আমের টক বা মিষ্টি স্বাদ তৈরি হয় কীভাবে
· Prothom Alo
গ্রীষ্মকালে ফলের দোকানের সামনে দাঁড়ালে একটি মজার দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। একজন বলছেন, ‘হিমসাগরের মতো মিষ্টি আর কিছু হয় না।’ পাশের আরেকজনের মত ভিন্ন। তাঁর মতে, ‘মিষ্টি হলেই হবে না, আমে গন্ধও থাকতে হবে।’ আবার কেউ খুঁজছেন সামান্য টক ভাব, যা আমের স্বাদকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
Visit bettingx.club for more information.
আসলে আমের স্বাদ বলতে আমরা ঠিক কী বুঝি?
শুধু মিষ্টতা নয়। টক ভাব, সুগন্ধ, মুখে লেগে থাকা অনুভূতি; সবকিছু মিলেই তৈরি হয় একটি আমের স্বাদ। এর পেছনে কাজ করে বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া।
আম কতটা স্বাস্থ্যকরসব আম সমান মিষ্টি হয় না। আম্রপালি, বারি-৪ বা কিছু আধুনিক জাতের আমে সাধারণত চিনির পরিমাণ বেশি পাওয়া যায়। অন্যদিকে কিছু আমে মিষ্টতার চেয়ে স্বাদের ভারসাম্য বেশি গুরুত্ব পায়।
মিষ্টতা ও টক ভাবের রসায়ন
আমের মিষ্টতার গল্প শুরু হয় স্টার্চ বা শ্বেতসার দিয়ে। কাঁচা অবস্থায় আমের মধ্যে প্রচুর শ্বেতসার জমা থাকে। ফল যত পাকতে থাকে, এই স্টার্চ ধীরে ধীরে ভেঙে চিনি তৈরি হয়। সহজভাবে বললে, আম পাকার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের জমাট শক্তি ধীরে ধীরে মিষ্টিতে বদলে যায়। এ কারণেই গাছ থেকে সদ্য পাড়া কাঁচা আম এবং কয়েক দিন পরের পাকা আমের স্বাদের মধ্যে এত বড় পার্থক্য দেখা যায়।
তবে সব আম সমান মিষ্টি হয় না। আম্রপালি, বারি-৪ বা কিছু আধুনিক জাতের আমে সাধারণত চিনির পরিমাণ বেশি পাওয়া যায়। অন্যদিকে কিছু আমে মিষ্টতার চেয়ে স্বাদের ভারসাম্য বেশি গুরুত্ব পায়।
কিন্তু শুধু চিনি বেশি হলেই কি একটি আমকে সুস্বাদু বলা যায়? সব সময় নয়। ধরুন, আপনি খুব মিষ্টি একটি আম খেলেন। প্রথম কয়েক টুকরো ভালো লাগবে ঠিকই। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই একই স্বাদ একটু ভারী বা একঘেয়ে মনে হতে পারে। এখানেই আসে টক ভাবের ভূমিকা।
কাঁচা অবস্থায় আমের মধ্যে প্রচুর শ্বেতসার জমা থাকেআমের মধ্যে থাকা বিভিন্ন জৈব অম্ল বা অর্গানিক অ্যাসিড এই টক স্বাদ তৈরি করে। কাঁচা আমে এগুলো বেশি থাকে, তাই তখন টক লাগে বেশি। পাকার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর পরিমাণ কমে যায়, কিন্তু একেবারে হারিয়ে যায় না। মজার ব্যাপার হলো, এই সামান্য টক ভাবই অনেক সময় পুরো স্বাদকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলে। শুধু মিষ্টি ও একটু ভারসাম্যপূর্ণ টকের কারণেই আম খেতে এত ভালো লাগে।
ফল গবেষণায় সাধারণত দেখা যায়, চিনি ও অম্লতার অনুপাত খুব গুরুত্বপূর্ণ। একদম সহজ করে বললে, শুধু মিষ্টি বাড়লেই ভালো স্বাদ হয় না, আবার শুধু টক থাকলেও না। মাঝামাঝি একটা ভারসাম্যই মানুষ বেশি পছন্দ করে।
আম গবেষণার পীঠস্থানআমের মধ্যে থাকা বিভিন্ন জৈব অম্ল বা অর্গানিক অ্যাসিড এই টক স্বাদ তৈরি করে। কাঁচা আমে এগুলো বেশি থাকে, তাই তখন টক লাগে বেশি। পাকার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর পরিমাণ কমে যায়।
ঘ্রাণেই অর্ধেক স্বাদ!
