জ্যামিতির কাজ কী
· Prothom Alo

জ্যামিতির মজা, মজার জ্যামিতি - ২
জ্যামিতি নামটা শুনলেই অনেকের মাথায় হয়তো কঠিন সব উপপাদ্য ও আঁকিবুঁকির চিন্তা আসে। কিন্তু জানো কি, জ্যামিতির ইংরেজি প্রতিশব্দ জিওমেট্রি শব্দটির মূল গ্রিক অর্থ কিন্তু পৃথিবী পরিমাপ! বাংলাতেও কিন্তু তাই। জ্যা মানে ভূমি বা পৃথিবী এবং মিতি মানে পরিমাপ। একে অন্যভাবেও বলা যায়। যেমন গ্রিক থেকে আসা জিও (Geo) শব্দের অর্থ ভূমি বা পৃথিবী এবং মেট্রন (metron) শব্দের অর্থ পরিমাপ। কাজেই জ্যামিতি অর্থ ভূমি বা পৃথিবীর পরিমাপ।
ইতিহাসজুড়ে গণিতবিদরা আরামদায়ক চেয়ারে বসে শুধু খাতায় দাগ কাটেননি, জ্যামিতিকে কাজে লাগিয়ে সত্যি সত্যি মাপজোখ করেছেন। তার মধ্যে অন্যতম প্রাচীন উদাহরণ হলো মিশরের প্রকাণ্ড পিরামিডের উচ্চতা মাপা। আর এই অসাধ্য সাধন করেছিলেন গ্রিক পণ্ডিত থেলিস। এমনকি সেই প্রাচীনকালে গোটা পৃথিবীর পরিধি, কিংবা পৃথিবী থেকে চাঁদ বা সূর্যের দূরত্বও মাপা হয়েছিল স্রেফ জ্যামিতিক যুক্তি কাজে লাগিয়ে।
Visit arroznegro.club for more information.
ইতিহাসের পাতা থেকে জ্যামিতির এমন কিছু দারুণ ও মজাদার অভিযান সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
১১ সংখ্যার ম্যাজিকথেলিস এবং সদৃশ ত্রিভুজের জাদু
আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগের কথা! মিশরের তপ্ত মরুভূমির বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ফারাওদের তৈরি করা বিশাল এক স্থাপত্য—দ্য গ্রেট পিরামিড অব গিজা। দেশে-বিদেশের মানুষ অবাক বিস্ময়ে সেই পাহাড় সমান পিরামিডের দিকে তাকিয়ে থাকে আর ভাবে, ‘বাপরে! এত উঁচু! কিন্তু এর আসল উচ্চতাটা কত?’
আজকের দিনে হলে আমরা লেজার রশ্মি, ড্রোন বা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে চোখের পলকে সেটা মেপে ফেলতে পারতাম। কিন্তু প্রাচীনকালে পিরামিডের চূড়ায় উঠে ফিতা দিয়ে মাপা তো আর সম্ভব ছিল না! সবাই যখন হাল ছেড়ে দিল, ঠিক তখন মাঠে নামলেন থেলিস। তাঁর হাতিয়ার ছিল স্রেফ দুটি জিনিস: একটি সাধারণ লাঠি এবং নিখাদ জ্যামিতিক বুদ্ধি! সেগুলো ব্যবহার করেই ওই পিরামিডের উচ্চতা মেপে ফেললেন! কিন্তু কীভাবে করলেন সেই কাণ্ডটা?
থেলিস জানতেন, বড় কোনো সমস্যার সমাধান লুকিয়ে থাকে খুব ছোট আর সাধারণ জিনিসের ভেতর। তিনি পিরামিডের কাছে গিয়ে মরুভূমির বালিতে একদম সোজা করে একটি লাঠি পুঁতে দিলেন।
এরপর লাঠিটার উচ্চতা (ধরা যাক, h) এবং মাটিতে পড়া তার ছায়ার দৈর্ঘ্য (ধরা যাক, l) মেপে নিলেন। একই সময়ে, বিশাল পিরামিডটাও সূর্যের আলোয় মরুভূমিতে এক প্রকাণ্ড ছায়া ফেলছিল। থেলিস এবার সেই পিরামিডের ছায়া মাপতে গেলেন।
এক কদমও এগোতে না পারার গোলকধাঁধাকিন্তু এখানেই দেখা দিল একটা মস্ত বড় গোলমাল! লাঠিটা সরু বলে তার ছায়া একদম গোড়া থেকেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু পিরামিড তো আর সরু নয়, তার ভিত্তিটা বিশাল এক বর্গক্ষেত্রের মতো। পিরামিডের চূড়ার যে ছায়াটা মাটিতে পড়ছে, তার আসল হিসাবটা শুরু হওয়ার কথা পিরামিডের একদম কেন্দ্র বা মাঝখান থেকে। কিন্তু সেই কেন্দ্র তো হাজার হাজার টন পাথরের নিচে ঢাকা!
