আপেক্ষিকতার মজার জগৎ—পর্ব ৩
· Prothom Alo

Visit moryak.biz for more information.
উনিশ শতকের পদার্থবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন, ইথার নিশ্চয়ই সেই খোলা মালবাহী ট্রেনের ওপর দিয়ে ছুটে চলা বাতাসের মতোই কাজ করে। এ ছাড়া আর কীই–বা হতে পারে! ইথার যদি স্থির থাকে, তবে এর ভেতর দিয়ে যেকোনো চলন্ত বস্তুকে তো উল্টো দিক থেকে আসা ইথার বায়ুর মুখোমুখি হতেই হবে। আলো হলো এই স্থির ইথারের ভেতর একটি তরঙ্গ। তাই চলন্ত কোনো বস্তুর ওপর আলোর বেগ মাপলে সেই ইথার বায়ুর প্রভাব অবশ্যই পড়বে।
পৃথিবী সূর্যের চারদিকে সেকেন্ডে প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেগে ছুটছে। বিজ্ঞানীদের যুক্তি ছিল, পৃথিবীর এই গতির কারণে সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগের একটি ইথার বায়ু তৈরি হওয়ার কথা, যা পৃথিবীকে ও এর প্রতিটি পরমাণুর ফাঁক গলে বয়ে যাবে। স্থির ইথারের সাপেক্ষে পৃথিবীর এই পরম গতি মাপতে হলে পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন দিকে ছোটা আলোর বেগ মাপলেই কাজ হয়ে যাবে। ইথার বায়ুর কারণে আলো নিশ্চয়ই এক দিকে জোরে ছুটবে! বিভিন্ন দিকে পাঠানো আলোর এই বেগের পার্থক্য তুলনা করে যেকোনো মুহূর্তে পৃথিবীর গতির আসল দিক ও পরম বেগ মাপা সম্ভব হবে।
আইনস্টাইনের জন্মের চার বছর আগে, ১৮৭৫ সালে বিখ্যাত স্কটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল প্রথম এমন একটি পরীক্ষার প্রস্তাব করেছিলেন।
নাসার সিমুলেশনে এবার পৃথিবীতে বসে মঙ্গলের অভিজ্ঞতা১৮৮১ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর এক তরুণ কর্মকর্তা আলবার্ট আব্রাহাম মাইকেলসন ঠিক এমনই এক পরীক্ষা করেছিলেন। মাইকেলসনের জন্ম জার্মানিতে, বাবা-মা ছিলেন পোলিশ। কিন্তু তাঁর বয়স যখন দুই বছর, তখন তাঁর বাবা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান। অ্যানাপোলিসের ইউএস নেভাল একাডেমি থেকে পড়াশোনা শেষ করে দুই বছর সমুদ্রে কাজ করার পর তিনি ওই একাডেমিতেই পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
ছুটি নিয়ে মাইকেলসন ইউরোপে পড়তে গিয়েছিলেন। জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী হারম্যান ফন হেলমহোল্টজের গবেষণাগারে বসেই তরুণ মাইকেলসন ইথার বায়ু ধরার জন্য প্রথম চেষ্টা করেছিলেন। প্রথম চেষ্টায় তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ, তিনি কম্পাসের যে দিকেই আলো পাঠান না কেন, আলোর বেগে কোনো পার্থক্যই নেই!
