ভুয়া নাকি আসল, সহজেই চিনে নিন এআই দিয়ে তৈরি ছবি-ভিডিও

· Prothom Alo

ইন্টারনেটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি হলো মজার ও অদ্ভুত সব ভিডিও সহজেই দেখা যায়। বিশেষ করে প্রাণীদের দুষ্টুমি বা হাস্যকর কাণ্ডকারখানার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন প্রশ্ন উঠছে, এসব ভিডিওতে দেখা প্রাণী বা ঘটনাগুলো আদৌ বাস্তব, নাকি পুরোপুরি কম্পিউটারে তৈরি?

Visit saltysenoritaaz.org for more information.

গত তিন বছরে এআই দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিওর মান অভাবনীয়ভাবে উন্নত হয়েছে। কয়েক বছর আগেও এসব সহজেই নকল বলে বোঝা যেত। এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো বাস্তব ভিডিও বা ছবির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা কঠিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও দেখে অনেকেই সেটি সত্যি মনে করে শেয়ার করেন। পরে জানা যায়, পুরো ভিডিওটিই এআই দিয়ে তৈরি। এর একটি আলোচিত উদাহরণ ছিল গত বছরের ‘ট্রাম্পোলিনে লাফানো খরগোশ’-এর ভিডিও। নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা বাস্তব দৃশ্য বলে মনে হলেও পরে প্রমাণিত হয়, ভিডিওটি পুরোপুরি এআই দিয়ে তৈরি। অন্যদিকে, এআই প্রযুক্তির কারণে মানুষের সন্দেহও বেড়েছে। ফলে বাস্তব ভিডিওকেও অনেক সময় এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করা হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি উদ্বেগের। কারণ, ভুয়া ছবি ও ভিডিও মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করতে পারে, ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে এবং বাস্তবতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তবে এখনো এআই প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই কয়েকটি লক্ষণ দেখে এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট শনাক্ত করা সম্ভব।

যেভাবে বুঝবেন ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি

সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত একটি ভিডিও তৈরি করা এখনো এআইয়ের জন্য সহজ নয়। উন্নতমানের এআই মডেলগুলোও দীর্ঘ সময় ধরে একই রকম নিখুঁত দৃশ্য ধরে রাখতে পারে না। ফলে ভিডিওতে কিছু অসংগতি থেকে যায়।

চলমান বস্তু হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায় বা একটির সঙ্গে আরেকটি মিশে যায়

এআই ভিডিওতে সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর একটি হলো দৃশ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারা।

উদাহরণ হিসেবে ট্রাম্পোলিনে লাফানো খরগোশের ভিডিওটির কথা বলা যায়। প্রথম দেখায় ভিডিওটি বাস্তব মনে হলেও খেয়াল করলে দেখা যায়, একটি খরগোশ অন্যটির সামনে আসতেই আগেরটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কোথাও আবার দুটি খরগোশের রং একসঙ্গে মিশে গিয়ে একটি খরগোশ মুহূর্তেই বিপরীত দিকে ঘুরে যাচ্ছে। শেষ দিকে একটি খরগোশ যেন ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। এ কারণে ভিডিওতে যদি মানুষ, প্রাণী বা অন্য কোনো বস্তু চলাচলের সময় হঠাৎ বিকৃত হয়ে যায়, গলে যাওয়ার মতো দেখায় বা পেছনের দৃশ্য অস্বাভাবিকভাবে বদলে যায়, তাহলে সেটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে অনেক মানুষের ভিড় বা বড় জনসমাগমের দৃশ্যে এ ধরনের ত্রুটি বেশি দেখা যায়।

ভিডিও অস্বাভাবিক ঝাপসা বা নিম্নমানের

বর্তমানে প্রায় সব স্মার্টফোনেই উচ্চমানের ক্যামেরা রয়েছে। তাই আধুনিক ফোনে ধারণ করা ভিডিও অকারণে অতিরিক্ত ঝাপসা হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু এআই দিয়ে তৈরি অনেক ভিডিও ইচ্ছাকৃতভাবেই কম রেজোল্যুশনের রাখা হয়। কারণ, ভিডিও ঝাপসা হলে ত্রুটিগুলো সহজে চোখে পড়ে না। এ কারণেই অনেক ভুয়া ভিডিওতে দাবি করা হয়, সেগুলো নিরাপত্তা ক্যামেরা বা সিসিটিভিতে ধারণ করা হয়েছে। এতে নিম্নমানের ভিডিওকে বিশ্বাসযোগ্য দেখানোর চেষ্টা করা হয়। তবে অনেক সময় স্মার্টফোনে ধারণ করা বলে প্রচারিত ভিডিওও অস্বাভাবিকভাবে ঝাপসা থাকে, যা সন্দেহের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া এআই এখনো লেখাসংবলিত অংশ ঠিকভাবে তৈরি করতে পারে না। সাইনবোর্ড, পোস্টার, ডিজিটাল ডিসপ্লে কিংবা দেয়ালে লেখা শব্দে অক্ষর জড়িয়ে যাওয়া, বানান ভুল, অস্বাভাবিক ফন্ট বা অর্থহীন শব্দ দেখা যেতে পারে। ঘড়ির ক্ষেত্রে সময়ের সংখ্যা সঠিকভাবে এগোচ্ছে কি না কিংবা কাঁটার গতি স্বাভাবিক কি না, সেটিও খেয়াল করা উচিত।