তাহলে উপায়? থেলিস কি হার মানবেন?
একদমই না! তিনি দারুণ এক কৌশল খাটালেন—পিরামিডের দেয়ালের একদম বাইরের প্রান্ত থেকে শুরু করে মাটিতে পড়া ছায়ার শেষ মাথা পর্যন্ত মাপলেন। তারপর এর সঙ্গে যোগ করলেন পিরামিডের ভূমির দৈর্ঘ্যের ঠিক অর্ধেকটা। কারণ, বাইরের দেয়াল থেকে ঠিক অর্ধেকটা পথ ভেতরে গেলেই তো পিরামিডের কেন্দ্র পাওয়া যাবে! এই দুটো মাপ যোগ করে থেলিস পেয়ে গেলেন পিরামিডের কেন্দ্র থেকে ছায়ার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত মোট দূরত্ব (ধরা যাক, L)।
এবার আসে জ্যামিতির সেই আসল চমক। থেলিস একটি দারুণ বৈজ্ঞানিক সত্য জানতেন—সূর্য পৃথিবী থেকে এতই দূরে অবস্থিত যে, সেখান থেকে আসা আলোর রশ্মিগুলো পৃথিবীতে একদম সমান্তরালভাবে এসে পড়ে। কিন্তু এ কথার মানে কী?
অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের দৌড়আসলে এর মানে হলো, সূর্যের আলো যখন লাঠি ও পিরামিডের ওপর একই কোণে পড়ছে, তখন সেখানে দুটো কাল্পনিক ত্রিভুজ তৈরি হচ্ছে: একটা ছোট ত্রিভুজ এবং একটা বড় ত্রিভুজ। ছোট ত্রিভুজটি লাঠি, লাঠির ছায়া এবং সূর্যের আলোকরশ্মি দিয়ে তৈরি। আর বড় ত্রিভুজটি সৃষ্টি হয়েছে পিরামিডের উচ্চতা, পিরামিডের মোট ছায়া এবং সূর্যের আলোকরশ্মি দিয়ে।
এই দুটো ত্রিভুজ দেখতে হুবহু একই রকম, তফাত শুধু আকারে একটা ছোট আর একটা বড়। অনেকটা মোবাইলে তোলা ছবি জুম ইন করার মতো! জ্যামিতির ভাষায় এই ধরনের হুবহু একই রূপের ত্রিভুজগুলোকে বলা হয় সদৃশ ত্রিভুজ।
ছবি ১৯: সদৃশ্য ত্রিভুজসদৃশ ত্রিভুজের একটা চমৎকার নিয়ম আছে। এদের আকার ছোট-বড় হলেও, এদের বাহুগুলোর অনুপাত সবসময় সমান হয়। কাজেই ছোট ত্রিভুজটার উচ্চতা আর ছায়ার অনুপাত যা হবে, বিশাল পিরামিডটার উচ্চতা আর ছায়ার অনুপাতও ঠিক তাই হবে! এই সাধারণ কিন্তু শক্তিশালী নিয়মটা ব্যবহার করে থেলিস একটা সহজ সমীকরণ বা অনুপাত দাঁড় করালেন:
H/L = h/l
ভালো করে খেয়াল করে দেখো, এই সমীকরণে শুধু পিরামিডের উচ্চতা (H) ছাড়া বাকি তিনটে মানই থেলিসের জানা আছে। ব্যস! একটুখানি হিসাব কষেই তিনি বের করে ফেললেন গ্রেট পিরামিডের উচ্চতা। সেজন্য কোনো ক্রেন লাগল না, পিরামিডের চূড়ায়ও চড়তে হলো না। শুধু একটুখানি জ্যামিতি ও বুদ্ধির জোরে অসাধ্য সাধন হলো!
যে গণিতের নিয়মে টিকে আছে পুরো মহাবিশ্বথেলিসের এই বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান এতটাই যুগান্তকারী ছিল যে, হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষ তা ভোলেনি। ১৯৯৪ সালে গ্রিস সরকার থেলিসের এই বিখ্যাত জ্যামিতিক অভিযানের সম্মানে একটি বিশেষ ডাকটিকিটও প্রকাশ করেছিল!
