বিরোধীদের প্রতিবাদে পার্লামেন্ট ছাড়লেন নেতানিয়াহু, তবু কেন পাস করালেন বিতর্কিত আইন
· Prothom Alo

ইসরায়েলের পার্লামেন্টে সরকারের শেষ দিনগুলোয় বেশ কিছু বিতর্কিত আইন পাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
Visit bettingx.club for more information.
গত মঙ্গলবার পার্লামেন্টে অধিবেশন চলাকালে বিরোধী দলের ডজনখানেক সংসদ সদস্য নেতানিয়াহুর উদ্দেশে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘লজ্জা, পদত্যাগ করুন, চলে যান।’
পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে নেতানিয়াহু ভোটাভুটিতে অংশ না নিয়েই পার্লামেন্ট ত্যাগ করেন। তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিলটি পাস হয়ে যায়।
নেতানিয়াহু পার্লামেন্টকক্ষে না থাকলেও তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের আইন প্রণয়নের গতি থেমে থাকেনি। গতকাল শুক্রবার নেসেট ভেঙে দেওয়ার আগে সরকার দ্রুত কয়েকটি বিতর্কিত বিল পাস করিয়ে নিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিল পাসের মূল উদ্দেশ্য ছিল নেতানিয়াহুর অতি রক্ষণশীল ইহুদি (হারেদি) ও কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের সন্তুষ্ট রাখা।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তার আগে নিজের রাজনৈতিক জোট অটুট রাখতেই এ উদ্যোগ নিয়েছেন নেতানিয়াহু। ব্যাপক গণবিক্ষোভ, ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলা এবং দীর্ঘস্থায়ী বহুমুখী যুদ্ধের মতো নানা অস্থিরতায় প্রায় চার বছর পার করার পর তাঁর সরকার একটি বিরল মাইলফলক স্পর্শ করল।
১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ইসরায়েলি সরকার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করল। এমনকি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করলেও এর আগে নিজেও কখনো পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি নেতানিয়াহু।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লম্বা সময় ক্ষমতা ধরে রাখার পেছনে ছিল একটি ধারাবাহিক কৌশল—জোটের শরিকদের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সন্তুষ্ট রাখা। মেয়াদের শেষ সপ্তাহে তড়িঘড়ি করে বিতর্কিত আইন পাস করানোর উদ্যোগও সে কৌশলেরই অংশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাদাভ ইয়াল লিখেছেন, ‘নেতানিয়াহু এখন রাজনীতিতে টিকে থাকার লড়াই করছেন। আর সে লড়াইয়ে হারেদি গোষ্ঠীর ইহুদিরা তাঁর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’।
নাদাভ ইয়ালের ভাষায়, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো হারেদি মিত্রদের বোঝানো, নেতানিয়াহুই তাঁদের দাবি পূরণ করতে সক্ষম একমাত্র রাজনীতিক।
ইসরায়েলের আইনে ১৮ বছর বয়স হলেই প্রায় সব নাগরিকের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে বহু বছর ধরে হারেদি সম্প্রদায়ের পুরুষেরা এ নিয়মের বাইরে রয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট কয়েক দফায় এ ব্যবস্থা বাতিলের নির্দেশ দিলেও এখনো এ নিয়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে।
তবে নেতানিয়াহু হারেদি সম্প্রদায়ের জন্য এ ব্যবস্থা বহাল রাখার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যা ছিল তাঁর জন্য একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। কারণ, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, তাদের অন্তত ১২ হাজার অতিরিক্ত সেনা প্রয়োজন। অথচ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বয়স হলেও প্রায় ৭২ হাজার হারেদি তরুণ এখনো বাধ্যতামূলক সামরিক বাহিনীতে যোগ দেননি। ফলে যুদ্ধের বাড়তি চাপ সামলাতে বাধ্যতামূলক ও রিজার্ভ সেনাদের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে হারেদিদের জন্য স্থায়ীভাবে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে আইন পাস করলে জনমতের বিরোধিতার মুখে পড়তে হতে পারে, এটি বুঝতে পেরেছিলেন নেতানিয়াহু। তাই তিনি সরাসরি সে পথে না গিয়ে বিকল্প কৌশল নেন।
এর অংশ হিসেবে একটি আইনে ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ ‘তাওরাত’ অধ্যয়নকে রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ‘তাওরাত’ অধ্যয়নের বিনিময়ে হারেদিদের সামরিক চাকরিতে যোগদান থেকে ছাড়ের ব্যবস্থা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও তা টিকিয়ে রাখা সহজ হবে।
আরেকটি আইনে সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়া কয়েক হাজার হারেদি তরুণকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত সাময়িক আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ওই সময় পর্যন্ত বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব এড়িয়ে গেলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
আগামী নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের শেষ অধিবেশননেসেটে ভোটাভুটির আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বিরল এক সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি প্রকাশ্যে বলেন, সেনাবাহিনীর বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে এ আইন কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, যাঁরা বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করছেন, এ ধরনের আইন তাঁদের মনে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি করতে পারে এবং সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থাও ক্ষুণ্ন হতে পারে।
জামিরের এ বক্তব্যে নেতানিয়াহুর জোটসঙ্গীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির কয়েকজন আইনপ্রণেতা জামিরের অপসারণের দাবি তোলেন। আর হারেদি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দল শাসের চেয়ারম্যান আরিয়েহ দেরি অভিযোগ করেন, সেনাপ্রধান সেনাবাহিনীর দায়িত্ব ছেড়ে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করছেন।
