুতবার অপরিহার্য অংশ বলে মনে করা হয়।
কোরআন ও সুন্নাহতে (হাদিসে) ন্যায়ানুগ শাসক, অর্থাৎ প্রকৃত সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বকে মানবজাতির জন্য আশীর্বাদস্বরূপ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও ‘সুলতান দুনিয়ায় আল্লাহর ছায়া’—ঠিক এ কথা ইসলামের আদি উৎসগুলোয়, অর্থাৎ কোরআন ও হাদিসে—খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আরব–বিশ্বের কোথাও খুতবায় এটি উচ্চারিত হয় না।
মুসলিম বিশ্বের মাদ্রাসা কার্যক্রম—যা একসময় পুরোনো বিশ্বের এক বিরাট এলাকাজুড়ে শিক্ষার আলো জ্বালাতে পেরেছিল—ক্রমেই তার জৌলুশ হারাতে শুরু করেছে, প্রাচীন শাস্ত্রীয় শিক্ষার কঙ্কালসার কাঠামোটিকে কোনোমতে টিকিয়ে রাখছে। উন্নত বিশ্বের প্রথম শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ধর্মীয় বিষয়াদির বিদ্যায়তনিক শিক্ষা, গবেষণা ও উচ্চতর জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নির্মোহ ও গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়।
মজার ব্যাপার হলো, বহু শতাব্দী আগে সুলতানি শাসনব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটলেও এ ধরনের বাক্য পাঠের প্রথা বিলোপ করার উদ্যোগ আজ পর্যন্ত এ অঞ্চলে নেওয়া হয়নি। বিনা প্রশ্নে ও নির্দ্বিধায় কথাটি চালু রাখাটা মূলত রক্ষণশীল ও গোঁড়া ধরনের কিছু লোকের অন্ধভক্তি ও প্রবণতার ফল। এ ধরনের প্রবণতা আত্মিক, আধ্যাত্মিক, ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথে অন্তরায়।
মুসলিম বিশ্বের মাদ্রাসা কার্যক্রম—যা একসময় পুরোনো বিশ্বের এক বিরাট এলাকাজুড়ে শিক্ষার আলো জ্বালাতে পেরেছিল—ক্রমেই তার জৌলুশ হারাতে শুরু করেছে, প্রাচীন শাস্ত্রীয় শিক্ষার কঙ্কালসার কাঠামোটিকে কোনোমতে টিকিয়ে রাখছে। উন্নত বিশ্বের প্রথম শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ধর্মীয় বিষয়াদির বিদ্যায়তনিক শিক্ষা, গবেষণা ও উচ্চতর জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে নির্মোহ ও গবেষণামূলক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়। এর ফলে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সায়েন্টিফিক স্টাডি অব রিলিজিয়ন ধারার জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ ধরনের যুগোপোযোগী ধারার ধর্মশিক্ষা মাদ্রাসাশিক্ষাব্যবস্থাকেও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
সূত্র:
১. মুজাফফার আলম, ‘দ্য কালচার অ্যান্ড পলিটিকস অব পার্সিয়ান ইন প্রিকলোনিয়াল হিন্দুস্তান’, লিটারারি কালচারস ইন হিস্ট্রি: রিকনস্ট্রাকশনস ফ্রম সাউথ এশিয়া, সম্পাদনা: শেল্ডন পুলক, বার্কলে ও লস অ্যাঞ্জেলেস: ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, ২০০৩, ১৩১-৯৮।
২. ‘রিপোর্ট অব দ্য বেঙ্গল প্রভিনশিয়াল কমিটি অব দ্য এডুকেশন কমিশন’, দ্বিতীয় অংশ, কলকাতা: ১৮৮৬, অনুচ্ছেদ ১৮৩, ‘সিলেকশনস ফ্রম দ্য রেকর্ডস অব গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া’, নম্বর ২০৫, ২৪১, ‘বেঙ্গল এডুকেশনাল এনডাউমেন্ট কমিটি রিপোর্ট’, কলকাতা, ১৮৮৮।
৩. শিক্ষাবিস্তারে মাদ্রাসার ভূমিকা ব্যাপক। বাংলায় নবজাগরণের আগে থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে। এমনকি আজও পশ্চিমবঙ্গের বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলের হিন্দু-মুসলিম সর্বস্তরের ছাত্রছাত্রীরা মাদ্রাসায় শিক্ষা লাভ করে।
মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক: বঙ্গীয় শিল্পকলাচর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের অতিথি অধ্যাপক, হার্ভার্ড ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ফেলো