ইলন মাস্কসহ প্রযুক্তি খাতের ধনীদের এত সম্পদের রহস্য কী, এটা কি অর্থনীতির নতুন ধরন

· Prothom Alo

বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হয়েছেন টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির ঘটনা নয়; বরং বৈশ্বিক পুঁজিবাদের চরিত্র বদলে যাওয়ারও ইঙ্গিত। একসময় সম্পদের উৎস ছিল তেল, ইস্পাত, রেলপথ বা ব্যাংক। এখন সম্পদের মূল উৎস ডেটা, অ্যালগরিদম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।

Visit librea.one for more information.

২০২০ সালে যে ইলন মাস্কের সম্পদমূল্য ছিল ২৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪৬০ কোটি ডলার, সেই তাঁর সম্পদমূল্য ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ৫০০ বিলিয়ন হয়ে যায়। এরপর চলতি বছরের ১২ জুন তিনি ট্রিলিয়নিয়ার হয়ে যান। ১২ দিনের জন্য তিনি এই খেতাব ধরে রাখেন। এরপর তাঁর সম্পদ আবার কমে ট্রিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের জিডিপির চেয়ে মাস্কের সম্পদ বেশি।

শুধু মাস্ক নন, ফোর্বস ম্যাগাজিনের ধনীদের তালিকায় দেখা যায়, বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনীর ৮ জনই প্রযুক্তি খাতের। তাঁদের সম্পদ অন্য খাতের ধনীদের তুলনায় অনেক বেশি। ধনীরা রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুবিধা পান, বিপুল সম্পদ আহরণের পেছনে এটা বড় প্রণোদনা। তবে বিষয়টি এখন আর তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্যে একচেটিয়াতন্ত্র বাড়ছে, নিশ্চিতভাবেই বাড়ছে বৈষম্য।

এদিকে মাস্কের সঙ্গে অন্যান্য শীর্ষ ধনীর ব্যবধান বাড়ছে। মাস্কের পরে যে চারজনের অবস্থান, তাঁদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণও মাস্কের মোট সম্পদের কাছাকাছি বা কখনো কখনো একটু বেশি। কথা হলো, মাস্কের সম্পদ এত বেশি হয়ে গেল কীভাবে, এই প্রবণতা কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নতুন ধরনের সামন্ততন্ত্র

গ্রিক অর্থনীতিবিদ ও দেশটির সাবেক অর্থমন্ত্রী ইয়ানিস ভারুফাকিস এই পরিবর্তন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ‘টেকনো ফিউডালিজমের’ ধারণা নিয়ে এসেছেন। তাঁর মতে, আমরা ধীরে ধীরে এমন এক যুগে প্রবেশ করছি, যেখানে প্রচলিত পুঁজিবাদের বাজারভিত্তিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বা কিছু ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোই অর্থনীতির প্রবেশ পথ নিয়ন্ত্রণ করছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের তথ্য, যোগাযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারছে, তারাই অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র হয়ে উঠছে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ইলন মাস্কের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য থেকে ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। টেসলা শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি করে না, একই সঙ্গে তা কোটি কোটি কিলোমিটার বাস্তব ড্রাইভিং ডেটা সংগ্রহ করছে। এই ডেটা ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর পরিবহনব্যবস্থার জন্য অমূল্য সম্পদ।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় স্পেসএক্স ভবন

স্পেসএক্স ও স্টারলিঙ্ক কেবল স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নয়, বৈশ্বিক ডিজিটাল সংযোগের অতি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে এক্স (সাবেক টুইটার) শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়; তথ্যপ্রবাহ, জনমত ও ব্যবহারকারীদের আচরণ–সম্পর্কিত বিপুল ডেটার উৎস এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এক্সএআইয়ের কাজ হচ্ছে, সেই তথ্যকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতায় রূপান্তরের চেষ্টা।

অর্থাৎ মাস্কের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আলাদা ব্যবসা নয়; বরং এটি একধরনের সমন্বিত ডিজিটাল ইকোসিস্টেম, যেখানে ডেটা এক প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক প্রতিষ্ঠানের শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। একটি প্রতিষ্ঠান তথ্য সংগ্রহ করছে, আরেকটি সেই তথ্য দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছে, তৃতীয়টি সেই প্রযুক্তিকে পরিবহন বা যোগাযোগে প্রয়োগ করছে। ফলে সম্পদ সৃষ্টির উৎস শুধু পণ্য বিক্রি নয়; বরং তথ্য, নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ।

