মেসি নামের অশ্রুনদী

· Prothom Alo

খেলা শেষের বাঁশি বাজল। স্পেনের কয়েকজন খেলোয়াড়কে অভিনন্দন জানালেন লিওনেল মেসি। তারপর ধীরে বসে পড়লেন মাঠেই। একা। ঠিক যেমন কোনো রাজা তাঁর শেষ যুদ্ধের পর বসে পড়েন নিজের রণক্ষেত্রেই।

Visit biznow.biz for more information.

বুট আর মোজা দুটো খোলার অভিনয়ে মেসি ভেতরকার ব্যথাটা লুকাতে পারেননি। বোঝা যাচ্ছিল, কোথাও একটা পাড় ভাঙছে অনবরত, নিঃশব্দে। কিন্তু কোথায় সে নদী, কেউ জানত না তখনো।

দেখা গেল একটু পরই। মঞ্চে রানার্সআপের পদকটা গলায় পরলেন। সেখান থেকে নামার সময় গর্জে উঠল নিউ জার্সির গ্যালারি—‘মেসি! মেসি!’। কিংবদন্তি এরপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। চোখের কোনা বেয়ে উঁকি দিল সেই অশ্রুনদী, যে নদীর উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না, শুধু স্রোতটা দেখা যায়।

মেসির জীবনে কান্না নতুন কী! ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হেরে কেঁদেছেন। দুই বছর পর কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের পরও দৃশ্যটা পাল্টায়নি। সেবার তো অবসরই নিয়ে ফেলেন। সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেরার পর ধীরে ধীরে পাল্টেছে তাঁর কান্নার ভাষা—যেমন একই নদী বদলে বদলে নেয় তার গতিপথ, কিন্তু জল থেকে যায় একই নোনতা।

২০২২ বিশ্বকাপ জিতে মেসি উপহার দিয়েছিলেন আনন্দাশ্রু। এবার বিশ্বকাপে মিসরের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতেও কেঁদেছেন মেসি। সেই কান্না যদি হয় স্বস্তি মেশানো আনন্দের, ফাইনালে শেষের কান্না তাহলে অস্তাচলে ডুবু ডুবু সূর্যের আলো ফুরিয়ে যাওয়ার ব্যথা।

বিশ্বকাপ ট্রফি পেছনে রেখে মঞ্চ থেকে নামছেন মেসি। তখন সেই পদযাত্রার কষ্টটা কেমন!

সূর্য যেমন সারা দিন আলো বিলিয়ে গোধূলিলগ্নে রিক্ত হাতে ফেরে, মেসির পথটাও কি তেমন নয়! ৩৯ বছরে এসে শেষের লগ্নে বিশ্বকাপ থেকে কিছুই পাওয়া হলো না। না গেল শিরোপা ধরে রাখা, গোল্ডেন বল কিংবা গোল্ডেন বুট—মিলল না কিছুই।

ক্যারিয়ারে প্রায় এমন কিছুই নেই, যা জেতেননি। বিশ্বকাপ ট্রফি থেকে এই টুর্নামেন্টের অনেক অনেক রেকর্ডও তাঁর। আছে দুই রকম অভিজ্ঞতাও—হারের বেদনায় যেমন নীল হয়েছেন, তেমনি ভেসে গেছেন চরম আনন্দেও। তাই ভাবতে পারেন, মেসির কান্নায় আর নতুন কী!

পাল্টা প্রশ্ন করা যায়। বাড়িতে বিশ্বকাপ জয়ের পদক রেখে এসে গলায় রানার্সআপের পদক ওঠায় যিনি কাঁদেন, তাঁকে কি তখন আর দশজন অল্প বয়সী সাধারণ আর্জেন্টাইন সমর্থকের মতোই লাগে না? যাঁরা হারের ব্যথায় কিংবা গোলের আনন্দে চোখের অশ্রু ছেড়ে দেন অবলীলায়। ২১ বছরের সোনা ফলানো ক্যারিয়ার শেষেও যিনি এভাবে কাঁদতে পারেন, আকাশি–সাদা জার্সির জন্য তাঁর আবেগ ঠিক কতটা গভীর, ভাবা যায়!

শেষটায় কাঁদতে কাঁদতে মেসি মাঠ ছাড়ার সময় দেখা গেল অন্য রকম এক দৃশ্য। গ্যালারিতে আকাশি–সাদা ভেজা চোখ আর ধরে আসা কণ্ঠগুলোর সঙ্গে মেসিও গাইছিলেন, ‘আমি আর্জেন্টাইন—এই অনুভূতি অমলিন।’ তখন মেসির হাতে শূন্যতা না ট্রফি—সেটা কে দেখে!

