কোন ফরমেশনের কী অর্থ
· Prothom Alo

তুমি যখন টিভিতে কোনো ম্যাচ দেখো, তখন আসলে দুটো খেলা একসঙ্গে চলে। একটা খেলা চোখের সামনে—বল নিয়ে খেলোয়াড়দের গোল, ড্রিবলিং, দর্শকদের চিৎকার। আর একটা খেলা চলে চোখের আড়ালে—সংখ্যার অঙ্কে, অদ্ভুত কিছু শব্দে, কিংবা টানেলের ওপারের এক রহস্যময় ঘরে। দর্শকদের চোখের অদৃশ্য সেই খেলা বুঝতে পারলে প্রথম খেলাটা হঠাৎ অন্য রকম সুন্দর হয়ে ওঠে। চলো, আজ সেই আড়ালের দুনিয়াটায় উঁকি দিই।
ফরমেশন: মাঠের ওপর আঁকা অদৃশ্য নকশা
Visit milkshakeslot.lat for more information.
প্রায় প্রতি ম্যাচ শুরুর আগে ধারাভাষ্যকারদের বলতে শোনা যায়, ‘আজ ব্রাজিল নামছে ৪-৩-৩ ফরমেশনে কিংবা আর্জেন্টিনা খেলবে ৪-৪-২ ফরমেশনে।’ কখনো প্রশ্ন এসেছে, এই সংখ্যাগুলো আসলে কী?
জোড়া গোলে বিশ্বকাপ শেষ করেছেন এমবাপ্পেখুব সোজা করে বললে, ফরমেশন হলো মাঠে খেলোয়াড়েরা কীভাবে দাঁড়াবে, তার একটা প্রাথমিক প্যাটার্ন বা নকশা। সংখ্যাগুলো পড়তে হয় নিজেদের গোলপোস্ট থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষের দিকে—প্রথমে রক্ষণভাগ (ডিফেন্ডার), তারপর মাঝমাঠ (মিডফিল্ডার), শেষে আক্রমণভাগ (ফরোয়ার্ড)। তাই ৪-৩-৩ মানে ৪ জন ডিফেন্ডার, ৩ জন মিডফিল্ডার, ৩ জন ফরোয়ার্ড। মোট ১০ জন। কিংবা ৪-৪-২ মানে ৪ জন ডিফেন্ডার, ৪ জন মিডফিল্ডার আর ২ জন ফরোয়ার্ড বা স্ট্রাইকার। কোচরা বেশ শক্ত করে এসব খেলোয়াড়দের মাথায় গেঁথে দেন। আর গোলরক্ষক? তাকে এই হিসাবে ধরা হয় না। কারণ, সে তো সব সময় গোলপোস্টেই থাকে—তাকে আলাদা করে বলে দেওয়ার কিছু নেই।
কিন্তু খেলা শুরুর পর সবচেয়ে মজার ব্যাপার দেখা যায়। তখন এই সংখ্যাগুলো প্রায়ই বদলে যেতে থাকে। যেমন দেখা যায়, কোনো দল যখন বল পায়, তখন এক আকৃতি, আবার বল হারালে আরেক! কাগজে-কলমে যে দল ৪-২-৩-১–এ নেমেছে, সেই দলই আক্রমণে গিয়ে হয়ে যেতে পারে ৩-২-৫, আবার রক্ষণে নেমে এসে ৪-৪-২। আধুনিক ফুটবলে কোচরা এক ম্যাচেই কয়েকবার দলটার আকৃতি বদলান যেন প্রতিপক্ষ কোনোভাবেই সুবিধা না নিতে পারে। তাই ফরমেশন দেখে পুরোপুরি বিচার করা যায় না কোন দল কেমন খেলবে; সেটা নির্ভর করে মূলত কোচের ভাবনার ওপর।
ফাইনালে এগিয়ে থাকবে কে—স্পেন নাকি আর্জেন্টিনা?তবে ফুটবল কিন্তু সব সময় এমন ছিল না। একদম শুরুর দিকে দলগুলো খেলত প্রায় সবাইকে আক্রমণে রেখে—ফরমেশনের হিসাবে ২-৩-৫, যেটাকে বলা হতো ‘পিরামিড’। ভাবো তো, পাঁচজন স্ট্রাইকার দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে! ১৯২৫ সালে অফসাইডের নিয়ম বদলে গেলে আক্রমণ এত সহজ হয়ে গেল যে কোচদের রক্ষণ শক্ত রাখতে চিন্তাভাবনা করতে হলো—জন্ম নিল WM ফরমেশন মানে ৩-২-২-৩, যেটাকে ছকের ওপর ঠিক দুটো ইংরেজি অক্ষর ‘W’ আর ‘M’-এর মতো দেখায়। এরপর ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিল ৪-২-৪ ফরমেশনে খেলে বিশ্বকে চমকে দিয়ে শিরোপা জিতল। সেই থেকে সংখ্যার এই খেলা চলছেই।
চলো দেখে নেওয়া যাক এখনকার জনপ্রিয় ফরমেশনগুলো—
৪-৪-২: দুই সারিতে চারজন করে ডিফেন্ডার আর মিডফিল্ডার, সামনে দুজন স্ট্রাইকার। সহজভাবে বললে, এই ফরমেশনকে বলা যায় ভারসাম্যের প্রতীক। কারণ, ১০ জন খেলোয়াড় এমনভাবে থাকে, যেন গোটা মাঠের প্রস্থ খুব সহজে দখলে নেওয়া যায়, আবার কাউন্টার অ্যাটাকের জন্যও এই ফরমেশন দারুণ কাজ করে। দিয়েগো সিমিওনের আতলেতিকো মাদ্রিদ কিংবা লেস্টার সিটির রূপকথার মতো ২০১৬ প্রিমিয়ার লিগ জয়—সবই এই ছকে। এর দুর্বলতা একটাই—মাঝমাঠে মাত্র দুজন থাকায় তিন মিডফিল্ডারের দলের কাছে কখনো কখনো বল দখলের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ে।
