জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত আরিফুল বললেন, ‘জীবন আর আগের মতো নেই’
· Prothom Alo

এ বছর জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি—দুই মাস হাসপাতালে ছিলেন মো. আরিফুল (৩২)। বাড়ি ফেরার পর আবার মে মাসে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। দুই মাস চিকিৎসার পর চলতি জুলাইয়ের শুরুর দিকে তিনি আবার বাড়ি ফেরেন।
Visit truewildslot.com for more information.
বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ব্যাপারে আরিফুল বললেন, ‘ইনফেকশন (সংক্রমণ) কিছুতেই থামছে না। পায়ের হাড়ের সংক্রমণ নিয়ে বারবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। এ পর্যন্ত ১২ বার অস্ত্রোপচার হয়েছে।’
২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে আহত হন আরিফুল। তিনি জানান, তাঁর ডান পায়ের হাঁটুতে গুলি লাগে। গুলিতে হাঁটুর হাড় ভেঙে যায়। গত দুই বছরে তাঁকে বাসার চেয়ে হাসপাতালেই বেশি থাকতে হয়েছে।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে আরিফুল জানান, সেদিন ছিল ১৯ জুলাই (২০২৪ সাল)। তিনি রাজধানীর রামপুরা ব্রিজের কাছে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে ছিলেন। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁর হাঁটুতে গুলি করে। গুলি করার আগে তাঁর মোটরসাইকেলটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
ছোটখাটো একটি চাকরির পাশাপাশি অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল চালাতেন আরিফুল। যেদিন গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, সেদিনও মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়েছিলেন তিনি।
আরিফুল বলেন, ‘একটু ভালো থাকার জন্য চাকরির পাশাপাশি অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেছিলাম। কিন্তু এখন তো আর আমার পক্ষে মোটরসাইকেল চালানো সম্ভব না। ডান পা ভাঁজ করতে পারি না।’
আরিফুলের গ্রামের বাড়ি নওগাঁর রানীনগর উপজেলার বিল পালশা গ্রামে। বাবা মো. চঞ্চল, মা মোসাম্মৎ আকলিমা। আরিফুলের একমাত্র সন্তান আয়েশা মনি (৯)। সে থাকে দাদির কাছে। আরিফুল জানালেন, ২০২০ সালে বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। রাজধানীর বাড্ডায় একটি সিমেন্টের দোকানে চাকরি নেন। কিন্তু বেতন ছিল কম। মাসে মাত্র ১৩ হাজার টাকা। নিজের খরচ চালিয়ে বাড়িতে টাকা পাঠানোটা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। তাই বাড়তি আয়ের জন্য এই চাকরির পাশাপাশি তিনি অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেছিলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দৃষ্টি হারানো তরুণ আমান উল্লাহ কাজের সুযোগ চানআরিফুল জানালেন, ২০২২ সালে একদিন তিনি দোকানমালিককে বললেন, তাঁর নিজের কাছে ২৫ হাজার টাকা আছে। আর কিছু টাকা ঋণ পেলে তিনি একটি ব্যবহৃত (সেকেন্ড হ্যান্ড) মোটরসাইকেল কিনতে পারবেন। দোকানমালিক তাঁকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ দেন। মোট ৬৫ হাজার টাকা দিয়ে তিনি একটি মোটরসাইকেল কেনেন। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল চালিয়ে ভালো আয় হচ্ছিল তাঁর। তেলখরচ বাদে মাসে তাঁর ১৪-১৫ হাজার টাকা হাতে থাকত। এক বছরে ১৮ হাজার টাকা ঋণ শোধ করেছিলেন তিনি। মালিক ভালো মানুষ ছিলেন। তাই বাকি টাকা তিনি নেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মোটরসাইকেলটি গেল। আর জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে তিনি হলেন আহত।
সেদিন কী হয়েছিল
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কী হয়েছিল, কীভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, সে বিষয়ে আরিফুলের ভাষ্য হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থী–জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছিলেন। রাস্তায় ঘুমাতেন—এমন একজনকেও গুলি করা হয়। সেটা দেখে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশে চেঁচিয়ে কিছু কটাক্ষমূলক কথা বলেছিলেন। গুলি না করে সামনে এসে লড়তে বলেছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য হয়তো কথাটা শুনেছিলেন। হুট করে তাঁদের কয়েকজনকে টেনে আটক করা হয়। তাঁকে গুলি করা হবে ভেবে তিনি বলতে থাকেন, তাঁর একটি মাত্র সন্তান আছে। তিনি অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল চালান। এভাবে বাঁচার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তাঁকে বলা হয়, ‘দৌড় দে।’
