‘কিছু বুঝে ওঠার আগেই বালুদস্যুরা আমাকে ট্রাকচাপা দেয়, যন্ত্রণা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি’
· Prothom Alo

অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে অভিযানে গিয়ে ট্রাকচাপায় গুরুতর আহত হন বন কর্মকর্তা তারিকুর রহমান। এ ঘটনার দেড় বছরেও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি। চিকিৎসায় তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা। তবে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি এখন জামিনে মুক্ত।
Visit chickenroad-game.rodeo for more information.
রাত তখন ৯টা। দুর্গম পাহাড়ি বনটিতে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। টর্চলাইটের আলো জ্বালাতেই ধরা পড়ে বালুভর্তি একটি ট্রাক। এসব বালু বনের ছড়া থেকে অবৈধভাবে তোলা হয়েছিল। পরে ট্রাকটিকে থামার জন্য সংকেত দেন বন কর্মকর্তারা। ট্রাকের রাস্তা আটকে সামনেও দাঁড়ান একজন। তবে ট্রাক থামেনি। উল্টো ওই বন কর্মকর্তাকে চাপা দিয়ে পালান চালক।
গত বছরের ১৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট রেঞ্জের কয়লাঝিলতলী এলাকায় বন বিভাগের অভিযানে এ ঘটনা ঘটে। ট্রাকচাপায় রেঞ্জ সহযোগী কর্মকর্তা তারিকুর রহমান (৪৮) গুরুতর আহত হন। এতে তাঁর ঊরুর হাড় ভেঙে যায়। এর পর থেকেই তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এখনো তিনি সুস্থ হননি। তবে এ ঘটনায় জড়িত দুজন গ্রেপ্তার হলেও তাঁরা জামিনে বাইরে। আর তারিকুর চিকিৎসা ছুটিতে রয়েছেন।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সেদিন সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাহাদী হাসানের নেতৃত্বে আট সদস্যের একটি দল অভিযানে যায়। দলে ছিলেন সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা তারিকুর রহমানসহ আটজন। অভিযানে ব্যবহারের জন্য তাঁদের সঙ্গে একটি চায়নিজ রাইফেল ও দুটি শটগান ছিল। ওই দিন চালক গতি কমানোর বদলে ট্রাকটি তারিকুরের ওপর তুলে দেন। মুহূর্তেই সড়কের পাশের জমিতে ছিটকে পড়েন তিনি। পরদিন হাসপাতালে তাঁর জ্ঞান ফেরে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বালুভর্তি ট্রাকটি তারিকুর রহমানকে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। কিছু দূর গিয়ে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ট্রাকটি আটকে যায়। এ সময় চালক পালিয়ে গেলেও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করেন বনকর্মীরা। ঘটনার পর সহকর্মীরা আহত তারিকুর রহমানকে উদ্ধার করে করেরহাট রেঞ্জ কার্যালয়ে নিয়ে যান। পরে গভীর রাতে তাঁকে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
জানতে চাইলে করেরহাট রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাহাদী হাসান বলেন, ঘটনার পরদিন রেঞ্জের ফরেস্টের ও স্টেশন কর্মকর্তা মোনায়েম হোসেন বাদী হয়ে বন আইনে একটি মামলা করেন। মামলায় মো. নুর উদ্দিন (৪৮) ও মো. আবদুল নামের দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। তবে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজন আসামিই এখন জামিনে মুক্ত।
চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের বাসিন্দা তারিকুর রহমান। ছোটবেলা থেকেই গাছপালা ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, তাঁর দাদা সুলতান আহমদ মৌসুমে বাজার থেকে ফল কিনে ফেরার পথে বীজ ছড়িয়ে দিতেন রাস্তার ধারে। সেই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া গাছ দেখে বড় হয়েছেন তারিকুর। সেখান থেকেই বন ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর।
১৯৯৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পাসের পর তিনি ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রিতে ভর্তি হন। ২০০৩ সালে তিন বছর মেয়াদি কোর্স সম্পন্ন করেন। ২০০৪ সালের নভেম্বরে বন বিভাগে যোগ দেন। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনের পর আড়াই বছর আগে মিরসরাইয়ের করেরহাট রেঞ্জে যোগ দেন তিনি। পদ শূন্য থাকায় কিছু সময় ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেছেন।
তারিকুর রহমান, রেঞ্জ সহযোগী কর্মকর্তা, বন বিভাগ, করেরহাট, মিরসরাই‘এখন চিকিৎসার খরচ, সন্তানের লেখাপড়া, বাসাভাড়া ও সংসারের নিত্য খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। আমি চাই, আমার এই দুঃসময়ে বন বিভাগ পাশে দাঁড়াক।’তারিকুর রহমান বলেন, কিছু বুঝে ওঠার আগেই বালুদস্যুরা তাঁকে ট্রাকচাপায় দেয়। এ ঘটনার পর একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে তাঁকে। অস্ত্রোপচার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিয়েও তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত চিকিৎসায় প্রায় ১২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর বড় অংশ জোগাড় করতে হয়েছে স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে ও ধারদেনা করে। বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা অনুদান পেয়েছেন। এর বাইরে চিকিৎসার জন্য আর কোনো সহায়তা পাননি।
তারিকুর রহমানের স্ত্রী শাহিনুর আক্তার গৃহিণী। তাঁদের দুই ছেলে আহনাফ শাহরিয়ার ও ইয়ানুর রহমান স্কুলে পড়াশোনা করছে। পরিবার নিয়ে তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। গ্রামের বাড়িতে থাকা বৃদ্ধ মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্বও তাঁর ওপর। তারিকুর রহমান বলেন, ‘এখন চিকিৎসার খরচ, সন্তানের লেখাপড়া, বাসাভাড়া ও সংসারের নিত্য খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। আমি চাই, আমার এই দুঃসময়ে বন বিভাগ পাশে দাঁড়াক।’
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩০ হাজার একর সংরক্ষিত বন নিয়ে গঠিত করেরহাট রেঞ্জ। এখানে রয়েছে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর পুরোনো সেগুন বাগান। এ ছাড়া গর্জন, তেলসুর, ডাকি জাম, চম্পা, চাপালিশ, কদমসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ এবং বাঁশের ঝাড় রয়েছে।
বনাঞ্চলটি পাহাড়ি হওয়ায় মূল্যবান গাছের পাশাপাশি বালু লুটের চক্রও সক্রিয়। ফলে এ রেঞ্জে বন সংরক্ষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নিয়মিত নানা ঝুঁকির মুখে কাজ করতে হয়। বন কর্মকর্তাদের দাবি, গত বছরের ৫ আগস্টের পরেও সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ ও বালু লুটের প্রবণতা বেড়েছে। এসব রোধে তারিকুর কঠোর ছিলেন। একাধিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ বালু জব্দ করা হয়। এতে অবৈধ বালু ও কাঠ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো তারিকুরের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও উপবন সংরক্ষক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘আমি সম্প্রতি অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করলে বিভাগীয়ভাবে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যায়, তা দেখা হবে। বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবরও নেব।’