শব্দে অস্বাভাবিকতা

এআই এখন লেখা, ছবি, ভিডিও এমনকি শব্দও তৈরি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে সবকিছু তৈরি করতে গেলে এখনো নানা সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। তাই অনেক সময় ভিডিওর দৃশ্য বাস্তবসম্মত হলেও শব্দে অসংগতি ধরা পড়ে। এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওতে কণ্ঠস্বরে অস্বাভাবিক প্রতিধ্বনি, খুব দ্রুত কথা বলা, হঠাৎ উচ্চারণ বদলে যাওয়া বা শব্দ অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা যেতে পারে। অনেক সময় কথাবার্তাও অতিরিক্ত কৃত্রিম বা বিজ্ঞাপনী ভাষার মতো শোনায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক এআই ভিডিওতে একটি নির্দিষ্ট ধরনের কণ্ঠস্বর শোনা যায়, যাকে অনেকে ‘এআই অ্যাকসেন্ট’ বলেন। এ ধরনের কণ্ঠ অস্বাভাবিকভাবে প্রাণবন্ত, অতিরিক্ত উদ্দীপনাপূর্ণ এবং অনেকটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবকদের উপস্থাপনার মতো শোনায়। কোনো ভিডিওতে পরিচিত ব্যক্তি বা তারকার বক্তব্য থাকলে সেটি বাস্তবসম্মত কি না, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। ভিডিওতে ওই ব্যক্তি সত্যিই এমন কথা বলার সম্ভাবনা আছে কি না, সাধারণ বিচারবুদ্ধি দিয়েই তা যাচাই করা যেতে পারে।

ভিডিওটির উদ্দেশ্য যদি শুধু আবেগপ্রবণ করে তোলা হয়

এআই দিয়ে তৈরি অনেক ভিডিও শুধু বিনোদনের জন্য তৈরি হলেও কিছু ভিডিওর উদ্দেশ্য থাকে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া বা মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করা।

ধরা যাক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ভিডিও দেখলেন, যেখানে কোনো রাজনীতিবিদ অত্যন্ত বিতর্কিত মন্তব্য করছেন। অথবা এমন একটি ভিডিও, যা দেখে আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে বা রাগ হচ্ছে। ভিডিওর সঙ্গে আবার অন্যদের শেয়ার করার আহ্বানও দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভিডিওটি সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার না করে আগে অন্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে বিষয়টি যাচাই করা উচিত। কারণ, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের আবেগকে উসকে দেওয়া ভুয়া তথ্য সত্য তথ্যের তুলনায় অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

যে অ্যাকাউন্ট ভিডিওটি প্রকাশ করেছে, সেটিও যাচাই করা

ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে শুধু ভিডিও দেখে নকল শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাই ভিডিওর পাশাপাশি সেটি যে অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশ করা হয়েছে, সেটিও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সন্দেহজনক কয়েকটি লক্ষণ হতে পারে

প্রথমত, অ্যাকাউন্টটি নতুন খোলা হলেও শুরু থেকেই একের পর এক ভাইরাল হওয়ার মতো ভিডিও প্রকাশ করছে।

দ্বিতীয়ত, একই ধরনের ভিডিও বারবার প্রকাশ করা হচ্ছে। শুধু ক্যামেরার কোণ, প্রাণীর রং বা ছোটখাটো কিছু পরিবর্তন ছাড়া প্রায় সব ভিডিও একই রকম। এআই ভিডিও তৈরির সফটওয়্যার একই নির্দেশনা থেকে একাধিক ভিন্ন সংস্করণ তৈরি করতে পারে। তাই এ ধরনের পুনরাবৃত্তি এআই ব্যবহারের ইঙ্গিত হতে পারে।

তৃতীয়ত, অ্যাকাউন্টটি দিন-রাত বিরামহীনভাবে পোস্ট করছে। বাস্তবে একজন মানুষের পক্ষে ২৪ ঘণ্টা নিয়মিত কনটেন্ট প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যদি অ্যাকাউন্টটি শুধু রাজনৈতিক বা একই ধরনের ভিডিও প্রকাশ করে, তাহলে সেটি বট বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