ছবি ২০: ১৯৯৪ সালের একটি গ্রিক ডাকটিকিটে থেলিসযে ত্রিভুজগুলোর আকৃতি একদম হুবহু এক, সেগুলোকে বর্ণনা করতে সদৃশ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। জ্যামিতি বইয়ে আমরা যে সদৃশ ত্রিভুজের উপপাদ্যগুলো পড়ি, সেগুলো শুধু খাতার পাতার বোরিং কোনো নিয়ম নয়। এই ত্রিভুজ ব্যবহার করেই মানুষ একসময় নদীর এপারে দাঁড়িয়ে ওপারের দূরত্ব মেপেছে, এমনকি পৃথিবীর পরিধিও নির্ণয় করেছে! জ্যামিতির দুনিয়ায় এমন আরও অনেক রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার লুকিয়ে আছে, আর তার অন্যতম পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবেন আমাদের এই বুদ্ধিমান গ্রিক পণ্ডিত—থেলিস। আমরা অচিরেই দেখতে পাব, জ্যামিতির বেশ কিছু রোমাঞ্চকর ও বিস্ময়কর উপপাদ্যে এই সদৃশ ত্রিভুজের এক বিরাট ভূমিকা রয়েছে।
গণিতের হিসাবে আর কতদিন টিকবে মানবজাতিফিতা ছাড়াই পৃথিবীর পরিমাপ!
খ্রিষ্টপূর্ব ২৪০ অব্দের কথা। তখন আকাশে কোনো স্যাটেলাইট ছিল না, উড়োজাহাজ তো দূরের কথা, সাধারণ মানচিত্রও ঠিকমতো তৈরি হয়নি। সেই যুগে বসে প্রাচীন মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরের এক পণ্ডিত একটা অসম্ভব স্বপ্ন দেখে বসলেন। তাঁর নাম ইরাতোস্থেনিস। তিনি ঠিক করলেন, পৃথিবীর ঠিক কতটা চওড়া—মানে এর পরিধি বা ঘের কতটুকু, সেটা তিনি মেপে বের করবেন!
সবাই হয়তো ভেবেছিল লোকটা পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু ইরাতোস্থেনিসের কাছে কোনো জাদুর কাঠি ছিল না, ছিল নিখাদ যুক্তি আর জ্যামিতির শক্তি। কাকতালীয়ভাবে, থেলিস যেভাবে ছায়া দিয়ে পিরামিড মেপেছিলেন, ইরাতোস্থেনিসও সেই সূর্যের আলো আর ছায়াকেই কাজে লাগালেন—তবে অন্যভাবে।
গল্পের শুরুটা হয়েছিল চমৎকার একটা প্রাকৃতিক ঘটনা দিয়ে। একদিন ইরাতোস্থেনিস একটা দারুণ তথ্য জানতে পারলেন। সাইন (যার বর্তমান নাম আসোয়ান) নামের একটি শহরে বছরের সবচেয়ে বড় দিনটিতে (গ্রীষ্মকালীন সংক্রান্তি) এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে। ঠিক দুপুরবেলা সেখানে কোনো কিছুর ছায়া পড়ে না! সূর্য ঠিক মাথার ওপর থাকে বলে খাড়াভাবে থাকা কোনো খুঁটির ছায়া মাটিতে দেখা যায় না। এমনকি, সেখানকার গভীর কুয়োর একদম তলা পর্যন্ত সরাসরি সূর্যের আলো পৌঁছে যায়।
ইরাতোস্থেনিস ভাবলেন, আচ্ছা সাইন শহরে যখন ছায়া পড়ছে না, ঠিক সেই একই দিনে একই সময়ে তাঁর নিজের শহর আলেকজান্দ্রিয়াতেও কি একই ঘটনা ঘটছে?
