ক্রোয়েশিয়ার গোল বাতিলের নেপথ্যে ট্রায়ানদা বলের কানেক্টেড প্রযুক্তি; কীভাবে কাজ করে ও কতটা নির্ভরযোগ্য
· Prothom Alo

বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ‘ট্রায়ানদা’ বলকে ঘিরে। বলটির সংযুক্ত (কানেক্টেড) প্রযুক্তি এবং এর ভেতরে থাকা বিশেষ সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই শেষ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়ার সমতাসূচক গোল বাতিল করা হয়েছে। খালি চোখে তো বটেই, ধীরগতির ভিডিও রিপ্লেতেও যে স্পর্শ ধরা পড়েনি, সেটিই শনাক্ত করেছে বলের ভেতরে থাকা ‘কানেক্টেড বল টেকনোলজি’।
গত বৃহস্পতিবার টরন্টোয় পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচের যোগ করা সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে ইওস্কো গভার্দিওল বল জালে পাঠান। গোলটি হলে ম্যাচে সমতা ফিরত। তবে ভিডিও সহকারী রেফারি (ভিএআর) পর্যালোচনার পর গোলটি বাতিল করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলো নিশ্চিত করে পর্তুগাল।
Visit likesport.biz for more information.
গোল বাতিলের সিদ্ধান্তে হতাশ হন ক্রোয়েশিয়ার খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা। তাঁদের দাবি ছিল, আক্রমণ গড়ে ওঠার সময় বল স্পর্শের কোনো প্রমাণ টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা যায়নি। তবে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা জানিয়েছে, গোলের আগে ক্রোয়েশিয়ার ইগর মাতানোভিচের চুলে বলের সামান্য স্পর্শই গোল বাতিলের কারণ। ফিফার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অ্যাডিডাসের ট্রায়ানদা ম্যাচ বলের ‘কানেক্টেড বল টেকনোলজি’ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গোলের আগে ক্রোয়েশিয়ার ২০ নম্বর খেলোয়াড় ইগর মাতানোভিচ বল স্পর্শ করেছিলেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অফসাইডের সিদ্ধান্ত নিয়ে গোল বাতিল করা হয়। ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবেও জানিয়েছে, সিদ্ধান্তটি শতভাগ সঠিক ছিল।
কীভাবে কাজ করে ‘কানেক্টেড বল’ প্রযুক্তি
ট্রায়ানদা বলটিতে রয়েছে কানেক্টেড প্রযুক্তি। এর ভেতরে বসানো হয়েছে একটি ইলেকট্রনিক সেন্সর, যা সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। বলটিতে সর্বশেষ কোন খেলোয়াড় স্পর্শ করেছেন, সেটিও শনাক্ত করতে পারবে এ প্রযুক্তি। অ্যাডিডাস জানিয়েছে, ট্রায়ানদা তৈরি করতে প্রতিষ্ঠানটির সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় লেগেছে। এ সময় ল্যাবরেটরিতে প্রায় ৩০০টি পরীক্ষা চালানো হয়েছে। আধুনিক অন্যান্য ফুটবলের মতো ট্রায়ানদার বাইরের স্তর পলিউরেথেন এবং ভেতরের স্তর বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি, যার প্রধান উপাদান পলিয়েস্টার। এর ভেতরে থাকা ব্লাডার অংশে বাতাস ভরে বলটি ব্যবহার উপযোগী করা হয়। এই কাঠামোর মধ্যেই স্থাপন করা হয়েছে স্মার্ট সেন্সর।
২০২২ বিশ্বকাপে ব্যবহৃত ‘আল রিহলা’ বলেও কানেক্টেড প্রযুক্তি ছিল। তবে আগের বলের তুলনায় ট্রায়ানদার সেন্সরটি ভিন্নভাবে বসানো হয়েছে। এবার এটি বলের কেন্দ্রে নয়, একটি বিশেষ স্তরের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। ভারসাম্য ঠিক রাখতে অন্য প্যানেলগুলোতে অতিরিক্ত ওজন যোগ করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার গবেষণা দলের প্রধান নিকোলাস ইভানস বিবিসিকে জানিয়েছেন, বলটির সেন্সর ত্রিমাত্রিকভাবে বলের অবস্থান ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। কখন এবং কীভাবে বল স্পর্শ করা হয়েছে, সে তথ্যও এটি শনাক্ত করতে সক্ষম।