ভারুফাকিসের ভাষায়, এটাই ডিজিটাল যুগের ‘জমিদারি’। মধ্যযুগে যেমন জমির মালিকানা ছিল সব ক্ষমতার উৎস, তেমনি আজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তথ্যপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ নতুন ধরনের অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব তৈরি করছে। ব্যবহারকারীরা প্রতিদিন যে তথ্য তৈরি করছেন, সেটিই এই নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে মূল্যবান কাঁচামাল। প্ল্যাটফর্মের মালিকেরা সেই প্রবাহের ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছেন। এতটাই যে সম্পদ অর্জনের সঙ্গে তাদের কর্মজগতের অসামঞ্জস্য অনেক বেশি।

এ কারণেই ইলন মাস্কের সম্পদকে কেবল গাড়ি বিক্রির মুনাফা বা রকেট উৎক্ষেপণের আয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাঁর কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য অনেকাংশে নির্ভর করছে ভবিষ্যতে এই সমন্বিত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো কতটা প্রভাবশালী হবে, সেই প্রত্যাশার ওপর।

বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করেন, যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট ইন্টারনেট, স্বচালিত যান, রোবোটিকস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম একই নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়, সেই ইকোসিস্টেম থেকে দীর্ঘ মেয়াদে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন সম্ভব।

ফোর্ড ও এডিসনের পুঁজি ছিল উৎপাদনমুখী। তাঁরা সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু আজ বেজোস ও জাকারবার্গের মালিকানাধীন ক্লাউড ক্যাপিটাল থেকে বাস্তব পণ্য উৎপাদিত হয় না। এই পুঁজির বদৌলতে তাঁরা ভিন্ন ক্ষমতা লাভ করেন। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে তাঁরা ভোক্তা, পুঁজিপতি ও এমনকি কারখানার শ্রমিকদের কাছ থেকেও মুনাফা লাভ করেন।

ইয়ানিস ভারুফাকিস স্প্যানিশ পত্রিকা এল-পাইসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, টেকনো-সামন্ত প্রভু বা ‘ক্লাউডালিস্টদের’ দেখতে অতীতের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তারা মৌলিকভাবে আলাদা। হেনরি ফোর্ড ও টমাস এডিসনের হাতে বিপুল পুঁজি ছিল ঠিক, তাঁরা রাজনীতির গতিপথ নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং গণমাধ্যম কিনে জনমত নিয়ন্ত্রণ করতেন। আজকের দিকে আজ জেফ বেজোস বা মার্ক জাকারবার্গও তা করেন। কিন্তু ফোর্ড ও এডিসনের পুঁজি ছিল উৎপাদনমুখী। তাঁরা সরাসরি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কিন্তু আজ বেজোস ও জাকারবার্গের মালিকানাধীন ক্লাউড ক্যাপিটাল থেকে বাস্তব পণ্য উৎপাদিত হয় না। এই পুঁজির বদৌলতে তাঁরা ভিন্ন ক্ষমতা লাভ করেন। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে তাঁরা ভোক্তা, পুঁজিপতি ও এমনকি কারখানার শ্রমিকদের কাছ থেকেও মুনাফা লাভ করেন। এটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। যে অর্থনীতিতে পণ্য উৎপাদন থেকে অর্জিত মুনাফার বদলে সম্পদ রেন্ট আকারে জমা হতে থাকে, সেই অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত টেকসই থাকে না।

ই–কমার্স

বাজার আছে, বাজার নেই

ইয়ানিস ভারুফাকিস এই প্রক্রিয়ার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি দেখান, কেউ যখন অ্যামাজনের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কার্যত পুঁজিবাদের জগৎ থেকে বেরিয়ে যান। অ্যামাজনে কোটি কোটি পণ্যের কেনাবেচা হলেও তাঁর মতে, এটি বাজার নয়। বরং এটি এমন এক অর্থনৈতিক পরিসর, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার নয়, বরং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অ্যালগরিদম সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।

