‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’ সিনেমাটি নিয়ে এত আলোচনা, বিতর্ক কেন

· Prothom Alo

গত ৩১ জুলাই মুক্তি পেয়েছে গ্রেগ আরাকি পরিচালিত সিনেমা ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’। মুক্তির আগে থেকেই ইরোটিক কমেডি থ্রিলার সিনেমাটি নিয়ে চলছে আলোচনা–সমালোচনা। কেন এ সিনেমা নিয়ে এত বিতর্ক, এত চর্চা?

হলিউডে যৌনতা নিয়ে সিনেমা নতুন কিছু নয়। ‘বেসিক ইনস্টিঙ্কট’, ‘আইজ ওয়াড শাট’, ‘ফিফটি শেডস অব গ্রে’ কিংবা ‘বেবিগার্ল’—প্রতিটি ছবিই নিজ নিজ সময়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। তবে এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত ইরোটিক থ্রিলারের নাম সম্ভবত ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’ মুক্তির আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সমালোচক মহল ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে তুমুল কৌতূহল তৈরি করেছে।
কারণ শুধু ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নয়; এ ছবি এমন কিছু প্রশ্ন তুলছে, যেগুলো নিয়ে হলিউড দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তিতে ছিল—ক্ষমতার সম্পর্ক, বয়সের ব্যবধান, নারীর যৌন–আকাঙ্ক্ষা, মি টু–পরবর্তী বাস্তবতা এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার। সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং সমকালীন হলিউডের সাংস্কৃতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

Visit freshyourfeel.org for more information.

মি টুর পর বদলে যাওয়া গল্প
ছবিটির গল্পের শুরু আজকের নয়। প্রায় ১৩ বছর আগে চিত্রনাট্যটি লিখেছিলেন লেখক কার্লি সিওরটিনো। তখন গল্পের কেন্দ্র ছিল বয়সে বড় এক পুরুষ এবং তার তরুণী সহকারী। কিন্তু বছরের পর বছর প্রযোজক পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে হলিউডে শুরু হয় ‘হ্যাশ ট্যাগ মি টু’ আন্দোলন। ক্ষমতাধর পুরুষ ও তরুণীর সম্পর্ক নিয়ে দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়। ঠিক তখনই পরিচালক গ্রেগ আরাকি গল্পের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন—চরিত্র দুটির লিঙ্গ বদলে দেওয়া হোক।

সে সিদ্ধান্তই পুরো ছবিকে নতুন মাত্রা দেয়। এখন ছবিতে দেখা যাবে, বয়সে বড়, ক্ষমতাধর ও আত্মবিশ্বাসী শিল্পী এরিকা ট্রেসি (অভিনয়ে অলিভিয়া ওয়াইল্ড) তাঁর তরুণ সহকারী এলিয়টকে (অভিনয়ে কুপার হফম্যান) নিজের অধীনস্থ, প্রেমিক এবং শিল্পচর্চার অংশে পরিণত করেন। যে গল্প একসময় বিতর্কিত হওয়ার আশঙ্কায় আটকে ছিল, সেটিই চরিত্র বদলের মাধ্যমে নতুন অর্থ খুঁজে পায়।

চলচ্চিত্রে বহু বছর ধরে নারীকেই মূলত আকাঙ্ক্ষার বস্তু হিসেবে দেখানো হয়েছে। ক্যামেরা তাঁর শরীরকে দেখেছে, পুরুষ চরিত্র তাঁকে কামনা করেছে, আর দর্শকও সেই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’ সেই প্রচলিত অবস্থানকেই উল্টে দিয়েছে। এখানে তরুণ পুরুষই হয়ে উঠেছেন আকাঙ্ক্ষার বস্তু।অলিভিয়া ওয়াইল্ডের চরিত্র এলিয়টকে শুধু ভালোবাসে না, তাকে পর্যবেক্ষণ করে, নিয়ন্ত্রণ করে, শিল্পের উপাদানে পরিণত করে। এ দৃষ্টিভঙ্গিকেই অনেক সমালোচক বলছেন ‘ফিমেল গেজ’-এর নতুন প্রকাশ।