সৌন্দর্যের মহাজাগতিক ব্যাকরণতিনি পরীক্ষা করে দেখলেন—না! আলেকজান্দ্রিয়ায় মাটিতে একটা সোজা লাঠি পুঁতলে তার ছোট একটা ছায়া ঠিকই পড়ছে। আলেকজান্দ্রিয়া শহরের অবস্থান সাইন থেকে ৫,০০০ স্টেড (তখনকার যুগের দূরত্বের একক) উত্তরে। তিনি হিসাব কষে দেখলেন, সেখানে সূর্যের আলো লাঠির সাথে ঠিক ৭.২° কোণ তৈরি করে বাঁকাভাবে পড়ছে। পৃথিবী যদি একদম চ্যাপ্টা বা সমতল হতো, তাহলে দুটো শহরেই সূর্য মাথার ওপর থাকত এবং কোথাও ছায়া পড়ত না। যেহেতু এক জায়গায় ছায়া পড়ছে আর অন্য জায়গায় পড়ছে না, এর মানে হলো পৃথিবীর পৃষ্ঠটা অবশ্যই গোল বা বক্রাকার!
ইরাতোস্থেনিস জানতেন, সূর্য পৃথিবী থেকে এতই দূরে যে তার আলোকরশ্মি পৃথিবীতে আসে একদম সমান্তরাল বা প্যারালালভাবে। এখানেই তিনি জ্যামিতির দুর্দান্ত একটি নিয়ম প্রয়োগ করলেন। জ্যামিতির একান্তর কোণের সূত্র অনুযায়ী তিনি প্রমাণ করলেন—আলেকজান্দ্রিয়ায় লাঠির মাথায় সূর্যের আলো যে ৭.২° কোণ তৈরি করেছে। জ্যামিতির বিপ্রতীপ ও একান্তর কোণের নিয়মে ইরাতোস্থেনিস বুঝলেন—আলেকজান্দ্রিয়ায় তৈরি হওয়া এই ৭.২° কোণটি আসলে পৃথিবীর কেন্দ্রেই তৈরি হওয়া কোণের সমান (ছবি ২১)!
ছবি ২১: পৃথিবীর পরিমাপএবার শুধু একটুখানি অংকের হিসাব। আমরা জানি, একটি সম্পূর্ণ গোল বৃত্তের কেন্দ্রে মোট কোণ থাকে ৩৬০ ডিগ্রি। ইরাতোস্থেনিস তখন সহজ একটা ভাগ করলেন: ৩৬০ / ৭.২ = ৫০ (মানে ৭.২° হলো পুরো বৃত্তের ঠিক ৫০ ভাগের ১ ভাগ!) আলেকজান্দ্রিয়া থেকে সাইন শহরের দূরত্ব যদি পৃথিবীর পরিধির ৫০ ভাগের ১ ভাগ হয়, তাহলে পুরো পৃথিবীর পরিধি অবশ্যই আলেকজান্দ্রিয়া ও সাইনের মধ্যকার দূরত্বের ৫০ গুণ হবে। অর্থাৎ পৃথিবীর পরিধি ২৫০,০০০ স্টেড।
যে সহজ ধাঁধাগুলো আমাদের মগজ ধোলাই করে দেয়প্রাচীনকালের ‘স্টেড’ ঠিক কত কিলোমিটারের সমান ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একটু বিতর্ক আছে। তবে আধুনিক পণ্ডিতদের হিসাব অনুযায়ী, এক স্টেড মানে প্রায় ০.১৫ থেকে ০.২ কিলোমিটার। সেই হিসাবে ইরাতোস্থেনিসের মাপা পৃথিবীর পরিধি দাঁড়ায় ৩৭,৫০০ থেকে ৫০,০০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি।
আর আধুনিক যুগে স্যাটেলাইট আর লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাপা পৃথিবীর আসল পরিধি কত জানো? প্রায় ৪০,০৭৫ কিলোমিটার! আড়াই হাজার বছর আগে বসে জ্যামিতি দিয়ে এমন নিখুঁত অনুমান করা সত্যিই অবিশ্বাস্য!
ভেবে দেখো, সেই প্রাচীনকালে কোনো উন্নত প্রযুক্তি ছাড়া, শুধু দুটো শহরের দূরত্ব আর একটা লাঠির ছায়া মেপে জ্যামিতির সাহায্যে একজন মানুষ পুরো পৃথিবীর সাইজ এত নিখুঁতভাবে বের করে ফেলেছিলেন! মানুষের বুদ্ধির জোর যে কত বড় হতে পারে, ইরাতোস্থেনিসের এই গল্পটা তার সবচেয়ে দারুণ প্রমাণ।
প্যারাডক্স লস্ট১৯২৯ সালের ব্যবহারিক জ্যামিতি
বইয়ের পাতায় তত্ত্ব আর সূত্রের জ্যামিতি যত নিখুঁতভাবে লেখা যায়, রুলার, চাঁদা আর পেন্সিল দিয়ে খাতায় আকৃতি আঁকতে গেলে কিন্তু অঙ্কটা আর ততটা সোজা থাকে না। পেন্সিলের ডগা একটু মোটা হওয়া, চাঁদা ধরতেই এক ডিগ্রি এদিক-ওদিক হওয়া—এসব ছোটখাটো ভুলকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় পরিমাপের ত্রুটি। কিন্তু এই ত্রুটির সাথে যখন যোগ হয় শিক্ষকের বকুনির ভয়, তখন জন্ম নিতে পারে কিছু হাস্যকর কাণ্ডকারখানা!
