নেতানিয়াহু নির্মমভাবে হেরে গেছেন, এখন তাঁকে সরে দাঁড়াতেই হবে

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ থামানোর জন্য গত সপ্তাহে যে প্রাথমিক চুক্তি হয়েছে, তাতে সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মধ্যপ্রাচ্যকে খাদের কিনারে ঠেলে দেওয়া এক খলনায়ক হিসেবেই তিনি ইতিহাসে নিন্দিত হয়ে থাকবেন। প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইসরায়েলি এই নেতার ‘সমাধান’ ছিল সব সময় একটাই—চরম এবং বেআইনি সহিংসতা।

Visit afrikasportnews.co.za for more information.

ইরানের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে এই অবৈধ যুদ্ধ ঘোষণা ছিল নেতানিয়াহু নীতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবেই তা ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন মরিয়া হয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে ভার্সাইয়ে তিনি যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন, তা কোনো কাপুরুষোচিত আত্মসমর্পণ নয়। কিন্তু বিশ্বজুড়ে সংশয় ও উপহাসের মুখে পড়েও ট্রাম্প হয়তো এই রাজনৈতিক লজ্জা কোনোমতে এড়াতে পারবেন। তবে নেতানিয়াহুর জন্য এর পরিণতি হতে যাচ্ছে চরম বিপর্যয়কর।

ট্রাম্প যেভাবে নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নষ্ট করে দিলেন

তাঁর রাজনৈতিক খতিয়ান এখন একটি অপরাধনামার মতো শোনায়। কয়েক দশক ধরে নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের (দুই রাষ্ট্রনীতি) বিরোধিতা করে এসেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের ভয়াবহ হামলা ঠেকাতে তিনি ব্যর্থ হন আর এরপর গাজায় চালান নির্বিচার গণহত্যা। কট্টর ডানপন্থীদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে বসিয়ে তিনি ক্ষমতা আঁকড়ে ধরেছিলেন, যা তাঁর দেশের জন্য চিরস্থায়ী লজ্জা ও গ্লানি বয়ে এনেছে। তিনি ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত পরমাণু চুক্তিটিকে দুর্বল করে দিয়েছিলেন। এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবেই ধেয়ে এসেছে চলতি বছরের এই বিপর্যয়কর সংঘাত।

তবে আসন্ন নির্বাচন ঘনিয়ে আসার মুখেও নেতানিয়াহু যে নিশ্চিত রাজনৈতিক পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, তার মূল কারণ ওপরের কোনোটিই নয়। এর আসল কারণ হলো, তিনি ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘বিশেষ সম্পর্ক’ বিষাক্ত এবং মারাত্মকভাবে দুর্বল করে ফেলেছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এখন একে অপরের সঙ্গে কথাই বলছেন না।

মার্কিন জনগণ ও হোয়াইট হাউস—সবাই এখন নেতানিয়াহুকেই দোষারোপ করছেন। তাঁদের ধারণা, খুব সহজে জয় ও ইরানের শাসনব্যবস্থা পতনের চটকদার গল্প শুনিয়ে নেতানিয়াহুই যুক্তরাষ্ট্রকে এই অন্তহীন যুদ্ধে টেনে এনেছেন। আর এখন যখন শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসেছে, তখন লেবাননে যুদ্ধ চালিয়ে গিয়ে নেতানিয়াহু সেই শান্তিপ্রক্রিয়া নস্যাৎ করছেন বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন।

এই ভাঙনের সম্ভাব্য পরিণতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এটি হয়তো ইসরায়েলের একাধিপত্যের অবসান ঘটাবে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান পরাশক্তি হিসেবে নেতানিয়াহুর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়ার স্বপ্ন এবং আমেরিকার নিঃশর্ত সামরিক সহায়তার দিন হয়তো এখানেই শেষ। এটি সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ সম্প্রসারণের আশাকেও ধূলিসাৎ করতে পারে। ট্রাম্পের অন্যায্য গাজা ‘শান্তি পরিকল্পনা’ও চিরতরে মুখথুবড়ে পড়বে।

১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের জন্মের পর থেকে এই দুই দেশের মধ্যে বহুবার বিরোধ হয়েছে—১৯৫৬ সালে সুয়েজ সংকট, আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, শান্তি পরিকল্পনা, সীমানা কিংবা বসতি স্থাপন নিয়ে। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, অভিন্ন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জেরে তাদের কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থ একসুতায় গেঁথে যায়। ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তা হু হু করে বাড়তে থাকে, একই সঙ্গে ওয়াশিংটনে শক্তিশালী হতে থাকে ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপগুলো। যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে ইসরায়েলের প্রধান রক্ষাকর্তা আর ইসরায়েল হয় মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান সহযোগী।

এই ঐকমত্যে প্রথম ফাটল ধরে ২০১৫ সালে, যখন বারাক ওবামার ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা রুখে দিতে নেতানিয়াহু এবং আমেরিকার ইসরায়েলপন্থী সংগঠনগুলো এক বিশাল প্রচারণায় নামে।

