চীনের চিয়াংসি প্রদেশের গ্রাম ইয়ানতিয়ানে কৃষি-পর্যটন ও বাস্তব জীবন
· Prothom Alo

চিয়াংসি ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসের ‘ওভারসিজ এডুকেশন স্কুল’-এর আয়োজনে ‘এক্সপেরিয়েন্সিং চায়না’ কোর্সের অংশ হিসেবে শিক্ষামূলক সফরে চিয়াংসি প্রদেশের উউইউয়ান কাউন্টির ইয়ানতিয়ান গ্রামে আমরা গিয়েছিলাম। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল অংশগ্রহণকারীদের ঐতিহাসিকভাবে সংরক্ষিত একটি গ্রামের প্রেক্ষাপটে চীনের গ্রামীণ সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের কার্যক্রম সরাসরি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দেওয়া।
Visit chinesewhispers.club for more information.
ইয়ানতিয়ান গ্রামটি গ্রামীণ জীবন ও প্রাচীন গ্রামের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্যের এক আদর্শ প্রতিচ্ছবি। সবুজ পাহাড়ঘেরা এই গ্রামে পাথরের খিলানযুক্ত সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ বারিধারা এবং ধীরলয়ে ঘুরছে প্রাকৃতিক এক গ্রামীণ জীবনচক্র। গ্রামটিতে রয়েছে ১৪ মিটার ব্যাসার্ধ ও ১ হাজার ৫০০ বছরের বেশি পুরোনো এক বিশাল কর্পূরগাছ, যা ‘কর্পূর বৃক্ষরাজ’ নামে পরিচিত।
ভোরের আলো ফুটতেই মোরগের ডাক শোনা যায় এবং ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁস তাদের খোঁয়াড় ছেড়ে বেরিয়ে এসে হ্রদে খেলা করে; দিনের পর দিন তারা যেন গ্রামবাসীদের সঙ্গী হয়ে ও তাদের প্রহরী হিসেবেই পাশে থাকে। গ্রামটিতে এখনো ‘হুই’ স্থাপত্যশৈলীর ৭৬টি সুসংরক্ষিত বাড়ি এবং সদ্য সংস্কার করা দুটি পৈতৃক স্মৃতিভবন টিকে আছে। ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে জানা যায়, সং থেকে চিং রাজবংশের শাসনকাল পর্যন্ত এই গ্রামের প্রায় ২৭ পণ্ডিত ও সরকারি কর্মকর্তা রাজকীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। গ্রামের এই সহজ-সরল ও শান্ত পরিবেশ মনকে প্রশান্ত করে এবং জীবনের গতিকে ধীর করে তোলে। ফলে শহরের কোলাহলপূর্ণ জীবন থেকে দূরে সরে আসার জন্য এটি এক আদর্শ স্থান।
পাহাড়ের ঢালে উঠে পুরো গ্রামটিকে দেখার সুযোগসহ এখানকার সবকিছুই চীনের জাতীয় ‘৪এ)’ পর্যায়ের দর্শনীয় স্থানের মানদণ্ড অনুযায়ী গড়ে তোলা হয়েছে। গ্রীষ্মকালে, অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট মাসে—ইয়ানতিয়ান গ্রামের রূপ পরিবর্তিত হয়। বসন্তের সেই মনোরম পুষ্পশোভিত পরিবেশের বদলে তখন শুরু হয় উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া। এ সময় এখানকার ভূপ্রকৃতিতে তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত এক কৃষিব্যবস্থার প্রাধান্য দেখা যায়: ধানের আঁকাবাঁকা খেত, প্রাকৃতিক জলাভূমিতে পদ্মমূলের (লোটাস রুট) চাষ এবং মিষ্টি আলুর জন্য তৈরি উঁচু উঁচু বেডের সারি। প্রথাগত ‘হুই’ স্থাপত্যশৈলীর পটভূমি এই ঋতুতে জিয়াংনান অঞ্চলের এক অনন্য নান্দনিক সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে। এ সময়ে প্রচুর বৃষ্টি হয় এবং গড় মাসিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