বয়সে বড় নারী, কম বয়সী পুরুষ—হলিউডের নতুন সমীকরণ
দশকের পর দশক ধরে সিনেমায় বয়সে বড় পুরুষের সঙ্গে তরুণীর সম্পর্ককে প্রায় স্বাভাবিক হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু নারী বয়সে বড় হলেই সে সম্পর্ককে ‘ট্যাবু’, ‘অস্বাভাবিক’ কিংবা ‘যৌন–কল্পনা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। ‘বেবিগার্ল’, ‘দ্য আইডিয়া অব ইউ’, ‘ব্রিজেট জোন্স: ম্যাড অ্যাবাউট দ্য বয়’, ‘ভ্লাদিমির’, ‘মার্টি সুপ্রিম’—একটির পর একটি সিনেমা ও সিরিজে বয়সে বড় নারীর সঙ্গে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী পুরুষের সম্পর্ক উঠে আসছে। ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’ সে ধারার সবচেয়ে আলোচিত সংযোজন।

‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

‘ফিমেল গেজ’ বনাম ‘মেল গেজ’
চলচ্চিত্রে বহু বছর ধরে নারীকেই মূলত আকাঙ্ক্ষার বস্তু হিসেবে দেখানো হয়েছে। ক্যামেরা তাঁর শরীরকে দেখেছে, পুরুষ চরিত্র তাঁকে কামনা করেছে, আর দর্শকও সেই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। ‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’ সেই প্রচলিত অবস্থানকেই উল্টে দিয়েছে। এখানে তরুণ পুরুষই হয়ে উঠেছেন আকাঙ্ক্ষার বস্তু।
অলিভিয়া ওয়াইল্ডের চরিত্র এলিয়টকে শুধু ভালোবাসে না, তাকে পর্যবেক্ষণ করে, নিয়ন্ত্রণ করে, শিল্পের উপাদানে পরিণত করে। এ দৃষ্টিভঙ্গিকেই অনেক সমালোচক বলছেন ‘ফিমেল গেজ’-এর নতুন প্রকাশ।

ক্ষমতার ভারসাম্য কি সত্যিই বদলেছে
তবে এ পরিবর্তনকে সবাই ইতিবাচকভাবে দেখছে না। অনেকের প্রশ্ন, ক্ষমতার অপব্যবহার যদি পুরুষের ক্ষেত্রে ভুল হয়, তাহলে নারী করলে সেটি কেন গ্রহণযোগ্য হবে? সমালোচকদের মতে, ছবিটি এ প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয় না; বরং ইচ্ছাকৃতভাবেই দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ, ক্ষমতার অপব্যবহার লিঙ্গ বদলালেই নৈতিক হয়ে যায় না।

‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

যৌনতা নয়, মানুষের জটিলতা
কার্লি সিওরটিনো নিজেই জানিয়েছেন, ছবিটির অনুপ্রেরণা এসেছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন থেকে। ২৫ বছর বয়সে নিজের চেয়ে প্রায় ২০ বছরের বড় এক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন তিনি। পরে সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি বর্ণনা করেছেন এমন এক সম্পর্ক হিসেবে, যা একই সঙ্গে সুন্দর, বিপজ্জনক এবং জীবন বদলে দেওয়া।
কার্লি সিওরটিনোর মতে, এটি মূলত এমন একজন তরুণের গল্প, যে এমন একটি সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, যা তাকে ভেঙেও দেয়, আবার নতুন করে গড়েও তোলে।

ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের আড়ালের প্রযুক্তি
ছবিটি আরেকটি কারণে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি পরিচালক গ্রেগ আরাকি জানিয়েছেন, তিনি এআই দিয়ে অভিনেতাদের প্রতিস্থাপনের ঘোর বিরোধী। তবে পোস্টপ্রোডাকশনে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার তাঁকে মুগ্ধ করেছে। ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল ব্যস্ত মহাসড়কের পাশের একটি মিনি গলফ মাঠে। শুটিংয়ের সময় গাড়ির শব্দে সংলাপ প্রায় শোনাই যাচ্ছিল না।

পরে আধুনিক এআইভিত্তিক অডিও টুল ব্যবহার করে সে শব্দ এমনভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে যে মনে হয় দৃশ্যটি একেবারে নিরিবিলি পরিবেশে ধারণ করা হয়েছে। আরাকির ভাষায়, ‘ফলাফল ছিল অবিশ্বাস্য!’ তাঁর মতে, এ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে স্বল্প বাজেটের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে।

‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’ সিনেমার প্রিমিয়ারে কুপার হফম্যান ও চেজ সুই ওয়ান্ডার্স। এএফপি