যেভাবে চিনবেন এআই দিয়ে তৈরি ছবি

এআই দিয়ে তৈরি ছবি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। তবে সব ছবিই নিখুঁত নয়। বিশেষ করে পুরোনো এআই মডেল দিয়ে তৈরি ছবিতে এখনো বেশ কিছু ত্রুটি দেখা যায়। ছবির লেখায় ভুল, বিকৃত হাত বা আঙুল, অস্বাভাবিক শরীরের গঠন এসব পুরোনো লক্ষণ এখনো অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়। এ ছাড়া ভিডিও শনাক্ত করার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, যেমন ছবির উদ্দেশ্য এবং যে অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলোও ছবির ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য।

মানুষকে অস্বাভাবিকভাবে নিখুঁত দেখায়

এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে মানুষের ত্বক প্রায়ই অতিরিক্ত মসৃণ ও দাগহীন দেখা যায়। মুখে কোনো ব্রণ, তিল বা ত্বকের স্বাভাবিক ছাপ থাকে না। চুল নিখুঁতভাবে সাজানো, মেকআপ একেবারে পরিপাটি এবং আলোও স্টুডিও মানের বলে মনে হয়। ফলে ছবিটি বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত বা কৃত্রিম মনে হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তব ছবির তুলনায় এআই ছবি অনেক সময় অতিরিক্ত পরিচ্ছন্ন ও সাজানো দেখায়, যা সহজেই সন্দেহের জন্ম দেয়।

পটভূমির দৃশ্যে অসংগতি খুঁজুন

এআই দিয়ে তৈরি ছবিতে সবচেয়ে বেশি ভুল ধরা পড়ে পটভূমির অংশে। তাই কোনো ছবি সন্দেহজনক মনে হলে শুধু মূল ব্যক্তির দিকে নয়, আশপাশের দৃশ্যও ভালোভাবে খেয়াল করতে হবে। পটভূমিতে যদি মানুষ থাকে, তাহলে তাদের মুখের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্বাভাবিক কি না দেখতে হবে। অনেক সময় মুখ বিকৃত, ঝাপসা বা অসম্পূর্ণ দেখা যায়। আবার এক ব্যক্তির শরীর আরেকজনের সঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে মিশে যেতে পারে। হাত-পা বা শরীরের গঠনও অনেক সময় বাস্তবসম্মত হয় না। এ ছাড়া ভবন, রাস্তা বা ঘরের বিভিন্ন অংশেও অসংগতি দেখা যায়। জানালার সারি অসমান হতে পারে, দরজার আকার অস্বাভাবিক হতে পারে, সিঁড়ি বা রাস্তা কোথাও গিয়ে হঠাৎ শেষ হয়ে যেতে পারে কিংবা স্থাপত্যের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সামঞ্জস্য নাও থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, কোনো ঘরের ছবি হলে দরজার হাতল, আলমারির নব, রান্নাঘরের চুলা কিংবা অন্যান্য ছোট ছোট বিষয়ও খেয়াল করুন। এসব জায়গাতেই এআইয়ের ভুল ধরা পড়ে বেশি।

আর কী ধরনের ভুয়া কনটেন্ট সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন?

সম্পূর্ণ এআই দিয়ে তৈরি ছবি বা ভিডিওই একমাত্র সমস্যা নয়। বর্তমানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রযুক্তিগুলোর একটি হলো ‘ডিপফেক’। ডিপফেকে পুরো ভিডিও নতুন করে তৈরি করা হয় না। বাস্তব ভিডিওর ওপর অন্য একজনের মুখ বসিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ভিডিওর পটভূমি, আলো বা চলাফেরা বাস্তব থাকায় এটি সাধারণ এআই ভিডিওর চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। গত কয়েক বছরে ডিপফেক নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীদের সহপাঠীদের মুখ ব্যবহার করে ভুয়া অশ্লীল ভিডিও তৈরির ঘটনা সামনে এসেছে। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে কিছু ব্যবহারকারী এআই ব্যবহার করে অন্যদের পোশাক ডিজিটালভাবে সরিয়ে দেওয়ার মতো অপব্যবহারও করেছে।

ডিপফেক শনাক্ত করবেন যেভাবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেক ভিডিওতে মুখ বা শরীরের চারপাশে অস্বাভাবিক ঝাপসা অংশ কিংবা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁপা পিক্সেল দেখা যেতে পারে। এগুলোকে ‘ডিজিটাল আর্টিফ্যাক্ট’বলা হয়।

ভিডিওতে ব্যক্তি দ্রুত নড়াচড়া করলে বা মুখের সামনে অন্য কোনো বস্তু চলে এলে এআই দিয়ে বসানো মুখটি ঠিকভাবে তাল মেলাতে পারে না। ফলে কিছু সময়ের জন্য আসল ভিডিওর অংশ দেখা যায় বা মুখের চারপাশে বিকৃতি তৈরি হয়। এসব লক্ষণ ডিপফেক শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে।

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

Read full story at source