হ্যারেটজ পত্রিকার কলামিস্ট জোশুয়া লেইফার লিখেছেন, ‘ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপগুলোর সেই আক্রমণ পরমাণু চুক্তি ঠেকাতে পারেনি। উল্টো তারা আমেরিকার রাজনীতিতে তাদের এত দিনের দ্বিপক্ষীয় মুখোশটি চিরতরে উন্মোচন করে ফেলে। তারা প্রকাশ্যেই রিপাবলিকান পার্টির একটি অঙ্গসংগঠন হিসেবে কাজ করা শুরু করে।’

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এই রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও গভীর করে। তিনি ফিলিস্তিনিদের অবজ্ঞা করেন, মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করেন এবং গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি দেন। লেইফার উল্লেখ করেছেন, ‘যেকোনো ফিলিস্তিপন্থী অ্যাকটিভিস্টের চেয়ে ট্রাম্প সাধারণ ডেমোক্র্যাটদের ইসরায়েল থেকে দূরে সরিয়ে দিতে বেশি ভূমিকা রেখেছেন।’

‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ ছাড়া ইরানের সঙ্গে চুক্তি নয়: কী এক বিস্ময় উপহার দিলেন ট্রাম্প

পরবর্তী সময়ে নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, ভূখণ্ড সম্প্রসারণের উগ্র নীতি এবং গাজা, লেবানন ও সবশেষ ইরানের সঙ্গে ব্যর্থ যুদ্ধ—এই ফাটলকে আরও চওড়া করেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে এক অভাবনীয় চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইতিহাসে এই প্রথম ইসরায়েলিদের চেয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি মার্কিন নাগরিক সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। তাঁরা ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা বন্ধ বা সীমিত করার দাবি জানাচ্ছেন। মজার ব্যাপার হলো, এই সমালোচনা এখন শুধু বামপন্থী প্রগতিশীলদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, ট্রাম্পের ‘মাগা’ সমর্থকদের মধ্য থেকেও এই আওয়াজ উঠছে।

নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্পের গালিগালাজপূর্ণ ব্যক্তিগত আক্রমণের খবর যদি সত্যি হয়, তবে তা দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাসের চরম ধসেরই প্রমাণ। আর এটার স্থায়ী ভূরাজনৈতিক পরিণতি হতে পারে। নেতানিয়াহু এমন কিছু করেছেন, যা তাঁর পূর্বসূরিরা করতে পারেননি: আমেরিকাকে এক পুরোদস্তুর যুদ্ধে টেনে নিয়ে এসেছেন এবং তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার এক গভীর কৌশলগত ফাটলের কেন্দ্রে।

ট্রাম্পের এই ইরান চুক্তি অনেক ইসরায়েলিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে এবং তা কেবল ডানপন্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই যুদ্ধ সাধারণ ইসরায়েলিদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিল। কারণ, নেতানিয়াহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি চিরতরে শেষ করবেন, হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি বাহিনীকে গুঁড়িয়ে দেবেন এবং তেহরানে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটাবেন। এর একটি লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। উল্টো ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার এখন আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে।

গত সপ্তাহে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের পর ট্রাম্প কার্যত নেতানিয়াহুর সব ‘লাল রেখা’কে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দিতে হবে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাখার অধিকার তাদের রয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অংশ হিসেবে ইরানের ফ্রিজ হওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র লেবাননে অবিলম্বে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স অত্যন্ত কড়া ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ বন্ধ করে লাইনে আসার নির্দেশ দিয়েছেন।

নেতানিয়াহু এখন কোণঠাসা। তিনি যদি ট্রাম্পের নির্দেশ অমান্য করে নিজের সার্বভৌম ক্ষমতা দেখাতে যান, তবে ইরান হয়তো আবারও যুদ্ধ শুরু করবে এবং শান্তিচুক্তি ভেস্তে যাবে। গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলার কারণে তেহরান আলোচনা থেকে পিছিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে দুই পক্ষ আগের যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু নেতানিয়াহু যদি ট্রাম্পের এই হুকুম মুখ বুজে মেনে নেন, বিশেষ করে লেবানন থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে, তবে কট্টর ডানপন্থী মিত্র এবং ভোটারদের কাছে তাঁর আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।

এই ভাঙনের সম্ভাব্য পরিণতি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এটি হয়তো ইসরায়েলের একাধিপত্যের অবসান ঘটাবে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান পরাশক্তি হিসেবে নেতানিয়াহুর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়ার স্বপ্ন এবং আমেরিকার নিঃশর্ত সামরিক সহায়তার দিন হয়তো এখানেই শেষ। এটি সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ সম্প্রসারণের আশাকেও ধূলিসাৎ করতে পারে। ট্রাম্পের অন্যায্য গাজা ‘শান্তি পরিকল্পনা’ও চিরতরে মুখথুবড়ে পড়বে। আর এটিই হতে পারে ইরানের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে মূল ধারায় ফেরার মুহূর্ত।

ইরানের বিরুদ্ধে বিজয় পাওয়ার আশায় নেতানিয়াহু জুয়া খেলেছিলেন এবং তিনি তাতে নির্মমভাবে হেরে গেছেন। এখন এই ধ্বংসযজ্ঞের দায় তাঁকেই নিতে হবে। আর কোনো অজুহাত বা অশান্তি তৈরি না করে তাঁকে পদত্যাগ বা সরে দাঁড়াতে হবে।

সাইমন টিসডাল গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক কলামিস্ট।

গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।

Read full story at source