যেমনটা ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে, ১৯২৯ সালে—ইংল্যান্ডের উত্তরভাগের এক ছোট্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর খাতায়।
সেই শিক্ষার্থীর জ্যামিতি খাতাটা দেখতে ছিল অসাধারণ। পরিচ্ছন্ন লেখা, নিখুঁত ছক, আর গ্রিক গণিতবিদ ইউক্লিডের শত শত বছরের পুরনো উপপাদ্য সুন্দর করে লেখা। পুরো খাতা জুড়েই যেন বিজ্ঞানের প্রতি গভীর নিষ্ঠা!
যোগফল বের করার জাদুকরী শর্টকাটগোলমালটা বাঁধল একদম শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে। সেখানে ছিল ‘প্র্যাকটিক্যাল ওয়ার্ক’ বা ব্যবহারিক কাজ। কাজটা ছিল খুবই সোজা। চাঁদা দিয়ে একটা ত্রিভুজের তিনটি কোণ মেপে আলাদা আলাদাভাবে লিখতে হবে। সেই সঙ্গে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের যোগফল ১৮০ ডিগ্রি। সেই শিক্ষার্থী একে একে তিনটি কোণ মেপে খাতায় লিখল। শিক্ষক মশাইও খাতা দেখে লাল কালিতে মস্ত বড় এক টিক চিহ্ন (✔) দিয়ে দিলেন!
ছবি ২২: ১৯২৯ সালের এক শিক্ষার্থীর অনুশীলনী খাতা থেকেকিন্তু একটু ভালো করে চাঁদা দিয়ে কোণগুলো মেপে দেখলে হাসি চেপে রাখা সত্যি মুশকিল! কারণ শিক্ষার্থী খাতায় কোণ A-এর মান লিখেছিল ৫০°। অথচ স্কেল ও চাঁদা বসিয়ে দেখলে দেখা যায়, ছবিটার কোণ A কোনোভাবেই ৪৫ ডিগ্রির বেশি নয়! আসল ঘটনাটা কী ঘটেছিল বোঝা যায়?
ছোট্ট শিক্ষার্থীটি চাঁদা দিয়ে কোণগুলো মেপে দেখেছিল যে হিসাবটা কেমন যেন এলোমেলো আসছে—যোগ করলে হয়তো ১৭৫° বা ১৮৩° হয়ে যাচ্ছিল! কিন্তু সে জানত, যোগফল ১৮০° না হলে শিক্ষক মশাই ছেড়ে কথা কইবেন না। তাই কোনো উপায় না দেখে সে চালাকি করে মানগুলো মনমতো একটু বাড়িয়ে-কমিয়ে বসিয়ে দিল, যাতে চোখ বন্ধ করে যোগফলটা কাঁটায় কাঁটায় ১৮০° মিলে যায়!
আর শিক্ষক মশাইও হয়তো কাজের চাপে পুরো কোণ না মেপেই শুধু ১৮০° যোগফল দেখেই সই মেরে দিয়েছিলেন।
বিজ্ঞান ও গণিতের ইতিহাসে এই বানিয়ে ১৮০° মেলানোর কৌশলকে রসিকতা করে বলা যায় টেকনিক্যাল পারফেকশন! খাতায় ব্যবহারিক জ্যামিতি আঁকতে গিয়ে এই জোড়াতালির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি—এমন শিক্ষার্থী বোধহয় সব যুগেই খুঁজে পাওয়া কঠিন!
শিল্পকলার প্রতিটি স্তরে এক বিস্ময়কর ধ্রুবকক্ষেত্রফল: জ্যামিতির সবচেয়ে কাজের আইডিয়া
একদম প্রাচীন আমলের কথা! মানুষ যখন শিকারি জীবন ছেড়ে ধীরে ধীরে জমিজমা আঁকড়ে ধরে কৃষি কাজ শুরু করল, ঠিক তখনই একটা বড় ঝামেলা বাধল। কার জমি কতখানি? কে বেশি জমি পেল আর কে কম?