এই ধারণা বোঝাতে ভারুফাকিস কাল্পনিক শহরের উদাহরণ দেন। শহরের প্রতিটি দোকান, রাস্তা ও জনপরিসর একজনের মালিকানাধীন-জেফ বেজোস। তিনি নিজে পণ্য উৎপাদন করেন না, কিন্তু কোন পণ্য সামনে আসবে, কোন বিক্রেতা দৃশ্যমান হবে এবং ক্রেতা কী দেখবেন, এসব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে অ্যালগরিদম। ফলে একই প্ল্যাটফর্মে থাকা মানুষও অ্যালগরিদমের কারণে ভিন্ন ভিন্ন ডিজিটাল বাস্তবতায় বসবাস করেন।

ভারুফাকিসের মতে, এটি প্রচলিত একচেটিয়া বাজার থেকেও ভিন্ন। এখানে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক, তথ্যপ্রবাহ ও বাজারের সামাজিক যোগাযোগ—সবই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অ্যাডাম স্মিথের কথিত ‘অদৃশ্য হাতের’ বদলে এখানে ব্যক্তিমালিকানাধীন অ্যালগরিদম কাজ করে, প্রধান লক্ষ্য, প্ল্যাটফর্মের মালিকের মুনাফা বাড়ানো। একই সঙ্গে এই অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করে এবং তাদের পছন্দ-অপছন্দ ও চাহিদাও প্রভাবিত করে। ফলে বিজ্ঞাপন, ভোক্তার পছন্দ ও পণ্য সরবরাহ—সবকিছু একই প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

ভারুফাকিস এই ব্যবস্থাকে ক্লাউড ক্যাপিটাল নামে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, ব্যবহারকারীর তথ্য, অ্যালগরিদম ও ডিজিটাল অবকাঠামোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই নতুন ধরনের পুঁজিই এখন অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রধান উৎস। এটি কেবল পুঁজিবাদের নতুন রূপ নয়, বরং ভিন্ন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সূচনা।

এই ব্যবস্থাকে তিনি মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেন। যেমন সামন্ত প্রভু জমি ব্যবহার করতে দিতেন, তেমনি অ্যামাজন ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল পরিসর তৈরি করে দেয়। সেখানে ব্যবসা করতে হলে প্ল্যাটফর্মের ফি দিতে হয় এবং অ্যালগরিদমের নিয়ম মেনে চলতে হয়। ফলে তারা স্বাধীন ব্যবসায়ী নয়, বরং ডিজিটাল সামন্তব্যবস্থার একধরনের ‘ভ্যাসাল’।

ভারুফাকিসের মতে, এই মডেল শুধু অ্যামাজনে সীমাবদ্ধ নয়; আলিবাবা, টেসলাসহ অনেক ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। টেসলার প্রতিটি গাড়ি কোম্পানির ক্লাউডভিত্তিক অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ফলে চালকের আচরণ ও ব্যবহারের তথ্য প্রতিনিয়ত কোম্পানির ক্লাউড ক্যাপিটাল সমৃদ্ধ করছে।

প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এখন মুক্তির পরিবর্তে নতুন ধরনের ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করছে, এটাই ভারুফাকিসের মত। গিগ অর্থনীতির শ্রমিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ ব্যবহারকারী ক্রমেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। প্রতিযোগিতামূলক বাজারের জায়গা দখল করছে ‘ক্লাউড ফিফ’, ভারুফাকিসের ভাষায়, এটাই টেকনো-ফিউডালিজম বা প্রযুক্তিগত সামন্তবাদ।

সামন্তবাদে ফেরা নয়

টেকনো-ফিউডালিজম তত্ত্ব নিঃসন্দেহে আলোড়ন সৃষ্টিকারী। তবে এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্কও আছে। অনেকেই মনে করেন, আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, তা মূলত সামন্তবাদের আক্ষরিক পুনরাবৃত্তি নয়, বরং পুঁজিবাদেরই নতুন, আরও আগ্রাসী, আরও কেন্দ্রীভূত ও আরও নজরদারিমূলক রূপ। তাঁদের মতে, ডেটা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো হলো নতুন ধরনের পুঁজি। টেক জায়ান্টরা হলো নতুন যুগের সফল ও ক্ষমতাধর পুঁজিপতি। তারা বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করছে, উদ্ভাবনী কৌশলে একচেটিয়াতন্ত্র কায়েম করছে। বাজারও অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত করছে, যাকে বলে ওলিগোপলি।

