গবেষণাগারে ব্ল্যাকহোলের ঘূর্ণনগতি ও প্রভাব তৈরিতে সফল হলেন বিজ্ঞানীরা
· Prothom Alo

ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর বিশাল মাধ্যাকর্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন মহাজাগতিক সত্তা। এর তীব্র মহাকর্ষীয় টান এড়িয়ে কোনো কিছুই বাইরে আসতে পারে না, এমনকি আলোও নয়। কিন্তু ১৯৬৯ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিদ স্যার রজার পেনরোজ দাবি করেছিলেন, ঘূর্ণমান ব্ল্যাকহোল থেকে শক্তি সংগ্রহ করা সম্ভব। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত এই রহস্য এবার গবেষণাগারে প্রমাণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা। বিশেষ একটি যন্ত্রের মাধ্যমে গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে ব্ল্যাকহোলের ঘূর্ণনগতি ও তার প্রভাবকে হুবহু নকল করে শক্তি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, ঐতিহাসিক এই অর্জন স্যার রজার পেনরোজের দেওয়া তাত্ত্বিক ধারণাকে প্রমাণ করতে পেরেছে।
স্যার রজার পেনরোজ দাবি করেছিলেন, যদি কোনো কণা ব্ল্যাকহোলের এরগোস্ফিয়ারে প্রবেশ করে, তবে কণাটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এর একটি অংশ ব্ল্যাকহোলের আকর্ষণে ভেতরে হারিয়ে যাবে, কিন্তু অন্য অংশটি মূল কণার চেয়েও দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে বাইরে ছিটকে আসবে। এরগোস্ফিয়ারে ব্ল্যাকহোলের তীব্র ঘূর্ণন স্থান ও কালকে নিজের দিকে টেনে নেয়। তাত্ত্বিক এ ধারণাই গবেষণাগারে বাস্তবে প্রমাণ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ বেতার যোগাযোগ, উন্নত অপটিকস এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
স্যার রজার পেনরোজের দেওয়া তাত্ত্বিক ধারণাকে পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃত করেছিলেন পদার্থবিদ ইয়াকভ জেলডোভিচ। তিনি জানান, আলো বা রেডিও তরঙ্গও যদি আলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে ঘূর্ণমান কোনো বস্তুর গায়ে ধাক্কা খায়, তবে সেই তরঙ্গ শক্তি শুষে নিয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে। তবে স্যার রজার পেনরোজ ও ইয়াকভ জেলডোভিচের তত্ত্ব কয়েক দশক ধরে পরীক্ষা করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। কারণ, ব্ল্যাকহোলের ঘূর্ণন নকল করতে যে চরম শক্তির প্রয়োজন, তাতে যেকোনো কঠিন পদার্থ বা যন্ত্র ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে যাবে। এ সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে মেটাম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি একটি সম্পূর্ণ স্থির রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি রিং বা বলয় তৈরি করে গবেষণা পরিচালনা করেছেন।
বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, গবেষণাগারে যন্ত্রটিকে বাস্তবে না ঘুরিয়ে এর চারপাশে থাকা ইলেকট্রনিক উপাদানগুলোর বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্যে নিখুঁত টাইমিং বা সময়ের পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। এই নিয়ন্ত্রিত টাইমিং একটি চলমান তরঙ্গ প্যাটার্ন তৈরি করে, যা আলোর চেয়েও দ্রুতগতিতে ঘূর্ণমান একটি বস্তুর ভৌত অবস্থাকে হুবহু ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। এই পরীক্ষার মূল চাবিকাঠি ছিল কৃত্রিম পরিবেশের ভেতরে তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গের প্রতিক্রিয়া। নির্দিষ্ট ঘূর্ণনবৈশিষ্ট্যযুক্ত রেডিও তরঙ্গ যখন এই স্থির রিংটিতে প্রবেশ করে, তখন তরঙ্গগুলো কৃত্রিম গতি থেকে শক্তি শুষে নেয় এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে বাস্তব যান্ত্রিক ঘূর্ণনের প্রয়োজনীয়তা দূর করে এই পরীক্ষা বিজ্ঞানীদের ব্ল্যাকহোলের প্রান্তের কাছাকাছি ঘটা প্রাকৃতিক নিয়মগুলো নিরাপদে অধ্যয়নের একটি চমৎকার সুযোগ করে দিয়েছে।
কোনো যান্ত্রিক নড়াচড়া ছাড়াই স্থির কৃত্রিম ঘূর্ণন ব্যবহার করে নির্দিষ্ট তরঙ্গকে শক্তিশালী করার এই ক্ষমতা ভবিষ্যৎ ওয়্যারলেস যোগাযোগব্যবস্থা এবং রাডারপ্রযুক্তির জন্য আরও দক্ষ উপাদান তৈরিতে সাহায্য করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিক যোগাযোগযন্ত্রে ব্যবহারের উপযোগী করতে মেটাম্যাটেরিয়াল রিংগুলোর আরও আধুনিকায়নের কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া