৪-৩-৩: এটা পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনা আর ম্যানচেস্টার সিটির প্রিয় ছক। দুই উইঙ্গার দিয়ে মাঠকে চওড়া করে, তিন মিডফিল্ডারের সমন্বয়ে মাঝখানে সংখ্যার আধিক্য তৈরি করে বলের পজেশন ধরে রাখা হয়। এর সমস্যা হলো ওপরে থাকা একমাত্র স্ট্রাইকার অনেক সময় একা পড়ে যান, তাই যে কাউকে এই ফরমেশনে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানো যায় না, তাঁকে হতে হয় পরিশ্রমী আর শক্তপোক্ত।
৪-২-৩-১: পেছনে দুই রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডারের একটা ‘ডাবল পিভট’ রেখে, তাদের সামনে একজন প্লেমেকার বা বিখ্যাত সেই ‘নাম্বার টেন’। জার্মানি এই ছকের ওপর দাঁড়িয়েই ২০১৪ বিশ্বকাপ জিতেছিল। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাও? এর মতো কার্যকর ফরমেশন খুব কম আছে।
৩-৫-২: আর তিন ডিফেন্ডারের যত ফরমেশন: তিনজন সেন্টারব্যাক, দুই পাশে দুই ‘উইংব্যাক’ (যারা একাধারে ডিফেন্ডার আর উইঙ্গারের মতো খেলে), মাঝে তিন মিডফিল্ডার আর সামনে দুই স্ট্রাইকার—এটা হলো এই ফরমেশনের ছক। নিচে তিন ডিফেন্ডার থাকায় দুই পাশে থাকা উইংব্যাকদের সাধারণত মিডফিল্ডারদের সঙ্গে গোনা হয়। কার্লোস বিলার্দোর আর্জেন্টিনা ১৯৮৬ বিশ্বকাপ জিতেছিল ঠিক এই ফরমেশনে, ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালেও দুই দল খেলেছিল এই ফরমেশনে। ইতালিয়ান ম্যানেজার আন্তোনিও কন্তে সাম্প্রতিক সময়ে একে আবার জনপ্রিয় করে তুলেছেন। তিন ডিফেন্ডারের আরও বিভিন্ন ফরমেশন হতে পারে, যেমন ৩-৪-৩, ৩-৪-২-১ ইত্যাদি।
এবার চলো, আধুনিক ফুটবলে যেসবে খেলোয়াড়দের রোল বা ভূমিকা আছে, সেসব নিয়ে জানার চেষ্টা করি।
বিশ্বকাপ জিতলে আর্জেন্টিনা কি নতুন কাপ পাবেকোচরা এখন প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে এমন সব অপ্রত্যাশিত জিনিস পরিচয় করাচ্ছেন, যেন নিয়ম ভাঙাটাই এখন নতুন নিয়ম! আমার কাছে মূলত ফুটবলের আসল মজাটা এখানেই।
ফলস নাইন: ৯ নম্বর জার্সি পরা খেলোয়াড় সাধারণত স্ট্রাইকার হয়। তবে এই প্লেয়ার রোল অনুযায়ী ওই খেলোয়াড় প্রথাগত স্ট্রাইকারের জায়গায় না থেকে নিচে নেমে আসেন, অনেকটা মাঝমাঠের দিকে। তাতে প্রতিপক্ষের সেন্টারব্যাকরা পড়ে যান দোটানায়—তাকে মার্ক করে অনুসরণ করব, নাকি নিজের জায়গায় থাকব? এই সুযোগে দুই পাশে থাকা ওয়াইড ফরোয়ার্ডরা দারুণ ড্রিবলিং বা গতি দিয়ে আক্রমণ করেন। গার্দিওলা যখন বার্সায় ছিলেন, লিওনেল মেসি এই ফলস নাইনে খেলে ফুটবলকে বদলে দিয়েছিলেন।
ইনভার্টেড ফুলব্যাক: দুই পাশের ডিফেন্ডার মানে ফুলব্যাক বা উইংব্যাকরা সাধারণত ওই সাইডলাইন ধরেই ওঠানামা করেন। কিন্তু এই প্লেয়ার রোলে তাঁরা সাইডলাইন থেকে সরে মাঝমাঠের দিকে চলে আসেন, যাতে মাঝখানে আরও একজন বা দুজন খেলোয়াড় বেশি এনে বলের নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়। এটাও আবার গার্দিওলারই আবিষ্কার বলা যায়, বায়ার্ন মিউনিখে কিংবদন্তি জার্মান রাইটব্যাক ফিলিপ লামকে দিয়ে শুরু করেছিলেন এই স্প্যানিশ কোচ।
তবে আসল কথা হচ্ছে, এই কাগজে-কলমে থাকা সংখ্যা দেখে সে দল কেমন খেলবে, বোঝা যায় না। যেমন ৩-৪-৩ শুনতে আক্রমণাত্মক, কিন্তু চাইলে রক্ষণাত্মকভাবেও খেলা যায়, আবার ৫-৩-২ শুনলে দুর্গের মতো মনে হয়, কিন্তু চাইলে এটা দিয়েও আক্রমণেও ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। ফরমেশন হলো অনেকটা ক্যানভাস, আসল ছবিটা আঁকা হয় কোচদের প্ল্যান আর খেলোয়াড়দের বাস্তবায়ন দিয়ে।
৬ বছর ধরে আমেরিকা যেভাবে ফুটবল বিশ্বকাপের মাঠ তৈরি করেছে