চীনের পর্যটনশিল্প এক অভাবনীয় ও দ্রুত অগ্রগতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ইয়ানতিয়ান গ্রাম হলো এই প্রক্রিয়ারই একটি উজ্জ্বল ও ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, পর্যটন ও সংশ্লিষ্ট খাতগুলো চীনের জিডিপিতে বার্ষিক ৫ দশমিক ৪৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ান অবদান রেখেছে, যা মোট জিডিপির ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ। এটি আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের ভ্রমণের সংখ্যা ৫৬০ কোটিতে পৌঁছেছে, যা মহামারি-পূর্ববর্তী সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া কেবল ২০২৫ সালের বসন্তকালীন উৎসবের (স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল) ছুটির সময়েই পর্যটন থেকে আয় হয়েছে ৬৭৭ বিলিয়ন ইউয়ান। এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল একটি শিল্পের ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্রই তুলে ধরে না, বরং এক গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেয়। কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার ওপর গড়ে ওঠা ‘অ্যাগ্রি–ট্যুরিজম’ বা কৃষি-পর্যটন এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসছে, আর এ ক্ষেত্রে উউইউয়ান কাউন্টির ইয়ানতিয়ান গ্রামের মতো কৃষি-নিসর্গগুলো মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৪০ কোটি জনসংখ্যা এবং আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম দেশ হিসেবে চীন বিশাল কৃষিজমি, সমৃদ্ধ গ্রামীণ ঐতিহ্য ও অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের অধিকারী, যা কৃষি-পর্যটনের ক্ষেত্রে পর্যটকদের একটি বিশাল সম্ভাব্য উৎস হয়ে উঠেছে। আগামী দশকে গ্রামীণ পর্যটন গ্রামীণ রূপান্তরের এক শক্তিশালী চালিকা শক্তি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। এগুলো গ্রামের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করা এবং সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত সংরক্ষণকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। চীনের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি কৃষি-পর্যটন বিকাশের ক্ষেত্রে অনন্য সুবিধা প্রদান করে: যেমন চিয়াংসির উপক্রান্তীয় অঞ্চলের আঁকাবাঁকা ধানখেত, ইনার মঙ্গোলিয়ার উচ্চভূমির তৃণভূমি, ঝেজিয়াংয়ের রেশমপোকা খামার, ইউনানের চা-বাগান, শানসির লোয়েস মালভূমির কৃষিজমি এবং গুয়াংডংয়ের বদ্বীপীয় জলপথ, যার প্রতিটিই নিজস্ব কৃষি-বাস্তুতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক।
চিয়াংসি প্রদেশ, যেখানে উউইউয়ান অবস্থিত, চীনের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চল। পলিমাটিসমৃদ্ধ সমভূমি, উপক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতির সুবাদে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
শরৎ ও বসন্তকালে ইয়ানতিয়ান গ্রামের দৃশ্যপট অত্যন্ত মনোরম হয়ে ওঠে। বসন্তে ধাপ-কাটা খেতজুড়ে একের পর এক শর্ষে ফুল ফুটে ওঠে। তখন কৃষিজ রঙের উজ্জ্বল সমাহারে পুরো এলাকা এক অপূর্ব সোনালি মোজাইকের রূপ ধারণ করে। শরৎকালে গ্রামটিতে ফিরে আসে এক শান্ত ও স্নিগ্ধ গ্রামীণ পরিবেশ, আর স্বচ্ছ আলোয় ‘হুই’ ঘরানার স্থাপত্যশৈলীর রূপরেখা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ইতিহাসের গভীরতা ও আবহ জড়িয়ে থাকা এই নিস্তব্ধ খেতগুলো এক গভীর ও চিন্তাশীল সৌন্দর্যের আবেশ তৈরি করে।