এক চার্জে ৬ ঘণ্টা
একটি ম্যাচের জন্য সাধারণত ১৫ থেকে ২০টি স্মার্ট বল প্রস্তুত রাখা হয়। প্রতিটি বল পূর্ণ চার্জে প্রায় ছয় ঘণ্টা ব্যবহার করা যায়। সেন্সরটি এতটাই সংবেদনশীল যে বলের সামান্য স্পর্শও শনাক্ত করতে পারে। অনেক সময় টেলিভিশনের রিপ্লে দেখেও নিশ্চিত হওয়া যায় না, কোনো খেলোয়াড় বল স্পর্শ করেছেন কি না। দ্রুতগতির পরিস্থিতিতে এ প্রযুক্তি ম্যাচ কর্মকর্তাদের আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ট্রায়ানদার ভেতরে থাকা ৫০০ হার্টজ গতিসংবেদী চিপ বলের প্রতিটি নড়াচড়ার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে সংগ্রহ করে ভিএআর ব্যবস্থায় পাঠাতে পারে। ফলে অফসাইডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া সম্ভব হবে।
প্রায় ১৪ গ্রাম ওজনের সেন্সরটি বলের একটি বাইরের প্যানেলের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে। ফিফা ও অ্যাডিডাসের দাবি, এটি বলের ওজন, ভারসাম্য, বাউন্স বা খেলোয়াড়দের খেলার অভিজ্ঞতায় কোনো প্রভাব ফেলে না। সেন্সরটি সচল রাখতে প্রতিটি ম্যাচের আগে বল চার্জ দিতে হয়। পূর্ণ চার্জে ব্যাটারিটি প্রায় ছয় ঘণ্টা কার্যকর থাকে। বিশ্বকাপের ভেন্যুতে স্থাপিত উচ্চগতির ক্যামেরার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে ট্রায়ানদার সেন্সর প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে বল ও খেলোয়াড়দের অবস্থানের তথ্য বিশ্লেষণ করে ম্যাচের ত্রিমাত্রিক চিত্র তৈরি করা সম্ভব। জানা গেছে, এ প্রযুক্তি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০ বার বল ও খেলোয়াড়দের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে। ফলে অফসাইড বা বল স্পর্শসংক্রান্ত বিতর্কিত মুহূর্তগুলো আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে।
কতটা নির্ভরযোগ্য এই কানেক্টেড প্রযুক্তি
গোল বাতিলের ঘটনায় বিতর্কের মূল কারণ ছিল, বিভিন্ন কোণ থেকে ধারণ করা ধীরগতির রিপ্লেতেও মানতানোভিচের বল স্পর্শের বিষয়টি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়নি। ঠিক সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বলের সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য।
ভিএআরের পরামর্শে ম্যাচের রেফারি এসপেন এসকাস সাইডলাইন মনিটরে ঘটনাটি পর্যালোচনা করেন। রিপ্লেতে ফিফা একটি ‘হার্টবিট গ্রাফিক’ দেখায়, যেখানে বল স্পর্শের মুহূর্তে স্পষ্ট একটি সংকেত দেখা যায়। ফিফার দাবি, এই তথ্যই প্রমাণ করে যে বলটি মানতানোভিচের মাথা ছুঁয়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির বৈদ্যুতিক ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মানোস তেন্তজেরিসের মতে, বলটি যত দ্রুতই চলুক বা যত বেশি ঘূর্ণন তৈরি করুক না কেন, সেন্সর সেটিকে কার্যকরভাবে অনুসরণ করতে পারে।
বলের অবস্থান নির্ধারণে প্রযুক্তিটির নির্ভুলতা ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এমনকি খেলোয়াড়দের অবস্থানও এত সূক্ষ্মভাবে শনাক্ত করা যায় যে জুতার সামনের অংশ পর্যন্ত আলাদাভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব। অনেক সময় এই সামান্য ব্যবধানই নির্ধারণ করে দেয় একজন খেলোয়াড় অফসাইডে আছেন কি না।
সূত্র: এবিসি নিউজ, নিউইয়র্ক টাইমস, ফিফা, আরটি ডটআইই, বিবিসি, উইওনিউজ