পঞ্চদশ সংশোধনী: এই রায়ের আসল বার্তা কোথায়?

· Prothom Alo

একটি সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মাবলির সংকলন নয়; এটি একটি জাতির রাজনৈতিক অঙ্গীকার, স্বাধীনতার দর্শন এবং ক্ষমতার সীমারেখার দলিল। সরকার বদলায়, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলায়, রাজনৈতিক মতাদর্শ বদলায়; কিন্তু সংবিধানের মূল উদ্দেশ্য বদলে যায় না। সে কারণেই আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—সংসদ কি সংবিধানের মালিক, নাকি সংবিধানই সংসদের ক্ষমতার উৎস?

Visit grenadier.co.za for more information.

বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক পঞ্চদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত রায় এই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। জনপরিসরে রায়টি নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। কিন্তু রায়ের ৭৪ পৃষ্ঠা মনোযোগ দিয়ে পড়লে স্পষ্ট হয়, আদালতের উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা নয়। বরং এই মামলার বিচারিক প্রশ্নটি আরও মৌলিক—সংবিধান সংশোধনেরও কি সাংবিধানিক সীমা আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আদালত বাংলাদেশের সাংবিধানিক আইনের কয়েকটি ভিত্তিপ্রস্তর—৭ অনুচ্ছেদ, ১৪২ অনুচ্ছেদ, জনগণের সার্বভৌমত্ব, বিচারিক পর্যালোচনা এবং ডকট্রিন অব বেসিক স্ট্রাকচার—নতুন করে বিশ্লেষণ করেছেন। রায়ের সঙ্গে একমত হওয়া বা না–হওয়া ভিন্ন বিষয়; কিন্তু এটিকে উপেক্ষা করা কঠিন। কারণ, এই রায় সংসদ, বিচার বিভাগ ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে একটি গভীর সাংবিধানিক বিতর্কের দ্বার খুলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সংসদ সংবিধানের যেকোনো অংশ পরিবর্তন করতে পারে। আদালত এই ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেন।

রায়ের যুক্তি সরল, কিন্তু তার সাংবিধানিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। সংসদ সংবিধানের স্রষ্টা নয়; সংবিধানই সংসদকে জন্ম দিয়েছে। জনগণ এই প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক। জনগণ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সাংবিধানিক পরিষদ বা সংসদ সংবিধান প্রণয়ন করে। সেই প্রণীত সংবিধানের অধীনেই সংসদের অস্তিত্ব। ফলে সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারে, কিন্তু সংবিধানের মৌলিক পরিচয় বিলুপ্ত করার ক্ষমতা তার নেই। আদালতের ভাষায়, সংশোধনের ক্ষমতা কখনোই সংবিধান ধ্বংসের ক্ষমতা হতে পারে না।

এই যুক্তি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় একেবারে নতুন নয়। অষ্টম সংশোধনী মামলায় আপিল বিভাগ প্রথমবারের মতো ঘোষণা করেছিলেন যে সংবিধানের একটি ‘মৌলিক কাঠামো’ রয়েছে, যা সংসদ পরিবর্তন করতে পারে না। কিন্তু সাম্প্রতিক রায় সেই নীতিকে আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়েছে। আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন, সংবিধান একটি ‘জীবন্ত সংবিধান’—এটি সময়ের সঙ্গে বিকশিত হবে, সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে; কিন্তু নিজের মৌলিক পরিচয় হারিয়ে নয়। একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব যেমন সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়, কিন্তু তিনি অন্য মানুষ হয়ে যান না, তেমনি সংবিধানও পরিবর্তিত হতে পারে, তবে তার আত্মপরিচয় নষ্ট করা যায় না।

এই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত এখানেই। আদালত সংবিধানকে একটি আইনি নথির বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে দেখেছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণতন্ত্রকে সাংবিধানিক গণতন্ত্রের আলোকে মূল্যায়ন করেছেন। কারণ, ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, নির্বাচিত সরকারও কখনো কখনো এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা গণতন্ত্রের ভিতকেই দুর্বল করে দেয়। তাই আধুনিক সংবিধান শুধু ক্ষমতা বণ্টনের দলিল নয়; এটি ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের দলিলও।