এসব সমালোচনার মধ্যেই বিলটি পাস হয়েছে। যদিও ভোটাভুটির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিরোধী দলগুলো হাইকোর্টে আবেদন করলে আদালত আইনটির কার্যকারিতা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন।
হারেদিদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানসংক্রান্ত আইন ছাড়াও সরকারে মেয়াদের শেষ দিকে নেতানিয়াহু আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করান। বিশ্লেষকদের মতে, এসবের উদ্দেশ্য ছিল জোটের শরিকদের সন্তুষ্ট রাখা এবং তাদের সমর্থন ধরে রাখা।
এর মধ্যে অন্যতম ছিল অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা সীমিত করার বিল। এটি নেতানিয়াহু সরকারের দীর্ঘদিনের বিচারব্যবস্থা সংস্কার কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ইসরায়েলি সরকার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করল। এমনকি দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করলেও এর আগে নিজেও কখনো পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি নেতানিয়াহু।
সমালোচকদের আশঙ্কা, আইনটি কার্যকর হলে সরকার আইনি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত উপেক্ষা করতে পারবে। পাশাপাশি বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারাকে অপসারণের চেষ্টার পথ আবারও খুলে যেতে পারে। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট সে উদ্যোগ আটকে দিয়েছিলেন।
এ সপ্তাহেই সম্প্রচার-সংক্রান্ত আইনেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, নতুন আইনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের ওপর সরকারের প্রভাব আরও বাড়বে এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নারী-পুরুষের জন্য পৃথক শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের একটি বিলও পাস হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও নারীর অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এ আইনের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এটি নারীদের প্রতি বৈষম্যকে উৎসাহিত করবে, সমতার নীতিকে দুর্বল করবে এবং উচ্চশিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জোটের অন্য শরিকেরাও সরকারের মেয়াদের শেষ সময়কে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন।
উগ্রপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের জন্য বড় অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দেন। এর আওতায় নতুন আবাসিক এলাকা এবং সেখানে যাওয়ার সড়ক নির্মাণে প্রায় ২৪০ কোটি শেকেল (প্রায় ৭৯ কোটি ডলার) ব্যয় করা হবে।
একই সঙ্গে এর আগে নেওয়া ৩৪টি নতুন অবৈধ বসতিকে বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্তও জানানো হয়। স্মোট্রিচের দাবি, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পর্যন্ত পশ্চিম তীরে নতুন অনুমোদিত বসতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৪টিতে।
এসব আইন পাসের উদ্যোগ জনমতের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জুলাই মাসে ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল ১২-এর এক জরিপে দেখা যায়, ৬৬ শতাংশ ইসরায়েলি ‘তাওরাত’ অধ্যয়নকে মৌলিক আইন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। আর ৬১ শতাংশ চান, পরবর্তী সরকারে হারেদি দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত না করা হোক।
এ জনমতকে সামনে রেখে বিরোধীরাও বিষয়টিকে নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম ইস্যুতে পরিণত করেছে।
বর্তমান জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসা ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট সরকারের পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষায়, রাষ্ট্রের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক জোট টিকিয়ে রাখতে সরকার বেপরোয়াভাবে সমঝোতা করেছে।
নেতানিয়াহু রাজনীতি থেকে বিদায় নিন, চান ৫৯ শতাংশ ইসরায়েলিইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও একই সুরে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সরকার সেনাসদস্য, তাঁদের পরিবার ও দেশের মানুষের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছে। তাঁর মতে, এটি অত্যন্ত নিচু মানের এবং জায়নবাদবিরোধী একটি পদক্ষেপ।
তবে এসব সমালোচনায় খুব একটা বিচলিত নন নেতানিয়াহু, এমনটাই মনে করছেন তাঁর ঘনিষ্ঠরা।
লিকুদ পার্টির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মানুষের স্মৃতি খুবই ক্ষণস্থায়ী। কোনো একটি আইন নিয়ে সাময়িক অসন্তোষের চেয়ে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক জোট ধরে রাখা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এসব সিদ্ধান্তে যে রাজনৈতিক ক্ষতি হওয়ার ছিল, তা আগেই হয়ে গেছে।
ওই নেতা আরও বলেন, বিচারব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে বিতর্ক, ৭ অক্টোবরের হামলা কিংবা দীর্ঘ যুদ্ধের পরও যাঁরা নেতানিয়াহুর পাশে থেকেছেন, তাঁরা এখন তাঁকে ছেড়ে যাবেন, এমনটা মনে করার কারণ নেই।
নেতানিয়াহুর ওই সহযোগীর মতে, আদালত শেষ পর্যন্ত এসব আইনে হস্তক্ষেপ করলেও তাতে প্রধানমন্ত্রী খুব একটা উদ্বিগ্ন নন। কারণ, আদালতের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত তৈরি হলে বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রচার আরও জোরালো করার সুযোগ তৈরি হবে, যা নির্বাচনের আগে তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে লাভজনকও হতে পারে।
নেতানিয়াহু নির্মমভাবে হেরে গেছেন, এখন তাঁকে সরে দাঁড়াতেই হবে