বাড়িঘর বানাতে বা ফসলের ক্ষেত ভাগাভাগি করতে গিয়ে মানুষ বুঝল—শুধু জমির চারপাশের দৈর্ঘ্য মাপলেই চলবে না, ভেতরের পুরো জায়গাটা কতটুকু, সেটাও জানা চাই। এভাবেই জন্ম নিল জ্যামিতির সবচেয়ে কাজের আর দরকারি আইডিয়া: ক্ষেত্রফল বা এরিয়া।
কিন্তু ক্ষেত্রফল জিনিসটা আসলে কী?
খুব সহজ ভাষায় বললে—কোনো একটা সমতল পৃষ্ঠের ওপর একটা আকৃতি ঠিক কতটা জায়গা দখল করে আছে, সেটাই তার ক্ষেত্রফল। এটা মাপার জন্য গণিতবিদরা এক দারুণ উপায় বের করলেন। তাঁরা ১ একক দৈর্ঘ্য এবং ১ একক প্রস্থের একটা ছোট বর্গক্ষেত্রকে ক্ষেত্রফলের একক হিসেবে ধরে নিলেন। এবার যেকোনো সমতল জায়গায় ওরকম ছোট ছোট কয়টা বর্গক্ষেত্র বা ঘর আঁটা সম্ভব, সেটা গুণলেই পাওয়া যাবে তার মোট ক্ষেত্রফল (ছবি ২৩)!
ছবি ২৩: ক্ষেত্রফলসাধারণ নিয়ম হিসেবে যেকোনো আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের জন্য আমরা একটি সূত্র ব্যবহার করি। দৈর্ঘ্য a আর প্রস্থ b হলে, তার ক্ষেত্রফলের সূত্র হলো: আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল = a × b। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের গুণফল। (এখানে a এবং b পূর্ণসংখ্যা হতে পারে, ভগ্নাংশ হতে পারে, এমনকি অমূলদ সংখ্যাও হতে পারে।)
বিশৃঙ্খলাকে বশে এনে ৩০ কোটি টাকার ব্রেকথ্রু পুরস্কার!আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফল তো বের হলো। কিন্তু যদি তোমাকে একটা সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল মাপতে বলা হয়, তাহলে তা কীভাবে বের করবে?
এখানেই লুকিয়ে আছে জ্যামিতির এক ভীষণ সুন্দর একটা ম্যাজিক! একটা আয়তক্ষেত্রের কথা চিন্তা করো, যার দৈর্ঘ্য a আর প্রস্থ b। এবার একটা স্কেল নিয়ে আয়তক্ষেত্রটার এক কোণা থেকে বিপরীত কোণা পর্যন্ত আড়াআড়ি একটি সোজা দাগ (যাকে আমরা বলি কর্ণ) টেনে দাও। কী দেখলে?
আয়তক্ষেত্রটি একদম সমান দুই টুকরো হয়ে গেল! এই দুটো টুকরোর প্রতিটিই কিন্তু এক একটা নিখুঁত সমকোণী ত্রিভুজ। তাহলে একটি সমকোণী ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল কী হবে?
উত্তরটা খুব সহজ—আয়তক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের ঠিক অর্ধেক! অর্থাৎ ১/২ (a × b)। মানে ১/২ (ভূমি × উচ্চতা) বা ভূমি ও উচ্চতার গুণফলের অর্ধেক।
ব্যাপারটা হয়তো শুনতে খুব সাধারণ আর সহজ মনে হচ্ছে, তাই না? কিন্তু গণিতের ইতিহাসে এই সামান্য সমকোণী ত্রিভুজ আর ক্ষেত্রফলের সাধারণ আইডিয়াটাই জন্ম দিয়েছিল পুরো জ্যামিতি জগতের সবচেয়ে বিখ্যাত এক উপপাদ্য—পিথাগোরাসের উপপাদ্য!
জমি মাপার এই জ্যামিতিক নিয়মটি ধরে কীভাবে গণিতবিদরা রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে আকাশের তারা মাপার সূত্র বানিয়ে ফেললেন, সেই গল্প আমরা জানব একটু পরেই।
সূত্র: ডেভিড অ্যাচিসনের দ্য ওয়ান্ডার বুক অব জিওমেট্রি: আ ম্যাথমেটিক্যাল স্টোরি অবলম্বনেচোখের পলকে অঙ্ক করার ম্যাজিক