এই প্রেক্ষাপটে আদালত একটি মৌলিক তাত্ত্বিক পার্থক্যের ওপর জোর দিয়েছেন—গাঠনিক ক্ষমতা (কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার) এবং সংবিধান কর্তৃক অর্পিত ক্ষমতা (কনস্টিটিউটেড পাওয়ার)। জনগণ যখন সংবিধান প্রণয়ন করে, তখন তারা ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার’ প্রয়োগ করে। কিন্তু সংসদ সেই সংবিধানের অধীনে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান; তার ক্ষমতা ‘কনস্টিটিউটেড পাওয়ার’। এই দুই ক্ষমতা কখনো এক নয়। সংসদ জনগণের প্রতিনিধি হতে পারে, কিন্তু জনগণের সাংবিধানিক সার্বভৌমত্বের বিকল্প নয়।

এই তাত্ত্বিক আলোচনাই শেষ পর্যন্ত আমাদের বিচার বিভাগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়—সংবিধান সংশোধনের বৈধতা বিচার করার চূড়ান্ত মানদণ্ড কেবল ১৪২ অনুচ্ছেদ নয়; বরং ৭ অনুচ্ছেদে নিহিত জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাংবিধানিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রও।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, আসল উদ্বেগ হলো নির্বাচন

পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায় নিয়ে জনপরিসরের আলোচনায় একটি বিষয়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে—তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। কিন্তু রায়টি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়লে একটি ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। আদালতের দৃষ্টি কোনো নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি নয়; বরং নির্বাচনের সাংবিধানিক বৈধতা এবং জনগণের আস্থার প্রতি।

এখানেই রায়টি রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে নিজেকে পৃথক করেছে। সংবিধানের কোথাও তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে গণতন্ত্রের একমাত্র মডেল বলা হয়নি। আদালতও তেমন কোনো ঘোষণা দেননি। বরং আদালতের বক্তব্যের সারমর্ম হলো—গণতন্ত্র তখনই কার্যকর থাকে, যখন জনগণ বিশ্বাস করে যে তারা অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করতে সক্ষম। নির্বাচন যদি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়, আর তার নিরপেক্ষতা নিয়ে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

যদি সংসদই সর্বোচ্চ হয়, তাহলে সংবিধান কেবল একটি কাগুজে আইনে পরিণত হবে, যা যেকোনো সময় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাল্টে ফেলা যাবে। কিন্তু যদি সংবিধান সর্বোচ্চ হয়, তাহলে সংসদ, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগ—তিনটি অঙ্গই সংবিধানের সীমার মধ্যে থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। আদালত এই দ্বিতীয় ধারণাকেই পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

এই কারণেই আদালত নির্বাচনকে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে দেখেননি; বরং এটিকে জনগণের সার্বভৌমত্বের বাস্তব প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে সংবিধানের প্রাধান্য এবং জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো জনগণ সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করবে? আদালতের উত্তর—অবাধ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে। সুতরাং নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি জনগণের সার্বভৌমত্বের কার্যকর রূপ।

এই বিশ্লেষণ থেকেই আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলুপ্তিকে মূল্যায়ন করেছেন। বিষয়টা এমন নয় যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিজেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, বরং যে ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলেছিল এবং নির্বাচনকে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য করেছিল, সেটিকে সম্পূর্ণ বাতিল করার আগে সংসদ কি যথেষ্ট সাংবিধানিক সতর্কতা অবলম্বন করেছিল? এখানে আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি প্রাতিষ্ঠানিক। রায়ের মূল উদ্বেগ একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থাকে রক্ষা করা নয়; বরং এমন একটি নির্বাচনব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যা জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম।