সেই জার্সিতে ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে দেশকে, জাতিকে কিছু দিতে না পারার ব্যথাটা মেসির চেয়ে ভালো আর কে জানে! ফাইনালের আগে কিংবদন্তি বলেছিলেন, যা কিছুই ঘটুক না কেন, তাঁদের দলটা যে ইতিহাস গড়েছে, সেটা কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। ২০২১ থেকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় অধ্যায়ে শুরু হওয়া সেই জয়রথ সত্যিই অমোচনীয়। দুটি কোপা আমেরিকার মাঝে বিশ্বকাপ ও ফিনালিসিমা ট্রফি। তারপর এবারের বিশ্বকাপে শূন্য হাতে, রিক্ত মেসির চোখে জল দেখে বোঝা গেল, কখনো কখনো তিনিও আমাদের মতোই রক্তমাংসের মানুষ! যাঁকে ব্যর্থতাও কখনো কখনো ছায়ার মতো তাড়া করে ফেরে।

ফাইনাল শেষে মাঠে একা বসে মেসি

মেসি মাঠে থাকতে আর্জেন্টিনা ৯০ মিনিটের মধ্যে স্পেনের পোস্টে একটি শটও রাখতে পারেনি। মেসি নিজেও ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিটে বল ছুঁয়েছেন মাত্র একবার। গোটা ম্যাচে বল স্পর্শ করেছেন ৫৪ বার—সবগুলোই স্পেনের বক্সের বাইরে। এই মেসিকে দেখা যেন দারুণ এক স্বপ্নের শেষে হঠাৎ দুঃস্বপ্নের ভেতর ঢুকে পড়া! ভাগ্যও কেমন নির্মম—এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ১০ বছর আগে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে অবসর ঘোষণা করেছিলেন মেসি। সেই একই স্টেডিয়াম এবার তাঁকে শুধু বিশ্বকাপ ট্রফি থেকেই বঞ্চিত করেনি, পাশাপাশি তুলে দিয়েছে একটি প্রশ্নও। আর্জেন্টিনার জার্সিতে এটাই কি কিংবদন্তির শেষ ম্যাচ?

এটাই কি মেসির শেষ, কী বলছেন ইব্রা-অঁরিরা

লিওনেল স্কালোনি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, মেসির সঙ্গে তাঁর এ নিয়ে কথা হয়নি। তবে মেসিকে নিয়ে নিজের ভাবনাটা বলেছেন আর্জেন্টিনা কোচ, ‘তার বয়স এখন ৩৯ বছর। অবিশ্বাস্য! তাকে নতুন করে আবিষ্কার করার মতো কিছু নেই। সে যত দিন চাইবে তত দিন খেলবে, এ বিষয়ে আমি পরিষ্কার। বাকি খেলোয়াড় ও পাশে থাকা সবাই তাকে সমর্থন দিয়ে যাবে।’

স্কালোনির পরের কথাটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ‘আমি নিশ্চিত, সবাই তাকে নিয়ে গর্ববোধ করবে। কারণ, সে–ই ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়।’

ফিফা চাইলে বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা আরও বাড়াতে পারে। কিন্তু আগামী দিনগুলোতে মেসিহীন বিশ্বকাপের কথা ভেবে কোকিলহীন বসন্তকে দেখার দুঃখই জাগে। ফুটবলও কত রসিক! ‘ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়’কেও কখনো কখনো ফিরতে হয় খালি হাতে।

মাঠ ছাড়ার সময় মেসি

তবে ফাইনাল থেকে মেসির একদমই যে অর্জন নেই, তা নয়। কাফুর পর দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে খেললেন তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল। তার শেষটায় কাঁদতে কাঁদতে মেসি মাঠ ছাড়ার সময় দেখা গেল অন্য রকম এক দৃশ্য। গ্যালারিতে আকাশি–সাদা ভেজা চোখ আর ধরে আসা কণ্ঠগুলোর সঙ্গে মেসিও গাইছিলেন, ‘আমি আর্জেন্টাইন—এই অনুভূতি অমলিন।’ তখন মেসির হাতে শূন্যতা না ট্রফি—সেটা কে দেখে!

যে হাত কিংবা পা দুটো জীবনভর শুধু দিয়েই গেল, আজ তাতে খানিকটা মরিচা দেখে যেন চোখের জলে ধুয়ে দিতে ইচ্ছে করে সব ব্যর্থতা। তারপর গলা ফাটিয়ে এই পৃথিবীকে শুনিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, ‘ধন্যবাদ, কিংবদন্তি।’

সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনির কান্না, ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা

Read full story at source