চিয়াংসি প্রদেশের ইয়ানতিয়ান গ্রাম, যা ‘চীনের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম’ হিসেবে খ্যাত—তারই বাইরের এক ধাপ-কাটা জমিতে লাল মাটির ওপর নীরবে হাঁটু গেড়ে বসে এক বয়স্ক কৃষক মিষ্টি আলুর চারা রোপণ শুরু করেন। চারাগুলোর সারি নিখুঁতভাবে সাজানো। দশকের পর দশক ধরে আয়ত্ত করা তাঁর এই বিশেষ কৌশল কোনো নির্দেশিকা বা ম্যানুয়ালে পাওয়া যাবে না। অদূরেই ধানখেতের ওপর ভেসে আছে পদ্মফুল—যে খেতগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধানচাষিদের জীবিকা জুগিয়ে আসছে। এই দৃশ্যগুলো কেবল চোখের প্রশান্তিই জোগায় না, একবিংশ শতাব্দীর অর্থনীতির ভাষায় বলতে গেলে, এগুলো এমন এক উল্লেখযোগ্য সম্পদ, যা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও মূলত আর্থিক মূল্যে পরিমাপ করা হয়নি।
ইয়ানতিয়ান গ্রামের মিষ্টি আলুর চাষি এমন এক বৈশিষ্ট্যের মূর্ত প্রতীক, যা কোনো চেইন হোটেল বা থিম পার্কের পক্ষে অনুকরণ করা সম্ভব নয়, আর সেটা হলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা ঐতিহ্য, স্থানীয় স্বকীয়তা এবং কৃষকের শরীর ও অভিজ্ঞতায় মিশে থাকা কৃষিজ্ঞান। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় কৃষির এই ‘আসল’ বা খাঁটি রূপটিকে ‘অ্যাগ্রি-ট্যুরিজম’ বা কৃষি-পর্যটনের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। কৃষি-অর্থনীতিবিষয়ক গবেষকেরা দেখেছেন, খাঁটি গ্রামীণ খামারের পরিবেশে পর্যটকদের ব্যয় আশপাশের গ্রামীণ জনপদে উল্লেখযোগ্য পরোক্ষ ও প্ররোচিত অর্থনৈতিক গুণক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে অর্জিত আয়ের পরিমাণ খামারের নিজস্ব মুনাফাকেও অনেক ছাড়িয়ে যায়। শহরের একদল দর্শনার্থীর সামনে ওই বয়স্ক কৃষকের মিষ্টি আলুর চারা বসানোর সঠিক পদ্ধতি ও মাটি প্রস্তুতির সেই ‘খাঁটি মুহূর্ত’ তুলে ধরার বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। এটি প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভের জন্য মানুষের সুগভীর আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন এবং একই সঙ্গে মানুষের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকেও উন্মোচিত করে। আর তা হলো গ্রামীণ জীবন ও কৃষিচর্চার জগতে ফিরে যাওয়ার তীব্র বাসনা।
ইয়ানতিয়ান গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নরওয়ে ও সুইডেনের মতো স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের ধাঁচের সঙ্গে এক চমৎকার সাদৃশ্য বহন করে, যেখানে মানবিক উষ্ণতার ছোঁয়া স্পষ্ট। পরিবেশের ওপর ন্যূনতম প্রভাব ফেলে এমন টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ এবং ঐতিহ্যবাহী কৃষি ব্যবস্থাপনার কারণে এখানকার গ্রামীণ দৃশ্যপট তার পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রেখেছে। ফলে এটি না তো কোনো অনুর্বর প্রান্তরে পরিণত হয়েছে, আর না তো অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের গ্রাসে হারিয়ে গেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা প্রথা অনুযায়ী এবারও এখানকার মিষ্টি আলু চাষের জমিতে মিষ্টি আলুর চারা রোপণ করা হবে। মহিষ দিয়ে জমি চাষ করা এবং প্রাকৃতিক হ্রদের পানিতে গ্রামবাসীদের বাসনপত্র ধোয়ার মতো কাজগুলো আজও তাদের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে ।আর এই সবকিছুই গ্রামীণ জীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যকার সেই দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর সম্পর্কের এক জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে।
লেখক: মো. সৈকত হোসেন, চিয়াংসি ইউনিভার্সিটি অব ফিন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিকসের পিএইচডি শিক্ষার্থী।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]