তবে এখানেই গল্প শেষ নয়। অনেক সময় চোখ বন্ধ করে শুধু গন্ধ শুঁকেও মানুষ একটি আম চিনে ফেলতে পারেন। ল্যাংড়া, হিমসাগর বা গোপালভোগের ভক্তদের মধ্যে এমন অভিজ্ঞতা খুবই সাধারণ। কারণ, আমের সুগন্ধও স্বাদের একটি বড় অংশ।
আমের মধ্যে শতাধিক ধরনের উদ্বায়ী রাসায়নিক যৌগ থাকতে পারে। এগুলো খুব সহজে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং নাকে পৌঁছে যায়। কিছু যৌগ ফলের মতো গন্ধ দেয়, কিছু ফুলের মতো, আবার কিছুতে থাকে হালকা মসলাদার ঘ্রাণ।
আমের মধ্যে শতাধিক ধরনের উদ্বায়ী রাসায়নিক যৌগ থাকতে পারে। এগুলো খুব সহজে বাতাসে ছড়িয়ে পড়েএ কারণেই দুটি আমের মিষ্টতা কাছাকাছি হলেও স্বাদ একরকম লাগে না। জিহ্বা এক জিনিস বলে, কিন্তু নাক আরেকটা তথ্য যোগ করে ফেলে। এই দুই মিলেই আমরা স্বাদ বুঝি।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় কিছু আমঅনেকেই মনে করেন, গাছ থেকে পেড়ে রাখলে আম নিজেই পুরোপুরি পেকে যাবে। বিষয়টা পুরোপুরি ঠিক না। সময়ের আগে পেড়ে ফেললে ভেতরের রাসায়নিক পরিবর্তন পুরোপুরি শেষ না-ও হতে পারে।
মাটি, পরিবেশ ও পাকার সময়
এখন গাছের পরিবেশের কথায় আসি। একই বাগানের ভেতরেও সব আম একরকম হয় না। যেদিকে সূর্যের আলো বেশি পড়ে, সেদিকের ফল সাধারণত একটু বেশি মিষ্টি হয়। কারণ, আলো থাকলে গাছ বেশি শক্তি তৈরি করতে পারে। সেই শক্তির একটা অংশ ফলের ভেতরে চিনি হিসেবে জমা হয়।
বৃষ্টির পরিমাণও প্রভাব ফেলে। খুব বেশি বৃষ্টি হলে ফলের ভেতরের ঘনত্ব কিছুটা কমে যেতে পারে, স্বাদ মনে হতে পারে হালকা। আবার রোদ বেশি থাকলে চিনি জমার প্রবণতা বাড়ে।
সময়ের আগে পেড়ে ফেললে ভেতরের রাসায়নিক পরিবর্তন পুরোপুরি শেষ না-ও হতে পারেমাটির বিষয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। মাটিতে থাকা খনিজ উপাদান, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা এবং জৈব পদার্থ—এসব মিলেই গাছের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে একই জাতের আম ভিন্ন অঞ্চলে চাষ করলে স্বাদেও সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা যায়। এ কারণেই রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের আলাদা পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফল সংগ্রহের সময়। অনেকেই মনে করেন, গাছ থেকে পেড়ে রাখলে আম নিজেই পুরোপুরি পেকে যাবে। বিষয়টা পুরোপুরি ঠিক না। সময়ের আগে পেড়ে ফেললে ভেতরের রাসায়নিক পরিবর্তন পুরোপুরি শেষ না-ও হতে পারে। ফলে বাইরের রং ভালো হলেও স্বাদ অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
আম কাঁচা অবস্থায় সবুজ কেন?মাটিতে থাকা খনিজ উপাদান, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা এবং জৈব পদার্থ—এসব মিলেই গাছের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে একই জাতের আম ভিন্ন অঞ্চলে চাষ করলে স্বাদেও সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা যায়।
পাকার সময় একটি প্রাকৃতিক হরমোন কাজ করে, যার নাম ইথিলিন। এটি স্টার্চকে চিনি বানাতে সাহায্য করে এবং গন্ধ তৈরির প্রক্রিয়াও বাড়িয়ে দেয়। এ কারণেই কোনো আম কখনো বাইরে থেকে সুন্দর দেখালেও খেতে তেমন ভালো না-ও লাগতে পারে।
আম নিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা সব সময় একরকম হয় না। কেউ ছোটবেলা থেকে যে আম খেয়ে বড় হয়েছেন, সেটাই তাঁর কাছে আসল স্বাদ। তাই একই আম খেয়ে দুজন মানুষের প্রতিক্রিয়া আলাদা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।
কেউ ছোটবেলা থেকে যে আম খেয়ে বড় হয়েছেন, সেটাই তাঁর কাছে আসল স্বাদশেষ পর্যন্ত আমের স্বাদ কোনো একক কারণে তৈরি হয় না। এটি চিনি, টক ভাব, গন্ধ, আলো, মাটি, পানি ও পাকার সময়ের ওপর নির্ভর করে। গন্ধটা কেমন, টক ভাব আছে কি না এবং মুখে কেমন অনুভূতি থাকছে—এসব একসঙ্গে মিলেই একটি আমকে তার আসল স্বাদ দেয়।
লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সূত্র: ব্লু প্যাসিফিক ফ্লেভারসবিশ্বজুড়ে আমের মেলা