‘আই ওয়ান্ট ইয়োর সেক্স’ শুধু যৌনতা বা বিতর্কের ছবি নয়; বহু বছর অর্থের অভাবে আটকে থাকা একটি স্বাধীন চলচ্চিত্র কীভাবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকেও বদলে নেয়, সে গল্পও এটি। একসময় যে চিত্রনাট্য প্রযোজকদের আগ্রহ পায়নি, সেটিই এখন হলিউডের সবচেয়ে আলোচিত ছবিগুলোর একটি।

যেভাবে ঘনিষ্ঠ দৃশ্যের শুটিং
ছবির ঘনিষ্ঠ দৃশ্যগুলো কীভাবে ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে মুখ খুলেছেন ছবির অন্তরঙ্গ দৃশ্য সমন্বয়কারী (ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটর) ইয়েহুদা ডুয়েনিয়াস। তাঁর ভাষ্য, ছবির অভিনেতা অলিভিয়া ওয়াইল্ড ও কুপার হফম্যান প্রতিটি দৃশ্যের আগে ‘ব্যথার মাত্রা’ নির্ধারণের বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। লস অ্যাঞ্জেলেসে ছবির প্রিমিয়ারে ভ্যারাইটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডুয়েনিয়াস জানান, ছবির কয়েকটি দৃশ্যে চরিত্রের সম্পর্ক ফুটিয়ে তুলতে শারীরিক আঘাতের অভিনয় ছিল। সে সময় তাঁরা ১ থেকে ১০ পর্যন্ত একটি ‘পেইন স্কেল’ ব্যবহার করতেন। ডুয়েনিয়াসের মতে, এ পদ্ধতি অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ সহজ করেছে। একই সঙ্গে দৃশ্যগুলো বাস্তবসম্মত দেখানোর পাশাপাশি নিরাপদ পরিবেশও নিশ্চিত করেছে।

বিতর্কিত ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নিয়ে মুখ খুললেন কিয়ারা, বললেন...

ছবিতে কুপার হফম্যান অভিনয় করেছেন সদ্য কলেজ পাস করা তরুণ এলিয়ট চরিত্রে। তিনি এক প্রভাবশালী গ্যালারি–মালিক এরিকা ট্রেসির (অলিভিয়া ওয়াইল্ড) সঙ্গে জটিল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ ছবির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয় করেন কুপার। অভিজ্ঞতাটি সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘ভয় লাগছিল, কিন্তু ভয় পেয়েই থেমে থাকলে চলবে না। নতুন কিছু করার সাহস থাকতে হয়।’ ডুয়েনিয়াসও বলেন, কুপার শুরু থেকেই জানতেন, কাজটি তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে। কিন্তু ভয়কে বাধা হতে দেননি; বরং তিনি জানতে চাইতেন, কীভাবে দৃশ্যগুলো আরও ভালোভাবে করা যায়।

গ্রেগ আরাকি তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাহসী বিষয়বস্তুর জন্য পরিচিত হলেও এবারই প্রথম কোনো ছবিতে ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটরের সঙ্গে কাজ করেছেন। ২০২৪ সালে এই পেশা যুক্তরাষ্ট্রের অভিনয়শিল্পীদের সংগঠন স্যাগ-আফট্রার স্বীকৃতি পাওয়ার পর হলিউডে এমন সমন্বয়কারীর উপস্থিতি ক্রমেই নিয়মিত হয়ে উঠেছে। ডুয়েনিয়াসের মতে, একজন ইন্টিমেসি কো-অর্ডিনেটরের কাজ অনেকটা স্টান্ট সমন্বয়কারীর মতো। তিনি বলেন, ‘অ্যাকশন দৃশ্যে নিরাপত্তার জন্য যেমন নানা প্রস্তুতি থাকে, তেমনি অন্তরঙ্গ দৃশ্যের ক্ষেত্রেও অসংখ্য বিষয় নিশ্চিত করতে হয়। দর্শক পর্দায় শুধু দৃশ্যটি দেখেন, কিন্তু এর পেছনে নিরাপত্তা ও পরিকল্পনার বড় একটি প্রক্রিয়া কাজ করে।’

ভ্যারাইটি, দ্য গার্ডিয়ান ও ভোগ অ্যারাবিয়া অবলম্বনে

Read full story at source