এরনস্ট মাখ নামের একজন নামকরা অস্ট্রীয় পদার্থবিজ্ঞানী অনেক দিন ধরেই ইথারের ভেতর পরম গতির এই ধারণার সমালোচনা করে আসছিলেন। তিনি মাইকেলসনের পরীক্ষার ফলাফল পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত নিলেন, ইথারের ধারণাটা বাতিল করতে হবে।
তবে বেশির ভাগ পদার্থবিজ্ঞানী এত বড় সাহসী পদক্ষেপ নিতে রাজি ছিলেন না। তাঁরা যুক্তি দেখালেন, মাইকেলসনের পরীক্ষার যন্ত্রটি তেমন নিখুঁত ছিল না। আরও ভালো নকশা ও সংবেদনশীল যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করলে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে বলেই সবার বিশ্বাস ছিল। মাইকেলসন নিজেও তা-ই ভাবতেন। তিনি তাঁর পরীক্ষার এই ব্যর্থতায় বেশ হতাশ হয়েছিলেন। তবে হতাশ হলেও থেমে যাননি। আবার চেষ্টা করার জন্য মুখিয়ে ছিলেন।
নক্ষত্রের ভোজে গ্রহ, অপেক্ষায় আছে বাদামি বামনমাইকেলসন নৌবাহিনীর চাকরি ছেড়ে ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডের কেস স্কুল অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। কাছেই ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটিতে রসায়ন পড়াতেন এডওয়ার্ড উইলিয়ামস মোর্লি। এই দুই ব্যক্তি খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেলেন। এখানে জানিয়ে রাখি, এই দুটি প্রতিষ্ঠান মিলে এখন নাম হয়েছে কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটি।
বার্নার্ড জ্যাফে তাঁর ‘মাইকেলসন অ্যান্ড দ্য স্পিড অব লাইট’ বইয়ে লিখেছেন, ‘বাইরে থেকে দেখতে এই দুই বিজ্ঞানী ছিলেন একেবারেই দুই মেরুর মানুষ...মাইকেলসন ছিলেন দেখতে সুদর্শন, পরিপাটি এবং সব সময় নিখুঁত পোশাক পরতেন। অন্যদিকে মোর্লি পোশাকের ব্যাপারে ছিলেন একেবারেই উদাসীন। তাঁকে দেখতে ঠিক গল্পের সেই ভুলো মনের অধ্যাপকদের মতোই লাগত...তিনি তাঁর চুলগুলোকে কাঁধ পর্যন্ত লম্বা হতে দিতেন এবং তাঁর একটা বিশাল লাল গোঁফ ছিল, যা একেবারে কান পর্যন্ত ছড়ানো ছিল।’
১৮৮৭ সাল। মোর্লির বেসমেন্টের গবেষণাগারে বসে এই দুই বিজ্ঞানী অধরা সেই ইথার বায়ুকে ধরার জন্য আরও বেশি সতর্কতার সঙ্গে দ্বিতীয়বারের মতো চেষ্টা করলেন। তাঁদের এই পরীক্ষা ‘মাইকেলসন-মোর্লি পরীক্ষা’ নামে পরিচিতি পায়। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি অন্যতম বড় একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা ছিল। পরীক্ষার যন্ত্রপাতিগুলো একটি বর্গাকার পাথরের স্ল্যাবের ওপর বসানো হয়েছিল। স্ল্যাবটির প্রতিটি পাশ ছিল প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা ও এক ফুটের বেশি পুরু। তরল পারদের ওপর ভাসানো ছিল এটি। ফলে যেকোনো ধরনের কম্পন এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। স্ল্যাবটিকে একদম সোজা রাখা হয়েছিল এবং মাঝখানের একটি পিনের ওপর ভিত্তি করে একে খুব সহজেই ঘোরানো যেত। স্ল্যাবের ওপর রাখা বেশ কিছু আয়না মিলে একটি নির্দিষ্ট দিকে আলোর রশ্মি পাঠাত। তারপর সেই আয়নাগুলো ওই রশ্মিটিকে একই দিকে এপাশ-ওপাশ করে আটবার আসা-যাওয়া করাত। আলোর পথ যথাসম্ভব লম্বা করার জন্যই এমনটা সম্ভব হয়েছিল। পাশাপাশি যন্ত্রটিকে এমনভাবে রাখা হয়েছিল, যাতে সহজেই ঘোরানো যায়। একই সময়ে আয়নাগুলো আরেকটি আলোর রশ্মিকেও একইভাবে আটবার আসা-যাওয়া করাত। তবে সেটি যেত প্রথম রশ্মিটির ঠিক সমকোণে।
১৮ বছরের অনুসন্ধানের পর কঙ্গোর বনে নতুন বানরের সন্ধানমাইকেলসন-মোর্লির ধারণা ছিল, স্ল্যাবটিকে যখন এমনভাবে ঘোরানো হবে, যাতে একটি আলোর রশ্মি ইথার বায়ুর সমান্তরালে আসা-যাওয়া করে, তখন এই রশ্মি একই দূরত্বে ইথার বায়ুর সমকোণে যাওয়া অন্য রশ্মিটির চেয়ে বেশি সময় নেবে। প্রথমে তোমার মনে হতে পারে, উল্টোটাই ঘটবে! কিন্তু যে আলো বাতাসের সঙ্গে এবং বাতাসের বিপরীতে যাচ্ছে, সেই আলোর কথা ভেবে দেখো। বাতাস কি যাওয়ার সময় আলোর বেগকে ঠিক ততটাই বাড়িয়ে দেবে না, যতটা সে আসার সময় কমিয়ে দেবে? যদি তা-ই হয়, তবে বাড়িয়ে দেওয়া এবং কমিয়ে দেওয়ার প্রভাব কাটাকাটি হয়ে বাতিল যাবে। তাহলে পুরো যাত্রার সময় এমন হবে যেন কোনো বাতাসই নেই!