বলা বাহুল্য, শ্রমিকদের (বিশেষ করে গিগ কর্মী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সস্তা ডেটা লেবেলারদের) আরও সূক্ষ্ম ও কার্যকরভাবে শোষণ করছে। এই ধারাকে শোশানা জুবফ ‘নজরদারি পুঁজিবাদ’ হিসেবে নামকরণ করেছেন। শানে নজুল হলো, মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে মুনাফা তৈরি করা। আবার, নিক সর্নিসেক প্ল্যাটফর্ম ক্যাপিটালিজম বইতে দেখিয়েছেন, কীভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ডেটা নিষ্কাশন, নেটওয়ার্ক ইফেক্ট ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের ওপর ভিত্তি করে নতুন ধরনের ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করেছে। এই মডেল চিরায়ত শিল্প পুঁজিবাদ থেকে পৃথক হলেও তা পুঁজিবাদেরই অন্তর্গত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি এখনো মানুষের মতো সব কাজ করতে পারে না

এই সমালোচকদের মতে, ‘টেকনো-ফিউডালিজম’ শব্দটি কিছুটা অতিসরলীকরণ; ঐতিহাসিক সামন্তবাদের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য আছে। যেমন সামন্তবাদে ভূমিদাসরা জমির সঙ্গে বাঁধা থাকত, কিন্তু আজকের ডিজিটাল ব্যবহারকারীরা তত্ত্বগতভাবে যেকোনো প্ল্যাটফর্ম ত্যাগ করতে পারে (যদিও কঠিন)।

সব মিলিয়ে, সত্যটা সম্ভবত এই দুই ব্যাখ্যার মাঝামাঝি কোথাও আছে। ব্যক্তিগত মালিকানা, মুনাফার আকাঙ্ক্ষা ও পুঁজির ভূমিকা এখনো বহাল থাকলেও ডিজিটাল প্রযুক্তি অর্থনৈতিক ক্ষমতা, সম্পদ ও তথ্যের নিয়ন্ত্রণকে অল্প কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত করেছে। ফলে নাম যা–ই হোক না কেন, বর্তমান ডিজিটাল অর্থনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে এবং বৈষম্য ও নির্ভরশীলতার নতুন রূপ তৈরি হচ্ছে।

যে ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক না কেন, মূল বিষয় হলো, এর মধ্য দিয়ে বৈষম্য বাড়ছে। এআইয়ের কারণে অনেক মানুষের কাজ চলে যাবে বা যাচ্ছে, বিষয়টি কেবল আর ধারণার মধ্যে সীমিত নেই। অনেক কাজ এআই দিয়ে করা সম্ভব হচ্ছে। এতে যেমন অনেকে কাজ হারাচ্ছেন, তেমনি যাঁরা এআই উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত (সবাই নন), তাঁদের আয় বাড়ছে। এই বাস্তবতায় সামাজিক ভারসাম্য বদলে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

সম্পদ বাড়ছে বানের পানির মতো

ফোর্বস ম্যাগাজিনের ধনীদের তালিকায় বিশ্বের প্রথম ১০০ বিলিয়ন সম্পদের মালিকের স্বীকৃতি পান অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। বেশি দিন আগের কথা নয়, এই ২০১৮ সালের ৬ মার্চ তিনি এই স্বীকৃতি পান। তখন সেটাই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল। আজ ৮ বছরের মধ্যে মাস্কের সম্পদমূল্য ১০০০ বিলিয়ন বা এক ট্রিলিয়ন পেরিয়ে গেল। অথচ বিশ্বজুড়ে মধ্যবিত্তের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা যেন থেমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত আয় প্রায় ১৯৭৪ সালের স্তরেই রয়ে গেছে। চীন ও ব্রাজিলের কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেলেও উৎপাদনশীলতা ও করপোরেট মুনাফা যে হারে বেড়েছে, সে হারে তাদের আয় বাড়েনি।

একসময় বলা হতো, সমাজের নিয়ন্ত্রণ জমির মালিকদের হাতে। শিল্পবিপ্লবের পর সেই জায়গা নেয় কারখানা। ডিজিটাল যুগে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে উঠছে ডেটা, অ্যালগরিদম ও ক্লাউড অবকাঠামো। ইলন মাস্কের ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে নাটকীয় প্রতীক। প্রশ্ন হলো, এর মধ্য দিয়ে যেভাবে বৈষম্য বাড়ছে, তাতে সামাজিক স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের অর্জনগুলো বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সমাজে ভারসাম্য না থাকলে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। সেই কথা মাথায় রেখেই এই আশঙ্কা।

Read full story at source