রায়ের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, আদালত সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে যা ফুটে ওঠে তা হলো পঞ্চদশ সংশোধনীর মতো একটি ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ, রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রশ্ন এবং সংশোধনী প্রণয়নের পদ্ধতি—এসব বিষয় আদালতের বিশ্লেষণে গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নীতি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—সংবিধানের বৈধতা শুধু তার বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করে না; তার প্রণয়ন-প্রক্রিয়ার বৈধতার ওপরও নির্ভর করে।

গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অপরিহার্য, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা একমাত্র সাংবিধানিক মূল্য নয়। আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা, পরামর্শ, অংশগ্রহণ এবং বিরোধী মতের প্রতি সম্মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সংবিধান কোনো একটি সরকারের দলিল নয়; এটি সমগ্র জাতির জন্য একটি সামাজিক চুক্তি। রায়ে আদালত পরোক্ষভাবে একটি গভীর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সংসদের হাতে যদি সীমাহীন সংশোধনী ক্ষমতা থাকে, তবে কোনো এক সময়ে সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে এমন পরিবর্তনও আনা সম্ভব, যা ভবিষ্যতের অবাধ নির্বাচনকেই অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। তখন গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো অক্ষুণ্ণ থাকলেও তার প্রাণশক্তি ক্ষয় হতে শুরু করবে।

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কেরও জন্ম হয়। আদালত যখন নির্বাচনব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক নির্ধারণ করবেন, তখন সেই বিচারিক মূল্যায়নের সীমা কোথায়? বিচার বিভাগ কি কেবল সাংবিধানিক নীতির রক্ষক হিসেবে কাজ করবে, নাকি ধীরে ধীরে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করবে?

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কিন্তু এটিই এই রায়ের সবচেয়ে মূল্যবান অবদান। এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে যে গণতন্ত্র কি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন, নাকি এমন একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতাও আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার এবং জনগণের সার্বভৌমত্বের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত? সম্ভবত এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের সাংবিধানিক রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।

আদালত কি সংসদের প্রতিদ্বন্দ্বী, নাকি সংবিধানের রক্ষক?

পঞ্চদশ সংশোধনী রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বিতর্কিত দিক সম্ভবত এখানেই। আদালত যখন একটি সাংবিধানিক সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এতে কি বিচার বিভাগ সংসদের ওপর প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করছে?

এই প্রশ্ন নতুন নয়। বিশ্বের প্রায় সব সাংবিধানিক গণতন্ত্রেই এটি বারবার ফিরে এসেছে। নির্বাচিত সংসদের সিদ্ধান্ত কি একজন বা কয়েকজন বিচারপতি বাতিল করতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর হলো—আদালত সংসদের ঊর্ধ্বে নয়; আদালত ও সংসদ—উভয়েই সংবিধানের অধীন। এখানেই সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সঙ্গে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাভিত্তিক গণতন্ত্রের মৌলিক পার্থক্য।

যদি সংসদই সর্বোচ্চ হয়, তাহলে সংবিধান কেবল একটি কাগুজে আইনে পরিণত হবে, যা যেকোনো সময় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাল্টে ফেলা যাবে। কিন্তু যদি সংবিধান সর্বোচ্চ হয়, তাহলে সংসদ, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগ—তিনটি অঙ্গই সংবিধানের সীমার মধ্যে থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। আদালত এই দ্বিতীয় ধারণাকেই পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

এই কারণেই আদালত সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদকে শুধু একটি ঘোষণামূলক বিধান হিসেবে দেখেননি; বরং পুরো সংবিধানের ব্যাখ্যার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এই প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। সংবিধান সেই জনগণের ইচ্ছার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ। ফলে সংসদের সংশোধনী ক্ষমতাকেও জনগণের মূল সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। সংসদ যদি সেই অঙ্গীকারকেই ভেঙে দেয়, তাহলে আদালতের হস্তক্ষেপ শুধু বৈধই নয়, সাংবিধানিক দায়িত্বও বটে।