এটা সত্যি যে বাতাস আলোর বেগকে এক দিকে ঠিক ততটাই বাড়িয়ে দেবে, যতটা সে অন্য দিকে কমিয়ে দেবে। কিন্তু বাতাস আলোর বেগকে বেশি সময় ধরে কমিয়ে রাখবে। এটাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। একটু হিসাব করলেই দেখা যায়, বাতাস না থাকলে আলো যে সময় নিত, তার চেয়ে এই পুরো যাত্রায় সময় বেশি লাগবে। বাতাস সেই রশ্মিটির গতিও কমিয়ে দেবে, যেটি বাতাসের সমকোণে ছুটছিল। এটাও খুব সহজেই হিসাব করা যায়। দেখা যায়, এই কমার পরিমাণ বাতাসের সমান্তরালে চলা রশ্মিটির কমার পরিমাণের চেয়ে কম। তাহলে আর কোনো সন্দেহই রইল না যে পৃথিবী যদি স্থির ইথারের সাগরের ভেতর দিয়ে চলে, তবে নিশ্চয়ই ইথার বায়ু তৈরি হবে। আর যদি ইথার বায়ু থাকে, তবে মাইকেলসন-মোর্লির যন্ত্রটি তা ঠিকই ধরে ফেলবে।
আসলে এই দুই বিজ্ঞানী নিশ্চিত ছিলেন, তাঁরা শুধু এমন বাতাস খুঁজে পাবেন তা-ই নয়, বরং (দুই রশ্মির আসা-যাওয়ার সময়ে সর্বোচ্চ পার্থক্য পাওয়া পর্যন্ত স্ল্যাব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে) তাঁরা যেকোনো মুহূর্তে ইথারের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর চলাচলের নিখুঁত দিকও বের করতে পারবেন। বলে রাখা ভালো, মাইকেলসন-মোর্লির যন্ত্রটি আলোর প্রতিটি রশ্মির আসল বেগ মাপত না। দুটি রশ্মি তাদের নিজ নিজ আসা-যাওয়ার পর একসঙ্গে মিলে একটি রশ্মিতে পরিণত হতো, যাকে একটি ছোট টেলিস্কোপের ভেতর দিয়ে দেখা যেত। এরপর যন্ত্রটিকে ধীরে ধীরে ঘোরানো হতো। দুই রশ্মির আপেক্ষিক বেগে যেকোনো ধরনের পরিবর্তন হলেই আলো ও অন্ধকারের একটি পাল্টাপাল্টি ব্যতিচার নকশার দিকে সরে যেত। কিন্তু মাইকেলসন আবার একই সঙ্গে অবাক ও হতাশ হলেন। তবে এবার শুধু তিনি নন, সারা বিশ্বের পদার্থবিজ্ঞানীরাই অবাক হয়েছিলেন। মাইকেলসন ও মোর্লি তাঁদের যন্ত্রটিকে যেভাবেই ঘোরান না কেন, তাঁরা ইথার বায়ুর কোনো চিহ্নই পেলেন না! বিজ্ঞানের ইতিহাসে এর আগে কখনো কোনো পরীক্ষার নেতিবাচক ফলাফল এত ইতিবাচক ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী হয়নি।
মাইকেলসন আবারও ভেবেছিলেন তাঁর পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছে। তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, তাঁর এই ‘ব্যর্থতা’ বিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ও বৈপ্লবিক পরীক্ষাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে! পরে মাইকেলসন ও মোর্লি আরও নিখুঁত যন্ত্রপাতি নিয়ে তাঁদের পরীক্ষাটির পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। অন্য পদার্থবিজ্ঞানীরাও তা-ই