জুলাইয়ের এই মুখগুলো এখন কোথায়আরিফুল বলেন, অন্যদের ক্ষেত্রে তিনি দেখেছেন, দৌড় দিলে গুলি করে। এ জন্য তিনি আস্তে–ধীরে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর ডান পায়ের হাঁটুতে গুলি এসে লাগে। রক্ত ছুটে বের হয়। শরীর অবশ লাগে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন তিনি। তাঁকে গুলি করার আগে তাঁর মোটরসাইকেলটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তিনি রাস্তায় পড়ে ছিলেন। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে তিনজন ছাত্রী তাঁকে রাস্তা থেকে টেনে পাশের গলিতে নিয়ে যান। তাঁরাই তাঁকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। পরদিন তাঁকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) স্থানান্তরিত হতে বলা হয়।
ঋণ করে চিকিৎসা
নিটোরে (পঙ্গু হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত) ভর্তি হওয়ার পর ২০ জুলাই হাঁটুতে প্রথম অস্ত্রোপচার হয় বলে জানালেন আরিফুল। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে তিনি এক মাসের বেশি সময় ছিলেন। প্রথম ১৭ দিনে নিজের টাকায় চিকিৎসা করতে হয়। এ জন্য তাঁকে ৮৫ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছিল।
খরচের চাপ সামলাতে না পেরে আরিফুল একসময় তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়া নিয়েই শঙ্কায় পড়ে গিয়েছিলেন। এ কথা জানিয়ে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর তাঁদের (আহত জুলাই যোদ্ধা) চিকিৎসা বিনা মূল্যে করা হবে বলে জানানো হয়। তখন তিনি কিছুটা স্বস্তি পান। পরে তাঁর চিকিৎসা হয় ঢাকায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)।
নতুন আবেদন নেই, জুলাই শহীদের সংখ্যা ৮৪৩এখন যেমন আছেন
এক ভাই-এক বোনের মধ্যে আরিফুল বড়। তিনি জানালেন, বসতভিটা ছাড়া নিজেদের কোনো জমি নেই। তাঁর বাবা বর্গাচাষি। চিকিৎসার জন্য আসা–যাওয়ার সুবিধার্থে তিনি এখন মামার বাড়ি নওগাঁর রানীনগর উপজেলার এনায়েতপুরে থাকেন। ‘অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সংগঠন তাঁকে মামার বাড়ির কাছে একটি দোকান করে দিয়েছে। তবে তাঁকে বেশির ভাগ সময় হাসপাতালে থাকতে হয় বলে দোকানটি ঠিকমতো চালাতে পারেন না তিনি। ফলে তাঁর জীবন হয়ে পড়েছে সরকারি সম্মানী ভাতার ওপর নির্ভরশীল। গুরুতর আহত ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তিনি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা পান।
‘অপরাজিত ২৪ ফাউন্ডেশন’–এর কর্মসূচি কর্মকর্তা তাছমিয়া হক প্রথম আলোকে বলেন, আহত ব্যক্তিদের ধরন অনুসারে আরিফুলের ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত (অতি গুরুতর আহত) হওয়ার কথা। তবে তাঁকে ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। ঢাকা–নওগাঁ—এভাবে হাসপাতালে যাওয়া–আসা করতে হয় আরিফুলের। এ কারণে তাঁকে তাঁর দোকানটি প্রায়ই বন্ধ রাখতে হয়। সব মিলিয়ে আরিফুলকে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
আরিফুল বলেন, আহত ব্যক্তিদের ধরন অনুযায়ী শুরুতে তাঁকে ‘গ’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছিল। পরে তাঁর আবেদনের ভিত্তিতে তাঁকে ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়। তিনি সরকার থেকে এককালীন তিন লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছেন।
দীর্ঘ অসুস্থতায় অনেকে, বিদেশে চিকিৎসায় এখনো ৩৯ জনচিকিৎসার প্রয়োজনে একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্সে করে নওগাঁ–ঢাকা যাওয়া–আসা করতেন বলে জানান আরিফুল। তিনি বলেন, একবার অ্যাম্বুলেন্সে করে যাওয়া–আসায় ভাড়া লাগত ২৪ হাজার টাকা। এভাবে অন্তত সাতবার যাওয়া–আসায় দেড় লাখ টাকার বেশি খরচ হয়ে যায়। দুই-তিন মাস পরপর তাঁকে হাসপাতালে যেতে হয়। এখন তিনি বাসে বা ট্রেনে করে ঢাকায় যাতায়াত করেন। বাসে গেলে দুটি আসন নেন। আর ট্রেনে গেলে তিনটি আসন। কারণ, তিনি পা ভাঁজ করতে পারেন না। ১০ মিনিটের বেশি তিনি হাঁটতে পারেন না বা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। চিকিৎসকেরা বলেছেন, হাঁটুর হাড় পাল্টাতে হবে। তবে তার আগে সংক্রমণ থামাতে হবে। কিন্তু সংক্রমণই থামানো যাচ্ছে না।
আরিফুল বলেন, ‘জীবন এখন আর আগের মতো নেই। সেটা নিয়ে মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়। শারীরিক কষ্টের একেকটা সময় মনে হয়, পা যদি ভাঁজ করে জড়ো হয়ে বসতে পারতেন, না জানি কত আরাম লাগত! এখন একটাই চিন্তা—একমাত্র সন্তানের জন্য ঘুরে দাঁড়াতে হবে।’
জুলাই যোদ্ধাদের আবাসনে বরাদ্দ ৩০০ কোটি