সিনেমার প্রস্তাবে ডেকে খুন করা হয়েছিল এ অভিনেত্রীকে

· Prothom Alo

বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাইয়ে এসেছিলেন মীনাক্ষী থাপা। অভিনয়ের সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এই তরুণ অভিনেত্রীর সামনে তখনো বড় সাফল্যের দরজা খোলেনি। কিন্তু যে স্বপ্নের শহরে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজতে গিয়েছিলেন, সেখানেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছিল।

Visit esporist.com for more information.

মীনাক্ষী থাপা

২০১২ সালের মার্চে নিখোঁজ হন ২৬ বছর বয়সী মীনাক্ষী। পরে জানা যায়, একটি ভুয়া সিনেমার প্রস্তাবের ফাঁদে ফেলে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল। আর এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলিউডেরই দুই জুনিয়র শিল্পী, যাঁদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল সিনেমার সেটে।

মীনাক্ষীর মৃত্যুর ঘটনা আজও বলিউডের অন্যতম আলোচিত ও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ, এতে উঠে এসেছিল বিনোদনজগতের নতুনদের সংগ্রাম, কাজ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার নির্মম চিত্র।

বিতর্ক, বিচ্ছেদ—সব ছাপিয়ে এখনো জনপ্রিয় আবেদনময়ী সেই নায়িকা

‘হিরোইন’-এর সেটে পরিচয়, পরে তৈরি হয় ফাঁদ
উত্তরাখন্ডের দেরাদুন থেকে মুম্বাইয়ে এসেছিলেন মীনাক্ষী। বড় পর্দায় নিজের পরিচিতি তৈরি করাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। তিনি এর আগে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘৪০৪’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। পরে পরিচালক মাধুর ভান্ডারকারের ‘হিরোইন’ ছবিতেও কাজের সুযোগ পান। কারিনা কাপুর অভিনীত ওই ছবির সেটেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় জুনিয়র আর্টিস্ট অমিত জয়সওয়াল ও প্রীতি সুরিনের।

পুলিশের তদন্ত ও আদালতের নথি অনুযায়ী, অমিত ও প্রীতি মীনাক্ষীর সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন। তাঁরা ধারণা করেছিলেন, মীনাক্ষীর পরিবার বেশ অর্থশালী। সেই ভুল ধারণা থেকেই তাঁরা তাঁকে অপহরণের পরিকল্পনা করেন।

মীনাক্ষী থাপা

অভিনয়ের সুযোগের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তর প্রদেশে
অভিনয়ে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা মীনাক্ষী ওই প্রস্তাবে বিশ্বাস করেছিলেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাঁকে বলেছিলেন, উত্তর প্রদেশে একটি সিনেমায় কাজের সুযোগ রয়েছে। নতুন অভিনেত্রী হিসেবে মীনাক্ষীর কাছে এটি ছিল বড় সুযোগ পাওয়ার একটি সম্ভাবনা।

২০১২ সালের ১৩ মার্চ অমিত ও প্রীতির সঙ্গে উত্তর প্রদেশের উদ্দেশে রওনা দেন মীনাক্ষী। গন্তব্য ছিল প্রয়াগরাজ।

কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফোন ধরছিলেন না মীনাক্ষী। উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে তাঁর পরিবার।

অভিনয়ের সুযোগ পেতে সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়া হয়, নায়িকার ক্ষোভ

মুক্তিপণ দাবি, দেওয়া হয় ভয়ংকর হুমকি
ঘটনার কয়েক দিন পর, ১৭ মার্চ মীনাক্ষীর পরিবারের কাছে অজ্ঞাত নম্বর থেকে একটি বার্তা আসে। সেখানে ১৫ লাখ রুপি মুক্তিপণ দাবি করা হয়। শুধু টাকা দাবিই নয়, পরিবারকে ভয় দেখাতে আরও ভয়ংকর হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, টাকা না দিলে মীনাক্ষীকে পর্নোগ্রাফিক ছবিতে কাজ করতে বাধ্য করা হবে।

পরিবারের পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তাঁরা মীনাক্ষীর ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬০ হাজার রুপি জমা করেছিলেন। কিন্তু সেই অর্থ তাঁকে বাঁচাতে পারেনি।

মীনাক্ষী থাপা

হত্যা, দেহ গুম এবং তদন্তের মোড়
তদন্তকারীদের দাবি, মুক্তিপণের টাকা না পাওয়ার পর অমিত ও প্রীতি মীনাক্ষীকে হত্যা করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে শ্বাস রোধ করে হত্যার পর দেহ খণ্ডিত করা হয়। মীনাক্ষীর মাথাবিহীন দেহ প্রীতির পরিবারের বাড়ির কাছের একটি সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর বিচ্ছিন্ন মাথা একটি বাসে করে লখনৌ যাওয়ার পথে ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। তবে সেটি আর কখনো উদ্ধার করা যায়নি।

২০১২ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রা স্টেশনের কাছে একটি এটিএমে অভিযানের পরিকল্পনা করে পুলিশ। সেখানে যাওয়ার পরই অমিত জয়সওয়াল ও প্রীতি সুরিনকে গ্রেপ্তার করা হয়

সিম কার্ড ও ডেবিট কার্ডেই ধরা পড়ে অভিযুক্তরা
হত্যার পরও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মীনাক্ষীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা দাবি করতে থাকে। কিন্তু তদন্তে একটি ভুল করে বসেন তাঁরা। তাঁরা মীনাক্ষীর সিম কার্ড নিজেদের কাছে রেখে দেন এবং তাঁর ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে টাকা তোলার চেষ্টা করেন। পুলিশ ফোন রেকর্ড ও ইলেকট্রনিক তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁদের গতিবিধি অনুসরণ করতে শুরু করে। ২০১২ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রা স্টেশনের কাছে একটি এটিএমে অভিযানের পরিকল্পনা করে পুলিশ।

সেখানে যাওয়ার পরই অমিত জয়সওয়াল ও প্রীতি সুরিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে মীনাক্ষীর সিম কার্ড ও ডেবিট কার্ড পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানায়। দুই দিন পর, ১৬ এপ্রিল সেপটিক ট্যাংক থেকে মীনাক্ষীর দেহ উদ্ধার করা হয়।

বিকিনি আর বদলে যাওয়া বলিউড, সত্তরের দশকের নায়িকারা যেভাবে পাল্টে দিয়েছিলেন হিন্দি সিনেমা

ছয় বছর পর আসে আদালতের রায়
এই মামলার বিচার শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ছয় বছর। ২০১৮ সালের ৯ মে মুম্বাইয়ের একটি আদালত অমিত জয়সওয়াল ও প্রীতি সুরিনকে হত্যা এবং মুক্তিপণের জন্য অপহরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। বিশেষ সরকারি আইনজীবী উজ্জ্বল নিকম এ ঘটনাকে ‘বিরলতম অপরাধ’ উল্লেখ করে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করেছিলেন। তবে আদালত দুজনকেই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেন।

মীনাক্ষী থাপা মুম্বাইয়ে এসেছিলেন একটি সুযোগের অপেক্ষায়। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, একটি ভালো চরিত্র তাঁর জীবন বদলে দিতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগের প্রতিশ্রুতিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল তাঁর মৃত্যুর কারণ, যে প্রস্তাবের পেছনে ছিল না কোনো সিনেমা, ছিল শুধু একটি ভয়ংকর অপরাধের পরিকল্পনা।

এনডিটিভি অবলম্বনে

Read full story at source