তবে এখানেই বিতর্কেরও সূচনা। কারণ ‘সংবিধানের মৌলিক কাঠামো’ নির্ধারণের দায়িত্ব যখন আদালতের হাতে থাকে, তখন বিচার বিভাগের ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়। কোন নীতি মৌলিক কাঠামোর অংশ, কোনটি নয়—তার নির্দিষ্ট তালিকা সংবিধানে নেই। আদালতকে সাংবিধানিক ইতিহাস, প্রস্তাবনা, মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং বিচারিক নজিরের আলোকে সেই উত্তর খুঁজতে হয়। এর ফলে বিচার বিভাগকে কখনো কখনো এমন প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হয়, যা আইন ও রাজনীতির মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থান করে। এখানেই ‘বিচারিক সক্রিয়তা’ এবং ‘বিচারিক সংযম’-এর সূক্ষ্ম ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই রায়ের ক্ষেত্রেও সেই বিতর্ক থাকবে। কেউ কেউ বলবেন, আদালত সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে যথার্থ ভূমিকা পালন করেছেন। আবার কেউ বলবেন, আদালত সংসদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্যায়নে অতিরিক্ত অগ্রসর হয়েছেন। গণতান্ত্রিক সমাজে এই দ্বিমত অস্বাভাবিক নয়। বরং এটিই সাংবিধানিক সংস্কৃতির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। এই রায় সংসদকে দুর্বল করার জন্য নয়; বরং সংসদের সাংবিধানিক চরিত্রকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। সংসদ নিঃসন্দেহে জনগণের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই প্রতিনিধিত্বও সংবিধানের সীমার মধ্যে। গণতন্ত্রে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়; কিন্তু সাংবিধানিক গণতন্ত্রে সেই সরকারও আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার এবং সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অধীন।

প্রতিটি প্রজন্মকে বারবার এই প্রশ্নে ফিরে আসতে হয়—সংবিধান কি কেবল পরিবর্তনযোগ্য একটি আইন, নাকি এমন একটি জাতীয় অঙ্গীকার, যার কিছু মৌলিক মূল্যবোধ সাময়িক রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে? পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায় সেই প্রশ্নের একটি উত্তর দিয়েছে।

রায়ের কার্যকরী অংশেও আদালত একটি লক্ষণীয় সংযম প্রদর্শন করেছেন। আদালত পুরো পঞ্চদশ সংশোধনীকে বাতিল করেননি। বরং যেসব বিধানকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করেছেন, সেগুলোকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর বহু বিধান বহাল থেকেছে এবং কিছু বিষয়ে ভবিষ্যৎ সংসদের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রও উন্মুক্ত রেখেছেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, আদালত নিজেকে ‘বিকল্প আইনসভা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। বরং আমাদের বিচার বিভাগ অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকায় একটি সীমারেখা টেনেছেন—সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারবে, কিন্তু সংবিধানের মৌলিক পরিচয় বিলুপ্ত করতে পারবে না। এই রায়ের প্রকৃত তাৎপর্য তাই কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। এর প্রকৃত তাৎপর্য হলো—বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় আবারও একটি মৌলিক নীতি উচ্চারিত হয়েছে: রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে নয়; সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব সংবিধানের, আর সংবিধানের বৈধতার উৎস জনগণ।

এই রায়ের আসল বার্তা কোথায়?

পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলতেই পারে। কেউ এটিকে বিচার বিভাগের ‘সাংবিধানিক সাহসিকতা’ বলবেন, কেউ ‘বিচারিক সক্রিয়তা’র উদাহরণ বলবেন। এই মতভেদ গণতান্ত্রিক সমাজে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই বিতর্কের ভিড়ে রায়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি যেন আড়াল না হয়ে যায়। এই রায়ের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—সংবিধানের সীমা কে নির্ধারণ করবে? আদালতের উত্তর স্পষ্ট। সেই সীমা নির্ধারণ করবে সংবিধান নিজেই। সংসদ, সরকার এবং আদালত—তিনটি অঙ্গই সংবিধানের সৃষ্টি; ফলে কেউই সংবিধানের ঊর্ধ্বে নয়।

এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া বা না–হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কিন্তু একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। কারণ, সংবিধানের উদ্দেশ্য কেবল সরকার গঠন নয়; সরকারকে সীমাবদ্ধ করাও। গণতন্ত্র কেবল ক্ষমতা অর্জনের ব্যবস্থা নয়; ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধের ব্যবস্থাও। এই কারণেই বিশ্বের অধিকাংশ সাংবিধানিক গণতন্ত্রে সংবিধানকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সংসদ আইন প্রণয়ন করে, কিন্তু সেই আইনও সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। আদালতের কাজ সংসদের বিকল্প হওয়া নয়; বরং সংবিধানের সঙ্গে সংসদের কর্মকাণ্ডের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা।

তবে এই রায় বিচার বিভাগের জন্যও একটি দায়িত্ব সৃষ্টি করেছে। যদি আদালত সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর রক্ষক হন, তাহলে সেই ক্ষমতা অত্যন্ত সংযমের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। ‘মৌলিক কাঠামো’ এমন একটি নীতি নয়, যার মাধ্যমে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক মতভেদ নিষ্পত্তি করবে। এটি কেবল তখনই প্রয়োগযোগ্য, যখন কোনো সংশোধনী সত্যিই সংবিধানের পরিচয়, গণতান্ত্রিক চরিত্র বা জনগণের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে। অন্যথায় বিচার বিভাগ নিজেই সাংবিধানিক ভারসাম্য নষ্ট করার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

অন্যদিকে সংসদের জন্যও এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও, সেই ক্ষমতার ব্যবহার হতে হবে পরিমিত, স্বচ্ছ এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে। সংবিধান কোনো সরকার, দল বা সংসদের সম্পত্তি নয়। এটি অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক অঙ্গীকার।

রায়ের কার্যকরী অংশেও আদালত এই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করেননি; বরং যেসব বিধানকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেছেন, সেগুলোকে বাতিল করেছেন এবং বাকি অংশ বহাল রেখেছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের আইনসভাকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুযোগও অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।

এখানেই রায়টির প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এই রায় চূড়ান্ত শব্দ নয়। আপিল বিভাগে এর পুনর্বিবেচনা হতে পারে। ভবিষ্যতে ভিন্ন মামলায় আপিল বিভাগ ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিতে পারেন। সেটিই বিচারব্যবস্থার স্বাভাবিক বিকাশ। কিন্তু এই রায় ইতিমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ফেলেছে—এটি আমাদের আবারও সেই মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে, যা স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের সাংবিধানিক রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব কার?

এই প্রশ্নের উত্তর যদি হয় সংসদ, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠতাই শেষ কথা; যদি উত্তর হয় আদালতে, তাহলে বিচার বিভাগই শেষ কথা। কিন্তু যদি উত্তর হয় সংবিধানে, তাহলে সংসদ ও আদালত—উভয়েরই ক্ষমতা সংবিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধান ৭ অনুচ্ছেদে যে দর্শন ধারণ করেছে, এই রায় মূলত সেই দর্শনকেই নতুন ভাষায় পুনরুচ্চারণ করেছে। তাই পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার প্রকৃত শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষে বা বিপক্ষে নয়; বরং একটি গভীর সাংবিধানিক সত্যের পুনঃস্মরণ—সংবিধান কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার সীমারেখাও।

হয়তো এই কারণেই প্রতিটি প্রজন্মকে বারবার এই প্রশ্নে ফিরে আসতে হয়—সংবিধান কি কেবল পরিবর্তনযোগ্য একটি আইন, নাকি এমন একটি জাতীয় অঙ্গীকার, যার কিছু মৌলিক মূল্যবোধ সাময়িক রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে? পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায় সেই প্রশ্নের একটি উত্তর দিয়েছে।

  • শামস নজীব প্রথম আলোর সিনিয়র লিগ্যাল অফিসার
    *মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source