করেছিলেন। ১৯৬০ সালে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির চার্লস এইচ টাউনস অত্যন্ত নিখুঁত একটি পরীক্ষা করেন। তিনি মেজার নামের একটি যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন। এটি আসলে অণুর কম্পনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি পারমাণবিক ঘড়ি ছিল। তাঁর যন্ত্রটি এত সংবেদনশীল ছিল যে পৃথিবী যদি তার আসল বেগের মাত্র এক হাজার ভাগের এক ভাগ বেগেও চলত, তবু তিনি ইথার বায়ু ধরে ফেলতে পারতেন। কিন্তু এমন কোনো বাতাসের চিহ্নই পাওয়া যায়নি।
চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন একজন ডেলিভারিম্যানমাইকেলসন-মোর্লি পরীক্ষার এই নেতিবাচক ফলাফল দেখে পদার্থবিজ্ঞানীরা প্রথমে এত অবাক হয়েছিলেন যে তাঁরা ইথার বায়ু তত্ত্বকে বাঁচানোর জন্য নানা রকম ব্যাখ্যার জন্ম দিতে লাগলেন। অবশ্য জি জে হুইটরো তাঁর ‘দ্য স্ট্রাকচার অ্যান্ড ইভল্যুশন অব দ্য ইউনিভার্স’ বইয়ে যেমনটা বলেছেন, পরীক্ষাটি যদি কয়েক শতাব্দী আগে করা হতো, তবে সবার মাথাতেই খুব সহজ একটা ব্যাখ্যা আসত: পৃথিবী আসলে ঘোরে না! কিন্তু এই তত্ত্ব তখন কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা ছিল আরেকটি পুরোনো তত্ত্ব। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী, বন্ধ ট্রেনের ভেতরের বাতাসের মতো ইথারও পৃথিবীর সঙ্গে সঙ্গে ঘুরতে থাকে। মাইকেলসন নিজেও এমনটাই ভেবেছিলেন। কিন্তু অন্য পরীক্ষাগুলো এই সম্ভাবনাকে বাতিল করে দেয়। এর মধ্যে একটি পরীক্ষা আবার মাইকেলসন নিজেই করেছিলেন!
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাখ্যাটি দিয়েছিলেন আইরিশ পদার্থবিজ্ঞানী জর্জ ফ্রান্সিস ফিটজেরাল্ড। তিনি বললেন, ‘হয়তো ইথার বায়ু চলন্ত বস্তুর ওপর চাপ দেয়। ফলে বস্তুটি যেদিকে ছুটছে, সেদিকে একটু ছোট বা সংকুচিত হয়ে যায়।’ একটি চলন্ত বস্তুর দৈর্ঘ্য বের করতে হলে স্থির অবস্থায় তার দৈর্ঘ্যকে একটি সহজ সূত্র দিয়ে গুণ করতে হবে। সূত্রটিতে v2 হলো বস্তুর বেগের বর্গ, আর c2 হলো আলোর বেগের বর্গ। সূত্রটি হলো:
এই সূত্র ভালো করে দেখলে বুঝবে, বেগ যখন কম থাকে, বস্তু তখন খুব সামান্যই ছোট হয়, যা ধরার মধ্যে পড়ে না। কিন্তু বেগ যত বাড়ে, বস্তুটি তত বেশি ছোট হতে থাকে। আবার যখন বস্তুর বেগ আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন সেটি অনেক ছোট হয়ে যায়। এর মানে, লম্বা চুরুটের মতো দেখতে একটি মহাকাশযান যদি খুব দ্রুতবেগে ছোটে, তবে তার আকার বদলে ছোট একটি চুরুটের মতো হয়ে যাবে। আলোর বেগ হলো এমন এক চূড়ান্ত সীমা, যা কখনো ছোঁয়া যায় না। তবে যদি ছোঁয়াই যেত, তাহলে সূত্রটি এমন হতো:
অর্থাৎ হিসাবের ফল দাঁড়াত শূন্য। বস্তুর দৈর্ঘ্যকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে ফলাফলও শূন্যই হবে। অর্থাৎ কোনো বস্তু যদি আলোর বেগে পৌঁছাতে পারত, তবে যেদিকে সে ছুটছে, সেদিকে তার কোনো দৈর্ঘ্যই থাকত না! ফিটজেরাল্ডের তত্ত্বটিকে চমৎকার গাণিতিক রূপ দিয়েছিলেন ডাচ পদার্থবিজ্ঞানী হেন্ড্রিক আন্টুন লরেন্টজ। মজার ব্যাপার হলো, লরেন্টজ নিজেও স্বাধীনভাবে ঠিক একই ব্যাখ্যার কথা ভেবেছিলেন। লরেন্টজ পরে আইনস্টাইনের খুব কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন, তবে তখনো তাঁদের পরিচয় হয়নি। এই তত্ত্ব পরে লরেন্টজ-ফিটজেরাল্ড সংকোচন তত্ত্ব নামে পরিচিতি পায়।
সংকোচন তত্ত্ব কীভাবে মাইকেলসন-মোর্লি পরীক্ষার ব্যর্থতাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, তা বোঝা খুব সহজ। ইথার বায়ু যেদিকে বইছিল, বর্গাকার স্ল্যাব ও এর ওপরের সব যন্ত্রপাতি যদি সেদিকে একটুখানি ছোট হয়ে যায়, তবে আলোকে একটু কম দূরত্ব পার হতে হবে। যদিও বাতাস আলোর আসা-যাওয়ার পথে গতি কমিয়ে দেবে, কিন্তু পথ ছোট হওয়ার কারণে আলো ঠিক সেই সময়েই তার যাত্রা শেষ করতে পারবে। অবশ্য বাতাস ও সংকোচন না থাকলেও একই সময় লাগত। সহজ কথায়, মাইকেলসন-মোর্লির যন্ত্রটিকে যেদিকেই ঘোরানো হোক না কেন, আলোর বেগ সব সময় ধ্রুব বা একই রাখার জন্য ঠিক যতটুকু সংকোচন দরকার, ততটুকুই হবে!
তুমি হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারো, এই তত্ত্ব পরীক্ষা করার জন্য যন্ত্রটির দৈর্ঘ্য মেপে দেখলেই তো হয়! দেখা যেত, পৃথিবীর গতির দিকে যন্ত্রটি সত্যিই ছোট হয় কি না। এর উত্তর হলো, যে স্কেল দিয়ে মাপা হবে, সেটিও একই হারে ছোট হয়ে যাবে। ফলে মাপজোখ করলে দেখা যাবে, কোনো সংকোচনই হয়নি, যেন সবকিছু আগের মতোই আছে! চলন্ত পৃথিবীর ওপর থাকা সবকিছুর ক্ষেত্রেই এই সংকোচন ঘটবে। পরিস্থিতিটা অনেকটা পয়েনকারের সেই থট এক্সপেরিমেন্টের মতো। এ ব্যাপারে প্রথম অধ্যায়ে আলোচনা করেছি। সেখানে পুরো মহাবিশ্ব হঠাৎ করে হাজার গুণ বড় হয়ে গিয়েছিল। শুধু পার্থক্য হলো, লরেন্টজ-ফিটজেরাল্ড তত্ত্বে এই পরিবর্তন শুধু একদিকে ঘটবে। যেহেতু এই পরিবর্তন সবকিছুর জন্যই প্রযোজ্য, তাই এটি ধরার কোনো উপায় নেই। নির্দিষ্ট কিছু সীমার মধ্যে আকারের মতোই বস্তুর রূপ বা গঠনও আপেক্ষিক। এই সীমাগুলো টপোলজির ওপর নির্ভর করে। বস্তুর আকার বদলালেও যেসব বৈশিষ্ট্য একই থাকে, সে ব্যাপারে পড়াশোনাকে বলে টপোলজি। এটা গণিতের একটি বিষয়। বড় হলে আরও ভালো বুঝতে পারবে।
ইতিহাসে যুদ্ধ ছাড়া কি কোনো যুগ ছিল